পুরাণে কথিত আছে, সুদামার পা ধুইয়ে দিয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। তাঁর শিষ্যদের পা ধুইয়ে দিয়েছিলেন যিশুও। বস্তুত খ্রিস্ট ধর্মে এই রীতি এখনও বহাল। পোপ নিজে জেলে গিয়ে সাজাপ্রাপ্ত বন্দিদের পা ধুইয়ে দেন।

মৃত্যুর দু’দিন আগে স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর শিষ্যদের পরম যত্নে খাইয়ে হাতে জল ঢেলে দিয়েছিলেন হাত ধোওয়ার জন্য। ভগিনী নিবেদিতা সঙ্কুচিত হওয়ায় যিশুর দৃষ্টান্তই দিয়েছিলেন তিনি। 

কুম্ভে গিয়ে সাফাইকর্মীদের পা ধুইয়ে দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদী। কিন্তু সাফাইকর্মীদের বড় অংশই তাতে আপ্লুত নন। তাঁদের বরং প্রশ্ন, সাফাইকর্মীদের প্রতি প্রধনমন্ত্রীর যখন এতই দরদ, তা হলে এখনও কেন সাফাইকর্মীদের সেপটিক ট্যাঙ্কে নেমে হাতে করে মল পরিষ্কার করতে হচ্ছে? কেনই বা ম্যানহোলে নেমে আবর্জনা সাফ করতে গিয়ে বিষাক্ত গ্যাসে সাফাইকর্মীদের মৃত্যু হচ্ছে?

সেপটিক ট্যাঙ্কে নেমে বা ম্যানহোলে নেমে আবর্জনা সাফ করতে গিয়ে বিষাক্ত গ্যাসে শুধু ২০১৮-তেই ১০৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ বছরের দু’মাসও যায়নি। তার আগেই মৃত্যুর সংখ্যা ১১ ছাপিয়েছে। সাফাইকর্মী আন্দোলনের জাতীয় আহ্বায়ক বেজওয়াড়া উইলসনের প্রশ্ন, ‘‘হাতে করে মল পরিষ্কার করা তো বেআইনি। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ সত্ত্বেও কেন এই প্রথা চলছে? প্রধানমন্ত্রী কেন গত পাঁচ বছরে এ নিয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি?’’

মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন ‘কর্মযোগ’ নামে একটি বই লিখেছিলেন নরেন্দ্র মোদী। উইলসনের অভিযোগ, ‘‘ওই বইতে মোদী হাতে করে মল পরিষ্কার করাতে ‘আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। আমি ওঁকে অনুরোধ করছি, কোনও মল সাফাইকারীকে প্রশ্ন করে দেখুন, তিনি অন্য লোকের মল সাফ করাকে দূরদূরান্ত থেকেও আধ্যাত্মিক বলে মনে করেন কি না!’’ 

রবিবার কুম্ভে মোদী নিজের হাতে সাফাইকর্মীদের পা ধুইয়ে দেওয়ার পর তাঁকে প্রায় গাঁধীর পরের আসনেই বসিয়েছিলেন বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ। কিন্তু সাফাইকর্মীদের বক্তব্য, প্রধানমন্ত্রীর এই আচরণ অম্বেডকরের নীতির বিরোধী। 

কারণ অম্বেডকর বলেছিলেন, ঝাড়ু ছাড়ো, কলম ধরো। বিরোধীদের অভিযোগ, সাফাইকর্মীদের পা ধোয়ানোর পিছনে মোদীর লক্ষ্য ছিল দলিত ভোট। আজ দলিত নেত্রী মায়াবতী বলেন, ‘‘ভোটের আগে প্রধানমন্ত্রী মোদী সঙ্গমে ডুব দিয়ে কি প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করার পাপ ধুতে পারবেন? নোট বাতিল, জিএসটি, হিংসা, জাতপাত, মেরুকরণ, স্বৈরতান্ত্রিক শাসন— এ সব ভুলে গিয়ে কি মানুষ বিজেপিকে 

ক্ষমা করবে?’’ উত্তরপ্রদেশে কংগ্রেসের রাজ্য সভাপতি রাজ বব্বরও বলেছেন, ‘‘নতুন নতুন পুজোর ধরন বার হচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখলাম, একজন মহিলা সাফাইকর্মীর পায়ের নূপুর খোয়া গিয়েছে। তিনি এফআইআর করবেন।’’

হাতে করে মল সাফাই নিষিদ্ধ করতে দু’বার আইন পাশ হয়েছে। একবার ১৯৯৩-এ, আর একবার ২০১৩-য়। প্রধানমন্ত্রীর গদিতে বসার পর স্বচ্ছ ভারত অভিযানে শৌচালয় তৈরির অভিযান শুরু করেন নরেন্দ্র মোদী। সাফাইকর্মীদের বক্তব্য, ৫ কোটি শৌচালয় তৈরি হয়েছে মানে ৫ কোটি সেপটিক ট্যাঙ্ক। কারা এ সব সাফ করবে? সরকারের একটি টাস্ক ফোর্সের সমীক্ষা, দেশে ৫৩ হাজার সাফাইকর্মী রয়েছেন, যাঁদের হাতে করে মল পরিষ্কার করতে হয়। কিন্তু সংগঠনের বক্তব্য, ওই সমীক্ষা দেশের তিন ভাগের এক ভাগ জেলায় হয়েছে। বাস্তবে এই ধরনের কর্মীর সংখ্যা প্রায় দেড় লক্ষ।