ভারতের প্রধানমন্ত্রী একজন ‘তুঘলক’। ভারতের প্রধানমন্ত্রী একটা ‘বোকা’। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ‘সক্ষমতা’ রয়েছে। কোনও কট্টর তৃণমূলী নন, তৃণমূলের মঞ্চে এসে রবিবার এই সব মন্তব্য করে গেলেন দেশের প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী যশবন্ত সিন্‌হা। বাজপেয়ী জমানার এই অর্থমন্ত্রী তীব্র আক্রমণ করলেন দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে এবং তাঁর সরকারের অর্থনীতিকে। তৃণমূলের ডিজিটাল সেলের মঞ্চে বসে যশবন্তের তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য, ‘‘আর একটা শেষ লড়াই আমার বাকি আছে।’’ একই মঞ্চে বসে অবশ্য রাজ্যের শাসক দলকে স্পষ্ট খোঁচা দিয়ে গেলেন কলকাতা হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি নাদিরা পাথেরিয়া।

 ‘আইডিয়া অব বেঙ্গল’— তৃণমূলের ডিজিটাল সেল আয়োজিত অনুষ্ঠানের পোশাকি নাম ছিল এটাই। সেলের দুই শীর্ষ পদাধিকারী সুপর্ণ মৈত্র এবং দীপ্তাংশু চৌধুরী বার বার বলছিলেন— কোনও রাজনৈতিক কর্মসূচি এটি নয়, মুক্ত আলোচনার পরিসর তৈরি করার প্রচেষ্টা মাত্র। কিন্তু যে মঞ্চে অতিথি যশবন্ত সিন্‌হার মতো প্রবীণ রাজনীতিক এবং প্রশ্নকর্তা তথা সঞ্চালকের ভূমিকায় সাংসদ তথা রাজ্যসভায় তৃণমূলের দলনেতা ডেরেক ও’ব্রায়েন, সেই মঞ্চে কথোপকথন যে রাজনীতির দিকে ঝুঁকবেই, তা বলাই বাহুল্য। ‘কালো টাকা এবং প্রতিশ্রুতিভঙ্গ’— চর্চার বিষয় ছিল এই। ফলে নরেন্দ্র মোদীর কঠোর সমালোচক যশবন্ত অত্যন্ত সাবলীল ছিলেন আলাপচারিতায়। ডেরেক-যশোবন্ত আলাপচারিতায় প্রথমেই আসে নোটবন্দির প্রসঙ্গ। ডেরেক মনে করান— নোটবন্দির কথা প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করার ঘণ্টা দেড়েকের মাথায় পর পর সাতটা টুইট করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা করেছিলেন, পদক্ষেপ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছিলেন। ডেরেকের কথা মেনে নিয়ে যশবন্ত বলেন, ‘‘আমি সত্যিই অবাক হই। অর্থনীতিবিদরাও বিভ্রান্ত ছিলেন। তাঁরাও বুঝতে পারছিলেন না, এর ফল দেশের অর্থনীতির জন্য ভাল হবে, না খারাপ। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখনই বুঝেছিলেন। তার জন্য তাঁকে কুর্ণিশ।’’

এতেই থামেননি যশবন্ত। নরেন্দ্র মোদীর ওই পদক্ষেপকে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, ‘‘নোটবন্দিকে কখনওই অর্থনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখবেন না। ওটা আপাদমস্তক রাজনৈতিক পদক্ষেপ।’’ সে প্রসঙ্গেই মহম্মদ বিন তুঘলকের কথা টেনে আনেন দেশের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। আক্রমণাত্মক মন্তব্যের আঁচ পেয়েই ডেরেক দ্বিতীয় বার তোলেন প্রসঙ্গটা। প্রধানমন্ত্রীকে কি তুঘলকের সঙ্গে তুলনা করছেন তিনি? প্রশ্ন করেন ডেরেক। দ্বিধাহীন যশবন্তের জবাব, ‘‘অবশ্যই! তিনি তুঘলকই। নোটবন্দিতেই সেটা প্রমাণ হয়েছে।’’

আরও পড়ুন: মোদীর উপর রাম-চাপ! রাজধানীতে ভিএইচপির সভায় সুর চড়াল সঙ্ঘও

২০১৪ সালের লোকসভা ভোটের আগে মোদী কালো টাকা ফেরানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আম জনতার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা করে ঢোকানোর অঙ্গীকার করেছিলেন। সে প্রসঙ্গ উঠতেই আরও আক্রমণাত্মক যশবন্ত। তিনি বলেন, ‘‘ওই সময়েই অনেকে আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন ১৫ লক্ষ টাকার বিষয়ে। আমি বলেছিলাম, বোকারা এই রকম প্রতিশ্রুতি দেয়।’’ আপনি কি তা হলে প্রধানমন্ত্রীকে ‘বোকা’ বলছেন? ঝটিতি প্রশ্ন ডেরেকের। যশোবন্তের সুকৌশলী জবাব, ‘‘তখন উনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না, প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী ছিলেন।’’

বাজপেয়ী জমানার বেশিরভাগ সময়টা জুড়েই যশবন্ত ছিলেন অর্থমন্ত্রী। শেষের দিকে বিদেশ মন্ত্রী ছিলেন। স্বাভাবিক ভাবেই এ দিনের আলোচনায় উঠে এসেছে সেই সময়ের কথা। উঠে এসেছে বাজপেয়ী এবং মোদীর তুল্যমূল্য বিচার। যশবন্ত সে প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘১৯৯৯ সালে বাজপেয়ীর নেতৃত্বে য সরকার গঠিত হয়েছিল, সেটাই ছিল ভারতের প্রথম জোট সরকার, যা পূর্ণ মেয়াদ ক্ষমতায় থাকতে পেরেছিল।’’ যশবন্তের ব্যাখ্যা, ‘‘এটা সম্ভব হয়েছিল অটলবিহারী বাজপেয়ীর দক্ষতা এবং উচ্চতার কারণে।’’ যশবন্তের মত, বর্তমান সরকারের আমলে একের পর এক সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব শেষ করে দেওয়া হয়েছে। ক্যাবিনেট, সংসদ, সুপ্রিম কোর্ট, নির্বাচন কমিশন, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক, সিবিআই, তথ্য কমিশন— সব প্রতিষ্ঠানকে খর্ব করে দেওয়া হয়েছে বলে যশবন্ত দাবি করেন। তিনি বলেন, বাজপেয়ী জমানায়, মন্ত্রিসভার সদস্যদের গুরুত্ব ছিল, এখন কারও গুরুত্ব নেই। নাম না করে মোদীকে তাঁর তীব্র কটাক্ষ, ‘‘অর্থমন্ত্রী জানতেন না যে, নোটবন্দি হচ্ছে। রাফাল চুক্তি নিয়ে অন্ধকারে ছিলেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী। জম্মু-কাশ্মীরে মেহবুবা মুফতির সরকার থেকে সমর্থন তোলার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কিছুই জানতেন না। আর বিদেশমন্ত্রীর অবস্থা তো আপনারা সবাই জানেন।’’

যশবন্ত সিন্‌হা এবং শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়— তৃণমূলের ডিজিটাল সেল আয়োজিত আলোচনা চক্রে এই দু’জনকে নিয়েই আগ্রহ ছিল সবচেয়ে বেশি। —নিজস্ব চিত্র।

দরজায় কড়া নাড়ছে লোকসভা নির্বাচন। যশবন্ত নিজে বিজেপি ছেড়ে দিয়েছেন ঠিকই। কিন্তু তাঁর ছেলে জয়ন্ত সিন্‌হা এখনও মোদী সরকারে মন্ত্রী। এমনই এক জটিল পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে এ বারের লোকসভা ভোটে তিনি কী অবস্থান নেন, তা নিয়ে জল্পনা রয়েছে রাজনৈতিক শিবিরে। সেই ধোঁয়াশাও এ দিন অনেকটাই স্পষ্ট করে দিয়েছেন যশবন্ত। মোদী সরকারের বিরোধিতাই তিনি করবেন, স্পষ্ট জানিয়েছেন যশবন্ত। তৃণমূলের হয়ে কি প্রচার করবেন? যশবন্তের জবাব, এই সরকারের বিরুদ্ধে প্রচার করার জন্য তাঁকে যেখানে ডাকা হবে, সেখানেই তিনি যাবেন।  যশবন্তের স্পষ্ট ঘোষণা, ‘‘২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের ফল বেরনোর পরে আমি পাকাপাকি ভাবে রাজনীতি থেকে অবসর নেব।’’ মোদী সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করাই তাঁর ‘শেষ লড়াই’, বুঝিয়ে দিয়েছেন প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী।

বাজপেয়ী জমানায় তিনি যেমন মন্ত্রী ছিলেন, তেমনই ছিলেন বাংলার বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। সহকর্মী মমতা কেমন ছিলেন? জানতে চেয়েছিলেন ডেরেক। যশবন্ত একটা ঘটনা উল্লেখ করলেন। বললেন, ‘‘১৯৯৯ সাল, ডিসেম্বরের শেষ দিক। কাঠমান্ডু থেকে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের বিমান অপহরণ করে কন্দহরে নিয়ে গিয়েছে জঙ্গিরা। জরুরি বৈঠক ডাকলেন প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ী। বৈঠকে ঢোকার সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার কিছু কথা হল। তার পরে বৈঠকে মমতা বললেন, যশবন্তজির সঙ্গে আমার কথা হয়ে গিয়েছে। আমরা দু’জন কন্দহর যেতে প্রস্তুত। আমাদের পণবন্দি হিসেবে আটকে রাখুক। বিমানের যাত্রীদের ছেড়ে দিক।’’ যশবন্তের মুখে এই আখ্যান শুনে বিস্ময় প্রকাশ করেন ডেরেক। সে বিস্ময়কে প্রশ্রয় দিয়ে মমতার প্রশংসায় মেতে ওঠেন যশবন্ত। নরেন্দ্র মোদীর সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে হলে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকাটা যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সে কথা একাধিক বার উচ্চারণ করেছেন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী।

আরও পড়ুন: ওয়েইসিকে ছাড়লেই সমর্থন, ভোটগণনার আগেই কেসিআর-কে প্রস্তাব বিজেপির

তবে তৃণমূলের ডিজিটাল সেল আয়োজিত গোটা অনুষ্ঠানটাতেই যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তথা তৃণমূলের প্রশংসা হয়েছে, এমন নয়। আলোচনাচক্রের দ্বিতীয় পর্বে চিকিৎসক রেজাউল করিম সমালোচনা করেন খোদ মুখ্যমন্ত্রীর হাতে থাকা স্বাস্থ্য দফতরের বেশ কিছু বিষয়ের। আর আলোচনা চক্রের শেষ পর্বে কলকাতা হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি নাদিরা পাথেরিয়া ছিলেন আরও চাঁছাছোলা। বাংলা ও বাঙালিকে তিনি কেন পছন্দ করেন— এই নিয়ে নিজের বক্তব্য শুরু করেছিলেন নাদিরা। বাংলার বহুত্ববাদী সংস্কৃতির প্রশংসা করছিলেন। তার পরে একই রকম সাবলীল ভঙ্গিতেই তৃণমূলের মঞ্চে বসে নাদিরা পাথেরিয়া জানিয়ে দেন— সিঙ্গুর পর্বটা তাঁর কাছে অত্যন্ত দুঃখজনক, ‘কর্মসংস্থানহীনতা’ তিনি মেনে নিতে পারেন না, আর যে বাঙালিরা বাইরে রয়েছে, তাঁদের ফিরিয়ে আনার (‘ওয়াপসি’) জন্য তৎপরতাও তাঁর পছন্দ নয়। যদি বাংলায় উপযুক্ত পরিস্থিতি তৈরি করা যায়, তা হলে বাইরে চলে যাওয়া বাঙালিরা নিজেরাই ফিরে আসবেন বলে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির মত।

আলোচনা চক্রের ওই শেষ পর্বেই অন্যতম বক্তা ছিলেন তৃণমূল সাংসদ সুব্রত বক্সি। ‘বহুত্ববাদ’ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে সুব্রতর ব্যাখ্যা— আগে রেড রোডে শুধু একটি ধর্মের অনুষ্ঠান হত। এখন রেড রোডে নমাজ হয়, দুর্গাপুজোর কার্নিভাল হয়, প্রজাতন্ত্র দিবস এবং স্বাধীনতা দিবস পালিত হয়। রেড রোডকে তৃণমূলের সরকার ধর্মনিরপেক্ষ করে তুলেছে— তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাখ্যা সুব্রত বক্সির।

 

(কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী, গুজরাত থেকে মণিপুর - দেশের সব রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ খবর জানতে আমাদেরদেশবিভাগে ক্লিক করুন।)