×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১৭ মে ২০২১ ই-পেপার

‘তোমার নেতা আমার নেতা’ মুজিব

সেমন্তী ঘোষ
০৫ ডিসেম্বর ২০২০ ০০:০১

উনিশশো বাহাত্তরের জানুয়ারি মাস। শীত-সকালের জমাট কুয়াশা ভেঙে বেরিয়ে আসে আলো, আবার তা মিশে যায়, ত্বরিত বিকেলের হিমেল অন্ধকারে। পৃথিবী কি জানতে পারছে কী বিরাট ওলটপালট ঘটে যাচ্ছে গত কয়েক মাস ধরে, পূর্ব গোলার্ধের একটি মানবঘন কোণে? দেশ ভেঙে বেরিয়ে আসছে নতুন দেশ, জাতি ভেঙে আবার নতুন জাতি, নতুন নাম, নতুন নেতা, নতুন নাগরিক! ভারতের পুব সীমান্ত পেরিয়ে ঘরছাড়া মানুষজন ফিরতি পথ ধরছেন ঘরের দিকে। তফাত কেবল, চলে এসেছিলেন তাঁরা যে দেশ ছেড়ে, ফিরছেন একটা নতুন দেশে! অসম্ভব আকাঙ্ক্ষায় উদ্বেলিত, আশঙ্কায় উদ্‌ভ্রান্ত তাঁদের মন। ভাঙা-গড়ার দোলায় দুলছে বাংলা আর বাঙালি।

যে পথে ফিরে যাচ্ছেন তাঁরা, তার দু’পাশ জুড়ে ছড়িয়ে আছে মহাযুদ্ধের চিহ্ন। ‘‘গোলাগুলির দাগ। ভাঙা সেতু। বিকল্প পথ। পাকিস্তানিদের তৈরি বাঙ্কার। ভারতীয় বা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ছাউনি।’’ চার দশক পরেও আনিসুজ্জামানের স্মৃতিতে উজ্জ্বল সেই দিনের ফেরার পথের ছবি। (বিপুলা পৃথিবী) পদ্মার উপর ৮ জানুয়ারির সন্ধ্যার অন্ধকার হব-হব, দোকানে গুনগুন রেডিয়ো— হঠাৎ শোনা গেল জনতার কলরোল, ‘জয় বাংলা’ উল্লাস! কী হল, কী ব্যাপার?

রেডিয়োয় ঘোষিত হয়েছে তখনই— বঙ্গবন্ধু মুক্তি পেয়েছেন পাকিস্তানের কারাগার থেকে।

Advertisement

বঙ্গবন্ধু! বাংলার বন্ধু, শেখ মুজিবুর রহমান, নতুন জন্মানো ওই দেশটির ‘পিতা’! উদ্বেল হবে না মানুষ? তারকাসুলভ রাজনৈতিক নেতা খুব বেশি তো পায়নি বাঙালি, তার সমগ্র ইতিহাস জুড়ে। এই মানুষটি নিঃসন্দেহে সেই গৌরবময় অভিধার অন্যতম দাবিদার, নেতাজির পরে। বাংলার মাটি কাঁপিয়ে ন’মাসের তীব্র যুদ্ধের শেষে যে স্বাধীনতা পেয়েছিল পুব বাংলার বাঙালি, তার প্রধান কারিগর তিনিই।

এই বছর তাঁর শতবর্ষ। এই সবই চেনা কথা, জানা ইতিহাস— তবু শতবর্ষে এসে ফিরে ভাবতে ইচ্ছে করে, যতটা বলা হয়, ততটাই কি তিনি? তত বড় নেতা? জাতির জনক, সত্যিই? জিন্নাও তো পাকিস্তানের ‘জনক’। বাংলার শেখ মুজিব কি পাকিস্তানের জিন্নার মতো?

না, শেখ মুজিবের সঙ্গে জিন্নার তুলনা চলে না। জিন্না করতেন ‘আর্মচেয়ার পলিটিক্স’। মুজিব মাঠেঘাটে ঘাম ঝরিয়ে রাজনীতি করা মানুষ। জিন্নার মতো নেতারা মানুষের ‘উপরে’ নিজেদের রাখতেন। মুজিবের মতো নেতারা মানুষের ‘মধ্যে’ মিশে যান, মানুষের আবেগের সঙ্গে নিজের আবেগকে ওতপ্রোত জড়িয়ে নেন। এমন যাঁরা হন, তাঁরা কেবল নেতা নন, তাঁরা যেন রূপকথার নায়ক। জিন্নারা দেশ তৈরি করেন রাজনীতির প্যাঁচ-পয়জার দিয়ে। আর মুজিবরা, রক্তকণিকা আর অশ্রুজল দিয়ে দেশ বানিয়ে তোলেন, অত্যাচারিত, নিপীড়িত সমাজের দেশ। এ কেবল আবেগের কথা নয়, আক্ষরিক ভাবে সত্যি কথা। সত্যিই তাঁর রাজনীতিতে মিশে আছে হাজার মানুষের চোখের জল, দেহের রক্ত। সেই দিক দিয়ে তাঁর সঙ্গে বরং তুলনা চলতে পারে হয়তো গ্যারিবল্ডির কিংবা নেলসন ম্যান্ডেলার। মুজিব বিষয়ে তথ্য জানতে, মুজিবকে সমর্থন করা থেকে সরিয়ে আনতে কত মানুষকে দিনের পর দিন অমানবিক শারীরিক অত্যাচার করা হয়েছে, আজকের এই হিংসা-অধ্যুষিত দিনেও পশ্চিম পাকিস্তানি সেনা অফিসারদের সেই নির্মমতার কাহিনি শুনলে অসুস্থ লাগে। মুজিব যে শেষ পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সাড়ে তিন বছর কাটিয়ে, তার পর এক দিন— ১৯৭৫ সালের ১৫ অগস্ট— আততায়ীর কোপে প্রাণ হারালেন— তা তো এই রূপকথারই সমাপন। তাঁর মতো নেতার কি এমন মৃত্যুই বরাদ্দ ছিল না?

একটা দেশকে লড়াইয়ের জন্য তৈরি করা সহজ কথা নয়। পাকিস্তানের জন্মের পর যে অত্যন্ত জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয় পূর্ব পাকিস্তানে, এক হাতে তার জট ছাড়াতে ছাড়াতে, আর এক হাতে সেই জটিলতাকে মূলধন করে একটা বিস্ফোরক আন্দোলন তৈরি করার কাজটা সহজ ছিল না সে দিন। বাংলাদেশ তৈরির লড়াইকে গোটা বিশ্বের কাছে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ আন্দোলন হিসেবে না দেখিয়ে, একটা ‘মুক্তিযুদ্ধ’ হিসেবে দেখানো— সামান্য কাজ ছিল না।

এই কাজে মুজিবের প্রধান মূলধন ছিল তাঁর স্বাভাবিক রাজনৈতিক অন্তর্দৃষ্টি। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ থেকে পরের জানুয়ারি অবধি পাকিস্তানি কারাগারের বন্দিত্ব নিয়ে তিনি পরে একটা কথা বলেছিলেন— অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘‘সে দিন আপনি কেন ওদের হাতে ধরা দিলেন?’’ মুজিবের উত্তর— প্রথমত, তিনি ধরা না দিলে তাঁর খোঁজে আরও অনেক লোককে খুন করা হত। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক ভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী ও ভারতের ক্রীড়নক বলে প্রমাণ করার চেষ্টা চলত। তৃতীয়ত, ‘‘একটা কথা বলি, তোমরা কেমন ভাবে নেবে জানি না, তবে আমার সুদৃঢ় বিশ্বাস, আমি পাকিস্তানিদের হাতে বন্দি থাকায় আমার দুঃখী বাঙালিদের মধ্যে দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ যেমন বেড়েছে, তেমনি মানুষ আমার অনুপস্থিতিতে আমার একটা বিশাল প্রতীক মনে মনে তৈরি করে নিয়েছে। এটা ছিল মুক্তিযুদ্ধের খুব বড় একটা শক্তি। আমি প্রবাসী সরকারে থাকলে শুধু প্রমাণ সাইজের মুজিবই থাকতাম। ওদের হাতে বন্দি থাকায় আমি বাংলাদেশের সকল মানুষের প্রাণপ্রিয় নেতার ভূমিকায় স্থান পাই। মানুষ আমার নাম নিয়ে হেলায় হেসে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে। ওরা আমাকে যদি মেরে ফেলত, আমি আরও বড় প্রতীকে পরিণত হতাম। বাংলার মানুষ আরও লড়াকু হয়ে যুদ্ধ করত!’’ (বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলাপ এবং প্রাসঙ্গিক কথকতা, শামসুজ্জামান খান)

এই একটি কথায় ধরা পড়ে মানুষের মনের সঙ্গে তাঁর আন্তরিক যোগ। বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা প্রশিক্ষিত সৈনিক ছিলেন না। তাঁদের না ছিল অস্ত্র, না ছিল যুদ্ধের উপযোগী সাজসরঞ্জাম, জামাকাপড়, খাবার-ওষুধ-আশ্রয়। পায়ে হেঁটে, কাদাজল পেরিয়ে, হেমন্তে-শীতে খালি গায়ে সাধারণ বাঙালির এই ঐতিহাসিক যুদ্ধ সম্ভব হত না তাঁদের আশ্চর্য মনোবল না থাকলে। কী করে এল এই মনোবল? এল কোনও প্রতীক থেকেই, কোনও এক অনুপস্থিত নেতার প্রতি তাঁদের আপ্রাণ প্রতিশ্রুতি থেকে। এই নেতারই নাম মুজিব। তাঁর নাম ধরে উচ্চারিত হত যুদ্ধের স্লোগান: ‘তোমার নেতা আমার নেতা শেখ মুজিব শেখ মুজিব’, ‘বঙ্গবন্ধু এগিয়ে চলো আমরা আছি তোমার সাথে’। ১৯৬৯ সাল থেকে দিগন্ত-কাঁপানো ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল মুজিবের অবয়ব। হাতে বাঁশের লাঠি, মুখে তাঁর দেওয়া ‘জয় বাংলা’ স্লোগান, একটা জাতি যেন ফুঁসে উঠল তাঁর নামে শপথ নিয়ে।



ইন্দিরা গাঁধীর সঙ্গে।

মুজিবের আর এক মূলধন— বাগ্মিতা। ৭ মার্চে ঢাকার সেই ঐতিহাসিক ভাষণ আধুনিক কালের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতার মধ্যে জায়গা করে নেয়। আবেগ-উদ্দীপিত বাক্য, সোজা-সোজা শব্দ যেন তিরের ফলার মতো গেঁথে যায় বিদ্রোহী বিক্ষুব্ধ দেশের কোণে কোণে— ‘‘ভায়েরা আমার’’ বলে সেই সম্বোধন, ‘‘এ বারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এ বারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’’ সেই ডাক। ‘‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে, তাই দিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা কিছু আছে আমি যদি হুকুম দেবার না-ও পারি তোমরা বন্ধ করে দেবে।’’ অসংবদ্ধ বাক্যগঠন, স্থানিক ভাষা। কিন্তু এটাই পুব বাংলার মানুষের প্রাণের ভাষা। সোজা গিয়ে তা মর্মস্থলে বিঁধবে, জানতেন মুজিব। নিজেকে তিনি নামিয়ে আনতেন, ভাসিয়ে নিতেন মানুষের স্রোতে, তাঁদের উপরে নিজেকে রাখতেন না। তাঁর বাগ্মিতা অপূর্ব, কিন্তু তাতে আনুষ্ঠানিকতা নেই। ‘‘আমাদের কেউ দাবায়ে রাখতে পারবা না’’— বাংলা ভাষায় এর তুল্য সংগ্রামী বার্তা আর আছে কি?

আর এক জরুরি মূলধন ছিল, আত্মত্যাগের সাহস, এমনকি দুঃসাহস। কৈশোর থেকে শুরু করে কত সময় যে মুজিব কারাগারে কাটিয়েছেন, ইয়ত্তা নেই। চল্লিশের দশকে, পঞ্চাশের দশকে, ষাটের দশকে। পাকিস্তান আন্দোলনের জন্য তাঁর নেতা সুরাবর্দির সঙ্গে জানপ্রাণ দিয়ে খেটেছেন, মুসলিম লীগের যুবকর্মী হিসেবে সারা বাংলা চষে বেড়িয়েছেন। তবুও পাকিস্তান হওয়ামাত্র সরকারের বিষনজরে পড়েছেন তিনি, একের পর এক গ্রেফতারের পালা। ১৯৪৭ থেকে ১৯৪৯-এর মধ্যে তিন-তিন বার জেলে গিয়েছেন, কত বার একাকী বন্দি বা সলিটারি কনফাইনমেন্ট-এ থেকেছেন। সম্প্রতি প্রকাশিত মুজিবের কারাগারের রোজনামচা বইটিতে ১৯৫৪ সাল থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত বারবার বিভিন্ন অভিযোগে তাঁর কারাবাসের সময়ের ডায়েরি পড়তে পাই আমরা। বইটির শেষ এন্ট্রিটি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার। ১৯৬৮ সালের ১৭ জানুয়ারি গভীর রাতে তাঁকে এক জেল থেকে মুক্ত করে কারাগারের গেট দিয়ে বার করতেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ষড়যন্ত্রের ভুয়ো অভিযোগে তাঁকে আবার গ্রেফতার করে। মানুষ জানতেও পারে না যে, তিনি বেঁচে আছেন না নেই।

১৯৬৯ সালে ৫ ডিসেম্বর তারিখটি লাল কালিতে রাঙিয়ে রাখার মতো। তাঁর প্রিয়তম নেতা শহিদ সুরাবর্দির মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত সভায় বঙ্গবন্ধু পূর্ব বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তানের একটি নতুন নাম দিলেন: বাংলাদেশ। বললেন, ‘‘এক সময় এ দেশের বুক হইতে, মানচিত্রের পৃষ্ঠা হইতে ‘বাংলা’ কথাটির সর্বশেষ চিহ্নটুকুও চিরতরে মুছিয়া ফেলার চেষ্টা হইয়াছে। ... একমাত্র বঙ্গোপসাগর ছাড়া আর কোন কিছু নামের সঙ্গে ‘বাংলা’ কথাটির অস্তিত্ব খুঁজিয়া পাওয়া যায় নাই। জনগণের পক্ষ হইতে আমি ঘোষণা করিতেছি আজ হইতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির নাম ‘পূর্ব পাকিস্তান’-এর পরিবর্তে শুধুমাত্র ‘বাংলাদেশ’।’’

**

পাকিস্তান চেষ্টা করেছিল ‘বাংলা’ কথাটা মুছে ফেলতে— নিজেই বলেছেন মুজিব। আক্ষরিক ভাবে সত্যি। এই বাংলা ভাষা, বাংলা সমাজ, বাংলা দেশকে ফিরিয়ে আনার জন্যই তো ১৯৪৭ সালের ১৫ অগস্ট পেরোতে না পেরোতে তাঁদের সংগ্রাম শুরু হয়েছিল। তবু একটা কথা থেকেই যায়। পূর্ব পাকিস্তানের স্রষ্টারা, শেখ মুজিব ও অন্যান্যরা ১৯৪৭ সালের আগেও পাকিস্তান আন্দোলনে ঘাম ঝরিয়ে সফল হয়েছিলেন। তবে কি অবাঙালি মুসলিমদের ফন্দি বুঝতে পারেননি তাঁরা? না কি ভুল করে এই ফন্দির সঙ্গে তাল মিলিয়েছিলেন? না কি, তাঁদের এমন কোনও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, যা পূর্ণ করা হয়নি?

এ সব খুব গুরুতর প্রশ্ন। কেবল শেখ মুজিব কেন, বাঙালি মুসলিমকে বুঝতে গেলেই এই প্রশ্ন তলিয়ে বোঝা দরকার। আর এই প্রসঙ্গেই বলতে হয় শেখ মুজিবের অসমাপ্ত আত্মজীবনী-র কথা। মাত্র কয়েক বছর আগে আমাদের হাতে এসেছে এই বই। জরুরি বইটি পড়ে আমরা আজ বুঝতে পারি, ১৯৪০-এর দশকে তরুণ মুজিবরা কী চাইছিলেন, ‘মুসলিম’ ও ‘বাঙালি’ এই দুই পরিচয়কে মিলিয়ে কেমন একটা আলাদা আইডেন্টিটি, আলাদা রাজনীতি ও সংস্কৃতি তৈরি করছিলেন। তাঁদের সেই ভাবনা ভাল ছিল না মন্দ, ঠিক ছিল না ভুল, হিন্দুরা মুসলমানদের নিচু চোখে দেখত বলে তার প্রতিক্রিয়া, না কি নিজেদের গোঁড়ামি-প্রসূত বিচ্ছেদ-আকাঙ্ক্ষা— সে সব তর্ক থাকুক। কিন্তু মুজিবের হাত ধরেই যদি মুজিবদের বুঝতে চেষ্টা করি, দেখব, ‘বাঙালি মুসলমান’ বলে একটি সমাজ সে দিনও ছিল, আজও আছে। তার সঙ্গে বাঙালি হিন্দু সমাজের দূরত্ব সে দিনও অনুভূত হত, আজও হয়। ফলে অন্য বিচারের আগে মেনে নেওয়া দরকার যে, এই আইডেন্টিটি তাঁরা শূন্য থেকে তৈরি করেননি, সেটা বরাবরই ছিল। তার সামাজিক স্বীকৃতিটা ছিল না, রাজনীতিটা তো ছিলই না। তরুণ মুজিবদের আগেই ১৯২০-৩০ এর বাঙালি মুসলিম নেতারা সেটা তৈরি করতে শুরু করেছিলেন— ফজলুল হক, শহিদ সুরাবর্দি। বাংলায় তাঁরা এমন সরকার, এমন রাজনীতি, এমন সমাজ চেয়েছিলেন, যেখানে মুসলিমদের কেউ নিচু চোখে দেখবে না, মুসলিম সংস্কৃতিকে হেয় করা হবে না। যেখানে মুসলিম ছেলেরা নির্ভয়ে নিশ্চিন্তে সামাজিক কাজকর্মে নেতৃত্ব দিতে পারবে।

ফলে, আমরা পড়ি অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে— কী ভাবে সুরাবর্দির মুখ্যমন্ত্রিত্বে বাংলায় দুর্ভিক্ষের সময়ে লঙ্গরখানা খোলার উৎসাহে মুজিবরা দিনরাত কাজ করতেন। কোনও দিন রাতে বাড়ি ফিরতেন, কোনও দিন মুসলিম লীগ অফিসেই টেবিলে শুয়ে রাত কাটাতেন। গাঁয়েগঞ্জে শহরে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে মানুষকে সাহায্য করার এই প্রবল উৎসাহ বাড়ির লোক কী ভাবে দেখতেন? মুজিবের আব্বা বলতেন, ‘‘বাবা, পাকিস্তানের জন্য কাজ করছ, সে তো সুখের কথা, কিন্তু লেখাপড়া করতে ভুলিও না।’’ অন্যরা আব্বাকে বলত, তাঁর ছেলে যা করছে, তাতে তার জেল হবেই। তিনি উত্তর দিতেন, ছেলে তো ‘দেশের কাজ’ করছে, এতে খারাপ কী। ‘দেশ’ যে কী এবং কোথায়, তার একটা অদ্ভুত মিশ্র ধারণা তৈরি হয়েছিল এই সময়কার বাঙালি মুসলমানের মনে— একটা ছবি, বাংলার ছবি, যেখানে বাঙালি মুসলমান তার অনেক দিনের অপেক্ষা সফল করে সম্মানজনক নাগরিকতা পাবে, এই হল সে দেশের আকাঙ্ক্ষা।

একটা সময় এল, মধ্য-চল্লিশের দশকে, যখন ‘শের-এ-বাংলা’ ফজলুল হকের উপরে মুসলিম লীগ নেতারা ও কর্মীরা বেশ চটা, কেননা তিনি লীগ ত্যাগ করেছেন, পাকিস্তানের কথা না বলে অন্য কথায় জোর দিচ্ছেন ইত্যাদি। রাতের বেলার ঘরোয়া আলোচনায় বাবার কাছে হক সাহেবকে নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতেন মুজিব। আর বাবা বলতেন, ‘‘বাবা, যাহাই করো, হক সাহেবের বিরুদ্ধে কিছু করিও না।’’ মুজিব বুঝতে পারছিলেন, ফজলুল হক এমনি এমনি শের-এ-বাংলা হননি, ‘‘বাংলার মাটিই তাঁকে ভালবেসে ফেলেছিল’’। বাড়িতে তিনি আলোচনা শুনেছিলেন, ‘‘জিন্না কে? তার নামও তো শুনি নাই। আমাদের গরিবের বন্ধু হক সাহেব। তিনি যদি পাকিস্তান না চান, আমরাও চাই না।’’ মুজিব এর থেকে একটা দামি শিক্ষা পেয়েছিলেন সে দিন। কেন পাকিস্তান, কী তাঁদের আসল লক্ষ্য— তার একটা দিশা মিলেছিল। সেই দিশার কেন্দ্রে ছিলেন বাংলার শিক্ষালোকবঞ্চিত অভাবী দরিদ্র মুসলিম মানুষ— যাঁদের কথা বাঙালি হিন্দু নেতারা মনে রাখেননি, রাখেন না। পাকিস্তান নেহাত উপলক্ষ মাত্র।

হক সাহেব ছাড়া আর যাঁর প্রবল প্রভাব মুজিবের মনটি তৈরি করে দিয়েছিল, তাঁর নাম শহিদ সুরাবর্দি। পাকিস্তানকে জনগণের আন্দোলনে পরিণত করেছিলেন আবুল হাশিমের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তাঁর শহিদ সাহেব— এই ছিল তাঁর উপলব্ধি। এঁদের ছাড়া বাকি যে মুসলিম লীগ, তা হল সুবিধেবাদীদের পার্টি, জোতদারদের স্বার্থ রক্ষাই তাঁদের কাজ। বাংলার কৃষক, বাংলার যুবক ও ছাত্রদের জন্যই বাঙালি মুসলমানের পাকিস্তান চাওয়া, নয়তো বাংলায় পাকিস্তানের পা-ও পড়ত না। আর এই মানুষগুলির যত-না পরিচয় মুসলিম হিসেবে, তার চেয়ে বেশি তারা— বাঙালি!

মুসলিম লীগের ‘‘নেতাদের আমরা বাধা দিতে চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু সম্পূর্ণরূপে পরাজিত করিতে পারি নাই। যার ফলে পাকিস্তান হওয়ার সাথে সাথেই এই খান বাহাদুর ও ব্রিটিশ খেতাবধারীরা তৎপর হয়ে উঠে ক্ষমতা দখল করে ফেলল।’’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী) এই জন্যই পূর্ব পাকিস্তান প্রথম থেকে দেখল বাঙালি নেতাদের বিক্ষুব্ধ প্রতিবাদ। সেই প্রতিবাদ আর সংগ্রামের ফসল— চব্বিশ বছর পরের নতুন দেশ— বাংলাদেশ!

**

ধিকিধিকি ফুলকি ছড়িয়েই ছিল। আগুন জ্বলে উঠল ১৯৪৮ সালে, যখন পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা ও পূর্ব পাকিস্তানের কিছু মুসলিম লীগ নেতারা স্থির করলেন, দেশের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। পূর্ব পাকিস্তান অনেক দূরে হলেও সেখানকারই জনসংখ্যা বেশি, তাঁদের ভাষা বাংলা, তবু উর্দু কেন? ‘‘আমরা সভা করে প্রতিবাদ শুরু করলাম। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চকে বাংলা ভাষা দিবস ঘোষণা করা হল। জেলায় জেলায় আমরা বের হয়ে পড়লাম। মুসলিম লীগের ছাত্ররা আমার সভায় গোলমাল করার চেষ্টা করলে খুব মারপিট হয়, অনেকে জখমও হয়। তারা সভা ভাঙতে পারে নাই, আমি শেষ পর্যন্ত বক্তৃতা করলাম।’’

আওয়ামী লীগ গঠন এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে তার টানা সংঘর্ষ, ষড়যন্ত্র, রক্তাক্ত আঘাত-প্রত্যাঘাত, এ সবেরই মূল বোঝা যায় এই বর্ণনা থেকে। প্রথম থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের সমাজের একাংশ যেমন বাঙালিত্বের পরিচয়ে প্রাণ পর্যন্ত দিতে রাজি, অন্য একাংশ সেই দাবিকে তার ইসলামি একত্বের উপর আঘাত ঠাউরে প্রতিরোধে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ইসলামের খাতিরে উর্দুকে নিজেদের ভাষা মেনে নিতে রাজি। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকেরা, নেতারা, সেনাকর্তারা সর্বতোভাবে তাতে ইন্ধন দিয়ে চলেছেন।

আর তার সঙ্গে মিলেছে গণতন্ত্র বনাম সেনাতন্ত্রের বিরোধ। এই জায়গাটায় শেখ মুজিবের অবদান অনন্য। পুব বাংলার মানুষের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে চাইলেন মুজিবরা, তাঁদের রচিত সংবিধান বলল গণতন্ত্রের কথা। আর উল্টো দিকে, দুই পাকিস্তানকে ইসলামের পরিচয়ে মেলাতে চাইলেন যাঁরা, তাঁরা গণতন্ত্রে ভয় পেলেন, তাই তাঁরা সেনা-একনায়কতন্ত্র চালু করলেন। সত্যিই তো, ধর্ম দিয়ে যদি বিবিধতা-সমৃদ্ধ সমাজকে শাসন করতে হয়, সামরিক একনায়কের চোখ-রাঙানি না হলে চলবে কেন!

শুরু হল আর এক লড়াই। ১৯৫৮ সালে সাধারণ নির্বাচনের পরিবর্তে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন নেমে আসার পর শেখ মুজিব হয়ে উঠলেন পূর্ব পাকিস্তানের অবিসংবাদী নেতা— অকুতোভয় প্রতিবাদী, জেদি, জঙ্গি। নিয়ে এলেন তাঁর ছয়দফা দাবি, পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের এক অসামান্য রাজনৈতিক চাল। সারা দেশ, বিশেষত গ্রামের মানুষ, প্রবল ভাবে উদ্দীপ্ত হয়ে উঠল তাঁর এই কর্মসূচিতে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পাকিস্তানের গণপরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে একাত্তরের জানুয়ারিতে বঙ্গবন্ধু ছ’ দফা-ভিত্তিক সংবিধানে অনুগত থাকার শপথ নিলেন। বিপদ বুঝে ৩ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান গণপরিষদকে স্থগিত করে দিলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনও কথাই বললেন না। ঢাকার রাস্তায়, অলিতে-গলিতে তখন নেমে এসেছে মানুষের ঢল। ১ মার্চ থেকে ব্যাপক ধরপাকড় চলল, ২৫ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীন দেশের ঘোষণা মুখে নিয়ে কারাবরণ করলেন— ন’ মাসের কারাবাস— ফিরলেন বাহাত্তরের ৮ জানুয়ারিতে।

তত দিনে বাংলার মাটি রক্তে ভাসিয়ে, অসংখ্য প্রাণ বলিদানের মূল্যে, লক্ষ লক্ষ নারীর মর্যাদাহানির পরে সফল হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীন হয়েছে বাংলাদেশ।

**

স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম প্রধানমন্ত্রী হয়ে কী দেখলেন মুজিব? দেখলেন, সাম্প্রদায়িক দল মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে এ ধারে ও ধারে। ‘‘এ এক নতুন পরিস্থিতি। ইসলামি দলগুলি আমার বিরুদ্ধে গোপন প্রচার করছে, শয়তানের হাসি হাসছে। দেখেশুনে মনে হয়, তাজউদ্দিনের হাতে ক্ষমতা দিয়ে ভোলা বা মনপুরায় গিয়ে ছোট্ট ঘর বানিয়ে থাকি।’’

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গাঁধীর সহায়তা মুক্তিযুদ্ধের সাফল্যের বিরাট স্তম্ভ। কেবল তা-ই নয়। সেই বাহাত্তরের ৮ জানুয়ারি পাক জেল থেকে ছাড়া পেেয় শেখ মুজিব যখন লন্ডন হয়ে দিল্লিতে এলেন ১০ জানুয়ারি, তাঁর জন্য রাজকীয় অভ্যর্থনা বরাদ্দ রেখেছিলেন ইন্দিরা গাঁধী। হিসেব পরিষ্কার। ভারতের স্বীকৃতির পর নবজাত বাংলাদেশকে অন্যান্য দেশও স্বীকার করতে এগিয়ে আসবে। অথচ স্বাধীন বাংলাদেশে মুজিব কী দেখে গেলেন? দেখলেন, তাঁর বহু সহ-নাগরিক মনে করছিলেন ভারতের ক্ষমতার ছায়ায় ঢোকানো হচ্ছে বাংলাদেশকে। মুজিবের প্রতি ধারালো হচ্ছিল আক্রমণ। ইন্দিরাও সতর্কবার্তা পাঠিয়েছিলেন— মুজিবের উপর ব্যক্তিগত আক্রমণ হতে পারে!

ব্যর্থ হল কি এত যন্ত্রণাভোগ, এত দাম দেওয়া?

তবু আশা রাখেন মুজিব। মনে করেন, ‘‘অবাধ স্বাধীনতার আকস্মিক স্বাদ ও হাতে আসা নগদ অর্থ দিশাহারা করেছে অনেককে। ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় আইন-কানুন ও প্রতিষ্ঠান করে এদের দায়িত্ব-সচেতন করা হবে। দেশটা তো শুধু মধ্যবিত্তের না, গরিব দুঃখী মানুষের। তাদের অবস্থার পরিবর্তন যদি করতে পারি, তবেই অর্থনৈতিক মুক্তি আসবে। আমার দেশের মানুষ আমাকে জাতির পিতা বলে, কত জন আমার জন্য রোজা রেখেছে, জান দিয়েছে। আমার দায়িত্ব বড় বেশি।’’ (বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলাপ)

তাঁর আন্তরিকতা বিরোধীদেরও ছুঁয়ে যেত। সদ্য-প্রয়াত বামভাবাদর্শী সাহিত্যকর্মী আবুল হাসনাতের কথা পড়ি শামসুজ্জামান খানের বইতে। মুজিবের সমালোচক হয়েও তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের পর হাসনাত অভিভূত: ‘‘এ যে রাজনৈতিক জাদুকর। এত বড় নেতা, আন্তরিকতা দিয়ে আমাকে গলিয়ে ফেললেন!’’

অনেক সমালোচনার জায়গা ছিল বইকি। স্বাধীনতার পর একদলীয় শাসন প্রবর্তনকে এখনও মনে করা হয় মুজিবের বিরাট ভুল, অ-গণতন্ত্রের অভিমুখ। সামরিক বাহিনীর দৌরাত্ম্য, শ্রমিক বাহিনীর স্বেচ্ছাচার, কোনওটাই রোধ করতে পারেননি। অত্যধিক বিশ্বাসপ্রবণতায় ভুল মানুষের উপর বিশ্বাস রেখেছেন। তাজউদ্দিনের মতো বিরাট মাপের নেতাকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে ভয়ানক ভুল করেছেন। নির্ভরযোগ্য বিরোধী দল তৈরির পরিসর তৈরি করতে পারেননি, তাই মেরুকরণ ঘটেছে, নিজের দলের অবস্থানই দুর্বল হয়েছে। সব মিলিয়ে, একাত্তর-পূর্ব যুগের গণতন্ত্রের প্রধান প্রবর্তক একাত্তরের পর গণতন্ত্রকে সবলতা দিতে পারেননি— এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।

কিন্তু সেই না-পারার মূল্য চুকিয়েছেন নিজের প্রাণ দিয়ে। ১৯৭৫ সালে যখন আততায়ীর হাতে তাঁর প্রাণ গেল, বিমূঢ় নবজাত দেশটি আবার পাকিস্তানে মিশে যাবেই, এমন আশঙ্কা যখন দুনিয়াজোড়া, তার পরও যে বাংলাদেশ রয়ে গেল, বেঁচে গেল, সাম্প্রদায়িক ও সামরিক শক্তির বোঝাপড়া করতে করতে নিজের পায়ে শক্ত হয়ে দাঁড়াল— পূর্ব বাংলার মানুষের সেই মনের জোর, রাজনীতির জোর, সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা কি মুজিবের ঐতিহ্য থেকেই স্ফুরিত হয়নি? তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা কি সেই ঐতিহ্যের উপর ভর রেখেই দেশকে সাফল্যের মুখ দেখাননি? সামাজিক উন্নয়ন আর রাজনৈতিক স্থিতিতে দেশকে পৌঁছে দেননি? এ তো বঙ্গবন্ধুরই উত্তরাধিকার, তাঁর সর্বজনহিতের লক্ষ্য। ‘গরিব দুঃখী মানুষের মুক্তি’ নিয়ে তাঁর দুর্ভাবনার ফসল।

আসলে স্বাধীনতাই হোক, আর সর্বজনহিতই হোক, এ সবের উত্তরাধিকার বোধহয় অলক্ষ্য, অবয়বহীন। আপাত-ব্যর্থতা, সাময়িক পরাজয়, এমনকি নৈরাজ্য আর বিনাশের মধ্যেও তা লুকিয়ে বসে থাকে, অপেক্ষা করে চলে, সুযোগ পেলেই ছড়িয়ে যেতে থাকে, রাতারাতি উবে যায় না।

শেখ মুজিবের শতবর্ষে, বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছরের জন্মদিনের প্রাক্কালে, এই কথাটাই আবার নতুন করে বুঝে নেওয়ার।

Advertisement