E-Paper

বর্ণময়তার বেশে বর্ণহীন

অশোকের ছবিতে কাটা কাটা মুখ, টুকরো রঙের সঙ্গে আবার কোথাও একটা জোরালো ফ্ল্যাট রং অদ্ভুত সাহসিকতার পরিচয় দেয়।

শমিতা বসু

শেষ আপডেট: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৪২
বর্ণিল: অ্যাকাডেমিতে শিল্পী অশোক মল্লিকের প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম

বর্ণিল: অ্যাকাডেমিতে শিল্পী অশোক মল্লিকের প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম

যে শিল্পীর কাজ প্রথম থেকেই এম এফ হুসেনের নজর কেড়েছিল, তাঁর নাম অশোক মল্লিক। অশোকের ২০তম একক প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসে। হুসেন সম্ভবত তাঁর নিজের আঁকায় যে রকম গল্প বলার একটা ঢং রাখতেন, তার সঙ্গে অশোকের ছবির কিছু সাদৃশ্য লক্ষ করেছিলেন। অশোক মল্লিকের ছবি প্রধানত আখ্যানধর্মী।

গত বেশ কিছু বছরে অশোক মল্লিকের ছবিতে বিশেষ পরিবর্তন এসেছে। শিল্পী তাঁর ছবিতে কিছু কিছু পৌরাণিক কাহিনি বা চরিত্রের উপস্থিতি ছাড়াও আজকের জটিল জীবনের বিভিন্ন অধ্যায় বর্ণনা করেন। কিন্তু তাঁর কল্পচিত্রে এবং আঙ্গিকে প্রভূত পরিবর্তন এসেছে। সেই পরিবর্তন হল, ছবিতে মানুষ বা বস্তুর আপেক্ষিক দূরত্ব, পাত্রপাত্রী এবং পশুপাখিদের অবস্থান এবং রঙের বাহারে দৃশ্যপটটি বেশ চিত্তাকর্ষক করে তুলতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। দর্শককে ছবিগুলি ভাবায়, আবার কখনও দৃষ্টিবিভ্রমের‌ও সৃষ্টি করে।

অশোকের ছবিতে কাটা কাটা মুখ, টুকরো রঙের সঙ্গে আবার কোথাও একটা জোরালো ফ্ল্যাট রং অদ্ভুত সাহসিকতার পরিচয় দেয়। এই ব্যাপারটা কিছুটা যেন ইমপ্রেশনিস্টদের থেকে বেরিয়ে পল গগাঁর ‘দ্য ডে অব দ্য গড’ বা তাঁর নিজের প্রতিকৃতির কথা মনে করায়। কিন্তু আবার অশোক মল্লিকের বেশির ভাগ কাজে ভিসুয়াল অংশ মাত্র একটা থাকে না। একাধিক অংশ সুদক্ষ ভাবে জুড়ে যেন দর্শককে অন্য কোনও কথা ভাবতে বাধ্য করেন শিল্পী। এখানেই তাঁর আঙ্গিক সম্পূর্ণ ভাবে নিজস্ব। এই প্রসঙ্গে ওঁর ‘বারাণসী’ ছবিতে আমরা দেখি, সে শহরের প্রতীক একটি ষাঁড়ের প্রতিকৃতি। সামনে স্ট্রোকে কাজ করেছেন, কিন্তু কাশী বলতে মানুষ যে গঙ্গা বোঝে, সেই গঙ্গা হলুদ রঙে ফ্ল্যাট ভাবে রঞ্জিত এবং বেঁকে চলে গিয়েছে সেই সুদূরে, যেখানে বারাণসী শহরের ছোট ছোট বাড়িঘর দৃশ্যমান। ভাবনাটি চমৎকার।

আবার ‘মিউজিশিয়ান’ সিরিজ়ের দু’টি উল্লেখযোগ্য ছবি এখানে দেখা গেল। প্রথম ছবিতে এক বাজনদার কাজের ফাঁকে সোফায় বসে আছেন। পাশে রাখা উজ্জ্বল বাদ্যযন্ত্র স্যাক্সোফোন। পেশাদার বাজনদারের মুখের অভিব্যক্তিটি অসাধারণ। সেখানে আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ একটি মুখ কিন্তু চোখের দৃষ্টিতে সুপ্ত বেদনার ছাপ। স্ট্রোকে কাজ করেছেন, কিন্তু জায়গায় জায়গায় ফ্ল্যাট রং দিয়ে প্রেক্ষাপট সুন্দর ভাবে ভরেছেন। শুধু একটি মুখ দেখেই শিল্পীর প্রতিকৃতি আঁকার হাত কতটা পরিণত, সেটা বোঝা যায়।

এর পরের ছবি, যেটার নাম ‘ওয়েটিং ফর মর্নিং’, একদল পেশাদার বিশ্রামরত বাজনদার। বিভিন্ন ভঙ্গিমায় গানের যন্ত্রপাতি বুকে জড়িয়ে ঘুমন্ত অবস্থায় তাদের অসহায়তা যন্ত্রণাদায়ক বলে মনে হয়। দূরে দেখা যায় বড় পাঁচিলঘেরা বাড়ি, যেখানে তারা বাজাতে এসেছে। ছোটবেলায় শিল্পী হয়তো নানা জায়গায় ব্যান্ডের বাজনদারদের দেখেছেন, যারা তাঁর মনে একটা ছাপ ফেলেছিল। সেটাই অপূর্ব ভাবে উঠে আসে তাঁর নানা ছবিতে বারবার।

প্রদর্শনীতে শিল্পীর আত্মপ্রতিকৃতি দু’টিই উৎকৃষ্ট। এর মধ্যে যেটি সামনের দিকে মুখ করা, সেটির ট্রিটমেন্ট অত্যন্ত প্রশংসনীয়। অতি সামান্য রঙের ব্যবহারে কাজটি অসাধারণ বলে মনে হয়।

‘নস্ট্যালজিয়া’ ছবিতে এক পুরনো দিনের প্রাসাদোপম বাড়িতে ফেলে যাওয়া দেবীর চালচিত্র এবং পরিত্যক্ত বেদি দেখা যায়। উপরতলায় বারান্দার ঘেরাটোপ এবং এক বিশাল থেমে থাকা ঘড়ি। সেখানে হঠাৎ সকালের আলোটুকু নিয়ে এসেছে একটি পাখি। সেখানেই শিল্পী ফেলেছেন হাইলাইট। মিডলটোনে করা বাড়িতেতীব্র আলোটা বেশ দক্ষতার সঙ্গে ফেলেছেন।

যখনই প্রেমিক-প্রেমিকা এসেছে তাঁর ছবিতে, তাদের আজকের সভ্যতার মাঝখান থেকে সরিয়ে নিয়েছেন। যেন তাঁর বক্তব্য হল, নৃশংস, আত্মঘাতী, বিকিয়ে-যাওয়া এই সভ্যতায় প্রেমের কোনও স্থান নেই। সেখানে প্রকৃত ভালবাসায় মুখর এক নৈঃশব্দ্যের ছায়া।

এই প্রদর্শনীর সব ছবিই ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিকের কাজ। বহু ছবিতে নানা অবস্থানে বিশাল পাখি, বড় বাঘ, ঘোড়া ইত্যাদি প্রাণীরা যেন মুক্তির আস্বাদ চায়, বা দিতে পারে। পুরো ব্যাপারটাতেই যেন শহরের জীবন থেকে সরে এসে অন্য কোথাও যাওয়ার কথা ফুটে ওঠে। অশোক মল্লিকের শৈল্পিক সত্তা যেন শহুরে মানুষের কাছ থেকে দূরে, আরও দূরে গিয়ে বসবাস করতে চায়। আর পশুপাখিরা‌ই হচ্ছে স্বপ্নের এবং মুক্তির দূত।

‘স্লিপিং ইন নাইট’ ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিকে আঁকা ছবি। নির্জন অন্ধকারে পথচলার শেষে একান্ত শ্রান্তির চেহারা এঁকেছেন। নারী-পুরুষ, তাদের সন্তান, কুকুর সব একত্রে নিদ্রামগ্ন। একাধিক পরিবারের সদস্যরা পরম শান্তিতে নিদ্রায় তন্ময়। তাহলে কি প্রকৃতির বুকেই প্রকৃত শান্তি পাওয়া যায় বলে শিল্পী ভেবেছেন? এই ছবিটিতে রঙের বিভাজন ছাড়াও রচনাশৈলীটি অত্যন্ত উপভোগ্য।

অভিজ্ঞ শিল্পী অশোক মল্লিক অনেক প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছেন এর আগে। কলকাতা ছাড়াও দিল্লি, মুম্বই, হায়দরাবাদ, চেন্নাই, দুবাই এবং জাকার্তায় একক শো করেছেন একাধিক বার। দেশে এবং বিদেশে অসংখ্য দলীয় প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন। তাঁর মিউরাল আছে নিউ টাউনে। এ ছাড়া কলকাতার সঙ্গীত রিসার্চ অ্যাকাডেমিতে আছে অশোকের দেওয়ালচিত্র। মাইহারে একটি স্থাপত্যকলা সৃষ্টি করেছিলেন, ধাতুর বর্জিত অংশ বা ছাঁটকাট দিয়ে। অশোক মল্লিক যে একজন প্রতিষ্ঠিত ও দক্ষ শিল্পী, এই প্রদর্শনীতে তাঁর কাজে তারই যথাযথ পরিচয় মেলে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Academy of Fine Arts Artwork

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy