সম্প্রতি আয়োজিত হয়েছিল ‘সোসাইটি অব কনটেম্পোরারি আর্টিস্টস’-এর ৬৬তম বার্ষিক প্রদর্শনী। স্থান, অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসের নর্থ, ওয়েস্ট এবং নিউ সাউথ গ্যালারি।
এই আয়োজন কেবল কাজের সমাবেশ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘ যাত্রাপথের সঞ্চিত স্মৃতি। গ্রুপটির ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, এক সময়ে যুক্ত ছিলেন গণেশ পাইন, সুনীল দাস, বিকাশ ভট্টাচার্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীরা। সময়ের স্বাভাবিক পরিবর্তনে শিল্পভাষা বদলেছে। ভাবনার পরিসরও প্রসারিত হয়েছে। তবু ধারাবাহিকতার সুতোটি অটুট। পুরনো ও নতুনের মেলবন্ধনে এ বারের ১৮জন শিল্পী যেন সেই সময়ের সঙ্গেই কথোপকথনে বসেছেন।
গ্রুপের অন্যতম অভিজ্ঞ শিল্পী আদিত্য বসাকের রচনারীতির সঙ্গে পরিচিতি থাকলেও, প্রত্যেক বারই নতুন কিছু দেখার আগ্রহ তৈরি করেন। দু’টি বড় ছবি, একটি সাদাকালোর ছোট কাজ। তিনটি কাজের মধ্যেই তাঁর পর্যবেক্ষণের তীক্ষ্ণতা ধরা পড়ে। সাদা-কালোর জলরঙের ছবিটি নিত্য আকর্ষণের বস্তু। হঠাৎ বৃষ্টিতে প্লাস্টিকের থলি মাথায় দিয়ে বালকদের দৃশ্য যেন দৈনন্দিন জীবনে লুকিয়ে থাকা অস্থায়ী আশ্রয়। আবার ‘পিকিং’ শিরোনামের কাজে আলো–আঁধারির ফাঁকে উঁকি দেয় এক অদৃশ্য উত্তেজনা। ইঙ্ক, অ্যাক্রিলিক ও মিশ্র মাধ্যমের ব্যবহার কেবল কারিগরি দক্ষতা নয়, দৃষ্টির প্রশ্নও উত্থাপন করে। মানুষের স্বার্থান্বেষী কর্মকাণ্ডে, আড়াল থেকে হরিণের বিচরণ ক্ষেত্রের অনুসন্ধান— সব মিলিয়ে দেখা ও দেখা হওয়ার দ্বৈত অবস্থান শিল্পীর কাজকে মনস্তাত্ত্বিক স্তরে উন্নীত করে।
অতীন বসাকের গ্রাফিক্সে রয়েছে নির্মাণের ধৈর্য। এচিংয়ের উপরে টেম্পারার প্রলেপে একই মুখের থেকে একাধিক মুখ উদ্ধার করেন। প্রত্যাখ্যাত প্রিন্টও তাঁর কাছে নতুন সম্ভাবনা নিয়ে আসে। প্রিন্টিং ইঙ্কের উপর পুনরায় রং চাপানোর প্রক্রিয়ায় ভিন্ন মাত্রা যোগ হয়। অবয়ব এখানে স্থির নয়— এক অন্তর্লীন মানসিক চিত্র।
বিশিষ্ট ভাস্কর অখিল চন্দ্র দাসের ব্রোঞ্জে নাগাল্যান্ডের বীরগাথা এক কঠিন সত্যের সামনে দাঁড় করায়। বীরত্বের মুখোশের আড়ালে যে হিংসার ছায়া, তা বলিষ্ঠ ফর্মে প্রকাশিত। নাটকীয়তা নেই, আছে ইতিহাসের ভার। বিমল কুণ্ডুর মিক্সড মিডিয়ার কাজে দৈনন্দিন উপাদান নতুন অর্থ পায়। কাঠ, ধাতু ও পৃষ্ঠের ব্যবহারে তিনি সময়ের ক্ষয় ও স্মৃতির স্তরকে একত্র করেছেন। মনু পারেখের রঙের ব্যবহার বরাবরের মতোই উজ্জ্বল হলেও, এক আধ্যাত্মিক কম্পন বোধ হয়।
নামী জলরঙের শিল্পী প্রদীপ মৈত্রর রঙে নরম আলো ও বিস্মৃতির ছাপ মিশে যায় চারটি কাজে। গুরুত্বপূর্ণ কাজ পিতৃদেবের একটি ভাঙা চেয়ার— যেটি মূলত শিক্ষালয়ের প্রতীক। ইয়েলো অকারের বেসিক লেয়ার দিয়ে জমির ব্যবহার এবং কালো রং লাগানোর মিশ্র পদ্ধতি অন্ধকারে রহস্যজনক পরিপ্রেক্ষিত নির্মাণ করে। বইয়ের জগৎকে তিনি একটি দেশ হিসেবে কল্পনা করেন। বর্তমানে যার উপরে ক্রমশ কালশিটে পড়ে চলেছে। স্বচ্ছ জলরঙের মধ্যেও বাস্তবের কঠোরতা এড়ানো যায় না।
বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী গণেশ হালুইয়ের কাজের সামনে ভাষা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই নীরব হয়ে আসে। বাস্তব ও বিমূর্ততার সীমা অতিক্রম করে তিনি যে স্পেস নির্মাণ করেন, সেখানে রঙের মিতব্যয়িতা এক গভীর সুর তোলে। প্রদর্শনীতে পাখির অবয়ব কেবল চিহ্ন নয়, এক অন্তর্গত গমন। লালুপ্রসাদ সাউয়ের কালি-কলমের পার্শ্ববর্তিনী এবং পঙ্কজ পানোয়ারের মিশ্র মাধ্যমের বৃদ্ধ একটি যুগের প্রতিনিধি।
গ্যালারির সবচেয়ে বড় কাজ ‘সামওয়ান সামহোয়্যার’-এর শিল্পী অতনু ভট্টাচার্য। সম্পূর্ণ অবচেতন মন থেকে সাধারণত তিনি কাজ করেন। ইয়েলো অকার এমন একটি রং, যা প্রায় প্রতিটি শিল্পীর প্রিয় রং এবং প্রধান সাপোর্ট। এ ক্ষেত্রেও অতনু একই পন্থাবলম্বী। পাঁচ-ছ’টি লেয়ারের পরে, একটু সময় নিয়ে ছবির যাত্রাপথ আলোড়ন তৈরি করে। রং ঘষে তোলা, লাগানোর মধ্যে বহু বোধের ছায়া তৈরি হয়। ছবিতে রেখার ভিত বেশ গুরুত্ব নিয়েই এসেছে। কোথাও আর্কিটেকচারাল ফর্ম, ফিগারের আভাস যুক্ত হয়ে ক্লাসিক ছাপ রাখে।
ভোলানাথ রুদ্রর জলরঙে গতি নয়, আছে স্থির মনন। মূল ইমেজ টাট্টু ঘোড়ার কেন্দ্রীয় উপস্থাপন। ইয়েলোর নানা শেড এবং কমলার ব্যবহারে আলোকে ধরা বেশ শক্তিশালী কাজ। এ ক্ষেত্রে শিল্পী উত্তীর্ণ। রাজেন মণ্ডলের উডকাট প্রিন্টে রেখার দৃঢ়তা বিশেষ ভাবে লক্ষণীয়। সৌমেন খামুরাইয়ের ‘টেম্পেরা অন বোর্ড’ বৃহৎ পরিসরে প্রকৃতিকে বিমূর্ত রূপ দেয়। আশিস চৌধুরীর স্টোনওয়্যার সেরামিকস নির্মাণে ফর্ম ও টেক্সচারের ভারসাম্য লক্ষ্য করার মতো। শিরোনামহীন উডকাটের উপবিষ্ট অবয়বে শ্রীকান্ত পাল তুলে ধরেন সামাজিক অবস্থানের ব্যাকটেরিয়া।
ডেভিড মালাকারের কাজে ধাতব উপস্থিতি শক্তিশালী ভিসুয়াল ইমপ্যাক্ট তৈরি করে। পেপারের উপরে চারকোল, কন্টি, ক্রেয়ন ও অ্যাক্রিলিকের বেসিক টোনের ‘কীর্তন’ ছবিটি বিশেষ অর্থবহ। কীর্তনের যে মাহাত্ম্য আর বর্তমান ‘হরেকৃষ্ণ’ নামের উল্লাস যে মূলত ধর্মীয় বিভাজনের জয়গান, তারই ইঙ্গিত ছবি জুড়ে। শিল্পীর প্রতিটি কাজেই প্রতিবাদ উঠে এসেছে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে। বর্ষীয়ান ভাস্কর নিরঞ্জন প্রধানের উলম্ব ‘আধুনিকা’ (ফাইবার গ্লাস) শেষ সুরে এক উঁচু উচ্চারণ যোগ করে।
শুধু এক আনুষ্ঠানিক প্রদর্শনী নয়, সময়ের মুখোমুখি দাঁড়ানো যৌথ শিল্পের নিবিড় এক আত্মসমীক্ষা বলা চলে এই প্রদর্শনীকে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)