সমকালীন ভারতীয় শিল্পচর্চায় শেখর কর এক উল্লেখযোগ্য নাম। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিত্রকলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের সময়েই তাঁর শিল্পভাষার ভিত নির্মিত হয়। এক দিকে প্রাতিষ্ঠানিক অনুশীলনের শৃঙ্খলা, অন্য দিকে স্বীয় অভিব্যক্তির স্বাধীন বিকাশ— দুটোই সমান্তরাল ভাবে তাঁর কাজে প্রবাহিত হতে থাকে। বিভিন্ন গ্যালারিতে তাঁর একক ও দলগত প্রদর্শনী শিল্পজগতে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান এনে দেয় তাঁকে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও বহুমাত্রিক গ্রহণযোগ্যতার সাক্ষ্য বহন করে সেগুলি।
সম্প্রতি ২৩টি ছোট-বড় কাজ নিয়ে ‘গপ্পো বাড়ি’ ভবনে অনুষ্ঠিত হল শিল্পীর প্রদর্শনী। কিউরেটর পারমিতা বিশ্বাসের দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন ছিল শিল্প-সংস্কৃতির একটি গোষ্ঠী গড়ে তোলার। এক সময়ে তিনি ঘনিষ্ঠ ভাবে যুক্ত ছিলেন বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী শানু লাহিড়ী, কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মতো ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে। সেখান থেকেই প্রেরণা পেয়েছিলেন। নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তিনি বিদেশ থেকে ফিরে এসে এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে এই শিল্প পরিসরের উদ্বোধন করেন। তার সূচনাতেই বেছে নিলেন অন্যতম প্রিয় শিল্পী শেখর করকে।
শিল্পীর চিত্রভাষা প্রথম দর্শনেই এক নীরব সংবেদ তৈরি করে। তাঁর সেমি-রিয়্যালিস্টিক দৃষ্টিকোণের কেন্দ্রে রয়েছে নারীর মুখ। কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তির নয়, বরং এক সামগ্রিক স্মৃতি, সময় ও আবেগের রূপক। এই ফর্ম করতে গিয়ে যেমন ভাঙার চেষ্টা করেন শিল্পী, তেমনই স্পেসকেও ভাঙেন স্বচ্ছ স্তরবিন্যাসে। এতে জটিল মনস্তাত্ত্বিক পরিধি তৈরি হলেও, তার ভিতরে একটি অন্তর্মুখী প্রাণকে অনুভব করা যায়। রং এখানে বিভিন্ন অনুভূতির ধারক হলেও, ছবিতে একটা আলঙ্কারিক রেশও সৃষ্টি হয়। সাধারণত একটি ডার্ক টোন দিয়ে শিল্পী তাঁর কাঙ্ক্ষিত মেজাজে পৌঁছন।
অ্যাক্রিলিকের বেশির ভাগ কাজই ছিল মুখের বিভিন্ন অভিব্যক্তি নিয়ে। নারীর মুখের যে ফর্ম এবং তার যে নানাবিধ প্রকাশ, তা শিল্পীর চোখে তীব্র ভাবে আকর্ষক। সেই অভিব্যক্তির নিরীক্ষণে ক্যানভাসের প্রধান চরিত্র হয়ে ওঠে নারী। মূলত রঙের খেলায় শিল্পী মেতে থাকেন। যেমন স্যাপ গ্রিনের সঙ্গে ভিরিডিয়ান, আবার লেমন— যখন যেটা মনে হয়, সে ভাবে মিশিয়ে সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণে শেষ করেন। ছবির অভিব্যক্তি ছাড়াও দর্শনের ক্ষেত্রে ব্যাকগ্রাউন্ড খুব গুরুত্বপূর্ণ ছাপ ফেলে দর্শকের মনে।
প্রত্যেকটি শিরোনামহীন কাজেই নারী-মুখ প্রধান মোটিফ হলেও, স্থান এবং সময়ের আবহ গভীর ভাবে অনুভবযোগ্য। ফলে প্রতিকৃতি আর নিছক প্রতিকৃতি থাকে না। যেমন একটি ছবিতে কোমল টোনের মডেলিংয়ের বিপরীতে লাল-কালোর তীব্র বিমূর্তায়ন সেই শান্ত আবেশকে ভেঙে দেয়। যেন বাইরের বাস্তব আর ভিতরের অবস্থার সংঘর্ষ একসঙ্গে উপস্থিত। দুই বিপরীত স্রোতের সূক্ষ্ম টানাপড়েন। আর একটি ছবি সম্পূর্ণ ভিন্ন। কালো-সাদা টোনে গড়ে ওঠা মুখটি যেন স্মৃতি থেকে উঠে আসা কোনও অবয়ব। ভাঙা ফর্ম, আলতো ব্রাশওয়ার্ক, চোখের গভীর অন্ধকার— সব মিলিয়ে এক বিষণ্ণ, প্রায় ভৌতিক আবহের ইঙ্গিত। এখানে রঙের চেয়ে রেখার উপস্থিতিই ছবির পরিভাষা।
একই সঙ্গে তাঁর পেপারে মিক্সড মিডিয়া কাজে কালোর প্রাধান্য এক ভিন্ন মেজাজ উন্মোচন করে। যেখানে টেক্সচার, প্রতীক ও আধ্যাত্মিক অনুষঙ্গ মিলিয়ে গড়ে ওঠে এক অন্তর্মুখী ভাষা। মা কালী, দুর্গা, গণেশ বা কৃষ্ণের মতো পৌরাণিক চরিত্র এখানে প্রচলিত ধারণায় নয়, বরং এক ব্যক্তিগত স্বাক্ষরে পুনর্নির্মিত হয়।
আরও কিছু কাজে রঙের প্রত্যাবর্তন লক্ষণীয়। সবুজাভ আনন, তার উপরে ড্রিপিং, কোলাজধর্মী লেয়ার, অলঙ্করণ— সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক জটিল টেক্সচার। আর একটি কাজ ভীষণ ভাবে সফল। নিভু নিভু আলোর ভারী ছায়ায় ঝুঁকে থাকা একটি মুখ। স্থির, নিরাবেগ, তবু গভীর। সেই রকমই আর একটি ছবিতে দেখি এক প্রশান্ত, স্থির মুখাবয়ব। তার চোখের গভীরতা দর্শককে টেনে নেয়। আলো-আঁধারের মৃদু ওঠানামায় মুখটি জীবন্ত হয়ে উঠলেও, বাস্তব ও স্বপ্নের মধ্যবর্তী এক আবছা পরিসর গড়ে ওঠে।
শেখর করের চিত্রভাষার মূল দিক হল, তাঁর টেক্সচারের ব্যবহার। রঙের উপর রং, কখনও তাকে হালকা টানে তুলে ফেলা, আবার চাপানোর কৌশলের ভিত্তিতেই সময়ের উপস্থিতি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। বিশেষ করে রঙের স্তরায়ন এখানে দেখার মতো। মাটিরঙা, ধূসর এবং নীলচে টোনের উপরে হঠাৎ লালচে স্পর্শ যেন এক আবেগের ক্ষণিক উত্থান। পটভূমির অস্পষ্ট স্থাপত্য, রেখা ও দাগ, সময়, স্মৃতির অবশেষ বা শহুরে অভিজ্ঞতার ছাপ হিসেবে কাজ করে।
নারীমুখের এই পুনরাবৃত্তি তাঁর কাজে এক ধরনের আইকনিক মাত্রা যোগ করেছে। কিন্তু এই আইকন কোনও ধর্মীয় বা পৌরাণিক কাঠামোয় আবদ্ধ নয়। বরং তা মানবিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং কখনও ব্যক্তিগত স্মৃতির সঙ্গে জড়িত। ফলে দর্শক নিজের অভিজ্ঞতা দিয়েই এই মুখগুলিকে পূরণ করতে বাধ্য হন।
দীর্ঘ দিনের নিষ্ঠা এবং মাধ্যমের ভিতর নিজেকে ক্রমাগত পুনর্গঠন করার মধ্য দিয়ে শেখর করের শিল্পচর্চা এক চলমান অন্বেষণের ইঙ্গিত বহন করে। যেখানে নীরবতার ভিতরেই সবচেয়ে গভীর উচ্চারণ লুকিয়ে থাকে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)