E-Paper

সার্থক গুরুপ্রণাম

পরবর্তী নিবেদন দেবমিতা সেনগুপ্তের একক পরিবেশনা কবি জয়দেবের গীতগোবিন্দ-র অষ্টপদী ‘প্রিয়ে চারুশিলে’।

বিপাশা মাইতি

শেষ আপডেট: ২০ জুন ২০২৬ ০৬:৪৮
নৃত্য পরিবেশনে দেবমিত্রা।

নৃত্য পরিবেশনে দেবমিত্রা।

সম্প্রতি কলকাতার জয় হিন্দ প্রেক্ষাগৃহে অনুষ্ঠিত হল কলকাতা ময়ূর ললিত অ্যাকাডেমি আয়োজিত ওড়িশি নৃত্যানুষ্ঠান ‘অনুচিন্তনম’। পদ্মবিভূষণ গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে এই আয়োজন করেছিলেন অ্যাকাডেমির কর্ণধার দেবমিত্রা সেনগুপ্ত। তাঁর সুদক্ষ পরিচালনায় ছাত্রীরা পরিবেশন করলেন গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র রচিত বেশ কিছু নৃত্যপদ। সূচনায় শিশুশিল্পীদের পরিবেশিত নৃত্যপদগুলি হল ‘নমন’, কবি কালিদাস রচিত শ্যামাঙ্গী, দেবী সরস্বতী স্তোত্র, বটু নৃত্য, বসন্ত রাগ ও একতালিতে নিবদ্ধ বসন্ত পল্লবী। এই পর্বের প্রতিটি নৃত্য পরিবেশনে ছাত্রীদের সুনিপুণ শিক্ষার ছাপ পরিলক্ষিত হয়। এঁদের মধ্যে সিদ্ধিসম্পূর্ণা দাস, শিবাঙ্গিনী মজুমদার, ঋতাক্ষী দাস, নৈঋতা মুখোপাধ্যায় যথেষ্ট সম্ভাবনাময়।

পরবর্তী নিবেদন দেবমিতা সেনগুপ্তের একক পরিবেশনা কবি জয়দেবের গীতগোবিন্দ-র অষ্টপদী ‘প্রিয়ে চারুশিলে’। অভিনয়প্রধান এই নৃত্যপদের মূল কথা রাধার মানভঞ্জন ও তাঁর চরণে কৃষ্ণের আত্মসমর্পণের মাধ্যমে ভক্তি ও প্রেমের এক অপূর্ব মিলন। দেবমিত্রা তাঁর সুললিত নৃত্যভঙ্গিমা এবং সুন্দর অভিনয় দ্বারা সকল দর্শককে মোহিত করে রেখেছিলেন। কমলমুখী শ্রীরাধার মুখমণ্ডল থেকে শ্রীকৃষ্ণের মধুপান অথবা যেখানে কৃষ্ণ রাধাকে বলছেন, ‘তুমিই আমার অলঙ্কার, তুমিই এই সংসাররূপ সমুদ্রের রত্ন’— সেই পঙ্‌ক্তিতে শিল্পীর নৃত্যশৈলী এবং মুদ্রাপ্রয়োগ অসাধারণ। ভাব প্রদর্শনও চমৎকার।

এর পর পরিবেশিত হয় ওই সন্ধ্যার শ্রেষ্ঠ উপস্থাপনা নৃত্যনাট্য ‘ষড়রিপু’। এই নৃত্যনাট্যের বিষয়ভাবনা দেব ঘোষের। নাট্য পরিকল্পনা শীর্ষা বন্দ্যোপাধ্যায়, ভাষ্যপাঠ ও সংস্কৃত শব্দচয়ন অধ্যাপক সুরজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ইংরেজিতে ভাষ্যরচনা ও পাঠে শীর্ষা বন্দ্যোপাধ্যায়। দেবমিত্রা সেনগুপ্তের তত্ত্বাবধানে ও পর্যবেক্ষণে এবং ময়ূর ললিতের আগামী শিল্পীদের নিজস্ব ভাবনায় ‘ষড়রিপু’ নৃত্যনাট্য পূর্ণতা লাভ করেছে। ভারতীয় দর্শন ও সাহিত্যে মানুষের যে ‘ষড়রিপু’র উল্লেখ আছে, নৃত্যশিল্পীরা ওড়িশি নৃত্যের চমৎকার শৈলী দ্বারা এই ছ’টি প্রবৃত্তির রূপকে ফুটিয়ে তুলেছেন। এখানে এক মানবকন্যা তার নিজ অস্তিত্ব নিয়ে পৃথিবীতে আসার পরে ধীরে ধীরে ‘ষড়রিপু’ তাকে গ্রাস করতে এগিয়ে আসে। কিন্তু সে নিজ সাধনার বলে ছয় রিপুকে জয় করে। রিপু তাকে স্পর্শও করতে পারে না। কন্যার চরিত্রে শীর্ষা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সাবলীল ওড়িশি নৃত্যভঙ্গিমা এবং ভাবমুদ্রা প্রয়োগের দ্বারা চরিত্রটিকে যথাযথ ভাবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। আগামী দিনের একজন প্রতিভাময়ী শিল্পী হওয়ার সম্ভাবনা দেখা গেল তাঁর মধ্যে। এই নৃত্যনাট্যে অন্য যাঁদের পরিবেশনা নজর কাড়ে, তাঁরা হলেন— কামরূপী এষা দালাল, মোহরূপী সুদর্শনা মিত্র, লোভরূপী শ্রেষ্ঠা ও বন্ধুলী।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে ছিল ‘অনুচিন্তন’-এর দ্বিতীয় পর্ব, যেখানে প্রদর্শিত হয় যথাক্রমে ‘ললিত লবঙ্গলতা’, ওড়িয়া গীত ‘নাচন্তি রঙ্গে শ্রীহরি’, ‘বিলাহারি পল্লবী’, বর্ষার বর্ণনায় বর্ণিত ‘গীত মারে বানা ধারা’ এবং ‘দশাবতার’। ‘নাচন্তি রঙ্গে শ্রীহরি’ নৃত্যপদে সঙ্গিনী রায় দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

অন্তিম পর্যায়ে দু’টি পরিবেশনা গীতগোবিন্দের ‘সখী হে’ এবং ‘খাম্বাজ পল্লবী’। এই দু’টি পরিবেশনায় দেবমিত্রা স্বয়ং ছাত্রীদের পাশে মঞ্চে একই সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করেন। এই দু’টি ওড়িশি নৃত্য গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র রচিত। ‘সখী হে’ অভিনয়প্রধান এবং সকল অংশগ্রহণকারীর অভিনয় যথাযথ ও একই রকম ভাবে প্রদর্শিত হয়। দেবমিত্রা ছাড়া আর যাঁদের নাম উল্লেখ করতে হয়, তাঁরা হলেন— আহেলি মুখোপাধ্যায়, রোহিণী যাদব, অম্বিকা রায় ও অর্চিতা চক্রবর্তী। মঞ্চের আলোকসজ্জা ও ধ্বনি প্রক্ষেপণ যথাযথ। কলকাতা ময়ূর অ্যাকাডেমির কলাকুশলীবৃন্দ তাঁদের উপস্থাপনার মাধ্যমে পদ্মবিভূষণ গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের প্রতি যে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করেছেন, তা সত্যিই সার্থক।

অমুষ্ঠান

সম্প্রতি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ত্রিগুণা সেন সভাঘরে অনুগামী আয়োজিত সঙ্গীতসন্ধ্যায় রবি ঠাকুর ও স্বর্ণযুগের গানের ডালি সাজিয়েছিলেন বর্ষীয়ান সঙ্গীতশিল্পী সুকুমার সেন। অনুষ্ঠানের শিরোনাম ছিল, ‘আজি গোধূলিলগনে’। ৭৯ বছরের প্রবীণ শিল্পী প্রথমার্ধে ‘অনুভবে রবি’র মধ্য দিয়ে উপস্থাপন করেন রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন পর্যায়ের গান। পাশাপাশি শ্রোতাদের তিনি শোনান বিভিন্ন গানের নেপথ্যের গল্প। কোনও কোনও গানের মূল রাগটিও পরিবেশন করেন শিল্পী। অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্যায়টি ছিল ‘স্বর্ণসুরে স্মৃতি’। সেখানে শিল্পী পরিবেশন করেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, মান্না দে, অখিলবন্ধু ঘোষের গাওয়া বেশ কিছু পুরনো গান। তিনি অনুষ্ঠান শেষ করেন ‘ডুবাইলি রে ভাসাইলি রে’ গানটি দিয়ে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Dance Programme

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy