E-Paper

রূপের ভিতর অনুরণন

বিমল কুণ্ডুর কাজের বড় শক্তি হল বিমূর্ততা। তবে ফর্মকে বিমূর্ত করলেও, পরিচয়ের আবহ তৈরি করেন।

পিয়ালী গঙ্গোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:১৪
রূপকল্প: মায়া আর্ট স্পেসে শিল্পী বিমল কুণ্ডুর ভাস্কর্যের প্রদর্শনী

রূপকল্প: মায়া আর্ট স্পেসে শিল্পী বিমল কুণ্ডুর ভাস্কর্যের প্রদর্শনী

আধুনিক ভারতীয় ভাস্কর্যের বিবর্তনে বিমল কুণ্ডুর কাজ এক বিশেষ ধারার প্রতিনিধিত্ব করে। সেখানে জ্যামিতি শুধু কাঠামো নয়, বরং মাধুর্য ও সংযমের ভিতর দিয়ে মূল সুরকে ধারণ করে। ১৯৮১ সালে সরকারি আর্ট কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে পাশ করার পর, তাঁর চার দশকের শিল্পযাত্রা মূলত এক ধারাবাহিক শৈল্পিক স্বর। শিল্পী জ্যামিতিকে কখনও অনমনীয় অবয়ব হিসেবে দেখেননি। মিতব্যয়ী উচ্চারণে তাকে এক মেলোডিক ভাষায় শৃঙ্খলিত করেন।

শিল্পীর কেন্দ্রবিন্দু হল ফর্মের পরিশোধন। ফিগার বা অবজেক্টকে ভেঙে এনে পুনর্গঠিত করা। কিন্তু আগ্রাসী ডিকনস্ট্রাকশনের পথে নয়। বরং কিউবিজ়ম অনুপ্রাণিত জ্যামিতির মধ্যে। তাঁর সরস্বতী, ডিভাইন বা মিউজ়িশিয়ান সিরিজ়ে দেখা যায়, কী ভাবে চোঙ, শঙ্কু, আর্চ ও সমতল মিলেমিশে এক অন্তর্মুখী স্থিরতা তৈরি করে। যে স্থিরতা কখনও তীক্ষ্ণ নয়, বরং ধ্যানমগ্ন। এই কারণেই শিল্পীর ব্রোঞ্জের ভাস্কর্যগুলি যেমন স্থিতপ্রজ্ঞ, তেমনই টেম্পারমেন্টে লিরিক্যাল।

বিমল কুণ্ডুর কাজের বড় শক্তি হল বিমূর্ততা। তবে ফর্মকে বিমূর্ত করলেও, পরিচয়ের আবহ তৈরি করেন। ‘হেড-টু’ বা ‘দুর্গা হেড’-এ ন্যূনতম রেখার গতিপথ প্রায় ক্যালিগ্রাফির মতো। আলো, পাতিনা, সারফেসের টোন স্কাল্পচারাল মাসে ইঙ্গিতের গভীরতা আনে। পাতলা সমতল ও মাংসল ভলিউমে বিপরীতমুখী দ্বন্দ্বে নতুন প্রাণ পায়। বাস্তবতার পরিবর্তে তুলে ধরেন তার ছায়া, সমগ্র অনুভূতির জ্যামিতি। ‘অ্যাওয়েটিং’, ‘মাদার অ্যান্ড চাইল্ড’ কিংবা ‘মিউজ়িশিয়ান’— এই ধারার পোক্ত উদাহরণ। শিল্পীর কাজে ভারতীয় সংবেদন স্পষ্ট, কিন্তু তা লোকজ নয়। পৌরাণিক ইঙ্গিত আসে, বর্ণনা আসে না। আসে তার সারাংশ। ‘বীরপুরুষ’ বা ‘রিক্লাইনিং ফিগার’-এ এই সারাংশ আরও তীব্র। যেমন এখানে বাহ্যিক চেহারা গৌণ, প্রধান হল মনস্তত্ত্ব।

শিল্পীর দেবী বা সঙ্গীতশিল্পী কোনওটিই বাস্তব প্রতিরূপ নয়। তাদের মধ্যে জেগে ওঠে এক শুদ্ধ আধ্যাত্মিকতা। ব্রোঞ্জ, অ্যালুমিনিয়াম, কাঠ বা ফাইবার গ্লাস তাঁর কাজে শুধুই মাধ্যম নয়। উপাদান বুঝে ভিন্ন ভিন্ন টোনালিটি ও টেক্সচার ব্যবহার করেন। তাঁর ব্রোঞ্জের মসৃণ পাতিনা যেখানে ইনট্রোস্পেক্টিভ, সেখানে কাঠে প্রাকৃতিক দাগ বা ধাতব ফিনিশ অন্য আকার দেয়। তামা, লোহা, সালফার ইত্যাদি ধাতুসংক্রান্ত গবেষণায় দেখা যায় বাদামি, সবুজ ও কালো রঙের অদ্ভুত সৌন্দর্য। শিল্পীর ভাষ্যে উঠে আসে, এই কাজে পরিশ্রম মারাত্মক। মাটি যা বলে, তাই তিনি শোনেন। একটা আন্তরিকতা থাকে। শিল্পীর মতে, মাটিকে এমন ভাবে মাখতে হয়, যেমন ময়ান দিয়ে ময়দা মাখতে হয়। তার পরে যে ভাবে মোল্ড তৈরি করেন, একটা কোণ থেকে হঠাৎ আভাস পেয়ে সেটা ধরেই এগোন তিনি। এ ভাবে করতে করতে মাটির রেসপন্সেই থেমে যান তিনি। মানুষের চোখ, ঠোঁটের তারতম্য গড়া নিয়ে শিল্পীর যুক্তি পরিষ্কার। এ ছাড়া ছাঁচের ওজন বুঝে মোমের পরিমাণ দেওয়া। অর্থাৎ কাজটি দশ কেজি হলে, মোম হবে একশো গ্রাম। এবং তাকে সলিড না করে সুন্দর করে ফিনিশ করা, তারপর ১২০০ ডিগ্রির ফায়ারিং। প্রচুর প্রক্রিয়া। পরিশেষে ফাইল দিয়ে ঘষে ঘষে ফিনিশ করা। মাথা, বুদ্ধি, হৃদয় দিয়ে প্রবল পরিশ্রম।

সম্প্রতি মায়া আর্ট স্পেসে শিল্পী বিমল কুণ্ডুর ভাস্কর্য ছিল ১৯৮৫ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত। দীর্ঘ ৬০ বছরের সাধনার ফল। নির্বাচিত ২৪টি ব্রোঞ্জ কিউবিস্ট ঢঙে নির্মিত হলেও, তাতে জীবনের ছাপ স্পষ্ট। শুয়ে থাকা মেয়েটি বা দুই বিনুনির কিশোরী, আবার পাঠরতা রমণী ও ‘মাদার অ্যান্ড চাইল্ড’-এ তো আমাদেরই চেনা মুখ, চেনা ভঙ্গির প্রতিনিধি। প্রদর্শনীতে বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য ‘অ্যানিমাল’। দুর্ভিক্ষের সময়ে পথকুকুর যে অবস্থায় পড়ে, সেই জায়গা থেকেই এই রচনা। স্কেলিটনের উপরে দুর্ভিক্ষের টানটান চামড়া— কী গভীর অনুশীলনের সৃষ্টি! এটি শুধু ভাস্কর্য নয়, বিবেকের প্রশ্ন। এরপর ‘ধর্মের ষাঁড়’-উত্তর কলকাতার প্রচলিত গল্পের প্রতীক। ভুল ধারণা আর নির্মমতার শিকার হওয়া প্রাণী। এই রচনায় শিল্পীর দৃষ্টিকোণ আর‍ও তীক্ষ্ণ। শিল্পীর দেখা উত্তর কলকাতা উঠে আসে ফর্মের পর ফর্মে। কখনও কঠিন, কখনও মোলায়েম, কখনও ব্যথাতুর।

পাবলিক স্কাল্পচার-এ শিল্পীর দক্ষতা সমান ভাবে আকর্ষক। কলকাতা এয়ারপোর্ট, নিক্কো পার্ক বা ভিআইপি রোডে স্থাপিত বৃহৎ ভাস্কর্যগুলি, চলার পথেও থামিয়ে রাখার ক্ষমতা রাখে। কলকাতায় প্রথম একক প্রদর্শনী হিসেবে বিমল কুণ্ডুর শিল্প-পরিচয়ের বিস্তার ছিল দেখার মতো। জ্যামিতিকে আবেগের ভাষায় রূপ দেওয়া তাঁর প্রধান স্বাক্ষর। কিউবিস্ট কাঠামো, মেলোডিক ছন্দ, মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা এবং উপাদান ব্যবহারের সূক্ষ্ম বোধ। প্রদর্শনীটি সেই ভাষার পরিপক্ব সারাংশ। মায়া আর্ট স্পেস নিবেদিত শিল্পীর ‘স্কাল্পচারাল ওডিসি’ তাই শুধু একটি সংগ্রহ নয়। বরং ফেলে আসা জীবনের মানচিত্র।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Review

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy