Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৩ অক্টোবর ২০২১ ই-পেপার

পোস্তয় ঝাঁজ থাকবে

১০ ডিসেম্বর ২০১৬ ০০:০০
শান্তিনিকেতনের মাঠে সৌমিত্র

শান্তিনিকেতনের মাঠে সৌমিত্র

খয়েরি চেক শার্ট।

নীল ট্র্যাক প্যান্ট।

মাথায় টুপি।

Advertisement

পূর্ব পল্লির মাঠে যে ‘তরুণ’ ব্যাট হাতে নামলেন, তাঁকে দূর থেকে দেখলে মনে হবে কোনও পেশাদার ক্রিকেটার।

সাবধানী ফুটওয়ার্ক। কপিবুক মেনে প্রতিটা শট খেলছেন। বিপক্ষ বোলারকে ছাড়ছেন না এক ইঞ্চি জমিও।

বোলার বাউন্সার দিলে ঠোঁটের কোণে রাগ পুষছেন। আর, ঠিক পরের বল-য়েই জবাব আসছে স্টেপ-আউটে বাউন্ডারি দিয়ে।

মাঠের এ দিক-ও দিক জড়ো হওয়া জনতার হাততালির বন্যায় যখন তাঁর ভেসে যাওয়ার কথা, সেই ‘তরুণ’ তৈরি হচ্ছেন পরের ডেলিভারির জন্য।

‘তরুণ’য়ের নাম সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

বয়স ‘মাত্র’ একাশি!

ডিসেম্বরের এক দুপুরে ক্রিকেট মাঠে এসে সেই একাশির ‘তরুণ’ যেন ঠিক করে ফেলেছেন যে, এই ম্যাচটাও তিনি সহজে হারবেন না। তা সে, বিপক্ষ বোলার যতই এক সময়ের ক্রিকেটার যিশু সেনগুপ্ত হন!

না, একটুও ভুল পড়েননি।

আজকাল শান্তিনিকেতনের বিভিন্ন প্রান্তে উঁকি মারলে যে চোখে পড়ছে এ রকমই সব দুর্লভ দৃশ্য। কোথাও ব্যাট হাতে মাঠে নামছেন সৌমিত্র, তো কখনও আবার সোনাঝুরির জঙ্গলে সাইকেল নিয়ে হাজির হচ্ছেন যিশু।

আর তাঁদের পিছন পিছন ছুটছে প্রায় একশো জন। কারও কাঁধে ক্যামেরা তো কারও হাতে স্ক্রিপ্ট। রবি ঠাকুরের রাজ্যে পৌষমেলার দিন কয়েক আগেই যেন এক উৎসব-উৎসব আবহ।

তবে এ সবের মাঝেও দু’জনের চোখ অবশ্য সেই মনিটরেই। শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায়। তাঁদের নতুন ছবি ‘পোস্ত’র শ্যুট নিয়েই যে শান্তিনিকেতনে এত হৈ-চৈ!

যে জুটির পরিচালনায় পর পর দুটো ছবি—‘বেলাশেষে’ ও ‘প্রাক্তন’ সুপারহিট, তাঁদের নতুন ছবি নিয়ে কৌতূহলটা তো স্বাভাবিক। বারবার সেলফির আব্দার মেটাতে হল সৌমিত্র ও পরান বন্দোপাধ্যায়কে, কিংবা স্রেফ একবার মিমি চক্রবর্তীকে দেখার জন্য পূর্ব পল্লির ছোট্ট বাড়িটায় ভিড় জমায় কয়েকশো মানুষ।

আসলে, ‘প্রাক্তন’য়ে বিচ্ছেদের গল্প বলার পর, শিবপ্রসাদ-নন্দিতা এ বার হাজির এমন এক বিষয় নিয়ে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে এক দাদু-ঠাকুমা এবং বাবা-মা। তাঁদের আইনি লড়াই, সম্পর্কের টানাপড়েন নিয়েই এ বারের গল্প।

এবং সেই কারণেই, ‘পোস্ত’ নিয়ে আরও বেশি সতর্ক পরিচালকদ্বয়। ছবির নাম শুনে যতই সাদাসিধে মনে হোক, দুই পরিচালকই স্বীকার করেছেন, এ বারের বিষয়টা অন্য ছবিগুলোর চেয়ে অনেকটা আলাদা এবং কঠিন। ‘‘সারা পৃথিবী জুড়ে এই সমস্যা প্রকট হচ্ছে। এই সময়ে দাঁড়িয়ে, এই গল্পটা আমাদের বলতেই হতো,’’ বলছিলেন শিবপ্রসাদ স্বয়ং।

ছবির বিষয়বস্তুর কথা মাথায় রেখে কাস্টিংয়েও রয়েছে কিছু চমক। এই প্রথম বার শিবপ্রসাদ-নন্দিতার ছবিতে দেখা যাবে যি শু ও মিমিকে। বাবা-মায়ের ভূমিকায়। এবং দাদু-ঠাকুমার চরিত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও লিলি চক্রবর্তী।

‘‘ছবিটার মজা হল, এখানে প্রতিটা চরিত্রেরই কিছু না কিছু বলার আছে। সুতরাং, তাঁদের প্রতিটা মুভমেন্ট, কথাবার্তা, ছবিটাকে এগিয়ে নিয়ে যায় বহু দূর,’’ বলছিলেন শিবপ্রসাদ।

এ বছরের মে মাসে যখন ‘প্রাক্তন’ মুক্তি পেয়েছিল, তখনও তাঁরা ভাবেননি যে, সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছবে সেই ছবি।

পর পর দুটি বক্স অফিসে সাফল্যের পর, যথারীতি ‘পোস্ত’ নিয়ে উন্মাদনা বেড়েছে। মানছেন আরেক পরিচালক নন্দিতাও। ‘‘যে বিষয়গুলো সাধারণ লোকের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়, আমরা তো পর্দায় সেগুলোই তুলে ধরি। তাই, দর্শকের প্রত্যাশাও বেড়েছে। সেটা সত্যিই একটু ভয়ের,’’ মুচকি হেসে বলছিলেন নন্দিতা।

কথা বলতে বলতেই মনিটরে চোখ রাখলেন পরিচালক। ক্যামেরা তখন প্যান করেছে লিলি চক্রবর্তী-র ওপর। ছলছল চোখে পাশে বসে মিমি, তাঁর শাশুড়ির সঙ্গে কথা বলছেন, ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে। বেশি কথা বলতে পারলেন না মিমি। দু’চোখ দিয়ে নেমে এল অশ্রু ধারা।

স্তব্ধ, থমথমে পরিবেশে ক্যামেরার পিছন থেকে ভেসে এল শুধু কয়েকটা শব্দ। ‘‘কাট ইট। এক্সসেলেন্ট শট...’’

কেউ তো আগে বলেনি...

ঝুপ করে সন্ধে নেমেছে একটু আগে। পূর্ব পল্লির বাড়িটা থেকে ভেসে আসছে তানপুরার সুর। এক কিশোর কন্ঠ গাইছে, ‘খর বায়ু বয় বেগে’।

আসলে, এক বাচ্চার সঙ্গে সান্ধ্য রেওয়াজে বসেছেন প্রাক্তন সংগীত শিক্ষক দীনেন লাহিড়ি। গানের ফাঁকে গল্প করছেন, আবার সুরে ভুল হলে, ধরিয়ে দিচ্ছেন সেটাও। অবসরের পর, এই নিয়েই দিন কাটে দীনেন ও তাঁর স্ত্রী গৌরীর।

ছেলে অর্ণব আর্ট কিউরেটর ও পুত্রবধূ সুস্মিতা থাকেন কলকাতায়। ন’মাসে ছ’মাসে শান্তিনিকেতন আসেন বাবা-মায়ের কাছে।

তাই প্রতি সন্ধ্যায়, এই বাচ্চাদের গান শেখানোর মধ্য দিয়েই যেন বেঁচে থাকার গান বাঁধেন বৃদ্ধ দম্পতি।

আসলে, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও লিলি চক্রবর্তী।

শিবপ্রসাদ-নন্দিতা জুটির সঙ্গে আগেও কাজ করেছেন ‘বেলাশেষে’ ও ‘প্রাক্তন’য়ে। এবং, সৌমিত্র মনে করেন, সম্পর্কের টানাপড়েন আর জীবনের ভাঙা-গড়ার গল্প বলাতে বাকিদের কিছুটা পিছনে ফেলে দিয়েছেন শিবু-নন্দিতা।

‘‘বাজারের কথা মাথায় রেখেও কী ভাবে ভিন্ন ধারার বিষয় নিয়ে ছবি করা যায়, সেটাই বারবার প্রমাণ করেছে শিবু-নন্দিতা। এই সমস্যার বিষয়গুলো তো সবাই জানে, কিন্তু কেউ তো আগে সিনেমার কথা বলেনি,’’ বলছিলেন সৌমিত্র।

এবং, জীবনের আনাচে কানাচে লুকিয়ে থাকা দুঃখ-কষ্টগুলো বার করতে পারেন বলেই বোধহয় প্রতিটা শট ও ফ্রেম নিয়ে খুঁতখুঁতে দুই পরিচালক। অভিনেতার নাম সৌমিত্র হোক কিংবা যিশু, শট পছন্দ না হলে, ‘আরেক বার টেক-এ যাব’ বলতে আপত্তি নেই শিবপ্রসাদ-নন্দিতার।

মানছেন যিশুও। করব করব করেও এর আগে এই জুটির সঙ্গে কাজ করা হয়নি। এবং, ‘পোস্ত’তে অর্ণবের ভূমিকায় অভিনয় করতে এসে পর্দার ব্যোমকেশ বুঝছেন, এই উইকেটে প্রতিটা বল-ই খেলতে হবে অত্যন্ত সতর্ক হয়ে।

‘‘একজন অভিনেতা হিসেবে এ রকম পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করাটা সব সময়েই একটা লার্নিং এক্সপেরিয়েন্স। এবং যে ভাবে প্রতিটা ডিটেলিং-য়ে ওরা নজর রাখে, সেটা জাস্ট ভাবা যায় না,’’ কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলছিলেন যিশু, যাঁকে শিবপ্রসাদ একটা নতুন নাম দিয়েছেন — বাধ্য ছাত্র!

বাড়ির বাইরে তখন ইতিউতি জনতার ভিড়। কেউ যিশুর সঙ্গে ছবি তুলতে চায়, তো সদ্য কলেজে পা-রাখা তরুণের কৌতূহলী প্রশ্ন, ‘‘মিমিদি, কোথায়?’’

গ্লিসারিন নয়, নিজে কাঁদো কালো ফ্রেমের চশমা।

চোখমুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।

গত কয়েক দিনে নাকি নিজেই নিজেকে চিনতে পারছেন না মিমি চক্রবর্তী। আসলে, পর্দার সুস্মিতা লাহিড়ি।

শান্তিনিকেতনে আসার পর থেকে মেক-আপ বক্সে হাত দেননি, কারণ পরিচালকের নির্দেশ, ‘শ্যুটিং হবে বিনা মেক-আপে।’

ছবিতে মিমি যে হেতু এক মায়ের ভূমিকায়, সেই জন্য বিনা মেক-আপের মিমিকে প্রতিটা ফ্রেমে অন্য ভাবে তুলে ধরছেন পরিচালকদ্বয়। ‘‘সবটাই চরিত্রের প্রয়োজনে। এর আগে কখনও বিনা মেক-আপে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াইনি। সুতরাং, এটাও একটা নতুন অভিজ্ঞতা,’’ হাসতে হাসতে বলছিলেন মিমি। যিশুর মতো মিমিও শিবু-নন্দিতার সঙ্গে কাজ করছেন এই প্রথম। এবং সেই জন্যই যেন প্রতিটা শট নিয়ে বাড়তি সতর্ক টালিগঞ্জের জনপ্রিয় অভিনেত্রী।

কেরিয়ার শুরু করেছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘গানের ওপারে’ সিরিয়াল দিয়ে, তবু মিমি মনে করেন এই ছবিটা করতে এসে যেন আবার নতুন করে অনেক কিছু শিখছেন। ‘‘প্রতিটা বিষয় নিয়ে এত যত্নশীল শিবুদা যে, জাস্ট ওর ইন্সট্রাকশন মেনে চললেই অনেকটা কাজ হয়ে যায়,’’ বলছিলেন মিমি।

যেমন কান্নার দৃশ্য শ্যুট করার আগে মিমিকে শুনতে হয় পরিচালকদের সতর্কবাণী — ‘কান্নার দৃশ্যে গ্লিসারিন লাগালে চলবে না। নিজেকে কাঁদতে হবে।’

‘‘চরিত্রের গভীরে যাওয়াটা
ভীষণ জরুরি। যদি কোনও চরিত্রের ভিতরে ঢোকা না যায়, তা হলে সেই ফ্লেভারটা ক্যামেরাতে ধরা যায় না,’’ মিমির পাশে দাঁড়িয়ে বলছিলেন শিবপ্রসাদ স্বয়ং।

একটা ‘পারফেক্ট শট’য়ের জন্য যাঁরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা শট নিতেও রাজি, সেই শিবপ্রসাদ-নন্দিতাই যেন ‘পোস্ত’ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে একটু বেশিই সতর্ক। প্রশ্ন করতেই হেসে বলছেন, ‘‘এখন সব বললে, সাসপেন্সটা যে থাকবে না...।’’



ভাত, ডাল, আর... পোস্ত

নাম শুনে যতই গো-বেচারা সিদেসাধা মনে হোক, পরিচালক থেকে চিত্রগ্রাহক গোপী ভগত — সবাই এক বাক্যে স্বীকার করছেন, এই ‘পোস্ত’তে যথেষ্ট ঝাঁজ আছে। ছবির নামকরণ নিয়ে ইতিমধ্যেই যথেষ্ট কৌতূহল চতুর্দিকে। এবং, সেই জন্যই গল্প নিয়ে এত গোপনীয়তা। ছবির নাম নিয়ে বলতে গিয়ে কিছুটা হেঁয়ালির সুর শিবপ্রসাদের গলাতেও। ‘‘এটা প্রত্যেক বাড়ির ঝালে, ঝোলে অম্বলে বেঁচে থাকার গল্প,’’ বলছিলেন তিনি। একটু থেমে যোগ করলেন, ‘‘আসল পোস্তটা কী ভাবে রান্না হয়, সেটা তো ছবি দেখলেই বোঝা যাবে...।’’

ছবির নাম নিয়ে সাসপেন্স রাখলেও শিবপ্রসাদ-নন্দিতা অবশ্য ইতিমধ্যেই ভাবতে বসেছেন এই অর্থ-সঙ্কটের বাজারেও কী ভাবে ‘প্রাক্তন’ বা ‘বেলাশেষে’র রেকর্ডকেও ছাপিয়ে যাওয়া যায়। ‘‘শুধু কয়েকটা হলে ভাল চললেই তো আর একটা ছবি সফল হয় না। তার জন্য প্রয়োজন ভাল প্ল্যানিং। সেটাও খুব জরুরি,’’ বলছিলেন।

আগামী সপ্তাহের শুরুতেই শান্তিনিকেতনের আউটডোর ছেড়ে কলকাতায় ছবির শেষ দিকের শ্যুটিং-য়ে নামবে ইউনিট। পরিচালকের চিন্তা সেই নিয়েও। কথা বলতে বলতে এগিয়ে গেলেন সৌমিত্র-র দিকে। গানের দৃশ্যের ফাইনাল টেক হবে এ বার। অ্যাকশন বলে, মনিটরে চোখ রাখলেন টালিগঞ্জের ‘শিবু’।

গান পর্বের শেষে এক ছোট্ট সহ-শিল্পীর পিঠ চাপড়ে দিলেন সৌমিত্র। মুচকি হেসে বললেন, ‘‘তুমি খুব ভাল করছ।’’

কিছুটা চমকে দিয়েসেই খুদে সহ-শিল্পীর তাৎক্ষণিক উত্তর, ‘‘তুমিও খুব ভাল করছ...!’’

হাসি চাপতে পারলেন না একাশির সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

এক ছোট্ট অভিনেতার বুদ্ধিদীপ্ত উত্তরে পূর্ব পল্লির বাড়িটায় তখন অন্ধকারেও এক চিলতে রোদ্দুর উঁকি মারল যেন। ভেতো বাঙালির জীবনে এই হাসি-কান্নার কোলাজগুলোই যে ভাতের পাতে রেখে দেওয়া এক এক দানা পোস্ত!



Tags:

আরও পড়ুন

Advertisement