Advertisement
০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

রাগ বসন্ত

কত যে রং ছিল তাঁর আলাপে! ২০ জুন পেরিয়ে গেল বসন্ত চৌধুরীর চলে যাওয়ার পনেরো বছর। তাঁর গল্প শোনাচ্ছেন শঙ্করলাল ভট্টাচার্যএকটা অনুভূতির কথা দিয়েই শুরু করা যায়। সত্যজিৎ রায়কে থেকে থেকেই মনে হত বাংলার শেষ ইংরেজ। বিখ্যাত মার্কিন পত্রিকা আশির দশকে তাঁকে নিয়ে ‘দ্য লাস্ট ইংলিশম্যান’ শিরোনামে স্টোরি করার বহু আগে থেকেই। ওই অনুভূতিরই অন্য অংশটা বসন্ত চৌধুরীকে নিয়ে। যখনই দেখেছি ভদ্রলোককে ওঁর কেতাদুরস্ত জমিদার বেশে মনে হয়েছে বাঙালির ইতিহাস কিংবা তেমন কোনও উপন্যাস থেকেই উঠে এলেন বুঝি এই মাত্র।

ছবি: ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য

ছবি: ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ০৪ জুলাই ২০১৫ ০০:০৩
Share: Save:

একটা অনুভূতির কথা দিয়েই শুরু করা যায়।
সত্যজিৎ রায়কে থেকে থেকেই মনে হত বাংলার শেষ ইংরেজ। বিখ্যাত মার্কিন পত্রিকা আশির দশকে তাঁকে নিয়ে ‘দ্য লাস্ট ইংলিশম্যান’ শিরোনামে স্টোরি করার বহু আগে থেকেই।
ওই অনুভূতিরই অন্য অংশটা বসন্ত চৌধুরীকে নিয়ে। যখনই দেখেছি ভদ্রলোককে ওঁর কেতাদুরস্ত জমিদার বেশে মনে হয়েছে বাঙালির ইতিহাস কিংবা তেমন কোনও উপন্যাস থেকেই উঠে এলেন বুঝি এই মাত্র।
আশির দশকের শেষ দিক আর নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি অবধি যখন খুব ঘন ঘন আঁচে দেখা হচ্ছে তখন অনুভূতিটার সঙ্গে একটা আশঙ্কাও জুড়ে গেল। হায় রে, এই বসন্তদাই বাংলার শেষ বাঙালি হয়ে পড়ছেন না তো!
শেষ ইংরেজ হয়ে পড়তে সত্যজিৎকে সারাক্ষণ সু্ট-বুট-টাই চড়াতে হয়নি। ঢোলা পাজামা-পাঞ্জাবিতেও একটা সাহেবসুবো ব্যাপার জড়িয়ে থাকত। কথা, কথার ভাবভঙ্গি উচ্চারণ, হাঁটাচলা, দাঁড়ানো, তাকানো—কীসে নয়?
বসন্ত চৌধুরীর বাঙালিয়ানার শুরুই হত পোশাক-আশাক, চেহারায়। কন্দর্পকান্তি চেহারার সঙ্গে আমে-দুধের মতো মিশত গলার ভারী গোল আওয়াজ। শরীরের শান্ত চলন এবং গভীর চাহনি। চওড়া কপাল থেকে পায়ের বিদ্যাসাগরী চটি অবধি এক পূর্ণ বাবুটি।
এ তো গেল দর্শনধারী বসন্ত। মনে করুন ‘ভগবান শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য’-য় চৈতন্যদেব গয়ায় পিণ্ডদানের সময় শ্রীহরির পাদপদ্মস্থলে অশ্রুবর্জন করছেন।

Advertisement

মনে করুন ‘আধাঁরে আলো’ ছবির নায়ক গঙ্গাস্নানে যাচ্ছেন। যেতে যেতে আবিষ্কার করছেন নায়িকা সুমিত্রা দেবীকে। কিংবা ‘রাজা রামমোহন’-এ রাজা সংরক্ষণবাদীদের সঙ্গে তর্কে নেমেছেন বা মৃত্যু ঘনিয়ে আসার দিনগুলোয় বিধ্বস্ত শরীরে বিলেতের শীতে পথে হাঁটছেন। এই মূর্তিগুলো দিয়েই বাঙালি-স্মৃতিতে বসন্ত বাঁধা পড়েছেন।

কিন্তু এই বহিরঙ্গের আড়ালে একটা সাহেব বসন্তও ছিলেন, যিনি আবার বাঙালি বসন্তকে সম্পূর্ণ করেন। থেকে থেকে চমৎকার ইংরেজি মিশিয়ে বাংলা কথা, সেরা ফরাসি কনিয়াকের রুচি, নিবিড় আমেজে হাভানা চুরুটে টান, প্রাচীন মুদ্রা সংগ্রহ ও তা নিয়ে পড়াশুনো, খাটাখাটনি ও অর্থব্যয়ে অপরূপ ও দুষ্প্রাপ্য সব শাল ঘরে তোলা আর, সর্বোপরি এক বিচিত্র, বিস্তীর্ণ বই পড়ার নেশা।

যে-পড়াশুনোর প্রশংসা করলে শুনতে হত, ‘‘আরে বাবা, আসলে তো খোট্টা। ভদ্রসমাজে মেশার তোড়জোড় করতে হবে না?’’

Advertisement

খোট্টা কেন?

কারণ বসন্ত চৌধুরীর জন্ম নাগপুরে। ৫ মে, ১৯২৮-এ। সেখানকার মরিস কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েট ১৯৪৯-এ।

তার পরেই কলকাতার পথে যাত্রা এবং অনতিকালে— ১৯৫২-য়—‘মহাপ্রস্থানের পথে’ ছবিতে আবির্ভাব।

সে ছবির শেষ দৃশ্য আজও ভুলিনি (হাত নেড়ে ‘ফিরব না! ফিরব না!’ বলে শ্মশ্রুগুম্ফমণ্ডিত চরিত্র মিলিয়ে যাচ্ছে দূরে) কারণ ওটিই আমার দেখা প্রথম বাংলা ছবি।

প্রথম আলাপের পর বসন্তদাকে সে-কথা বলতে বলেছিলেন, ‘‘সে কী গো, একেবারে মহাপ্রস্থান দিয়ে সিনেমাযাত্রা শুরু?’’ ওঁকে আশ্বস্ত করতে বলেছিলাম, ‘‘না, ওটা প্রথম বাংলা ছবি। সিনেমা দেখা শুরু ‘রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট’ দিয়ে।’’ তাতে বসন্তদা’র প্রতিক্রিয়া দাঁড়াল, ‘‘সর্বনাশ, সে তো আরও মস্ত করুণ প্রস্থান!’’

এখন ভাবতে অবাক লাগে বসন্তদা’র সঙ্গে ঘনিষ্ঠ আলাপেরও শুরু কতগুলো বিচ্ছেদ ও প্রস্থানের বৃত্তান্ত দিয়েই।

‘সানন্দা’ পত্রিকা শুরুর কিছু দিনের মধ্যেই একটা বড় লেখা লিখি ‘অ্যান্ড গড ক্রিয়েটেড উওম্যান’ ছবির পরিচালক রোজে ভাদিম-এর চাঞ্চল্যকর স্মৃতিকথা নিয়ে। স্মৃতি আর কী, তাঁর তিন বিশ্ববিখ্যাত সুন্দরী স্ত্রীদের নিয়ে রোমন্থন। সেই স্ত্রীরা কারা? না, ব্রিজিৎ বার্দো, জেন ফণ্ডা এবং কাতরিন দনোভ!

মহানায়িকার সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে কিছুতেই বলতে চাইতেন না বসন্ত চৌধুরী

লেখাটা বেরোনোর দু’দিনের মাথায় একটা ফোন এল। বসন্তদা! বললেন, ‘‘শোনো এ লেখার আলোচনা ফোনে হয় না। সন্ধেবেলায় বাড়িতে এসো। মন্টেক্রিস্টো চুরুট আর ‘কামু’ কনিয়াক দিয়ে হবে।’’

গিয়ে দেখি টেবিলে সব সাজানো। আর পাশে রাখা আছে রোজে ভাদিম-এর বইটাও। পানীয়ে চুমুক দিতে দিতে বসন্তদা বললেন, ‘ভাবো, একটা ছবি আর তিনটে বউয়ের জন্য লোকটা অমর হয়ে গেল!

সুন্দরী বউ আর বিচ্ছেদ নিয়ে কথা চলতে চলতে হঠাৎ এক সময় একটু আড়ষ্ট হয়ে গিয়েছিলাম, কারণ মনে পড়েছিল যে এই পরম রূপবান মানুষটির এক অতি অপরূপা স্ত্রী ছিলেন। অলকা। ওঁদের দুই গুণবন্ত পুত্র, যাঁদের বসন্তদা’ই মানুষ করেছেন।

স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর বসন্ত’দা আর বিবাহ করেননি এবং এও লক্ষ করলাম যে, নারী-পুরুষ সম্পর্ক নিয়ে এতশত কথার মধ্যে একটিবারও অলকার প্রসঙ্গ আনলেন না। ফলে কথায় কথায় আমিও ওঁর স্ত্রীর কথা ভুলে গেলাম।

ভুলে যে গেলাম তার কারণ খানিক পরে বসন্তদা’র বিচিত্র পড়াশুনো আর গভীর রসবোধের কথা উছলে উঠতে শুরু করল। একবার বললেন ‘অনেক তো ছাড়াছাড়ির কথা হল। না ছাড়তে পারলেও যে শনির দশা কাটে না সেটাও তো দেখিয়ে দিলেন অষ্টম এডোয়ার্ড।’

সে-সময়েই কলকাতার বাজারে এসেছিল ‘ওয়ালিস-এডোয়ার্ড লাভ লেটার্স’। রাজা এডোয়ার্ড ও তাঁর মার্কিন প্রণয়িনী ওয়ালিস সিম্পসনের প্রেমপত্র নিয়ে জোর তর্ক পড়ুয়া সমাজে।

সে-সব চিঠির জায়গা-জায়গা থেকে উল্লেখ করে বসন্তদা বললেন, ‘‘এও তো মহাপ্রস্থান। মিসেস সিম্পসনেরও দাপট দ্যাখো। ইংল্যান্ডের সিংহাসন ছাড়ছে প্রেমিক, ভয়ে ভয়ে সরেও গেল না! এই হচ্ছে আমেরিকান নার্ভ।’’

নার্ভ ধরে রাখতে পারেননি বলেই নাকি মুহম্মদ বিন তুঘলক বাজারে তাঁর টাকা চালু রাখতে পারেননি। জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘সেই মুদ্রা কি হাতে এসেছে?’’

বললেন, ‘‘কী করে আসবে? টাকা তো ঘুরলই না। ঠিক যে দশা বাঙালি রান্নার পদের। বাঙালির রান্নাঘরে নেই, বইয়ে বইয়ে ঘুরছে। যে কথাটা সেদিন শাঁটুল (রাধাপ্রসাদ গুপ্ত) বলছিল না বিলেতের সাহেবকে? আফশোস হয়।’’

অনেক রাতে বসন্তদা’র ওখান থেকে বেরিয় রাস্তায় পড়ে আরেকটা আফশোস মনে এল আমার। হাফপ্যান্ট পরা বয়সে ফিল্ম পত্র-পত্রিকায় বসন্ত ও অলকার সদ্যবিবাহিত যুগল ফটো সব দেখে ভাবতাম, ইস্, এত সুন্দরী মহিলা, ইনিও তো নায়িকা হলে পারেন। অনেক পরে শুনেছি অলকার নায়িকা হওয়ার কথা ছিল সত্যজিৎবাবুর ছবিতে। আপত্তি ছিল হবু কর্তা বসন্ত চৌধুরীর। কাজেই হয়নি।

ফিরতে ফিরতে আরও মনে পড়ছিল বসন্ত সম্পর্কে বন্ধু রাধাপ্রসাদের মূল্যায়ন। বলেছিলেন, ‘‘ও একটা robust ভদ্রলোক। অনেক দিকে মাথা খেলে। কিন্তু পল্লবগ্রাহী নয়। ভীষণ সেন্স অফ হিউমার, কিন্তু তাঁর সঙ্গে কোথাও যেন একটা মেলানকোলির ছোঁয়া।’’

জানি না এটা বলার সময় বিশ্বপড়ুয়া রাধাপ্রসাদের মাথায় ফ্ল্যোব্যের-এর ‘মাদাম বোভারি’ উপন্যাসের এই বর্ণনা মাথায় ঘুরছিল কিনা—মেলানকোলি গেইটি বা বিষণ্ণ আনন্দ। তবে এ যে কী ভীষণ মানায় বসন্তদা’কে তা আজ ওঁর মৃত্যুর ঠিক পনেরো বছরের দিনক্ষণে (২০ জুন, ২০০০) বার বার মনে হচ্ছে।

বসন্তদা’কে আমার শেষ বাঙালি বলাটাও মনে হয় রাধাপ্রসাদ বেঁচে থাকলে একটা ইংরেজি শব্দ দিয়ে জোর সমর্থন করতেন—অ্যাবসলিউটলি!

নাগপুরের বাঙালি বসন্তর হিন্দি তো চোস্ত ছিল, তবে বাংলায় কি হিন্দির ছায়াটান ছিল?

যখন অভিনয় করছেন তখন তো অসম্ভব মার্জিত অ্যাক্সেন্ট, কিন্তু মজামিরির আড্ডায়, ঠাট্টা-ইয়ার্কির বুলিতে দিব্যি একটা শোভাবাজারি টানও চালু করতে পারতেন।

যেটা খুব শোনা যেত যখন ওঁর তিন পিঠোপিঠি বয়েসের বন্ধু অমিতাভ চৌধুরী (ম্যাগসাইসাই পুরস্কাপ্রাপ্ত সাংবাদিক), ‘রবীন্দ্রনাথের পরলোকচর্চা’-র লেখক সদ্যপ্রয়াত অমিতাভ চৌধুরী এবং ইউএসআইএস-এর প্রাক্তন পাবলিকেশনজ্ ডিরেক্টর ওম্বিকা গুপ্ত (হ্যাঁ, ওটাই ওঁর নামের বানান) এককাট্টা হতেন।

‘পরলোকচর্চা’-র দুঁদে তার্কিক অমিতাভ চৌধুরীকেও দিব্যি চেপে দিতেন বুলি, কায়দার উচ্চারণ আর যুক্তি-কুযুক্তির ভেল্কিতে।

এরকম এক রেপার্টি বা শাণিত প্রত্যুক্তির পর অমিতদা বোধহয় বলেছিলেন, ‘‘ছাড় তো তোর ও সব ফাজলামো!’’

তাতে মার্টেলজ ব্র্যান্ডিতে ছোট্ট চুমুক দিয়ে সামান্য হেসে এবং ছদ্ম কেশে বসন্তদা’র জবাব ছিল: ‘‘তা তো বলবি। তবে শব্দটার মাতৃভাষা উর্দুতে ফাজিল-এর মানে কিন্তু জ্ঞানগম্যি লোক। আর ফাজ্ল্ কথার মানে পাণ্ডিত্য।’’

তখন নিরুপায় অমিতদা বললেন, ‘‘বুঝলাম। তবে আমি আমার বাংলা মানেতে কথাটা বলেছি। তোমার ঊর্দু তোমার কাছে রাখো।’’

তাতে বসন্ত চৌধুরী উপসংহার টানলেন, ‘‘এই তো, এই করেই তো বাঙালি প্যারোকিয়ালই থেকে গেল, নিজের জলচৌকিতে বসে লর্ড ক্লাইভ!’’

নাগপুরের বসন্ত চৌধুরীকে কিন্তু চেষ্টা করেই মনে হয় ওঁর ওই বাঙালি পার্সোনা বা ব্যক্তিত্ব তৈরি করে নিতে হয়েছিল। ওঁর যে-রসিক সত্তাটা দেখা যেত সেটা ওঁর সিনেমার কোনও চরিত্রের সঙ্গে মেলে না।

‘ভগবান শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য’, ‘আঁধারে আলো’ বা ‘রাজা রামমোহন’-এর কথা ছেড়ে দিচ্ছি, ওঁর অন্য স্মরণীয় ছবি কী? ‘যদু ভট্ট’, সুচিত্রা সেনের বিপরীতে ‘দীপ জ্বেলে যাই’, ‘শুভরাত্রি’ ও ‘মেঘ কালো’, এছাড়া ‘অভয়া ও শ্রীকান্ত’, ‘অনুষ্টুপ ছন্দ’, ‘দিবারাত্রির কাব্য’ ও ‘দেবী চৌধুরাণী’।

প্রাচীন মুদ্রা, গণেশ মূর্তি ও জামেয়ার সংগ্রাহক, সুরা সিগার পঞ্চব্যঞ্জন বিলাসী, ড্রইংরুমে আলো করা রাকঁতর্ বা গল্পপটু বসন্ত চৌধুরীর কোনও ছায়া নেই ওঁর গম্ভীর, প্রধানত দুঃখী, কখনও রোম্যান্টিক হলেও বেদনার কারণেই স্মরণীয় সিনেমার চরিত্রগুলোয়। জীবন ও সিনেমায় সম্পূর্ণ দুটো ভিন্ন সরণিতে হেঁটে গেছেন বসন্ত চৌধুরী। দু-দুটি ভিন্ন সাফল্যের লক্ষ্যে।

‘রাজা রামমোহন’-এর জন্য বিএফজেএ পুরস্কার পেয়েছিলেন, কিন্তু আরও জটিলভাবে বাঙালি মনস্তত্ত্বে মিশে আছেন ‘আঁধারে আলো’র নায়ক চরিত্রের জন্য।

চেহারা ছাড়াও বসন্তদার কণ্ঠস্বর পুরোপুরি ভগবৎদত্ত। সত্যজিৎ রায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এবং অমিতাভ বচ্চন ছাড়া অত সুন্দর পুরুষ কণ্ঠস্বরও বেশি শুনিনি। মাঝে মাঝে ‘ভয়েস এজ’ বা স্বরের বয়েস নিয়ে বলতেন।

ওঁর প্রিয় বন্ধু, এলগিন রোডের জাহাজ বাড়ির মিলন সেনের উদ্যোগে দিলীপকুমার রায়ের ‘অ্যামাঙ্গ দ্য গ্রেট’ বই অবলম্বনে একটা অনুষ্ঠান করার কথা হয়েছিল ওঁর। রবীন্দ্রনাথ, রোম্যাঁ রোল্যাঁ, বার্ট্রান্ড রাসেল, গাঁধী ও শ্রীঅরবিন্দের সঙ্গে দিলীপবাবুর সাক্ষাৎকার নিয়ে বই।

তা থেকে একটা স্ক্রিপ্ট তৈরি করতে হয়েছিল আমাকে। তখন বসন্তদা’ ধরলেন দিলীপকুমারের প্রশ্নগুলো আমাকেই পড়তে হবে মঞ্চে।

ভয়ে ভয়ে রাজি তো হলাম, পরে বসন্তদা’র ওখানে রিহার্সাল করতে গিয়ে এক অপূর্ব অভিজ্ঞতা হল। একে তো ওই স্বর্ণকণ্ঠের পাঠাবেশ, তার মধ্যে হঠাৎ-হঠাৎ সেই মধুর লহরের মধ্যে বসন্তদার আওয়াজ বসে যাওয়া। দিন তিনেক এমন হওয়ার পর বসন্তদা মিলনদাকে জানিয়ে দিলেন এই প্রোগ্রাম উনি করতে পারবেন না।

বাড়ি যেতে একটা জে অ্যান্ড বি স্কচ হুইস্কি খুলে সামনে রেখে বললেন, ‘‘পড়া থাক, দু’জনে এটা খাই চলো। আর এই নাও সিগার। একটা খাও আর বাক্সটা নিয়ে যাও।’’ দেখলাম সিগারটা আলজিরীয়, আর টান দিয়ে বুঝলাম এর স্বাদ ষোলো আনা স্বর্গীয়।

বসন্তদা কিন্তু দেখলাম সিগার ঠোঁটে নিচ্ছেন না। চমৎকার চিনা খাবার আনিয়েছেন, সেইগুলো এগিয়ে দিচ্ছেন। আমার মনে পড়ল আমাদের বাড়িতে প্লেট-ডিঙানো জাম্বো প্রন দেখে অমিতাভ চৌধুরী যখন বলছেন, ‘‘ওরে, এ তো লবস্টার নয়, মনস্টার!’’ বসন্ত চৌধুরী দিব্যি চিংড়ি‌র পরতের পর পরত উপড়ে সাবেক বাঙালির কীর্তিত স্টাইলে খেয়ে যাচ্ছেন মালাইকারি। ‘মাছ আর বাঙালি’-র লেখক রাধাপ্রসাদ যাঁর খাওয়া নিয়ে আমায় বলেছিলেন, ‘‘ফিটফাট ধুতি-পাঞ্জাবি মেন্টেন করে বসন্ত কীরকম খায় দেখেছ পার্টিতে! একটা ছিটে লাগে না কোত্থাও।’’

সেই বসন্তদা আমায় খাবার বাড়াচ্ছেন, নিজে নিচ্ছেন নামমাত্র। তার পর যখন বেরুচ্ছি, আমায় ‘দাঁড়াও! দাঁড়াও!’ করে আটকে পেল্লায় পেল্লায় দু’বাক্স বর্মা চুরুট এনে বললেন, ‘‘এগুলোও তোমার। আমায় মনে হচ্ছে সিগারটা ছাড়তে হবে।’’

কিন্তু ঘুণাক্ষরে বুঝতে দিলেন না ওঁর শরীরে কর্কট রোগ ধরা দিয়েছে। বরং মুহূর্তটাকে হাল্কা করতে প্রশ্ন করলেন, ‘‘আমার গায়ের ওডিকোলোনটা ধরতে পারলে?’’

বললাম, ‘‘বুঝতে পারছি অ্যামেরিকান, তবে ব্র্যান্ডটা ধরতে পারছি না।’’

বসন্তদা হেসে বললেন, ‘‘এই সবে লঞ্চড্ হয়েছে— ক্যালভিন ক্লাইন নাম্বার ওয়ান। এক ভক্ত নিয়ে এসেছে ওদেশ থেকে।’’

বসন্ত চৌধুরীর ভক্তের শেষ ছিল না। অভিনেতা বসন্তর ভক্ত অনেকেই, কিন্তু মানুষ বসন্তর কে নয়?

একটা দীর্ঘ সময় ধরে কলকাতার সেরার সেরা সান্ধ্য পার্টির সেরা মুখ ছিলেন বসন্ত। কলকাতার শেরিফ এবং নন্দন-এর চেয়ারম্যান পদ তো আলো করেইছেন। কিন্তু রাতের পর রাত বসন্ত চৌধুরীর ভেতরকার সেরা মানুষটাকে বেরিয়ে আসত, এক পেট ভাল ডিনার খেয়ে লিকিওর গ্লাসে একটু একটু আউরম, বেনেদিক্তিন বা কোয়ান্ত্রো নিয়ে।

বসন্তদার ভেতরের সেরা মানুষটা খুব ভাল মানুষ। আর দশটা সিনেমার মানুষের সম্পর্কে একটা খারাপ কথা নয়। নিজের প্রশংসাও কানে নিতেন না। সে বিমল রায়ের ‘পরখ’ ছবিতে সাধনার সঙ্গে, কী ‘দীপ জ্বেলে যাই’-তে সুচিত্রার বিপরীতে অভিনয়ের কথা এমন দায়সারা ভাবে বলতেন, যেন ও সব রোজকার অপিসের কাজ।

সাধনা বা সুচিত্রার আকর্ষণটা কোথায়?

এক সন্ধ্যায় এই প্রশ্নের জবাবে বসন্তদা’র উত্তরটা ছিল এ রকম: ‘‘সাধনার মুখটা এমনিতেই খুবই সুন্দর। কপালটা ঢেকে রাখত চাইনিজ কাট চুলে। তবে ‘পরখ’-এ বিমলদা ওকে শাড়িপরা সাধারণ মেয়ের চেহারায় এনেছিলেন। ওঁর মাথায় তখন নূতনের ইমেজটা প্লে করছিল। সাধনাকে মানিয়েও গেল।’’

কোনও রোম্যান্টিক ইনভল্ভমেন্ট?

‘‘দূর বাচ্চা মেয়ে!’’

আর সুচিত্রা?

বসন্তদা এমন ভাবে প্রসঙ্গটা এড়িয়ে গেলেন যেন এটা কোনও প্রশ্নের স্তরেই ওঠে না। বললেন, ‘‘খুবই প্রফেশনাল অ্যাক্ট্রেস, কাজ নিয়ে ইন্টারঅ্যাক্ট করা যেত। এ ছাড়া ওর একটা নিজের জগৎ তো ছিলই। যখন ‘শ্রীচৈতন্য’ করছি, তখন এক সুচিত্রা দেখেছি, ‘দীপ জ্বেলে যাই’-এর সময় ও তো এখনকার এই ইমেজে এসে গেছে। আর রোম্যান্টিক?’’

নিজেই প্রশ্নটা করে চুপ করে গেলেন। এর কী মানে আজও জানি না। কিছুক্ষণ এ ভাবে চুপ থেকে এ বার আমাকে প্রশ্ন করলেন, ‘‘ভবঘুরে চ্যাপলিনকে রোম্যান্টিক লাগে না?’’

— বললাম, ‘‘ভীষণ!’’

— মেয়েদের মধ্যে এমনটা?

— মানে?

— দুষ্টু, মিষ্টি, খ্যাপাটে, বিষণ্ণ আর খুব মজার।

— ‘ব্রেকফাস্ট অ্যাট টিফেনিজ’-এর অড্রে হেপবার্ন। ‘ডিভোর্স ইটালিয়ান স্টাইল’-এর সোফিয়া লোরেন, ‘বেল দ্য জুর’-এর কাতরিন দনোভ।

— এক্সেলেন্ট! আর এ দেশের?

— ‘গাইড’-এর ওয়াহিদা, কী জানি একটু বেশি বিষণ্ণতার দিকে ঝুঁকে পড়লেও নূতন এবং সাধনা।

বসন্তদা সব উত্তরকে ডিটো করে বললেন, ‘‘দ্যাখো, সত্যজিৎবাবুর কপাল। ওঁকে অস্কার দিতে পেয়ে গেলেন অড্রে হেপবার্নকে!’’

সুযোগ পেলেই ওঁর এই সত্যজিৎ প্রশংসা শুনতে বেশ ভাল লাগত। আর ভাবতাম এই বসন্তই সত্যজিতের শ্যুটিং ফ্লোর থেকে তুলে নিয়ে এসেছিলেন ভাবী স্ত্রী অলকাকে।

মনে পড়ল ওঁর বড় ছেলে সৃঞ্জয়ের লেখা টেলিগ্রাফ পত্রিকায় সত্যজিৎ উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করাতে কী রকম চোখ ছল ছল করে উঠেছিল স্বভাবত সংযত বসন্তদার। মুহূর্তের মধ্যে পুত্র-গৌরবে মুখটা আচ্ছন্ন হয়ে গেল, সামলে নিয়ে বললেন, ‘‘কী সুন্দর কথাগুলো বলেছিলেন সত্যজিৎ।’’

যদ্দুর মনে করতে পারি, কথা হচ্ছিল একটা পাঁচ তারা হোটেলের পার্টি ফ্লোরে। জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘‘সত্যজিৎবাবুর সঙ্গে দেখা হয়?’’

কী জানি, উত্তর করবেন না বলেই হয়তো সহসা বলে উঠলেন, ‘‘দ্যাখো, মদ ঠোঁটে নেবার আগে নানা দেশের কত ভিন্ন ভিন্ন উল্লাস ধ্বনি। ফরাসিরা কিন্তু তার মধ্যেও তোমার স্বাস্থ্যের শুভকামনা করে। এই হচ্ছে কালচার।’’

বাঙালি সংস্কৃতির এক সেরা মুখ বসন্ত চৌধুরীর কৃষ্টি ছিল বীরের মতো নিজের ব্যথা-বেদনাকে গোপন রেখে দেওয়া। আনন্দটুকুই শুধু ভাগ করার।

তাই দীর্ঘ দিন ওঁর ক্যানসার লুকিয়ে রাখলেন সবার থেকে। মৃত্যুর দোরগোড়ায় এসে ভারতীয় জাদুঘরে শেষ এক বার এলেন এক অনুষ্ঠানে, নিজের কিছু সংগ্রহ দান করতেই কি? মনে করতে পারছি না।

শেষ বাঙালি এলেন এবং চলে গেলেন হুইলচেয়ারে। বেরনোর মুখে দাঁড়িয়ে ছিলাম পাশেই।

কারও দিকে না তাকিয়ে চলে গেলেন ‘মহাপ্রস্থানের পথে’-র নায়ক। উনি কারও চোখের জল সহ্য করবেন না।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.