৩৬ বছরে দেশের শ’তিনেক বিলাসবহুল হোটেলে প্রতারণা! চম্পট দিতেন বিল না দিয়েই, অবশেষে গ্রেফতার চার্লস শোভরাজের ‘শিষ্য’
অভিযোগ, গত তিন দশক ধরে ভারত জুড়ে ৩০০টিরও বেশি বিলাসবহুল হোটেলের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন জন। তদন্তকারীদের জন জানিয়েছেন, সিরিয়াল কিলার চার্লস শোভরাজের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন তিনি।
৩৬ বছরে ভারত জুড়ে ৩০০টিরও বেশি বিলাসবহুল হোটেলের সঙ্গে প্রতারণা। টাকা না মিটিয়েই চম্পট দিতেন হোটেল থেকে! অবশেষে পুলিশের হাতে গ্রেফতার ৬৯ বছর বয়সি অভিযুক্ত। অভিযুক্তের নাম বিংসন জন। তামিলনাড়ুর বাসিন্দা তিনি। রায়পুরের একটি হোটেলের অভিযোগের ভিত্তিতে ভুবনেশ্বর থেকে গ্রেফতার করা হয় তাঁকে।
অভিযোগ, গত তিন দশক ধরে ভারত জুড়ে ৩০০টিরও বেশি বিলাসবহুল হোটেলের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন জন। তদন্তকারীদের জন জানিয়েছেন, সিরিয়াল কিলার চার্লস শোভরাজের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন তিনি এবং প্রতারণার ক্ষেত্রে তাঁর মতোই কৌশল বেছে নিয়েছিলেন। মঙ্গলবার রায়পুর পুলিশ এ কথা জানিয়েছে।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, জন হোটেলকর্মীদের বিশ্বাস অর্জনের জন্য বিদেশি ট্যুর গাইড, ইংরেজি শিক্ষক বা যোগব্যায়াম প্রশিক্ষক সেজে অভিজাত হোটেলগুলিকে নিশানা করতেন। বিলাসবহুল ঘরে রাত্রিযাপন এবং অন্যান্য পরিষেবা উপভোগ করার পর বিল পরিশোধ না করেই চম্পট দিতেন তিনি। কোনও কোনও ক্ষেত্রে হোটেলের সম্পত্তিও চুরি করতেন।
তবে অবশেষে পুলিশের জালে ধরা পড়েছেন ৬৯ বছর বয়সি জন। জনের বিরুদ্ধে শেষ অভিযোগ দায়ের করা হয় রায়পুরের একটি বিলাসবহুল হোটেলের তরফে। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্ত গত ২৫ জুন ওই হোটেলে গিয়ে ওঠেন।
তবে অভিযোগ, হোটেলের ‘চেক-আউট’ প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করে এবং ৬৩,৭৫৫ টাকার বকেয়া বিল না মিটিয়েই ২৭ জুন সকালে সেখান থেকে পালিয়ে যান জন। এমনকি, জরুরি কাজের নামে অনুরোধ করে হোটেল কর্তৃপক্ষের থেকে প্রায় দেড় লক্ষ টাকা মূল্যের একটি ল্যাপটপ নিয়েছিলেন তিনি। চম্পট দেওয়ার সময় সেটিও সঙ্গে নিয়ে যান ৬৯ বছর বয়সি অভিযুক্ত।
আরও পড়ুন:
জনের সঙ্গে বার বার যোগাযোগের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর হোটেল কর্তৃপক্ষ পুলিশের দ্বারস্থ হন। অভিযোগের ভিত্তিতে তেলিবান্ধা পুলিশ ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (বিএনএস)-এর ৩১৮(৪) ধারায় একটি মামলা দায়ের করে।
এর পরেই জনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে ‘অ্যান্টি-ক্রাইম অ্যান্ড সাইবার ইউনিট’ এবং তেলিবান্ধা পুলিশের যৌথ দল। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্তের দেওয়া নথিপত্র এবং মোবাইল নম্বরগুলির সূত্র ধরে তদন্তকারীরা অভিযুক্তের খোঁজে ভুবনেশ্বরে পৌঁছোন। সেখানে থেকেই গ্রেফতার করা হয় তাঁকে। রায়পুরের হোটেলের ল্যাপটপও উদ্ধার করা হয় তাঁর কাছ থেকে।
পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্ত তদন্তকারীদের জানিয়েছেন যে তিনি ভারতীয়-ফরাসি ‘সিরিয়াল কিলার’ চার্লস শোভরাজের জীবনের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। এর পরেই প্রতারণার পথে পা বাড়ান।
পুলিশ সূত্রে খবর, জিজ্ঞাসাবাদের সময় জন পুলিশকে জানিয়েছেন যে শোভরাজের মতো একই কৌশল অবলম্বন করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা বিলাসবহুল হোটেলগুলিকে নিশানা করতেন তিনি। হোটেলগুলিতে ভিন্ন ভিন্ন ছদ্মবেশ ধারণ করে যেতেন তিনি। ভিন্ন ভিন্ন পেশাগত পরিচয়ও দিতেন।
আরও পড়ুন:
জেরার মুখে অভিযুক্ত জন নাকি এ-ও স্বীকার করেন যে, ১৯৯০ সাল থেকে সারা দেশে ৩০০টিরও বেশি হোটেলের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন তিনি। পুলিশের দাবি, দেশের ১০টিরও বেশি রাজ্যের শহরে, যার মধ্যে বেশ কয়েকটি মেট্রোপলিটন শহরও অন্তর্ভুক্ত, তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের রয়েছে।
তদন্তকারীরা আরও জানান, জন তিহাড়-সহ বিভিন্ন কারাগারে ১৫ বছরেরও বেশি সময় কাটিয়েছিলেন। সেখানে কুখ্যাত অপরাধীদের সংস্পর্শে এসেছিলেন তিনি। সেখান থেকেই প্রতারণার বিভিন্ন ফিকিরের সঙ্গে পরিচিত হন।
অবশেষে ওড়িশার ভুবনেশ্বর থেকে গ্রেফতার হয়েছেন ৬৯ বছর বয়সি এই ঠগ। পুরো বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত ভাবে তদন্ত চলছে বলেও জানানো হয়েছে পুলিশের তরফে।
তবে বিলাসবহুল হোটেলে দিনের পর দিন রাত্রিযাপনের পর টাকা না মিটিয়ে চম্পট দেওয়ার ঘটনা ভারতে এই প্রথম নয়। এর আগেও ঘটেছে একাধিক বার। ২০২২ সালে নিজেকে আবু ধাবি সরকারের আধিকারিক দাবি করে এক ব্যক্তি দিল্লির এক হোটেলে ছিলেন প্রায় তিন মাস। অভিযোগ, তার পর ২৩ লক্ষ টাকা বিল না মিটিয়ে পালিয়েছিলেন।
অভিযুক্তের নাম ছিল মাহামেদ শরিফ। অবশেষে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে গ্রেফতার হন তিনি। পরে জানা যায় আবু ধাবি নয়, আদতে কর্নাটকের বাসিন্দা তিনি। একটি হোটেলে প্রায় তিন মাস থেকে ২৩ লক্ষ ৪৬ হাজার ৪১৩ টাকা না মিটিয়েই পালিয়েছিলেন তিনি। হোটেল ছাড়ার সময় বেশ কিছু দামি জিনিসও চুরি করেছিলেন। হোটেলের জেনারেল ম্যানেজারের অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁকে কর্নাটক থেকেই গ্রেফতার করা হয়।
২০২৩ সালের জুন মাসেও নয়াদিল্লির বিলাসবহুল হোটেলে এক রাতের জন্য ঘরভাড়া নিয়ে মোট ৬০৩ দিন কাটিয়েছিলেন অঙ্কুশ নামে এক যুবক। বিল করেছিলেন ৫৮ লক্ষ টাকার। অভিযোগ, এত দিন ধরে হোটেলে থেকে বিলবাবদ এক টাকাও মেটাননি যুবক। এর পর হঠাৎই তিনি ওই হোটেল থেকে উধাও হয়ে যান।