ডলারের ‘দাদাগিরি’ ভাঙতে সরাসরি রুপি-ইয়েনে লেনদেন? আমেরিকাকে চাপে ফেলতে দ্বীপরাষ্ট্রের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধছে ভারত!
আগামী দিনে জাপানের সঙ্গে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন শুরু করবে ভারত? দ্বীপরাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির দিল্লিসফরে তুঙ্গে জল্পনা।
১৬তম দ্বিপাক্ষিক বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে প্রথম বার ভারতসফরে জাপানি প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। আলোচনা শেষে যৌথ বিবৃতি দেন তাঁরা। সেখানে তাকাইচিকে ‘ছোট বোন’ এবং ‘দূরদর্শী ও জনপ্রিয় নেত্রী’ বলে উল্লেখ করতে দেখা গিয়েছে মোদীকে। জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ঘটনাটিকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেকেই।
তাকাইচির সফরের মুখে দিল্লি-টোকিয়ো সম্পর্ক নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে ‘নিক্কেই এশিয়া’ নামের জাপানি গণমাধ্যম। সেখানে বলা হয়েছে, স্থানীয় মুদ্রায় দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য পরিচালনার পরিকল্পনা করছে দুই দেশ। ফলে মোদী-তাকাইচি বৈঠকে রুপি-ইয়েন লেনদেনের নীলনকশা তৈরির অনুমোদনের প্রভূত সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও আলোচনা শেষে সরকারি ভাবে এই নিয়ে কিছু বলা হয়নি।
ভারত ও জাপানের স্থানীয় মুদ্রায় দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য পরিচালনা করতে চাওয়ার নেপথ্যে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, ডলারের নিরিখে দু’টি দেশেই লাফিয়ে লাফিয়ে নামছে স্বদেশীয় মুদ্রার দাম। মুদ্রামূল্যের এই পতন নয়াদিল্লি ও টোকিয়োর জন্য বেশ উদ্বেগজনক। তা ছাড়া এ দেশের মতোই মার্কিন ডলারের উপর নির্ভরশীলতা কমাতে চাইছে প্রশান্ত মহাসাগরীয় ওই দ্বীপরাষ্ট্র।
‘নিক্কেই এশিয়া’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, রুপি-ইয়েন বাণিজ্য চালু হলে জাপানি অনাবাসীরা ভারতীয় ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট খোলার অনুমতি পাবেন। তখন যে কোনও পণ্য লেনদেনের ক্ষেত্রে স্থানীয় মুদ্রা ব্যবহার করতে পারবেন তাঁরা। শুধু তা-ই নয়, এতে টোকিয়ো ও নয়াদিল্লির পক্ষে বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা-সহ বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রে লগ্নি করা অনেক বেশি সহজ হবে।
গত বছর (২০২৫ সাল) ‘জাপান-ইন্ডিয়া ভিশন’-এ রুপি-ইয়েন সরাসরি দ্বিপাক্ষিক লেনদেনের বিষয়টি প্রস্তাব করে টোকিয়ো। সূত্রের খবর, এর পরই দুই দেশের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে শুরু হয় আলোচনা। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বড় ভূমিকা থাকবে ভারতীয় রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের (আরবিআই)। নয়াদিল্লির তরফে রুপি-ইয়েন আদান-প্রদানের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করবে তারাই।
আরও পড়ুন:
২০১৯ সালে ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে স্থানীয় মুদ্রায় দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য শুরু করে জাপান। যেটা এখনও অব্যাহত রয়েছে। ‘নিক্কেই এশিয়া’ জানিয়েছে, এর জেরে মাত্র ছ’বছরের মধ্যেই (পড়ুন ২০২৫ সাল) জাকার্তায় লগ্নির অঙ্ক ৭৭০ কোটি ডলারে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে টোকিয়ো। বর্তমানে এই ব্যবস্থা চালু করতে মালয়েশিয়ার সঙ্গেও আলোচনা চালাচ্ছে তাকাইচি প্রশাসন।
তবে ভারত-জাপান রুপি-ইয়েন লেনদেন চালু করলেও ডলার নির্ভরশীলতা কতটা কাটিয়ে উঠতে পারবে, তা নিয়ে সন্দিহান বিশেষজ্ঞ মহল। তাঁদের দাবি, নতুন ব্যবস্থায় মার্কিন মুদ্রায় বাণিজ্য করা যাবে না, সেকথা বলা হচ্ছে না। শুধুমাত্র স্থানীয় অর্থে পণ্য বেচাকেনার সুবিধা পাবেন ব্যবসায়ীরা। ফলে রুপি-ইয়েন নীচের স্তরে কতটা কাজ করবে, তা নিয়ে সন্দেহ থাকছেই।
দ্বিতীয়ত, বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য করে মার্কিন ডলারের মোকাবিলা আদৌ সম্ভব নয়। কারণ, ভারত ও জাপান কারও কাছেই নেই খনিজ তেল। ফলে জ্বালানি ঘাটতি পূরণ করতে বিপুল পরিমাণে তরল সোনা আমদানি করতে হচ্ছে তাদের। এর উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রীয় ডলারের। ফলে বৈদেশিক মুদ্রাভান্ডারে আমেরিকার টাকা থাকা জরুরি।
তৃতীয়ত, মাত্র ২,৭০০ কোটি ডলারের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য রয়েছে ভারত ও জাপানের। সেটা কলেবরে দক্ষিণ কোরিয়ার (রিপাবলিক অফ কোরিয়া বা আরওকে) থেকে অনেকটাই কম। চতুর্থত, বর্তমানে গত চার দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে চলে গিয়েছে টোকিয়োর ইয়েন। ডলারের নিরিখে মুদ্রার মূল্য ঠিক করার লাগাতার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছে ওই প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র।
আরও পড়ুন:
ফলে রুপি-ইয়েন লেনদেন ব্যবস্থা চালু হলে জাপানের লাভ হওয়ার প্রভূত সম্ভাবনা রয়েছে। উল্টো দিকে এই ব্যবস্থায় ভারত কতটা সুবিধা পাবে সেটা স্পষ্ট নয়। এ দেশে টোকিয়োর লগ্নির পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। সেই তুলনায় এ দেশের শিল্পসংস্থাগুলি প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রে যে বিপুল বিনিয়োগ করতে পারছে, এমনটা নয়। এই পার্থক্যও স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য চালু হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হতে পারে।
বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি (ইউএই), ইন্দোনেশিয়া, মলদ্বীপ এবং মরিশাসের সঙ্গে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য করছে ভারত। এ ছাড়া রাশিয়ার সঙ্গেও রুপি-রুবল দ্বিপাক্ষিক লেনদেনের চুক্তি রয়েছে নয়াদিল্লির। কিন্তু, তার পরেও কোনও জায়গাতেই সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাটি দুর্দান্ত জনপ্রিয়তা পেয়েছে, এমন নয়। কারণ, অধিকাংশ রাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক ঘাটতি রয়েছে কেন্দ্রের।
বিশ্লেষকদের দাবি, ডলারে বাণিজ্য করার সুবিধা হল এর মূল্যমানের স্থায়িত্ব। সেটা রুপি বা ইয়েন কারওরই নেই। মার্কিন মুদ্রার নিরিখে এ দেশের টাকার দাম প্রতি বছরে গড়ে পড়ে যায় অন্তত চার শতাংশ। বর্তমানে সেটা ৯৫ থেকে ৯৬-তে ঘোরাফেরা করছে। অন্য দিকে, ডলারের নিরিখে ইয়েনের মান দাঁড়িয়েছে ১৬১। আর তাই রুপি-ইয়েন লেনদেনে নীচুতলার ব্যবসায়ীরা উৎসাহিত না-ও হতে পারেন।
তবে এগুলির উল্টো যুক্তিও রয়েছে। পশ্চিম এশিয়ায় ইরান যুদ্ধের পর দুনিয়া জুড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপর ভরসা কমেছে। ফলে ডলার-নির্ভরতা কমাতে চাইছে চিন, রাশিয়া থেকে শুরু করে ইউরোপীয় ইউনিয়ানও (ইইউ)। আগামী দিনে একই রাস্তায় হাঁটতে দেখা যেতে পারে সৌদি আরব-সহ খনিজ তেল সমৃদ্ধ একাধিক উপসাগরীয় দেশকে। সে ক্ষেত্রে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন নয়াদিল্লির পক্ষে শাপে বর হতে পারে।
তা ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিরক্ষা, মহাকাশ গবেষণা, সেমিকন্ডাক্টর ও পরমাণু জ্বালানির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিতে জোর দিচ্ছে কেন্দ্রের মোদী সরকার। রফতানি বাণিজ্য বৃদ্ধির চলছে মরিয়া চেষ্টা। তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবায় ইতিমধ্যেই বিশ্বে অন্যতম ‘বড় খেলোয়াড়’ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে ভারত। ফলে জি৭-ভুক্ত জাপানের সঙ্গে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন নয়াদিল্লির আন্তর্জাতিক অবস্থান যে মজুবত করবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
মোদী-তাকাইচি বৈঠকের পর একটি প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করে ভারত ও জাপান। সূত্রের খবর, নয়াদিল্লির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে মোগামি শ্রেণির ‘স্টেলথ’ ফ্রিগেট (এক ধরনের রণতরী) তৈরি করতে চাইছে টোকিয়ো। সেটা এ দেশের মাটিতে তৈরি করার ক্ষেত্রে আপত্তি নেই প্রশান্ত মহাসাগরীয় ওই দ্বীপরাষ্ট্রের। এই প্রকল্প সবুজ সঙ্কেত পেলে রুপি-ইয়েন লেনদেনে লাভ হতে পারে দু’পক্ষের।
গত কয়েক বছর ধরেই তাইওয়ান-সঙ্কটকে কেন্দ্র করে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে চিন-জাপান সম্পর্ক। ফলে ‘আগ্রাসী’ বেজিংকে ঠেকাতে লাগাতার প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়বরাদ্দ বৃদ্ধি করছে টোকিয়ো। বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, আগামী দিনে ফৌজকে শক্তিশালী করতে ভারতীয় অস্ত্রের দিকে তাকাতে পারে তারা। সে ক্ষেত্রে ব্রহ্মস সুপারসনিক ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র বা আকাশ এয়ার ডিফেন্স বিক্রির সুযোগ পাবে নয়াদিল্লি।
তাকাইচির সঙ্গে বৈঠকের পর তার একটা ইঙ্গিত অবশ্য দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক শান্তি জোরদার করার কথা বলতে শোনা গিয়েছে তাঁকে। সাবেক সেনাকর্তাদের একাংশের ধারণা, আগামী দিনে যৌথ হাতিয়ার নির্মাণ প্রকল্পগুলিতে আরও কাছাকাছি আসবে ভারত ও জাপান। সে কথা মাথায় রেখেও রুপি-ইয়েন লেনদেনের নীলনকশা তৈরি করতে পারে দুই দেশ।
যৌথ বিবৃতিতে আগামী ১০ বছরে ভারতে ১০ লক্ষ কোটি ইয়েন লগ্নির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন জাপানি প্রধানমন্ত্রী। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) প্রযুক্তির ব্যাপারেও দু’তরফে সই হয়েছে একটি চুক্তি। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এ দেশের দ্বীপরাষ্ট্রের সংস্থার সংস্থা দ্বিগুণ হবে বলে আশাবাদী মোদী। ফলে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের ব্যাপারে দিল্লি সম্মত হয় কি না, সেটাই এখন দেখার।