‘বন্ধু’ দেশে পুড়ল মার্কিন বিমান, খুন করা হল পাইলটকে! পশ্চিমের পর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেও যুদ্ধে জড়াবে ট্রাম্পের আমেরিকা?
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে মার্কিন পাইলটকে। শুধু তা-ই নয়, ওই পাইলট যে বিমানে ছিলেন, সেটিকেও পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তেমনটাই দাবি করা হচ্ছে।
উত্তেজনা কমছেই না আমেরিকা এবং ইরানের মধ্যে। দু’দেশের মধ্যে সমঝোতার একটি মউ স্বাক্ষরিত হয়েছে। তাতে ৬০ দিনের সংঘর্ষবিরতির কথা বলা আছে। তার পরেও বিক্ষিপ্ত ভাবে অশান্তি, হামলা এবং পাল্টা হামলা হয়েছে দুই পক্ষের মধ্যে। প্রযুক্তিগত স্তরে সংঘর্ষবিরতির শর্তগুলির বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা চলছে।
এর মধ্যেই আবার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি দেশে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এক মার্কিন পাইলটকে। শুধু তা-ই নয়, ওই পাইলট যে বিমানে ছিলেন, সেটিকেও পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তেমনটাই দাবি করা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে উত্তেজনাও ছড়িয়েছে আন্তর্জাতিক মহলে।
সেই দেশ ইন্দোনেশিয়া। ঘটনাটি ঘটেছে সে দেশের হাইল্যান্ড পাপুয়ার ইয়াহুকিমো এলাকায়। ইন্দোনেশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় পাপুয়া অঞ্চলে অবতরণের পর একটি অসামরিক বিমানে আগুন ধরিয়ে দেওয়া এবং এর মার্কিন পাইলটকে গুলি করে হত্যার দাবি করেছে পাপুয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহীরা।
বিদ্রোহী গোষ্ঠীটির দাবি, বিমানটি সংঘাতপূর্ণ এলাকায় ইন্দোনেশিয়ার সামরিক সদস্যদের পরিবহণের সঙ্গে যুক্ত ছিল। সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীটির এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, এই হামলাটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইন্দোনেশিয়া সরকারের প্রতি একটি ‘বার্তা’।
উল্লেখ্য, পাপুয়ার ওই অঞ্চলে বিগত কয়েক দশক ধরে বিদ্রোহ চালাচ্ছে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলি। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সশস্ত্র বিদ্রোহীদের ঘন ঘন ও প্রাণঘাতী হামলা আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। আমেরিকার পাইলটকে গুলি করা এবং বিমান পোড়ানোর দাবি তুলেছে যে সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী, তার নাম ‘ওয়েস্ট পাপুয়া ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি’ (টিপিএনপিবি)। টিপিএনপিবির মুখপাত্র সেবি সম্বম জানিয়েছেন, বালিংগামা জেলায় বিমানটি অবতরণের পর তাদের ‘যোদ্ধা’রা মার্কিন পাইলট নিকোলাস এফ গসেলিনকে হত্যা করেছে। পুড়িয়ে দিয়েছে বিমানটিকে।
আরও পড়ুন:
টিপিএনপিবি র মুখপাত্র জানিয়েছেন, বিমানটিকে লক্ষ্যবস্তু করার কারণ সেটি টিপিএনপিবি-র নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় অসামরিক বিমান চলাচল নিয়ে আরোপ করা নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করেছিল। সম্বম দাবি করেছেন, বার বার সতর্কবার্তা দেওয়া সত্ত্বেও বিমানটি চলাচল অব্যাহত রেখেছিল। নিয়মিত ভাবে ইন্দোনেশিয়ার সেনাদের নিয়ে যাতায়াত করছিল বিমানটি এবং টিপিএনপিবির শর্ত লঙ্ঘন করছিল। আর সে কারণেই পাইলটকে হত্যা করা হয়েছে।
এই হামলাকে ইন্দোনেশিয়া ও আমেরিকা উভয় সরকারের জন্যই একটি ‘বার্তা’ হিসাবে অভিহিত করেছেন সম্বম। তাঁর দাবি, পাপুয়ায় ইন্দোনেশীয় সেনাবাহিনী এবং টিপিএনপিবি বাহিনীর মধ্যেকার সংঘাতের মূল কারণগুলি সমাধানে ব্যর্থ হওয়ার কারণেই এই বার্তা দেওয়া হয়েছে।
টিপিএনপিবি-র তরফে আরও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, পাপুয়ার যে সব এলাকাকে বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন ‘রেড জ়োন’ বলে মনে করে, সেখানে ইন্দোনেশিয়া যদি অসামরিক বিমান চলাচলের অনুমতি দেয়, তবে বিদ্রোহীরা বিমানের উপর হামলা চালানো জারি রাখবে।
ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ানতোকে পাপুয়া সংঘাত নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনা শুরুর আহ্বানও জানিয়েছেন বিদ্রোহী গোষ্ঠী টিপিএনপিবির মুখপাত্র সম্বম। পাশাপাশি তিনি রাষ্ট্রপুঞ্জের প্রতি জাকার্তা, টিপিএনপিবি এবং পাপুয়ান প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনার ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন:
বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীটির তরফে একটি ভিডিয়োও প্রকাশ্যে আনা হয়েছে। সেই ভিডিয়োয় দেখা গিয়েছে, সশস্ত্র বিদ্রোহীরা বন্দুক ও কুঠার হাতে ‘মর্নিং স্টার’ পতাকা (পাপুয়ার স্বাধীনতার প্রতীক) ওড়াচ্ছেন এবং হামলার ঘোষণা করছেন। যদিও সেই ভিডিয়োর সত্যতা যাচাই করেনি আনন্দবাজার ডট কম।
অন্য দিকে সংবাদসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইন্দোনেশীয় কর্তৃপক্ষ বিমানটি পোড়া অবস্থায় পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও তাৎক্ষণিক ভাবে বিদ্রোহীদের দাবি যাচাই বা পাইলটের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেনি।
ইন্দোনেশিয়ার যৌথ পুলিশ-সামরিক টাস্কফোর্স কেবল নিশ্চিত করেছে যে, ইয়াহুকিমোর একটি স্থানীয় বিমানবন্দরে একটি বিমান পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। সেই বিমানে মার্কিন পাইলট এবং সাত জন পাপুয়ান যাত্রী ছিলেন। তবে সত্যিই মার্কিন পাইলটকে খুন করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেননি কর্তৃপক্ষ।
যৌথ নিরাপত্তা অভিযানের মুখপাত্র ইউসুফ সুতেজো বলেছেন, ‘‘বিচ্ছিন্নতাবাদীরাই বিমানটিতে হামলা চালিয়েছেন কি না কিংবা পাইলটকে হত্যা করা হয়েছে কি না, তা কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করতে পারেননি। তবে বিমানটি পোড়ানো হয়েছে, এটা সত্য।’’
ইন্দোনেশিয়ার পরিবহণ মন্ত্রক বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, বিমানটি এক জন মার্কিন পাইলট এবং সাত জন যাত্রী নিয়ে ওয়ামেনা থেকে ইয়াহুকিমোর উদ্দেশে রওনা হয়েছিল। অবতরণের পর পরই বিমানটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বিমানটি ‘পিটি এএমএ’ নামক একটি বিমানসংস্থার ছিল, যারা পাপুয়ার প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে খাদ্য, জ্বালানি ও ডাক সেবা পৌঁছে দেয়। যদিও এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে ‘পিটি এএমএ’ বা জাকার্তায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস— কোনও পক্ষই এখনও কোনও মন্তব্য করেনি।
বিশ্বের সর্বাধিক মুসলিম জনসংখ্যার দেশ ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে সম্প্রতি প্রতিরক্ষা চুক্তি সেরেছে আমেরিকা। চলতি বছরের ১৩ এপ্রিল জাকার্তা-ওয়াশিংটন সামরিক সমঝোতার বিষয়টি সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম এক্স হ্যান্ডলে পোস্ট করে জানান মার্কিন যুদ্ধসচিব পিট হেগসেথ। ওই চুক্তি প্রসঙ্গে এক্স হ্যান্ডলে করা পোস্টে হেগসেথ লিখেছিলেন, ‘‘ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে বৃহৎ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা অংশীদারি চুক্তি করতে পেরে আমরা অত্যন্ত গর্বিত।’’
চুক্তিটির পোশাকি নাম ‘বৃহৎ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা অংশীদারি’ চুক্তি। বিশেষজ্ঞদের দাবি, এর জেরে মলাক্কা প্রণালীতে বাড়তি নজরদারির অধিকার পাবে যুক্তরাষ্ট্রের ফৌজ। ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরের এই সঙ্কীর্ণ জলপথটিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পণ্য চলাচলের ‘লাইফলাইন’ বললে অত্যুক্তি হবে না। সংশ্লিষ্ট সমঝোতায় সই করতে সে সময় যুক্তরাষ্ট্র সফর সেরেছিলেন জাকার্তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী শাফরি শামসু্দ্দিন। তাঁকে আমেরিকার যুদ্ধ দফতরের (ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ার) সদর কার্যালয় পেন্টাগনে স্বাগত জানিয়েছিলেন স্বয়ং হেগসেথ। মূল চুক্তিটি হয়ে গেলেও এখনও বেশ কিছু ব্যাপারে দু’তরফে আলোচনা চলছে বলে জানা গিয়েছে।
সংবাদসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মলাক্কা প্রণালীতে নজরদারির জন্য ইন্দোনেশিয়ার আকাশসীমায় অবাধ প্রবেশাধিকার চেয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। যদিও এ ব্যাপারে এখনও সবুজ সঙ্কেত দেয়নি জাকার্তা। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দু’তরফে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছে দ্বীপরাষ্ট্র। অন্য দিকে যৌথ বিবৃতিতে চুক্তিবদ্ধ দু’টি দেশ জানিয়েছে, তিনটি স্তম্ভের উপর ভিত্তি করে ‘বৃহৎ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা অংশীদারি’ সমঝোতা হয়েছে। সেগুলি হল, সামরিক আধুনিকীকরণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ এবং পেশাগত দক্ষতা ও অভিযানে সহযোগিতা।
তবে সেই চুক্তির কয়েক মাসের মধ্যেই এ বার ইন্দোনেশিয়ায় গুলি করে খুন করা হল মার্কিন পাইলটকে। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন বিষয়টিকে মোটেও ভাল ভাবে নেবে না আমেরিকা। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করবে দেশটি। তবে সেই পদক্ষেপ কী হবে তা নিয়ে বিভিন্ন মত উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিদ্রোহী দমনের জন্য ইন্দোনেশিয়ার হাত শক্ত করতে পারে আমেরিকা। প্রয়োজনীয় যুদ্ধাস্ত্র দিয়েও সাহায্য করতে পারে। তবে অন্য একাংশ আবার মনে করছে, সে পথে না গিয়ে সরাসরি পদক্ষেপ করতে পারে ওয়াশিংটন। সে ক্ষেত্রে পশ্চিম এশিয়ার পর এ বার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সংঘাতে জড়াতে পারে আমেরিকা। তবে এখনও পর্যন্ত পুরো বিষয়টিই রয়েছে জল্পনার স্তরে।
বছর দু’য়েক আগে পাপুয়ার বিদ্রোহীরা নিউ জ়িল্যান্ডের পাইলট ফিলিপ মেহরটেনসকে অপহরণ করেছিল। তাঁর বিমানটি প্রত্যন্ত এনডুগা অঞ্চলে অবতরণের পর ঘটনাটি ঘটেছিল। দীর্ঘ কয়েক মাস বন্দি থাকার পর ২০২৪ সালে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়।