‘দুর্গ’ ধ্বংসকারী খেইবার শেকান থেকে শাহাব, সেজ্জিল! কী কী ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে ইরানের? আকাশ প্রতিরক্ষাতেও বা কতটা এগিয়ে?
ইরানের হাতে ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ়, দু’ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রই রয়েছে। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন অনুসারে, ইরানের হাতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত রয়েছে ৩,০০০-এরও বেশি। তবে সব ক’টিই মাঝারি ও কম পাল্লার।
পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতির এক সপ্তাহের বেশি সময় অতিক্রান্ত। ইরানের উপর ক্রমাগত আঘাত হানছে মার্কিন ও ইজ়রায়েলি বাহিনী। ইরানের তেলের ডিপোগুলি লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে। ঘন কালো ধোঁয়ায় ভরে উঠেছে তেহরানের আকাশ।
পাল্টা হামলা চালাচ্ছে ইরানও। ইজ়রায়েল এবং মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইরান। উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলা চালিয়ে আমেরিকার একাধিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘থা়ড’ (টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স) গুঁড়িয়ে দিয়েছে পারস্য উপসাগরের পাশের দেশটি। অত্যাধুনিক এই রেডার ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে আমেরিকাকে হুঁশিয়ারিও দিয়েছে আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের দেশ।
পাশাপাশি, সংযুক্ত আরব আমিরশাহিকে লক্ষ্য করে পর পর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান। একই সঙ্গে শতাধিক ড্রোন হামলাও চালিয়েছে তারা। এমনটাই অভিযোগ তুলেছে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির প্রশাসন।
যুদ্ধ পরিস্থিতির দ্বিতীয় সপ্তাহে সামরিক বাহিনীর তরফে একাধিক ভিডিয়ো প্রকাশ্যে এনে ইরান দাবি করেছে যে, তারা ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ় ৪’-এর ২৮তম ধাপের অংশ হিসাবে খেইবার শেকান, এমাদ এবং গাদর ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।
যুদ্ধ বিশেষজ্ঞেরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, ভবিষ্যতের হামলা আরও বড় হতে পারে এবং তা প্রতিহত করা আরও কঠিন হতে পারে, বিশেষ করে যদি ইরান তার সবচেয়ে উন্নত ফতেহ-১ এবং খেইবার শেকানের মতো ক্ষেপণাস্ত্র বেশি করে ব্যবহার করে।
আরও পড়ুন:
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে ইজ়রায়েল-আমেরিকার যৌথশক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইরানের হাতে কী কী ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে? পারস্য উপসাগরের পাশের দেশটির হাতে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাই বা কী কী রয়েছে?
ইরানের হাতে ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ়, দু’ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রই রয়েছে। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন অনুসারে, ইরানের হাতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত রয়েছে ৩,০০০-এরও বেশি। তবে এর সব ক’টিই মাঝারি ও কম পাল্লার।
ইহুদিদের ধ্বংস করতে ইরান কাজে লাগাতে পারে দু’ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র। ৩০০ কিলোমিটার থেকে ২,৫০০ কিলোমিটার পাল্লার এই সব ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের একাধিক ধরন রয়েছে। এর মধ্যে ছোট ও মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইরান থেকে সরাসরি ইহুদি ভূখণ্ডে হামলা করা সম্ভব নয়।
স্বল্পপাল্লার অস্ত্রের মধ্যে, শাহাব-১ (৩৫০ কিমি) এবং শাহাব-২ (৭৫০ কিমি) ব্যবহার করে ইরান। এ ছাড়াও রয়েছে কিয়াম-১, যার পাল্লা ৭৫০ কিমি। সব ক’টিই তরল জ্বালানি দিয়ে চলে। কঠিন জ্বালানিচালিত হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ফতেহ পরিবারের মধ্যে রয়েছে ফতেহ-১১০ (৩০০ কিমি), ফতেহ-৩১৩ (৫০০ কিমি) এবং জ়োলফা (৭৫০ কিমি)।
আরও পড়ুন:
তবে ২,৫০০ কিলোমিটার পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইহুদিদের এলাকায় আক্রমণ চালাতে পারে শিয়া মুলুকটি। এর মধ্যে রয়েছে শাহাব-৩, সেজ্জিল, গদর ১১০-এর মতো ক্ষেপণাস্ত্র। এগুলির পাল্লা ১২০০ থেকে ৩০০০ কিলোমিটারের মধ্যে।
ইরানের হাতে রয়েছে খেইবার শেকান-এর মতো ক্ষেপণাস্ত্রও। আইআরজিসি অ্যারোস্পেস ফোর্স দ্বারা পরিচালিত এবং কঠিন জ্বালানিচালিত এই ক্ষেপণাস্ত্রটি মাঝারি পাল্লার একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র।
‘খেইবার শেকান’ কথাটির অর্থ ‘ক্যাসল বাস্টার’ বা ‘দুর্গ ধ্বংসকারী’। সুরক্ষিত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার ক্ষেত্রে এর বিশেষ সুনাম রয়েছে। ইরানি সংবাদমাধ্যমের মতে, ক্ষেপণাস্ত্রটির পাল্লা প্রায় ১,৪৫০ কিলোমিটার। ফলে ক্ষেপণাস্ত্রটি সহজেই পশ্চিম ইরান থেকে ইজ়রায়েলে পৌঁছোতে সক্ষম।
খেইবার শেকান ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রায় ৪ মিটার লম্বা এবং প্রায় ১,৫০০ কিলোগ্রাম ভারী। বায়ুমণ্ডলের মধ্যে ১৯,৫০০ কিমি প্রতি ঘণ্টা এবং বায়ুমণ্ডলের বাইরে প্রায় ৯,৮০০ কিমি প্রতি ঘণ্টা গতিতে আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্রটি। ফলে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পক্ষেও এটিকে আটকানো কঠিন।
আমেরিকা-ইজ়রায়েলের মতো উন্নত না হলেও ইরানের হাতেও রয়েছে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা ‘এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম’ হল শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, যুদ্ধবিমান এবং রকেটের হামলার বিরুদ্ধে কোনও দেশের প্রতিরক্ষামূলক ঢাল। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় সাধারণত রেডার, সেন্সর, কমান্ড এবং ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র থাকে। রেডারগুলি প্রথমে আগত হুমকিকে শনাক্ত করে। পরে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তার তীব্রতা এবং গতিপথ মূল্যায়ন করে।
যদি হামলা বিপজ্জনক বলে মনে হয়, তা হলে মাঝ-আকাশে লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করার জন্য ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। যেহেতু আধুনিক যুদ্ধে বড়সড় আঘাত সাধারণত আকাশ থেকে হয়, তাই আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যে কোনও দেশের নিরাপত্তায় প্রথম সারির ভূমিকা পালন করে।
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ইরান তার দেশীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করায় অগ্রাধিকার দিয়েছে। ইরানের হাতে থাকা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার তালিকায় প্রথমেই রয়েছে এস-৩০০ পিএমইউ২। রাশিয়া থেকে কেনা এই দূরপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ঢাল।
তবে ২০২৪ সালের অক্টোবরে ইজ়রায়েলি বিমান হামলার সময় এস-৩০০ পিএমইউ২ উল্লেখযোগ্য ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল। ফলে তেহরান অভ্যন্তরীণ বিকল্পগুলিতে আরও বেশি মনোযোগ দিতে বাধ্য হয়েছিল।
ইরানের হাতে রয়েছে ‘বাভার-৩৭’ নামে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি দূরপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা ‘সৈয়দ-৪বি’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে বলে জানা গিয়েছে। দাবি, ক্ষেপণাস্ত্রটির পাল্লা প্রায় ৩০০ কিলোমিটার। খোরদাদ-১৫ নামে মাঝারি পাল্লার একটি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও রয়েছে ইরানের। ওই প্রতিরক্ষা সহজেই স্থানান্তরিত করা সম্ভব। সেই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি ৮৫ কিলোমিটার পর্যন্ত স্টেলথ যুদ্ধবিমান শনাক্ত করতে পারে বলেও জানা গিয়েছে।
ইরানের হাতে সেভম খোরদাদ নামে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি ১০৫ কিলোমিটার পর্যন্ত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে সক্ষম বলে জানা গিয়েছে। ২০১৯ সালে একটি মার্কিন ড্রোন ধ্বংস করার পর বিশ্বব্যাপী মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ইরান দাবি করে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলি পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমানকে লক্ষ্যবস্তু করে আঘাত হানতে পারে। তবে যুদ্ধ বিশেষজ্ঞেরা সাধারণত ইজ়রায়েল এবং আমেরিকার প্রযুক্তিকেই যোগ্যতার পাল্লায় এগিয়ে রাখেন।