অগ্নি-৬, না কোনও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র? সিঁদুরের বর্ষপূর্তিতে রহস্যের আড়ালে কোন ‘ব্রহ্মাস্ত্রের’ পরীক্ষা চালাল ভারত?
চলতি বছরের ৮ মে ওড়িশা উপকূলে একটি ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালিয়েছে নয়াদিল্লি। তবে এই পরীক্ষা নিয়ে সামরিক বিশ্লেষক মহলে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।
অন্ধকার চিরে সাদা ধোঁয়া ছড়িয়ে সাপের মতো এঁকেবেঁকে ছুট! চোখের পলক ফেলার আগেই গায়েব সেই ‘ধূমকেতু’। চলতি বছরের ৮ মে, শুক্রবার ওড়িশা উপকূলের আকাশে এ-হেন দৃশ্য দেখে হতবাক এলাকাবাসী। এই ঘটনাকে মহাজাগতিক বিস্ময় বলে ধরে নিয়ে তা স্মার্টফোনের ক্যামেরাবন্দি করেন তাঁদের একাংশ। যদিও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভাঙে ভুল। জানা যায়, অত্যাধুনিক প্রযুক্তির দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে ভারত।
নিত্যনতুন হাতিয়ারের শক্তি যাচাই করতে দীর্ঘ দিন ধরেই ওড়িশার এপিজে আব্দুল কালাম দ্বীপটি ব্যবহার করে আসছে নয়াদিল্লির প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা ডিআরডিও (ডিফেন্স রিসার্চ ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজ়েশন)। যদিও এ বারের পরীক্ষা শেষে সামরিক বিশ্লেষকদের মনে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। তাঁদের প্রশ্ন, অগ্নি-৬-এর প্রাথমিক মহড়া সেরে রাখল ভারত? না কি সেনার তূণে আসতে চলেছে কোনও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র?
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের এই জিজ্ঞাসা একেবারেই অমূলক নয়। কারণ, সম্প্রতি নিরাপত্তা সংক্রান্ত একটি আলোচনাচক্রে অগ্নি-৬ নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেন ডিআরডিওর চেয়ারম্যান সমীর ভি কামাত। তাঁর কথায়, ‘‘আমরা এই ক্ষেপণাস্ত্রের প্রতিটা যন্ত্রাংশের আলাদা আলাদা করে পরীক্ষা চালিয়েছি। এখন শুধু চূড়ান্ত শক্তি যাচাইয়ের প্রক্রিয়াটি বাকি। তার জন্য আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত। সরকারের থেকে সবুজ সঙ্কেত এলেই সেই পরীক্ষা করা হবে।’’
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ডিআরডিও চেয়ারম্যানের এই মন্তব্যের পরেই বঙ্গোপসাগরে বিমান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা বা ‘নোটাম’ (নোটিস টু এয়ারম্যান) জারি করে কেন্দ্র। তিন-চার দিনের মাথায় ওড়িশা উপকূলে চলে নতুন ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা। তাতে ১০০ শতাংশ সাফল্য পেয়েছে নয়াদিল্লি। গত ৯ মে, শনিবার সেই কথা জানিয়ে এক্স হ্যান্ডলে (সাবেক টুইটার) পোস্ট করে কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। যদিও সংশ্লিষ্ট হাতিয়ারটির ব্যাপারে খুব বেশি তথ্য প্রকাশ্যে আনেনি তারা।
এক্স হ্যান্ডলের পোস্টে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক জানিয়েছে, গত ৮ মে, শুক্রবার ওড়িশার চাঁদিপুরের এপিজে আব্দুল কালাম দ্বীপে এমআইআরভি ক্ষমতাসম্পন্ন উন্নত (অ্যাডভান্সড) অগ্নি ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালানো হয়েছে। কিন্তু, পরমাণু হামলায় সক্ষম হাতিয়ারটি কত নম্বর সিরিজ়ের, সেটা না বলায় তৈরি হয়েছে নানা জল্পনা। কেউ কেউ বলছেন, অগ্নি-৫-এরই শক্তি যাচাই করেছে ভারত। কারও আবার মত, সেটা ছিল অগ্নি-৬।
আরও পড়ুন:
অগ্নি-৬ নিয়ে মাতামাতি হওয়ার নেপথ্যে অবশ্য একাধিক কারণ রয়েছে। এটির পরীক্ষা সফল হলেই আন্তঃমহাদেশীয় (ইন্টার-কন্টিনেন্টাল) ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রভুক্ত দেশগুলির তালিকায় চলে আসবে ভারত। সংশ্লিষ্ট ব্রহ্মাস্ত্রটির পাল্লা ১০,০০০-১২,০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, এমনকি আমেরিকার একাংশেও যে কোনও মুহূর্তে আণবিক হামলা চালানোর শক্তি চলে আসবে নয়াদিল্লির হাতে।
দ্বিতীয়ত, অগ্নি-৬ আইসিবিএমে (ইন্টার-কন্টিনেন্টাল ব্যালেস্টিক মিসাইল) রয়েছে ‘মাল্টিপল ইন্ডিপেন্ডেন্টলি টার্গেটেবল রি-এন্ট্রি ভেহিকল’ বা এমআইআরভি প্রযুক্তি। অর্থাৎ কয়েকশো কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে একসঙ্গে পরমাণু হামলা চালাতে পারে এই ক্ষেপণাস্ত্র। বর্তমানে বিশ্বের হাতে গোনা কয়েকটি দেশের আছে এই সক্ষমতা। এর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও চিন উল্লেখযোগ্য।
এমআইআরভি প্রযুক্তি সম্পন্ন নতুন অগ্নি ক্ষেপণাস্ত্রটিতে ঠিক কতগুলি ‘ওয়ারহেড’ ছিল, অর্থাৎ কতগুলি লক্ষ্যবস্তুতে এর মাধ্যমে একসঙ্গে হামলা চালানো সম্ভব, তা উল্লেখ করেনি কেন্দ্র। তবে সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, পরীক্ষায় সময় অন্তত চার থেকে পাঁচটি ‘ওয়ারহেড’ ব্যবহার করা হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্রটি একসঙ্গে সর্বোচ্চ ছ’টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে সক্ষম বলেও উল্লেখ করেছেন তাঁরা।
তৃতীয়ত, বর্তমানে বিশ্বের মাত্র পাঁচটি দেশের ঝুলিতে রয়েছে আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। সেই তালিকায় প্রথমেই আসবে আমেরিকার নাম। এলজিএম-৩০ মিনিটম্যান থ্রি নামের একটি আইসিবিএম ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের ফৌজ। এর পাল্লা ১৪,০০০ কিলোমিটার। অন্য দিকে রাশিয়ার আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ১৮,০০০ কিলোমিটার। এর সাঙ্কেতিক নাম, আরএস-২৮ সারমাত।
আরও পড়ুন:
এ ছাড়া চিনের ‘পিপল্স লিবারেশন আর্মি’ বা পিএলএর হাতে থাকা ডিএফ-৪১ ও ডিএফ-৬১ আইসিবিএমের পাল্লা ১২,০০০ থেকে ১৫,০০০ কিলোমিটার। প্রায় একই পাল্লার আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ‘ডেমোক্র্যাটিক পিপল্স রিপাবলিক অফ কোরিয়া’ বা ডিপিআরকে-র (পড়ুন উত্তর কোরিয়া) ফৌজ। সংশ্লিষ্ট হাতিয়ারের পোশাকি নাম হ্যাসং-১৭ এবং হ্যাসং-১৮।
আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের তালিকায় থাকা পঞ্চম দেশটি হল ইজ়রায়েল। ইহুদিদের হাতে থাকা আইসিবিএমের পোশাকি নাম জেরিকো থ্রি। এর পাল্লা ১১,৩০০ কিলোমিটার বলে জানা গিয়েছে। অন্য দিকে ভারতের হাতে আছে মাঝারি পাল্লার (ইন্টারমিডিয়েট রেঞ্জ) ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। ডিআরডিওর তৈরি সেই ব্রহ্মাস্ত্রের নাম অগ্নি-৫। গত কয়েক বছরে বেশ কয়েক বার এর পরীক্ষা চালিয়েছে নয়াদিল্লি।
সরকারি ভাবে অগ্নি-৫-এর পাল্লা ৫,৫০০ কিলোমিটারের বেশি বলে জানিয়েছে ভারত। যদিও প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের দেওয়া এই তথ্য মানতে নারাজ চিন। বেজিঙের অভিযোগ, ইচ্ছাকৃত ভাবে অগ্নি-৫-এর পাল্লা কম দেখানো হচ্ছে। ৮,০০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁত নিশানায় হামলা চালাতে পারে এই ক্ষেপণাস্ত্র। ২০২৪ সালের মার্চে সফল পরীক্ষার পর একে ‘দিব্যাস্ত্র’ বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, গত ৯ মে, শনিবার স্ক্র্যামজেট ইঞ্জিনের সফল পরীক্ষা চালায় ডিআরডিও। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ১২০ সেকেন্ডের ক্ষমতাসম্পন্ন ইঞ্জিন তৈরি করতে সক্ষম হয় তারা। এ বার সেটা বেড়ে ১,২০০ সেকেন্ড বা ২০ মিনিট হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এর জেরে হাইপারসনিক (শব্দের পাঁচ গুণের চেয়ে গতিশীল) ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির দিকে নয়াদিল্লি যে আরও একধাপ এগিয়ে গেল, তা বলাই বাহুল্য।
এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে চলা ইরান বনাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজ়রায়েলের যুদ্ধে বার বার খবরের শিরোনামে এসেছে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র। গতির কারণে তেহরানের সেই হাতিয়ারকে আটকাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয় আমেরিকা ও ইহুদিদের বিশ্বসেরা আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) ব্যবস্থা। ফলে অনায়াসেই এর সাহায্যে পশ্চিম এশিয়ার একাধিক সেনা ছাউনি ও জ্বালানি পরিকাঠামোয় হামলা চালাতে পেরেছে সাবেক পারস্যের শিয়া ফৌজ।
এ-হেন পরিস্থিতিতে ওড়িশা উপকূলে ভারত হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে বলেও একটি তত্ত্ব প্রকাশ্যে চলে এসেছে। যদিও সেই সম্ভাবনা যথেষ্ট কম। কারণ, প্রতিরক্ষা মন্ত্রক সংশ্লিষ্ট হাতিয়ারটিকে ‘অগ্নি’ সিরিজ়র বলে জানিয়ে দিয়েছে। শব্দের পাঁচ গুণের চেয়ে গতিশীল যে ক্ষেপণাস্ত্রগুলি তৈরির চেষ্টা চলছে, সেগুলি হল ব্রহ্মস-২, সূর্য এবং প্রজেক্ট বিষ্ণুর আওতায় থাকা অন্যান্য দূরপাল্লার অস্ত্র।
গত বছর (২০২৫ সাল) পহেলগাঁও জঙ্গি হামলার পর পাকিস্তানকে শিক্ষা দিতে সেনা অভিযান চালায় ভারত। এর সাঙ্কেতিক নাম ছিল ‘অপারেশন সিঁদুর’। চার দিনের সেই ‘যুদ্ধে’ ইসলামাবাদের ১১টি বিমানঘাঁটি ধ্বংস করে এ দেশের ফৌজ। উড়িয়ে দেয় রাওয়ালপিন্ডির একগুচ্ছ লড়াকু জেট। এতে সর্বাধিক কার্যকরী ভূমিকা নিয়েছিল রাশিয়ার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে তৈরি ব্রহ্মস সুপারসনিক ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র।
কিন্তু, বছর ঘুরতেই ঘোর সঙ্কটে ভারতীয় সেনাবাহিনীর গর্বের সেই হাতিয়ার। কারণ, বিপুল সংখ্যায় কর্মীবদলির জেরে বর্তমানে ৫০ শতাংশ কমে গিয়েছে এর উৎপাদন। ফলে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকারের কপালে পড়েছে চিন্তার ভাঁজ। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে অস্ত্রের অভাবে এ দেশের নৌবাহিনীকে যে বিশেষ করে ভুগতে হবে, তা বলাই বাহুল্য।
মাত্র এক বছরের মধ্যে কী ভাবে এতটা হ্রাস পেল ব্রহ্মসের উৎপাদন? বিষয়টি নিয়ে সরকারি ভাবে কোনও বিবৃতি দেয়নি কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। তবে সূত্রের খবর, গত কয়েক মাসে অন্তত ৫৬ জন গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীকে বিভিন্ন কারখানায় বদলি করেছে ‘সুপারসনিক’ (শব্দের চেয়ে গতিশীল) ক্ষেপণাস্ত্রটির নির্মাণকারী সংস্থা। এর ফলে কর্মীমহলে তৈরি হয় অসন্তোষ, যার জেরে চাকরি থেকে ইস্তফা দেন তাঁদের একাংশ। উৎপাদন মার খাওয়ার নেপথ্যে এই ডামাডোলকে চিহ্নিত করেছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।