সাদ্দামের প্রতিশোধের আগুনে জ্বলে কুয়েতের ৭৫০ তেলের কুয়ো! ‘কালো বরফ’ ঝরেছিল হিমালয়ের বুকে, বিপর্যয়ের স্মৃতি ফেরাল ইরান
উপসাগরীয় যুদ্ধের শেষের দিকে ইরাকি বাহিনী কুয়েত থেকে পিছু হটার সময় প্রায় ৭৫০টি তেলকূপে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। এই ঘটনাকে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয় বলে ধরা হয়। এই ভয়াবহ আগুন নেবাতে প্রায় ন’মাস সময় লেগেছিল।
১৯৯১ সাল। প্রায় শেষ উপসাগরীয় যুদ্ধ। সাদ্দাম হোসেনের পরাজিত ইরাকি বাহিনী পিছু হটার সময় শেষ কামড় বসিয়ে দিয়ে যায় কুয়েতে। পশ্চিম এশিয়ার তেলসম্পদকে কুক্ষিগত করতে এবং পাহাড়প্রমাণ ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে কুয়েত দখলের নির্দেশ দিয়েছিলেন সাদ্দাম।
ইরাকি আগ্রাসনের হাত থেকে কুয়েতকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ব্যাপক বোমাবর্ষণ শুরু করলে দ্রুত পিছু হটতে বাধ্য হয় ইরাকি ফৌজ। ১৯৯১ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনী ইরাকের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন ডেজ়ার্ট স্টর্ম’ শুরু করে। পরাজয় নিশ্চিত জেনে ইরাকি প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন ‘পোড়ামাটি নীতি’ (স্কর্চড আর্থ পলিসি) গ্রহণ করেন।
পোড়ামাটি নীতি হল একটি সামরিক কৌশল। এর মাধ্যমে শত্রুপক্ষের যে কোনও সম্পদ, পরিকাঠামো, খাদ্যের উৎস এবং অন্যান্য উপকরণ নির্বিচারে ধ্বংস করা হয়।
উপসাগরীয় যুদ্ধের শেষের দিকে ইরাকি বাহিনী কুয়েত থেকে পিছু হটার সময় প্রায় ৭৫০টি তেলকূপে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। এই ঘটনাকে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয় বলে ধরা হয়। পরিকল্পিত আঘাতে কুয়েতের তেলের সঞ্চয় ও পরিকাঠামো মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ে বিপর্যস্ত হয়ে গিয়েছিল।
ফেব্রুয়ারি মাসে ইরাকি সৈন্যেরা কুয়েত ছেড়ে পালানোর সময় পরিকল্পিত ভাবে তেলকূপগুলিতে ডিনামাইট দিয়ে বিস্ফোরণ ঘটায় এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। ধোঁয়ার কুণ্ডলী প্রাথমিক ভাবে ১৩০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। ১ কোটি ১০ লক্ষ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পারস্য উপসাগরে ছড়িয়ে পড়ে।
আরও পড়ুন:
সাগরে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি তেলের আস্তরণ তৈরি হয়। মরুভূমির উপরিভাগে প্রায় ৩০০টি তেলের হ্রদ তৈরি হয়ে মাটি দূষিত করে। জলাশয়গুলিতে কালো ঘন অশোধিত তেল ছড়িয়ে পড়েছিল। মারা গিয়েছিল হাজার হাজার পাখি।
সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল কুয়েতের দক্ষিণাঞ্চলীয় মরুভূমিতে থাকা বুরগান তৈলক্ষেত্রটি। সেই ৫০০ বর্গ কিলোমিটার প্রশস্ত শুষ্ক ঊষর এলাকায় এখনও শতাধিক দূষিত তেলের হ্রদ জেগে রয়েছে বালির বুকে।
ইরাকি চক্রান্তে কুয়েতের মরুভূমি নরকে পরিণত হয়েছিল। প্রায় ৭৫০টি কূপ থেকে অনবরত আগুনের শিখা এবং ঘন কালো ধোঁয়া বার হচ্ছিল। প্রতি দিন প্রায় ৪০ থেকে ৬০ লক্ষ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পুড়েছিল। বিষাক্ত ধোঁয়া এবং ছাইয়ে আকাশ গিয়েছিল ঢেকে।
কিছু কিছু কূপ থেকে আগুনের শিখা ১০০ ফুটেরও বেশি উঁচুতে উঠেছিল। দূর থেকে মনে হত পুরো দিগন্তই যেন জ্বলছে। ধোঁয়ার চাদর এতটাই ঘন ছিল যে, মরুভূমির বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দিনের বেলাতেও সূর্যের আলো পৌঁছোত না। দুপুরের সময়ও মনে হত গভীর রাত। তাপমাত্রা নাটকীয় ভাবে কমে গিয়েছিল।
আরও পড়ুন:
কয়েক মাস ধরে উপসাগরের আকাশ ঘন কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ছিল। জ্বলন্ত কূপগুলো থেকে বিপুল পরিমাণে সালফার ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইডের বিষাক্ত ধোঁয়া বাতাসে মিশে যায়। এর ফলে শুধু পশ্চিম এশিয়া নয়, পূর্ব এশিয়ার কিয়ংদশ (ইরান, পাকিস্তান এবং ভারতের কিছু অংশ) থেকেও এর প্রভাব লক্ষ করা গিয়েছিল।
দূষণের চিহ্ন হাজার হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। এমনকি ২,৭০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরে কাশ্মীর ও হিমাচল প্রদেশে ‘কালো বরফ’ পড়ার খবর পাওয়া গিয়েছিল।
অনেক কূপে আগুন না ধরলেও অনিয়ন্ত্রিত ভাবে তেল নির্গত হচ্ছিল। মরুভূমির বালিতে মিশে সেগুলি বিশাল বিশাল বিষাক্ত তেলের হ্রদ তৈরি করেছিল, যা ভূগর্ভস্থ জল এবং মরুভূমির বাস্তুতন্ত্রকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। এর ফলে পরবর্তী ৩০ বছরে মরুভূমির উদ্ভিদের উপর নির্ভরশীল প্রাণীর সংখ্যা লক্ষণীয় ভাবে কমে যায়।
কুয়েত এনার্জির সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও ইঞ্জিনিয়ার সারা আকবর সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, বাস্তুতন্ত্র শেষ পর্যন্ত পুনরুদ্ধার হলেও প্রচুর মানুষের শ্বাসযন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি ডেকে এনেছিল এই বিপর্যয়। ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এক মার্কিন সেনার ফুসফুস এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, যেমনটা কোনও ব্যক্তি টানা তিন বছর প্রতি দিন তিন প্যাকেট করে সিগারেট খেলে তবেই ঘটতে পারে।
এই বিশাল বিপর্যয় সামলাতে হিমশিম খেতে হয় কুয়েত সরকারকে। বিশাল এলাকা জুড়ে আগুন নেবানো ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং ব্যয়সাপেক্ষ। কুয়েত সরকার বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অগ্নিনির্বাপক বিশেষজ্ঞ দল (আমেরিকা ও কানাডার) ভাড়া করে আনে।
আগুন নেবানোর অন্যতম বড় বাধা ছিল মরুভূমিতে ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার মাইন এবং অবিস্ফোরিত বোমা। ফলে আগে এলাকা মাইনমুক্ত করতে হত সেনাবাহিনীকে। তার পর অগ্নিনির্বাপক কর্মীরা কাজ শুরু করতে পারতেন। এর দোসর হয় জলের তীব্র সঙ্কট।
আগুন নেবানোর জন্য ডিনামাইট বিস্ফোরণ ঘটিয়ে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ করার মতো কৌশল নিতে হয়েছিল বিশেষজ্ঞদের। অতিকায় ক্রেন ব্যবহার করে কূপের মুখ বন্ধ করা হয়েছিল। সমুদ্রের নোনাজল পাইপলাইনের মাধ্যমে মরুভূমিতে এনে আগুন নেবানোর কাজে ব্যবহার করা হয়েছিল।
এই ভয়াবহ আগুন নেবাতে প্রায় ন’মাস সময় লেগেছিল। বিভিন্ন দেশের সহযোগিতারও প্রয়োজন হয়েছিল। একে আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয় বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। চেরনোবিল (১৯৮৬) এবং ভোপাল (১৯৮৪)-এর পর তৃতীয় সবচেয়ে ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয় হিসাবে ২০১০ সালের টাইম ম্যাগাজ়িনে স্থান পেয়েছিল কুয়েত তেলকূপ বিপর্যয়টি।
৩৫ বছর পর পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান সংঘাত ১৯৯১ সালের কুয়েতের তৈলক্ষেত্রের অগ্নিকাণ্ডের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইরানের তেলের ভান্ডারগুলিতে মার্কিন-ইজ়রায়েলি বিমান হামলার ফলে তেহরানে কালো বৃষ্টি হয়েছে বলে সংবাদসংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে। ইরানের রাজধানীর উপর আকাশ থেকে কালো ও তৈলাক্ত বর্ষণের পর তেহরানের বাসিন্দারা চোখে জ্বালা করতে থাকে এবং শ্বাসকষ্ট শুরু হয়।