গার্ডেনরিচ প্রথম নয়, ‘তাসের ঘর’ ভেঙে মৃত্যু আগেও দেখেছে কলকাতা! হাহাকার দেখেছে মুম্বই-দিল্লিও
১৯৮৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর। বেঙ্গালুরুর সুবেদার ছত্রম রোডে কাপালি প্রেক্ষাগৃহের কিছুটা দূরে ভেঙে যায় ‘গঙ্গারাম’ নামে নির্মীয়মাণ একটি সাত তলা ভবন। ধ্বংসস্তূপের নীচে চাপা পড়ে মৃত্যু হয়েছিল ১২৩ জনের।
রবিবার মধ্যরাত। চার দিক শুনশান। হঠাৎ বিকট আওয়াজে কেঁপে ওঠে কলকাতা পুরসভার ১৩৪ নম্বর ওয়ার্ডে গার্ডেনরিচের ফতেপুর ব্যানার্জি পাড়া লেন। হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে ওই এলাকার নির্মীয়মাণ একটি পাঁচ তলা বাড়ি। বহুতলটির আশপাশে বেশ কিছু ঝুপড়ি রয়েছে। সেগুলির উপরেই ভেঙে পড়ে বাড়িটি। সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিশ। কিছু ক্ষণ পরে বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী এবং দমকল পৌঁছনোর পর শুরু হয় উদ্ধারকাজ।
সেই ঘটনার পর ১২ ঘণ্টা পেরিয়ে গিয়েছে। নির্মীয়মাণ বহুতল ভেঙে পড়ার ঘটনায় ইতিমধ্যেই আট জনের মৃত্যু হয়েছে। অনেকে আহত হয়েছেন। মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তবে এই প্রথম নয়, ভারতের বুকে এর আগেও অনেক বার নির্মীয়মাণ বা পুরনো বাড়ি তাসের ঘরের মতো হুড়মুড় করে ভেঙে যেতে দেখেছে দেশবাসী। দুর্ঘটনার সাক্ষী থেকেছে কলকাতাও।
১৯৮৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর। বেঙ্গালুরুর সুবেদার ছত্রম রোডে কাপালি প্রেক্ষাগৃহের কিছুটা দূরে ভেঙে পড়ে ‘গঙ্গারাম’ নামে নির্মীয়মাণ একটি সাত তলা ভবন। ধ্বংসস্তূপের নীচে চাপা পড়ে মৃত্যু হয়েছিল ১২৩ জনের। আহত হন ১২০ জনেরও বেশি মানুষ।
১৯৮১ সাল থেকে ওই ভবনটির নির্মাণ শুরু হয়। ১৯৮৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর দুপুর সাড়ে তিনটে নাগাদ ভবনটি ভেঙে পড়ে। সেই ঘটনায় যে ১২৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে বেশির ভাগই ছিলেন নির্মাণ শ্রমিক এবং পথচারী। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ সিনেমা দেখতে গিয়েছিলেন। ওই ভবনটির মালিক এন গঙ্গারামের পুত্রও ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে মারা যান। প্রায় এক মাস পরে তাঁর দেহ উদ্ধার হয়েছিল।
আরও পড়ুন:
১৯৮৯ সালের ১৯ জুন। ঘটনাস্থল কলকাতা। ভবানীপুর এলাকায় সদ্য নির্মিত একটি বহুতল ভেঙে ১১ জন বাসিন্দার মৃত্যু হয়। সেই ঘটনা কলকাতার ইতিহাসে ‘কুন্ডলিয়া ভবন বিপর্যয়’ নামে পরিচিত।
সেই ঘটনার ছ’বছরের মাথায় অভিজাত আবাসন ভেঙে আবার বিপর্যয় দেখা গিয়েছিল। ১৯৯৫ সাল ২৭ জুলাই দক্ষিণ কলকাতায় ১০ বছরের পুরনো আবাসন ‘শিবালিক’ ভেঙে পড়ে রাতের অন্ধকারে। ঘুমের মধ্যেই মৃত্যু হয় ১৬ জনের।
বহুতল ভেঙে বিপর্যয় এবং মৃত্যু দেখেছে রাজধানী দিল্লিও। ২০১০ সালের ১৫ নভেম্বর রাত সওয়া ৮টা নাগাদ দিল্লির ললিতা পার্ক এলাকায় ১৫ বছরের পুরনো একটি বাসভবন ভেঙে পড়ে।
ওই ভবনটিতে প্রায় ২০০ জনের বসবাস ছিল। যার মধ্যে বেশির ভাগই দরিদ্র পরিযায়ী এবং ছোটখাটো ব্যবসায়ী ছিলেন। সেই দুর্ঘটনায় কমপক্ষে ৬৭ জন নিহত এবং ৭৩ জন আহত হন। তদন্ত করে দেখা যায়, আবাসনটি বৈধ ভাবে নির্মিত হয়নি। অনুমোদনের চেয়ে দু’তলা উঁচু তৈরি করা হয়েছিল। পাশাপাশি ওই অঞ্চলে বন্যার কারণেও ভবনটির ভিত দুর্বল হয়ে গিয়েছিল।
আরও পড়ুন:
২০১৩ সালের ৪ এপ্রিল কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে মহারাষ্ট্রের ঠাণের একটি বহুতল। ঠাণের মুম্বরার শীল ফাটা এলাকায় আদিবাসীদের জমিতে তৈরি ওই ভবনটি ধসে পড়ে। মৃত্যু হয় ৭৪ জনের। যার মধ্যে ১৮ জন শিশু এবং ২৩ জন মহিলা ছিলেন। আহতের সংখ্যা ছিল ১০০ জনেরও বেশি।
পরবর্তী সময়ে সেই ভবনটি বেআইনি ভাবে নির্মাণের অভিযোগ ওঠে। ঘটনার সাত দিনের মধ্যে ১১ জন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়।
ওই একই বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর, মহারাষ্ট্রের মুম্বইয়ের মাজাগাঁও এলাকায় একটি পাঁচ তলা ভবন ধসে পড়েছিল। সেই বিপর্যয়ে কমপক্ষে ৬১ জন নিহত এবং ৩২ জন আহত হয়েছিলেন।
২৭ সেপ্টেম্বর সকাল ৬টা নাগাদ ৩২ বছরের পুরনো ওই ভবনটি ভেঙে পড়ে। ওই ভবনে ১০০ জনেরও বেশি বাসিন্দা বসবাস করতেন।
২০১৪ সালের ২৮ জুন তামিলনাড়ুর চেন্নাইয়ের মৌলিভাক্কাম এলাকায় নির্মীয়মাণ একটি ১১ তলা বহুতল ভেঙে পড়ে। মৃত্যু হয় ৬১ জনের। মৃতদের বেশির ভাগই ছিলেন নির্মাণ শ্রমিক। বজ্রপাতের কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল বলে তদন্তে উঠে আসে।
২০১৯ সালের ১৯ মার্চ কর্নাটকের ধারওয়াদের কুমারেশ্বর নগরে একটি নির্মীয়মাণ বহুতল ধসে পড়ে। দুর্ঘটনায় ১৯ জনের মৃত্যু হয় এবং ৫০ জন আহত হন।
২০২০ সালের ২৫ অগস্ট সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা নাগাদ মহারাষ্ট্রের রায়গড় জেলায় অবস্থিত পাঁচ তলা একটি বাড়ি ধসে পড়ে। সেই ঘটনায় ১৬ জন নিহত হন এবং ৩০ জন আহত হন। ছ’বছরের পুরানো সেই ভবনটি দুর্বল ভিতের উপর তৈরি হওয়ার কারণেই ভেঙে পড়েছিল বলে তদন্তে উঠে আসে।