নিজের দেশের তেল বিক্রির টাকাতেও নেই অধিকার, মর্জিমতো ‘ভিক্ষা’ দেয় আমেরিকা! পশ্চিম এশিয়ার যে দেশ আজও ‘পরাধীন’
এ দেশের তেল-রাজস্বের উপর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে মূলত নিউ ইয়র্ক ফেডারেল রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কেরই। সরকার চাইলেও জমা থাকা নিজস্ব অর্থ সরাসরি পুরোটা তুলতে বা খরচ করতে পারে না।
পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের মাঝে ইরানের বিরুদ্ধে ইরাককে পাশে পাওয়ার জন্য তাদের প্রাপ্য টাকা আটকে দিয়েছে আমেরিকা। ইরান-সমর্থিত জঙ্গিগোষ্ঠীগুলির বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য বাগদাদের উপর চাপ বাড়াতে এই কৌশল নিয়েছে ওয়াশিংটন। ইরাককে ভাতে মেরে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আসরে নামাতে চায় আমেরিকা।
বাগদাদ সরকারকে ইরান থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে বাধ্য করার জন্য মার্কিন প্রশাসনের জোরালো চাপ প্রয়োগের একটি কৌশল হল এই টাকা বন্ধ করে দেওয়া। যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে ডলার পাঠানো স্থগিত রেখেছে। ইরাকের নিজস্ব তেল বিক্রি থেকে অর্জিত অর্থও আটকে রেখেছে।
চলতি বছরের এপ্রিলে ইরাকে পাঠানো তেল বিক্রির প্রায় ৫০ কোটি ডলারের নগদ চালান আটকে দিয়েছে আমেরিকার অর্থ দফতর। আর্থিক ভাবে পঙ্গু দেশটিতে ইতিমধ্যেই ডলারের চাহিদা তুঙ্গে। আটকে সমস্ত আর্থিক লেনদেন। বেতন পাচ্ছেন না সরকারি কর্মীরা।
২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেন সরকারের পতনের পর থেকে ইরাকের তেল বিক্রির অর্থ বা রাজস্বের উপর শক্তিশালী আইনি ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণ শুরু করে আমেরিকা। ইরাকের মোট বাজেটের প্রায় ৯০ শতাংশই আসে তেল রফতানি থেকে। তাই ইরাকের অর্থনীতি ও রাজনীতির উপর ওয়াশিংটনের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে।
ইরাকের তেল-রাজস্বের উপর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে মূলত নিউ ইয়র্ক ফেডারেল রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের। কারণ সাদ্দামকে গদিচ্যুত করার পর আমেরিকার নেতৃত্বে কোয়ালিশন প্রভিশনাল অথরিটি (সিপিএ) ‘ডেভেলপমেন্ট ফান্ড ফর ইরাক’ (ডিএফআই) প্রতিষ্ঠা করে। সেই তহবিল দিয়ে ইরাকের উন্নয়ন করা হবে বলে জানিয়েছিল ওয়াশিংটন। সেই টাকা নিউ ইয়র্কস্থিত ফেডারেল ব্যাঙ্কে গচ্ছিত রাখা হয়।
আরও পড়ুন:
ইরাক সরকারের তেল বিক্রির যাবতীয় অর্থ সরাসরি জমা হয় যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক ফেডারেল রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক অফ ইরাকের একটি বিশেষ অ্যাকাউন্টে। বিশ্ববাজারে ইরাক যত তেল বিক্রি করে, তার সব ডলার সবার আগে এই মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টে গিয়ে জমা হয়।
এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে ছিল ইরাকে তেলসম্পদ কুক্ষিগত করার প্রয়াস। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ২০০৩ সালের মে মাসে একটি আদেশনামা জারি করেন। এই আদেশের মূল উদ্দেশ্যই ছিল সাদ্দামের আমলের পুরনো ঋণ বা আন্তর্জাতিক মামলার কোনও দাবিতে কেউ যেন ইরাকের তেলের টাকার দাবি তুলতে না পারে বা বাজেয়াপ্ত করতে না পারে।
আমেরিকা-বিরোধী রাষ্ট্রগুলির অভিযোগ, বাগদাদকে সুরক্ষা দেওয়ার অজুহাতে ইরাকের তেলের অর্থের চাবিকাঠি নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। আজ পর্যন্ত প্রতি বছর এই আদেশের মেয়াদ নবায়ন করে আসছেন ক্ষমতায় থাকা মার্কিন প্রেসিডেন্টরা।
ইরাক সরকার চাইলেই জমা থাকা তাদের নিজস্ব টাকার পুরোটা তুলতে বা খরচ করতে পারে না। ইরাকের অর্থ মন্ত্রণালয়কে প্রতি মাসে তাদের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, আমদানি ব্যয় এবং অন্যান্য খরচের জন্য প্রয়োজনীয় ডলারের একটি চাহিদাপত্র ফেডারেল রিজ়ার্ভের কাছে জমা দিতে হয়।
আরও পড়ুন:
মার্কিন প্রশাসন সেই চাহিদা পরীক্ষা করে অনুমোদন দেওয়ার পর প্রতি মাসে আক্ষরিক অর্থেই ডলারের বান্ডিল বা নগদ বিমানে করে বাগদাদে পাঠানো হয়। যেহেতু টাকা মার্কিন ব্যাঙ্কের আয়ত্তে, তাই চাইলেই টাকা বন্ধের হুমকি দিয়ে ইরাকের উপর একটি বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে ওয়াশিংটন।
এমনকি ইরাকের সরকার গঠনে বা নীতি নির্ধারণে মার্কিন স্বার্থের পরিপন্থী কোনও দল বা গোষ্ঠীর আধিপত্য মাথাচাড়া দিলে, ওয়াশিংটন অনেক সময় ইরাকে নগদ ডলার পাঠানো ধীর গতির করে দেওয়ার বা অ্যাকাউন্ট স্থগিত করার হুমকি দেয়।
২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে ইরাকি পার্লামেন্টে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের একটি প্রস্তাব পাশ হয়েছিল। ঠিক সেই সময়েই তৎকালীন ট্রাম্প প্রশাসন খুব স্পষ্ট ভাবে বাগদাদকে হুমকি দিয়েছিল যে, মার্কিন সেনা তাড়ানোর সিদ্ধান্ত কার্যকর করলে নিউ ইয়র্ক ফেডারেল রিজ়ার্ভে থাকা ইরাকের তেলের অ্যাকাউন্টটি ফ্রিজ় বা ব্লক করে দেওয়া হবে।
ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির একটি বড় অংশ আইনি ভাবে ইরাকি নিরাপত্তাবাহিনীর অংশ হওয়া সত্ত্বেও তারা বাগদাদের কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশ না মেনে সরাসরি তেহরানের রণকৌশল অনুযায়ী কাজ করে। যখন ইরাকি সেনাবাহিনী বা নিরাপত্তাবাহিনী এই সংগঠনের রকেট ও ড্রোন হামলা থামাতে যায়, তখনই তারা দেশের বাহিনীর উপরই আক্রমণ করে বসে।
আন্তর্জাতিক মহলের মত, মার্কিন প্রশাসন যদি ইরাকে এই সংগঠনগুলির রাশ টেনে ধরতে চায়, তবে ইরাকের সাধারণ জনগণের মধ্যে মার্কিন-বিরোধী মনোভাব তীব্র হবে। এর ফলে ইরাক সরকার পুনরায় মার্কিন সেনাদের তাড়ানোর আইনি প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে। এই পরিস্থিতিতেই যুক্তরাষ্ট্র ‘আর্থিক লাগাম’ ব্যবহার করে। তারা বাগদাদের উপর চাপ সৃষ্টি করে, যাতে ইরাক সরকার নিজে থেকে এই সমস্ত ভাড়াটে সংগঠনগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করে। অন্যথায় নিউ ইয়র্ক ফেডারেল রিজ়ার্ভ থেকে ডলারের সরবরাহ সঙ্কুচিত করার সূক্ষ্ম ইঙ্গিত দেওয়া হয়।
একটি দেশের মোট বাজেটের ৯০ শতাংশই যেখানে তেল থেকে আসে, এবং সেই দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট যদি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়, তবে রাতারাতি পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা পঙ্গু হয়ে যাবে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বন্ধ হয়ে যাবে এবং মুদ্রাস্ফীতি আকাশ ছোঁবে।
ইরাক যদি ইরানের কাছ থেকে গ্যাস বা বিদ্যুৎ আমদানির জন্য ডলারে অর্থ পরিশোধ করতে চায়, তবে মার্কিন ট্রেজ়ারি তাতেও বাধা দেয়। মার্কিন ডলার যাতে পাচার হয়ে ইরান বা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এমন কোনও দেশের হাতে না যায়, সে ব্যাপারে কড়া নজর রাখে মার্কিন প্রশাসন।
এত অসুবিধা সত্ত্বেও ইরাক কেন আন্তর্জাতিক মঞ্চে সরব হয় না? তার পিছনেও রয়েছে ইরাকের আর্থিক জটিলতা। ইরাক একটি আমদানি-নির্ভর দেশ। খাদ্য থেকে শুরু করে ওষুধ এবং ভারী যন্ত্রপাতি— সব কিছুর জন্যই তাদের মার্কিন ডলারের প্রয়োজন হয়। ফেডারেল রিজ়ার্ভের হাত মাথায় থাকায় ইরাক আন্তর্জাতিক বাজারে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য আমদানিকারক দেশ হিসাবে গণ্য হয়। মার্কিন ডলারের নিয়মিত সরবরাহ স্থানীয় মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ইরাকের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভারসাম্য। বাগদাদের সরকারের একটি বড় অংশ ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র সংগঠন ও রাজনৈতিক দলগুলোর আধিপত্য নিয়ে চিন্তিত। এই সংগঠনগুলি প্রায়শই রাষ্ট্রে অর্থ ও ডলারের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। যাতে তারা ইরানের উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেহরানকে সাহায্য করতে পারে।
ইরাকি জনগণদের অনেকেই মনে করেন, এ যেন ‘পরধীনতার’ সম্পর্ক। আমেরিকার নিয়ন্ত্রণকে অপছন্দ করলেও বাগদাদ নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে এটিকে মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে বলে সংবাদমাধ্যমে মুখ খুলেছেন জানিয়েছেন ইরাকের প্রশাসনিক আধিকারিকদের একাংশ।