শেয়ারবাজারে ‘ডোনাল্ড ডজ’! ৯০ দিনে ৩,৭০০ স্টকের লেনদেন, আরও এক কেলেঙ্কারিতে জড়ালেন ‘সুপার পাওয়ার’ প্রেসিডেন্ট?
সোনালি স্মার্টফোনের পর এ বার শেয়ার কেলেঙ্কারিতে নাম জড়াল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের। এ বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে উপদেষ্টাদের সঙ্গে নিয়ে জাতীয় নীতি নির্ধারণের সঙ্গে জড়িত সংস্থাগুলির ৩,৭০০ স্টক কেনাবেচা করেছেন তিনি।
ইরান যুদ্ধে লেজেগোবরে দশা! তার মধ্যেই নতুন বিতর্কে ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ বার মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে উঠল শেয়ার কেলেঙ্কারির অভিযোগ। যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় গণমাধ্যম ‘ব্লুমবার্গ’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ বছরের প্রথম তিন মাসেই ৩,৭০০টি স্টকের লেনদেন করেন তিনি। সঙ্গে ছিলেন তাঁর উপদেষ্টারাও। এতে ইতিমধ্যেই কয়েক কোটি ডলার পকেটে এসেছে তাঁদের। এর জেরে স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ উঠেছে তাঁদের বিরুদ্ধে।
‘ব্লুমবার্গ’ জানিয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে বেছে বেছে মার্কিন সরকারের নীতি-নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্তের দ্বারা প্রভাবিত সংস্থাগুলির স্টক কেনেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও তাঁর উপদেষ্টারা। এর মধ্যে এনভিডিয়া, মাইক্রোসফ্ট, অ্যামাজ়ন এবং বোয়িং উল্লেখযোগ্য। তালিকায় নাম আছে আমেরিকার বেশ কয়েকটি বহুজাতিক প্রযুক্তি, আর্থিক, মহাকাশ গবেষণা এবং গণমাধ্যম সংস্থারও।
মার্কিন সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে এই কোম্পানিগুলিকে ব্যবসা করতে হয়। উদাহরণ হিসাবে এনভিডিয়ার কথা বলা যেতে পারে। সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ তৈরিতে তাদের দুনিয়াজোড়া খ্যাতি রয়েছে। ওয়াশিংটনের অনুমতি ছাড়া সংশ্লিষ্ট পণ্যটি চিনে রফতানি করতে পারে না তারা। একই কথা বোয়িংয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কারণ, লড়াকু জেট থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের সামরিক ও মহাকাশ গবেষণার সরঞ্জাম নির্মাণ করে থাকে এই সংস্থা।
এ ছাড়া মাইক্রোসফ্ট, অ্যামাজ়ন ও মেটার মতো বহুজাতিক টেক জায়ান্টগুলি একচেটিয়া ব্যবসাও যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত সিদ্ধান্তের দ্বারা প্রভাবিত। সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) প্রযুক্তির সঙ্গে জড়িয়ে আছে তারা। এ বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে এই ধরনের সংস্থাগুলিতে দিনে গড়ে ৪০টির বেশি স্টকের লেনদেন করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
গত বছরের (২০২৫ সাল) শেষ তিন মাসে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) উপদেষ্টাদের সঙ্গে নিয়ে ৩৮০টি শেয়ার কেনাবেচা করেন ‘পোটাস’ (প্রেসিডেন্ট অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস)। কিন্তু, পরবর্তী তিন মাসে সেই সংখ্যা ৩,৭০০-য় পৌঁছে যাওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেছে ওয়াল স্ট্রিটের তাবড় ব্রোকারেজ ফার্ম। ‘ব্লুমবার্গ’-সহ একাধিক গণমাধ্যমের কাছে ইতিমধ্যেই মুখ খুলতে শুরু করেছেন তাঁরা।
আরও পড়ুন:
এ প্রসঙ্গে ব্রোকারেজ ফার্ম টাটল ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের এগ্জ়িকিউটিভ অফিসার ম্যাথিউ টাটল বলেছেন, ‘‘ট্রাম্প ও তাঁর উপদেষ্টারা বিপুল লেনদেন করেছেন। এটা ক্ষমতায় থাকা কোনও রাষ্ট্রনেতার ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক।’’ গোটা বিষয়টির নেপথ্যে গভীর কোনও ষড়যন্ত্র আছে কি না, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন তুলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক বিশ্লেষকদের একাংশ। অন্য দিকে, সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে মুখে কুলুপ এঁটে রয়েছেন খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, গত বছর (২০২৫ সাল) ট্রাম্পের ‘পারস্পরিক শুল্ক নীতি’র জন্য ঝিমিয়ে পড়ে ওয়াল স্ট্রিটের মার্কিন শেয়ারবাজার। কিন্তু, ২০২৬ সালের জানুয়ারি পড়তে না পড়তেই আমূল বদলে যায় পরিস্থিতি। কারণ, তাঁর নির্দেশে নতুন বছরের গোড়ায় সস্ত্রীক ভেনেজ়ুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে আনে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ কমান্ডো বাহিনী তথা ডেল্টা ফোর্স। শুধু তা-ই নয়, এর জেরে সেখানকার খনিজ তেলের বিপুল ভান্ডারের নিয়ন্ত্রণ পায় আমেরিকা।
‘অপারেশন মাদুরো’তে ট্রাম্প সাফল্য পেতেই ঊর্ধ্বমুখী হয় ওয়াল স্ট্রিটের জ্বালানি সংস্থাগুলির স্টকের সূচক। এর পর ২৮ ফেব্রুয়ারি ইজ়ারায়েলের সঙ্গে যৌথ ভাবে ইরান আক্রমণ করে যুক্তরাষ্ট্র। এতে হু-হু করে বাড়তে থাকে সামরিক সরঞ্জাম নির্মাণকারী মার্কিন কোম্পানির শেয়ারের দাম। ঠিক এই সময়কালের মধ্যে ট্রাম্প ও তাঁর উপদেষ্টারা বিপুল পরিমাণ স্টকের লেনদেন চালিয়ে যাওয়ায় আর্থিক বিশ্লেষকদের মনে দানা বেঁধেছে সন্দেহ।
সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে একটি সূত্রকে উদ্ধৃত করে ‘ব্লুমবার্গ’ জানিয়েছে, এ বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে এনভিডিয়া, ওরাকল, মাইক্রোসফ্ট, বোয়িং এবং কস্টকো-সহ সংস্থাগুলির প্রতিটি থেকে কমপক্ষে ১০ লাখ মার্কিন ডলার মূল্যের শেয়ার কেনেন ট্রাম্প। পাশাপাশি, অ্যামাজ়ন, মেটা, উবর, ইবে, অ্যাবট ল্যাবরেটরিজ়, এটিঅ্যান্ডটি এবং ডলার ট্রি-র সংস্থাগুলির সঙ্গে তাঁর একই রকমের লেনদেনের হদিস পাওয়া গিয়েছে।
আরও পড়ুন:
সূত্রের খবর, এই সময়সীমার মধ্যে ১০ ফেব্রুয়ারি সবচেয়ে বড় স্টক কেনাবেচা করেন ট্রাম্প। ওই দিন মাইক্রোসফ্ট, মেটা ও অ্যামাজ়নের বিপুল সংখ্যক শেয়ার ছেড়ে দেন তিনি। এর বাজারমূল্য ৫০ লক্ষ থেকে ২.৫ কোটি ডলার ছিল বলে জানা গিয়েছে। তা ছাড়া নেটফ্লিক্স, ওয়ার্নার ব্রোস ডিসকভারি এবং প্যারামাউন্ট গ্লোবাল-সহ বেশ কয়েকটি বিনোদনভিত্তিক গণমাধ্যমেও তাঁর লগ্নির তথ্য প্রকাশ্যে চলে এসেছে।
ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু হতেই পারস্য উপসাগরের কৌশলগত সামুদ্রিক রাস্তা হরমুজ় প্রণালী অবরুদ্ধ করে ইরান। শত চেষ্টা করেও তা খুলতে পারেনি মার্কিন ফৌজ। ফলে এ ব্যাপারে তেহরানকে ঘন ঘন হুমকি দিতে দেখা গিয়েছে ট্রাম্পকে। আর্থিক বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, জেনেবুঝেই ওই ধরনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের বর্ষীয়ান প্রেসিডেন্ট। এতে বাজারের সূচক ওঠানামা অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রিত হয়েছে বলে স্পষ্ট করেন তাঁরা।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের এ-হেন শেয়ার কেলেঙ্কারিতে নাম জড়িয়েছে ট্রাম্পের জামাই জ্যারেড কুশনারেরও। বর্তমানে পশ্চিম এশিয়ার আমেরিকার রাষ্ট্রদূত হিসাবে কাজ করছেন তিনি। ফলে উপসাগরীয় এলাকায় মার্কিন বিনিয়োগের তদারকি করার আইনি বৈধতা রয়েছে তাঁর। সেখানকার সৌদি আরবের মতো রাষ্ট্রে কোটি কোটি ডলার লগ্নি রয়েছে ওয়াশিংটনের। ফলে ট্রাম্পের স্বার্থ রক্ষায় কুশনার রাজনৈতিক প্রভাব খাটাতে পারেন বলে মনে করেন অনেকেই।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে সবাইকে চমকে দিয়ে বাজারে নতুন স্মার্টফোন আনার কথা ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্রের বর্ষীয়ান প্রেসিডেন্টের সংস্থা। এই সংস্থার মাথায় রয়েছেন ট্রাম্পের দুই পুত্র ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র এবং এরিক ট্রাম্প। সম্পূর্ণ সোনালি রঙের ওই মুঠোবন্দি ডিভাইস হাতে পেতে ১০০ ডলার দিয়ে আগাম অর্ডার করতে বলেন তাঁরা। প্রেসিডেন্ট পরিবারের এই ঘোষণায় আমেরিকা জুড়ে তৈরি হয় তুমুল উন্মাদনা।
সোনালি স্মার্টফোন কিনতে ওই সময় ট্রাম্পভক্তদের অনেকেই ১০০ ডলার দিয়ে গ্রাহক হয়ে যান। প্রেসিডেন্টের পরিবার জানিয়ে দেয়, ২০২৫ সালের অগস্টে বাজারে আসবে সংশ্লিষ্ট মুঠোবন্দি ডিভাইস, যার পোশাকি নাম ‘টি১’। স্মার্টফোনটির বাজারমূল্য হবে ৪৯৯ ডলার। অর্থাৎ, ভারতীয় মুদ্রায় দাম দাঁড়াবে প্রায় ৪৮ হাজার টাকা।
এই সোনালি স্মার্টফোন নিয়ে আরও একটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সংস্থার কর্ণধার তথা ট্রাম্পের দুই পুত্র। সেটা হল, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে আগাম বরাত দেওয়া গ্রাহকদের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ডিভাইসটি বিলি করবেন তাঁরা। শুধু তা-ই নয়, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে স্মার্টফোনটি বাজারে না এলে অগ্রিম দেওয়া ১০০ ডলার ফিরিয়ে দেওয়ার কথাও বলতে শোনা গিয়েছিল তাঁদের। যদিও বাস্তবে দেখা গিয়েছে ঠিক তার উল্টো ছবি।
২০২৫ সালের অগস্ট তো দূরে থাক, সেপ্টেম্বর কেটে গেলেও সোনালি স্মার্টফোন বাজারে না আসায় ট্রাম্পভক্তদের মনে তৈরি হয় সন্দেহ। পরে এ ব্যাপারে বিবৃতি দেয় প্রেসিডেন্টের পারিবারিক সংস্থা। সেখানে বলা হয়, সরকারি নীতির টালবাহানার কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ডিভাইসটিকে বাজারজাত করা যায়নি। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সেটি হাতে পাবেন গ্রাহক। ফলে ওই সময় এ ব্যাপারে দানা বাঁধেনি কোনও ক্ষোভ।
কিন্তু, চলতি বছরের প্রথম তিন মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও সোনালি স্মার্টফোনের ব্যাপারে ট্রাম্পের সংস্থা কোনও উচ্চবাচ্য না করায় ধৈর্য হারান গ্রাহকেরা। এক্স হ্যান্ডল (সাবেক টুইটার) এবং টিকটকে শুরু হয় প্রেসিডেন্টের দুই পুত্রের নাম করে গালিগালাজ। পাশাপাশি, ‘কোথায় গেল আমার ট্রাম্প ফোন’ শিরোনামে প্রচার চালাতেও দেখা গিয়েছে তাঁদের। ফলে সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে ‘পোটাস’-এর উপর যে চাপ বাড়ছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
ট্রাম্পের সংস্থার ওয়েবসাইটে অবশ্য সম্পূর্ণ অন্য কথা বলা হয়েছে। সেখানে লেখা শর্তাবলি অনুযায়ী, অগ্রিম বরাতে জমা করা অর্থে ডিভাইসটি উৎপাদন করা হবে বা পরে সেটি কেনা যাবে, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, যাঁরা অগ্রিম টাকা দিয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে বিক্রয় সংক্রান্ত কোনও চুক্তি করা হয়নি। ফলে পণ্য মজুত বা সংরক্ষণের প্রশ্ন নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমগুলির দাবি, আগামী দিনে ট্রাম্পের স্মার্টফোন আদৌ বাজারে আসবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। আনুমানিক প্রায় ছ’লক্ষ আমেরিকাবাসী সংশ্লিষ্ট ডিভাইসের জন্য ১০০ ডলার জমা করেছিলেন। ফলে প্রেসিডেন্টের দুই ‘সুপুত্র’ সব মিলিয়ে প্রায় ছ’কোটি ডলার বাজার থেকে তুলে নিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই এ বার শেয়ার কেলেঙ্কারিতে নাম জড়াল ট্রাম্পের। যদিও যাবতীয় অভিযোগ খারিজ করে পাল্টা বিবৃতি দিয়েছে হোয়াইট হাউস। সেখানকার একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, কোনও রকমের স্বার্থের সংঘাতে প্রেসিডেন্ট জড়িয়ে নেই। শুধুমাত্র আমেরিকার জনগণের স্বার্থে কাজ করছেন তিনি।
এ বছরের (২০২৬ সাল) নভেম্বরে আমেরিকায় রয়েছে মধ্যবর্তী (মিড টার্ম) নির্বাচন। ভোট এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে শুল্ক সংঘাত ও ইরান যুদ্ধের মতো ইস্যুগুলিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রে কমছে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা। তার মধ্যে সোনালি স্মার্টফোনের প্রতারণা ও শেয়ার কেলেঙ্কারির অভিযোগ তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টির সদস্যদের জন্য দুঃস্বপ্ন বয়ে আনল বলেই মনে করছে বিশেষজ্ঞ মহল।