‘মহাকাশের মেঘনাদে’ রণাঙ্গন কাঁপাচ্ছে ইরান! কী ভাবে কাজ করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র? প্রথম ব্যবহার করেছিল কোন দেশ?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজ়রায়েলকে প্রতিহত করতে ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রে প্রত্যাঘাত শানাচ্ছে ইরান। কী ভাবে জন্ম হল এই গণবিধ্বংসী হাতিয়ারের? কাদের কাছে আছে এই ‘ব্রহ্মাস্ত্র’? কোথায় দাঁড়িয়ে ভারত?
কখনও ইহুদিভূমি। কখনও আবার মার্কিন সামরিক ঘাঁটি বা রণতরী। জোড়া ‘মহাশক্তি’কে গুঁড়িয়ে দিতে ঘন ঘন ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রে আঘাত হানছে ইরান। তেহরানের এই ‘ব্রহ্মাস্ত্র’ ঠেকাতে দিশাহারা তেল আভিভ ও ওয়াশিংটন। সামরিক বিশেষজ্ঞদের দাবি, আধুনিক যুদ্ধে যে কোনও মুহূর্তে লড়াইয়ের অভিমুখ বদলানোর ক্ষমতা রাখে এই গণবিধ্বংসী হাতিয়ার। পশ্চিম এশিয়ার সংঘর্ষে সংশ্লিষ্ট অস্ত্রটি হয়ে উঠবে ‘গেম চেঞ্জার’? উঠছে প্রশ্ন।
সাবেক সেনাকর্তাদের কথায়, বর্তমানে আঘাত হানার নিরিখে ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রকে ‘সর্বাধিক বিপজ্জনক’ বললে অত্যুক্তি হবে না। চোখের পলকে এক মহাদেশ থেকে উড়ে গিয়ে অন্য মহাদেশে আছড়ে পড়তে পারে এই হাতিয়ার। এর মাধ্যমে চালানো যায় পরমাণু হামলাও। স্থলসেনার পাশাপাশি রণতরী এবং ডুবোজাহাজেও ব্যবহার হয় সংশ্লিষ্ট গণবিধ্বংসী অস্ত্র। গতি ও পাল্লার নিরিখে এর বেশ কয়েকটি ভাগ রয়েছে।
এ-হেন ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের জন্ম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-’৪৫ সাল) সময়। ফ্যুয়েরার আডল্ফ হিটলারের নেতৃত্বে নাৎজ়ি জার্মানি তখন সামরিক শক্তি বাড়িয়েই চলেছে। সেই কাজে দেশকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন ক্ষুরধার মস্তিষ্কের এক ইঞ্জিনিয়ার তথা মহাকাশবিজ্ঞানী ওয়ার্নার ভন ব্রাউন। কয়েক বছরের চেষ্টায় বানিয়ে ফেলেন স্বল্পপাল্লার বিশেষ ধরনের এক রকেট, নাম এ-৪। হিটলারের নাৎজ়ি ফৌজ অবশ্য সেটার নাম বদলে ভি-২ করে দিয়েছিল।
১৯৪২ সালের ৩ অক্টোবর প্রথম বার স্বল্পপাল্লার ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালায় বার্লিন। ব্রাউন তত দিনে হিটলারের অত্যন্ত আস্থাভাজন আধাসেনা এসএসের সদস্যপদ নিয়ে ফেলেছেন। তাঁর তৈরি ভি-২ ছুড়তে উল্লম্ব লঞ্চারের প্রয়োজন ছিল। তা বানাতে জার্মান সেনার খুব একটা সময় লাগানি। যদিও গোড়ার দিকে সংশ্লিষ্ট হাতিয়ারটিকে যুদ্ধের ময়দানে নামানোর ব্যাপারে যথেষ্ট আপত্তি ছিল নাৎজ়ি কমান্ডারদের।
কিন্তু, ১৯৪৪ সাল আসতে আসতে ইউরোপের একাধিক রণাঙ্গনে বেকায়দায় পড়ে জার্মানি। তখন রাজধানী বার্লিন-সহ একাধিক শহরে মাঝেমধ্যেই বোমাবর্ষণ করছে মিত্রশক্তি। ফলে ‘প্রতিশোধের অস্ত্র’ হিসাবে ভি২ রকেট ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে ফেলেন হিটলার। নির্দেশ মিলতেই প্রথমে ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের লন্ডন এবং পরে বেলজিয়ামের অ্যান্টওয়ার্প ও লিয়েজ়ে একসঙ্গে তিন হাজারের বেশি ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রে হামলা চালিয়ে বসে নাৎজ়ি ফৌজ।
আরও পড়ুন:
জার্মানির এই প্রত্যাঘাতে ইউরোপ-সহ গোটা দুনিয়া হকচকিয়ে গিয়েছিল। কারণ, স্বল্পপাল্লার ভি-২র কার্যপদ্ধতি ছিল বাকি সব কিছুর থেকে আলাদা। উল্লম্ব ভাবে উৎক্ষেপণের পর এটা সোজা চলে যেত মহাকাশে। তার পর সেখান থেকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে আছড়ে পড়ত ব্রাউনের রকেট। পাশাপাশি, নিশানা ঠিক রেখে ইংরেজি ‘ইউ’ অক্ষরের মতো যাত্রাপথে ছুটত এই হাতিয়ার। আজও এই নিয়মের উপর ভিত্তি করেই ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেন প্রতিরক্ষা গবেষকেরা।
ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধের সঙ্গে সঙ্গে জ্যোতির্বিজ্ঞানেরও যাবতীয় হিসাব পাল্টে দিয়েছিল। কারণ, পৃথিবী থেকে মহাশূন্যে পাঠানো প্রথম কোনও বস্তু ছিল এই হাতিয়ার। পরবর্তী কালে তৈরি হয় আরও শক্তিশালী রকেট, যার উপর ভিত্তি করে কৃত্রিম উপগ্রহ এবং নভশ্চরদের মহাকাশে পাঠাতে সক্ষম হয় বিভিন্ন দেশ। অন্য দিকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রূপ বদলে আরও ঘাতক আকার ধারণ করে জার্মানদের তৈরি ওই ‘ব্রহ্মাস্ত্র’।
বিশ্বের প্রথম ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রকে নিয়ে ২০১১ সালে একটি তথ্যচিত্র তৈরি করে ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি। ভি-২ প্রয়োগ সত্ত্বেও কী ভাবে এবং কেন হিটলারের পরাজয় হল, তা সেখানে তুলে ধরা হয়। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বযুদ্ধে ব্রাউনের রকেটের আঘাতে সামরিক এবং অসামরিক মিলিয়ে প্রাণ হারান অন্তত ৯,০০০ জন। এ ছাড়া জোর করে দ্রুত এই অস্ত্রের উৎপাদনের সময় মৃত্যু হয় আরও ১২ হাজার শ্রমিকের। এঁদের একাংশ আবার বন্দি ছিলেন জার্মান কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে।
বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর নাৎজ়িদের ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি হাতে পেতে মরিয়া হয়ে ওঠে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আর তাই চাকরি আর মোটা বেতনের লোভ দেখিয়ে এক এক করে জার্মানির দুঁদে প্রতিরক্ষা বিজ্ঞানীদের নিজের দেশে নিয়ে যায় আমেরিকা। সেই প্রলোভন সামলাতে পারেননি ব্রাউনও। আর তাই লড়াই থামার পর পর তাঁরও গন্তব্য হয় নিউইয়র্ক। ওয়াশিংটনের এই গোপন অভিযানের নাম ছিল ‘অপারেশন পেপারক্লিন’।
আরও পড়ুন:
যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে আমেরিকার রাস্তায় হেঁটে জার্মানির জটিল প্রতিরক্ষা প্রকৌশলের কিছুটা হস্তগত করে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন। ফলে খুব দ্রুত ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে ফেলে এই দুই মহাশক্তি। পরবর্তী দশকগুলিতে তাদের মধ্যেই ‘ঠান্ডা লড়াই’ (কোল্ড ওয়ার) শুরু হলে সংশ্লিষ্ট ‘ব্রহ্মাস্ত্র’টিকে আরও শক্তিশালী করার প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে মস্কো এবং ওয়াশিংটন। ফলে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে এর গতি এবং পাল্লা।
বর্তমানে পাল্লার নিরিখে ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রকে পাঁচটি ভাগে ভাগ করা যায়। সেগুলি হল, কৌশলগত (ট্যাকটিকাল), স্বল্প পাল্লার (শর্ট রেঞ্জ), মাঝারি পাল্লার (মিডিয়াম রেঞ্জ), মধ্যম পাল্লার (ইন্টারমিডিয়েট রেঞ্জ) এবং আন্তঃমহাদেশীয় (ইন্টারকন্টিনেন্টাল) ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। এর মধ্যে প্রথম দু’টির পাল্লা ৩০০ কিলোমিটার এবং ৩০০-১০০০ কিলোমিটার। মাঝারি পাল্লার ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সর্বোচ্চ ৩,৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত আঘাত হানতে সক্ষম।
মধ্যম পাল্লার ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সাধারণত ৫,০০০-৫,৫০০ কিলোমিটারের হয়ে থাকে। আন্তঃমহাদেশীয়গুলির পাল্লা ১২ হাজার কিলোমিটার বা তারও বেশি। গতির নিরিখে এই হাতিয়ার আবার দু’ভাগে বিভক্ত। একটি হল সুপারসনিক অর্থাৎ শব্দের গতিতে ছোটা ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। অপরটির নাম হাইপারসনিক। সেটি শব্দের পাঁচ গুণের চেয়ে বেশি জোরে ছুটতে পারে। শেষের প্রযুক্তিটি হাতেগোনা কয়েকটি দেশের কাছে রয়েছে।
জার্মানির ভি-২ ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছিল একটি সুপারসনিক হাতিয়ার। সেই প্রযুক্তি হাতে পাওয়ার পরও ‘ঠান্ডা লড়াই’য়ের প্রথম পর্বে বাজিমাত করে সোভিয়েত ইউনিয়ন। ১৯৫৭ সালের অগস্টে আর-৭ নামের একটি ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালায় মস্কো। সেটা ছিল বিশ্বের প্রথম আন্তঃমহাদেশীয় হাতিয়ার। দু’বছর পর ১৯৫৯ সালে সংশ্লিষ্ট অস্ত্রটিকে বাহিনীতে শামিল করে ক্রেমলিন।
১৯৭০ সাল আসতে আসতে ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের প্রযুক্তিতে বড় বদল আনে আমেরিকা। এর নাম হল ‘মাল্টিপল ইন্টিপেন্ডেন্টলি টার্গেটেবল রি-এন্ট্রি ভেহিকল’ বা এমআইআরভি। এর মাধ্যমে একটা ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রে একাধিক ওয়ারহেড বা বিস্ফোরকযুক্ত করার সুযোগ পায় যুক্তরাষ্ট্র। সেটা মহাশূন্যে গিয়ে মূল রকেট থেকে আলাদা হয়ে পৃথক পৃথক জায়গায় আছড়ে পড়তে পারে। অর্থাৎ, একটি ক্ষেপণাস্ত্রে একাধিক লক্ষ্যভেদের শক্তি চলে আসে ওয়াশিংটনের হাতে।
বিশ্বে প্রথম হাইপারসনিক ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা নিয়ে অবশ্য যথেষ্ট ধোঁয়াশা রয়েছে। মস্কোর দাবি, এ কাজে তারা সবচেয়ে এগিয়ে। অন্য দিকে চিন মনে করে, সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিতে সবচেয়ে বেশি মুনশিয়ানা আছে তাদের। এই তালিকায় সর্বশেষ নামটি হল তুরস্ক। গত বছর (পড়ুন ২০২৫) সংশ্লিষ্ট হাতিয়ারের পরীক্ষা চালায় আঙ্কারা। এর সাঙ্কেতিক নাম হল ‘টাইফুন ব্লক-৪’। যদিও এই অস্ত্রের পাল্লা এবং গতি সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য গোপন রেখেছে ‘ইউরোপের রুগ্ন মানুষ’।
২১ শতকে ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে সবচেয়ে এগিয়ে আছে আমেরিকা। যুক্তরাষ্ট্রের মিনিটম্যান-থ্রিকে এই শ্রেণির সেরা হাতিয়ার বলা যেতে পারে। দ্বিতীয় স্থানে আছে রাশিয়ার আরএস-২৮ সারমাট। এ ছাড়া চিনের ডিএফ-৪১, ইরানের সেহর ও সিজ্জল সিরিজ় এবং উত্তর কোরিয়া বা ডিপিআরকের (ডেমোক্র্যাটিক পিপল্স রিপাবলিক অফ কোরিয়া) হোয়াসং ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে নিশ্চিহ্ন হতে পারে আস্ত শহর।
গত শতাব্দীর ৮০-র দশকে ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির দিকে মন দেয় ভারত। সেই লক্ষ্যে প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা ডিআরডিওর (ডিফেন্স রিসার্চ ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজ়েশন) নেতৃত্বে ১৯৮৩ সালে শুরু হয় ‘ইন্টিগ্রেটেড গাইডেড মিসাইল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম’। মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় পৃথ্বী নামের একটি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে ফেলে তারা। ১৯৮৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে এর প্রথম পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ হয়েছিল।
পরবর্তী বছরগুলিতে ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে দ্রুত উন্নতি করে ডিআরডিও। ১৯৮৯ সালে অগ্নি-১-এর সফল পরীক্ষা চালায় তারা। এর কিছু দিনের মধ্যেই এমআইআরভি প্রযুক্তি হাতে পায় নয়াদিল্লি। ফলে অগ্নি সিরিজ়ের পরবর্তী ক্ষেপণাস্ত্রগুলিতে জুড়ে যায় সেটা। আগামী দিনে অগ্নি-৬-এর পরীক্ষা চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে এ দেশের প্রতিরক্ষা গবেষকদের। এর পাল্লা ১২ হাজার কিলোমিটারের বেশি হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এর পাশাপাশি হাইপারসনিক ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতেও এগিয়ে গিয়েছে ভারত। বর্তমানে এ দেশের বাহিনীর হাতে আছে ‘প্রলয়’ নামের একটি আধা ব্যালেস্টিক হাতিয়ার। এর গতি প্রায় পাঁচ ম্যাক। এ ছাড়া ডুবোজাহাজ থেকে হামলার জন্য ‘সাগরিকা’ নামের একটি ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে নৌবাহিনীর কাছে।