৩৮ বছর আগেও নাকাল হয় আমেরিকা, একই কায়দায় হরমুজ় আটকাল ইরান, মাইনের জঞ্জাল সাফ করত ব্রিটিশ ‘ঝাঁটা’?
৩৮ বছর আগের এক ঘটনা প্রমাণ করে দিয়েছিল সম্মুখ যুদ্ধের চেয়ে মাইন এবং ছোট নৌকা দিয়ে আক্রমণ করে আমেরিকার মতো ক্ষমতাশালী নৌশক্তিকে পরাভূত করা বেশি সহজ। দক্ষ হাতে তা করে দেখিয়েছিল ইরান। সেই একই পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে হরমুজ় অবরোধ করে রেখেছিল সাবেক পারস্য দেশটি।
সালটা ১৯৮৭। পারস্য উপসাগরের মাঝে জেগে থাকা এক দ্বীপ। নাম, ফারসি আইল্যান্ড। সেখান থেকে একটি ছোট নৌকা পাড়ি দিল গুটিকতক লোককে নিয়ে। গন্তব্য অত্যন্ত গোপন। রাতের অন্ধকারে সন্তর্পণে সাগরের বুকে পেতে দিল নীরব ক্ষুদ্র ঘাতকদের। ৫০০ গজ জুড়ে ‘অপারেশন’ সেরে ভোরের আলো ফোটার আগেই উধাও হয়ে গেল সেই নৌকা।
পরদিন, ২৪ জুলাই সকালে পারস্য উপসাগরে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় ঘটে গেল মহাবিপর্যয়। মার্কিন নৌবাহিনীর পতাকা বহনকারী বিশাল এক ট্যাঙ্কারে ঘটল বিস্ফোরণ। আল-ফাও উপদ্বীপের কাছে পারস্য উপসাগরের আন্তর্জাতিক জলসীমায় এসএস ব্রিজেটন নামের বিশাল ট্যাঙ্কারটিকে আঘাত করে একটি ইরানি সামুদ্রিক মাইন। বিশাল বিস্ফোরণে জাহাজটির খোলে ৩০ ফুটের এক বিশাল গর্তের সৃষ্টি হয়। তবে অতিকায় জাহাজটিকে ডোবাতে পারেনি উপসাগরে পেতে রাখা ইরানি মাইন।
আমেরিকা পরিচালিত ‘অপারেশন আর্নেস্ট উইল’ ঘোষণা হওয়ার কয়েক দিনের মাথাতেই ইরানের রেভলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর সুদক্ষ নৌসেনারা আমেরিকার নৌশক্তিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বসেন। ইরানের আচমকা আঘাতে টলমল করে উঠেছিল মার্কিন রণসজ্জা। রাতের অন্ধকারে কুয়েতের জাহাজকে আঘাত করার জন্য মোট ন’টি মাইন পাতা হয়েছিল উপসাগরে।
ইরান-ইরাক যুদ্ধের (ট্যাঙ্কার ওয়ার) সময় পারস্য উপসাগরে কুয়েতি তেল ট্যাঙ্কারগুলোকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য পরিচালিত মার্কিন সামরিক অভিযান ছিল ‘অপারেশন আর্নেস্ট উইল’। এই অভিযানের সবচেয়ে আলোচিত এবং বিতর্কিত অধ্যায় হল ব্রিজেটনের ঘটনাটি।
ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় উভয় দেশ একে অপরের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার জন্য তেল ট্যাঙ্কারগুলিতে হামলা চালানো শুরু করে। কুয়েত তখন ইরাককে সমর্থন করছিল। ফলে ইরানি বাহিনী কুয়েতি ট্যাঙ্কারগুলিকে নিশানা করে। সহায়তার জন্য আমেরিকার কাছে কুয়েত আবেদন করলে, মার্কিন নৌবাহিনী সেই ট্যাঙ্কারগুলোকে মার্কিন পতাকাবাহী জাহাজে রূপান্তরিত করে। সেগুলিকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব নেয়।
আরও পড়ুন:
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় ছিল, ব্রিজেটনকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল অত্যাধুনিক মার্কিন যুদ্ধজাহাজ। কিন্তু যুদ্ধজাহাজগুলির কাছে সামুদ্রিক মাইন শনাক্ত করার মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না। ফলে, ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলিই উল্টে ব্রিজেটনের পিছু পিছু চলতে থাকে। কারণ ৪ লক্ষ ১৪ হাজার টনের বিশাল ট্যাঙ্কারটি মার্কিন নৌবহরের ঢাল হিসাবে কাজ করেছিল।
ইরান কুয়েতের ট্যাঙ্কারকে স্তব্ধ করার জন্য একটিও বুলেট বা কোনও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেনি। বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী নৌবাহিনী একটি সাধারণ মাইনের কাছে পরাস্ত হওয়ায় আমেরিকার সামরিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ৩৮ বছর আগের সেই ঘটনা প্রমাণ করে দিয়েছিল সম্মুখ যুদ্ধের চেয়ে মাইন এবং ছোট নৌকা দিয়ে আক্রমণ করে আমেরিকার মতো ক্ষমতাশালী নৌশক্তিকে পরাভূত করা বেশি সহজ।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ব্রিজেটনের ঘটনাটি শুধু মার্কিন নৌশক্তির একটি কৌশলগত ব্যর্থতা ছিল না। এটি ছিল ইরানের মনস্তাত্ত্বিক দক্ষতার এক চরম নিদর্শন। বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত ডেস্ট্রয়ারগুলিকে একটি অসামরিক ট্যাঙ্কারের ছায়ায় লুকিয়ে থাকতে বাধ্য করে তেহরান। ইরানি নৌযোদ্ধাদের দক্ষতা প্রমাণ করে দিয়েছিল, মাত্র ১৫ ডলারের প্রযুক্তি কয়েক হাজার কোটি ডলারের সম্পদকে ধরাশায়ী করতে সক্ষম।
সেই একই পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে ৩৮ বছর পরেও হরমুজ়ে অবরোধ চালিয়ে গিয়েছে সাবেক পারস্য দেশটি। ইজ়রায়েলের সঙ্গে সংঘাত চলাকালীনই পারস্য উপসাগরে জাহাজভর্তি সামুদ্রিক মাইন রেখেছিল ইরান। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের উপর মার্কিন ইজ়রায়েল যৌথ হানার পর ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছিল, হরমুজ় প্রণালী থেকে তেলবাহী জাহাজ পশ্চিম এশিয়ার বাইরে যেতে দেবে না। কার্যত তা করে দেখিয়েছে ইরান।
আরও পড়ুন:
একাধিক মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, হরমুজ় প্রণালীতে কয়েক ডজন মাইন বিছিয়ে রেখেছে ইরান। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত দুই আধিকারিককে উদ্ধৃত করে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে মাহম ৩, মাহম ৪, এমনকি মাহম ৭-এর মতো মাইনও পেতে রেখেছে ইরানি নৌবাহিনী।
মাহম হল ইরানের তৈরি একটি অত্যন্ত আধুনিক এবং শক্তিশালী চৌম্বকীয় প্রভাব সম্বলিত মাইন। ১৯৮৭ সালে ব্রিজেটন যে সাধারণ মাইনে আঘাত পেয়েছিল, মাহম মাইন তার চেয়ে কয়েক প্রজন্ম এগিয়ে। বর্তমান ২০২৬ সালের হরমুজ প্রণালীর সঙ্কেতে এই মাইনটিই আমেরিকা ও বিশ্বের অন্যান্য দেশের নৌবাহিনীর জন্য প্রধান মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাহম মাইন হল ইরানের সেই পুরনো কৌশলের আধুনিক সংস্করণ।
মাহম জলের নীচে মাসের পর মাস সক্রিয় থাকতে পারে। মাইনের বাইরের আবরণ এমন বিশেষ উপাদানে তৈরি যা সোনার সিগন্যাল শোষণ করে নেয়। ফলে সমুদ্রের নীচের পাথরের সঙ্গে এই মাইনের পার্থক্য করা বেশ কঠিন। মাহমে থাকা বহুমুখী সেন্সর জাহাজের চৌম্বকক্ষেত্র, ইঞ্জিনের শব্দ এবং জলের চাপের পরিবর্তন সহজেই শনাক্ত করতে পারে।
হরমুজ় প্রণালীতে মাইন বিছিয়ে রাখার অভিযোগ তুলে ইরানকে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুদ্ধবিরতির আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘‘হরমুজ় প্রণালীতে ইরান যদি কোনও মাইন রেখে থাকে, অবিলম্বে তা সরিয়ে নিক। যদি কোনও কারণে মাইন রাখা হয়, তবে ইরানের সামরিক পরিণতি এমন পর্যায়ে যাবে, যা তারা কল্পনাও করতে পারেনি।’’
মাইনের উপস্থিতি নিয়ে দোলাচলের মাঝেই হরমুজ়ে জাহাজ চলাচল ৯০ শতাংশ কমে যায়। সমুদ্রের তলদেশে থাকা শত্রু দেশের মাইন বিদায় করার শেষ জাহাজটিকে আমেরিকা বিদায় জানিয়েছে ২০২৫ সালে। আমেরিকা তাদের পুরনো মাইন সুইপারগুলিকে অবসরে পাঠিয়ে তার জায়গায় লিটেরাল কমব্যাট শিপ মোতায়েন করেছে। জাহাজগুলি নিজে মাইনের চৌহদ্দি মাড়ায় না। দূর থেকে ড্রোন এবং হেলিকপ্টার ব্যবহার করে মাইন পরিষ্কার করার চেষ্টা করে।
সমুদ্রের একদম তলদেশে লুকিয়ে থাকা আধুনিক মাহম মাইন শনাক্ত করতে এই পদ্ধতি কতটা ফলপ্রসূ তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের একাংশের। এই অবস্থায় ত্রাতা হয়ে উঠতে পারে ব্রিটিশ প্রযুক্তি। উপসাগরে মাইনের সমস্যা মোকাবিলার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ভাবে ব্রিটেনকে সবচেয়ে অভিজ্ঞ মনে করা হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি যখন উপকূলগুলিতে মাইন নিয়ে হামলা চালিয়েছিল, তখন ব্রিটিশ নৌপ্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞেরা একটি বিশেষ পদ্ধতি বেছে নেন। ডিগসিং বা চৌম্বকত্ব দূরীকরণ পদ্ধতি নৌ-যুদ্ধের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী উদ্ভাবন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে বার্লিনের গোপন অস্ত্র চৌম্বক মাইন থেকে ব্রিটিশ নৌবাহিনীকে বাঁচাতে এটি তৈরি করেন ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা গবেষকেরা।
ডিগসিং হল এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে জাহাজের চৌম্বকক্ষেত্রকে কৃত্রিম ভাবে শূন্য বা নিরপেক্ষ করে ফেলা হয়, যাতে সমুদ্রের তলদেশে থাকা মাইনগুলো জাহাজটিকে শনাক্ত করতে না পারে। আধুনিক মাইন আরও উন্নত হয়েছে। এখন শুধু চৌম্বকত্ব নয়, জাহাজের শব্দের কম্পন এবং জলের চাপের পরিবর্তনও মাইন শনাক্ত করতে পারে। এই উন্নত সংস্করণগুলির সঙ্গে লড়াই করতে উন্নত হয়েছে ডিগসিং প্রযুক্তিও।
রয়্যাল নেভির কাছে বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সেরা ম্যাগনেটিক সিগনেচার রেঞ্জ (স্কটল্যান্ডের উপকূলীয় এলাকায়) রয়েছে। সেখানে যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়ে মাপা হয় তার ডিগসিং ঠিকমতো কাজ করছে কি না। মাহমের মতো মাইন আধুনিক ডিগসিং প্রযুক্তির ফাঁকফোকরগুলো চেনে। আধুনিক যুদ্ধজাহাজ যত বেশি চৌম্বকীয় ভাবে শান্ত হওয়ার চেষ্টা করছে, মাহম মাইনের সেন্সরগুলো তত বেশি সংবেদনশীল করে তৈরি করা হচ্ছে।
২০২৬ সালের শুরুতে ব্রিটেন তাদের মাইন হান্টারগুলিকে পারস্য উপসাগর থেকে সরিয়ে নিয়েছিল। তার বদলে কিছু প্রোটোটাইপ মাইন শনাক্তকরণ প্রযুক্তি মোতায়েন করতে চেয়েছিল ব্রিটেন। কয়েকশো ছোট ছোট রোবটিক সাবমেরিন পাঠিয়ে মাইন চিহ্নিতকরণ, হেলিকপ্টার থেকে নীল-সবুজ লেজ়ার পাঠিয়ে জলের নীচের মাইন শনাক্ত ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে মাহম ও পাথরের ফারাক খোঁজার কাজ করবে এই প্রোটোটাইপগুলি। হরমুজ়ে মাইন সাফাই অভিযানে কতটা সফল হতে পারে ব্রিটিশ ‘ঝাঁটা’ তার অপেক্ষাতেই ছিল গোটা বিশ্ব। তার আগেই এল যুদ্ধবিরতির বার্তা।