সংসারের হাল ধরতে ক্রিকেটার হওয়া হয়নি, বাবার দেনা মেটাতে বড় মূল্য দিতে হয়েছিল, এখন কী করেন রেখার জামাইবাবু?
খেলোয়াড় কোটায় ব্যাঙ্কের কর্মচারী পদে চাকরি পেয়েছিলেন রেখার জামাইবাবু। কিন্তু সেই বেতনে পাঁচ সদস্যের পরিবারের খরচ বহন করতে পারছিলেন না তিনি। অন্য দিকে, বাবার দেনার দায়েও সংসারের অবস্থা ছিল সঙ্গিন। তখনই বাধ্য হয়ে কেরিয়ার নিয়ে বাজি খেলতে হয়েছিল তাঁকে।
শ্যালিকা বলিউডের ডাকসাইটে সুন্দরী অভিনেত্রীদের তালিকায় এখনও প্রথম সারিতে। অভিনেত্রীর বয়স সত্তরের কোঠা পার করে গেলেও এখনও তাঁর অনুরাগীর সংখ্যা নেহাত কম নয়। কিন্তু নায়িকার জামাইবাবু হয়ে বলিউডে নাকি আর কাজ পান না তেজ সপ্রু। উপার্জনের জন্য শেষ পর্যন্ত ছোটপর্দায় ভরসা রাখতে হয় রেখার জামাইবাবু তেজ সপ্রুকে।
১৯৫৫ সালের এপ্রিলে মহারাষ্ট্রের মুম্বইয়ে জন্ম তেজের। বাবা ডিকে সপ্রু ছয়ের দশকের নামকরা বলিউড অভিনেতা। মা হেমবতীও পেশায় ছিলেন অভিনেত্রী। বলিউডের খলনায়ক জীবন সম্পর্কে কাকা তেজের। তেজের দুই বোনের এক জন, প্রীতি সপ্রু অভিনেত্রী। অন্য জন, রিমা রাকেশ নাথ পেশায় চিত্রনাট্যকার। এমনকি, জামাইবাবু রাকেশ নাথও বলিউডের প্রযোজক-পরিচালক। তার আগে দীর্ঘ ২৮ বছর বলি অভিনেত্রী মাধুরী দীক্ষিতের ম্যানেজার ছিলেন রাকেশ।
শৈশব থেকেই ফিল্মি দুনিয়ার সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত তেজ। কিন্তু পরিবারের পদাঙ্ক অনুসরণ করে বড়পর্দায় কখনওই কেরিয়ার গড়তে চাননি তেজ। বরং, ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন তিনি।
খেলায় বরাবরই আগ্রহী ছিলেন তেজ। মহারাষ্ট্রের জুনিয়র ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছিলেন। আবার ক্রিকেটও খেলতেন। সিকে নাইডু ট্রফিতে জুনিয়র টিমে খেলেছিলেন তেজ। তাঁর দলেই ছিলেন দিলীপ বেঙ্গসরকার, সন্দীপ পাটিলের মতো ভারতীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড়রা।
কলেজে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলোয়াড় হওয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছিলেন তেজ। ঠিক সেই সময় অভিনয় ছেড়ে প্রযোজনার দিকে ঝোঁকেন তেজের বাবা। প্রথম ছবির প্রযোজনায় বিপুল সাফল্যও পান। তবে গন্ডগোল বাধে দ্বিতীয় ছবি প্রযোজনা করতে গিয়ে।
আরও পড়ুন:
প্রথম ছবির সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে দ্বিতীয় ছবিতেও বিপুল খরচ করে ফেলেছিলেন তেজের বাবা। কিন্তু ছবিটি মুক্তি পাওয়া তো দূর, ছবিটি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন সকলে। কেউ নাকি সেই ছবি কিনতে চাননি। ফলে, এই ছবির ব্যর্থতায় প্রায় নিঃস্ব হয়ে যান তেজের বাবা।
বিলাসবহুল বাংলো ছেড়ে জুহুর একটি ছোট্ট ফ্ল্যাটে চলে যায় তেজের পরিবার। দেনা শোধ করতে বিক্রি করে দিতে হয় তাঁদের বাড়ি এবং তিনটি গাড়ি। তেজের বাবার কাজ পাওয়ার সুযোগও কমে যায়। বাধ্য হয়ে সংসারের হাল ধরতে হয় তেজকে। সকালে কলেজের পড়াশোনা শেষ করে খেলার প্রশিক্ষণ নিয়ে তার পর চাকরি করতে যেতেন তিনি।
খেলোয়াড় কোটায় ব্যাঙ্কের কর্মচারী পদে চাকরি পেয়েছিলেন তেজ। ব্যাঙ্কের হয়ে ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে অসংখ্য বার বিজয়ী হয়েছিলেন তেজ। তবে, ব্যাঙ্কের চাকরি করে পাঁচ সদস্যের পরিবারের খরচ বহন করতে পারছিলেন না তিনি। তেজকে তখন অভিনয় নিয়ে কেরিয়ার গড়ার পরামর্শ দেন তাঁর বাবা। কারণ, বলিউডে অর্থোপার্জনের সুযোগ এবং সুবিধা দুই-ই বেশি।
ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন ত্যাগ করে বাবার ইচ্ছা পূরণ করার পথে নামলেন তেজ। অভিনয় শেখার জন্য তিনি পুণের ফিল্ম ইনস্টিটিউটে পড়াশোনা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তেজের বাবা আপত্তি জানান। তার পরিবর্তে বলিউডের এক পরিচালকের সঙ্গে তেজকে দেখা করার নির্দেশ দেন তিনি।
আরও পড়ুন:
পরিচালক রবিকান্ত নাগাইচ তখন মিঠুন চক্রবর্তীকে নিয়ে ‘সুরক্ষা’ ছবি তৈরি করছেন। ছবির জন্য দ্বিতীয় নায়ক খুঁজছিলেন রবিকান্ত। তেজকে দেখেই পছন্দ হয়ে যায় তাঁর। ‘সুরক্ষা’ ছবিটির মাধ্যমে অভিনয়জীবন শুরু হয় তেজের। সেই ছবিতে এক গোয়েন্দার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনি।
তার পর থেকে কেরিয়ার থেমে থাকেনি তেজের। তবে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পার্শ্বচরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব আসত তাঁর কাছে। পরিবারের কথা ভেবেই চরিত্র নিয়ে কখনও বাছাবাছি করতেন না তেজ। যখন যেমন সুযোগ পেতেন, তেমন ভাবেই কাজ করতেন। কিন্তু রোজগারের কথা চিন্তা করতে গিয়ে কেরিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয় তেজের।
রেখার সৎবোন ধনলক্ষ্মীকে বিয়ে করেন তেজ। রেখার মতো জনপ্রিয় অভিনেত্রীর জামাইবাবু হয়েও বড়পর্দায় পসার জমাতে পারছিলেন না তিনি। একের পর এক পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করতে করতে পর্দায় তাঁর গুরুত্বও কমে যেতে থাকে। একসময়ের পর তিনি মূল খলনায়কের চরিত্রের পরিবর্তে খলনায়কের সঙ্গীর চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব পেতে শুরু করেন।
তেজের চোখের মণির রং নীল। গম্ভীর কণ্ঠস্বর এবং বলিষ্ঠ শারীরিক গঠনের জন্যও প্রশংসা পেতেন তিনি। শুটের সময় সংঘর্ষের দৃশ্যে ‘বডি ডাবল’ ব্যবহার করতেন না তেজ। নিজেই নিজের অ্যাকশন দৃশ্যে অভিনয় করতেন। সে কারণে অ্যাকশন দৃশ্যে অভিনয় করতে গিয়ে বার বার আহত হতে থাকেন তিনি।
হিন্দি ছাড়াও মোট ১২টি ভাষার ছবিতে অভিনয় করেছিলেন তেজ। তাঁর কেরিয়ারের ঝুলিতে ছিল ২০০টিরও বেশি ছবি। কিন্তু নিজে থেকেই বড়পর্দা থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করেন তেজ।
২০০৪ সাল থেকে ছোটপর্দায় অভিনয় শুরু করেন তেজ। ‘কবুল হ্যায়’, ‘তুমহারি পাখি’, ‘পালমপুর এক্সপ্রেস’, ‘চক্রবর্তী অশোক সম্রাট’, ‘ভারতবর্ষ’-এর মতো অসংখ্য হিন্দি ধারাবাহিকে অভিনয় করতে দেখা গিয়েছে তেজকে। ২০২৩ সালে ‘কিসি কা ভাই কিসি কি জান’ ছবিতে ইনস্পেক্টরের চরিত্রে অভিনয়ের পর ২০২৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তেলুগু ভাষার ‘দে কল হিম ওজি’ ছবিতে শেষ বারের মতো অভিনয় করতে দেখা গিয়েছে রেখার জামাইবাবুকে।