স্কুলের মঞ্চ থেকে রাজ্যসভা, তর্কের নেশা রক্তেই! একাধিক বিদেশি সংস্থায় চাকরি, রাঘবের শিক্ষাগত যোগ্যতা চোখধাঁধানো
বরাবরই যুব সম্প্রদায়ের কাছে জনপ্রিয়। সংসদে রাঘব চড্ঢার বাকপটুতায় মুগ্ধ ‘জেন জ়ি’র একাংশ। হিন্দি ও ইংরেজিতে তাঁর বাগ্মিতা, তাঁকে আপের অন্যতম কনিষ্ঠ মুখপাত্রে পরিণত করেছিল।
অরবিন্দ কেজরীবালের আম আদমি পার্টির সঙ্গে প্রকাশ্য সংঘাত। মতবিরোধের জেরে রাজ্যসভার উপদলনেতার পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছিল দল। ক্ষুব্ধ রাজ্যসভার সাংসদ রাঘব চড্ঢা আপের সংশ্রব ত্যাগ করে ঝুঁকেছেন বিজেপিতে। আরও দুই আপ সদস্যকে নিয়ে পদ্মশিবিরে নাম লেখানোর কথা ঘোষণা করেন সংসদের এই তরুণ তুর্কি।
১৯৮৮ সালে দিল্লিতে জন্ম রাঘবের, সেখানেই বড় হয়ে ওঠা। ২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে দক্ষিণ দিল্লি কেন্দ্র থেকে টিকিট পেলেও বিজেপি প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন রাঘব। হেরে গেলেও দলে তাঁর প্রভাব ছিল চোখে পড়ার মতো। দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনের জন্য দলের নির্বাচনী ইস্তাহারের খসড়া তৈরি থেকে শুরু করে হিন্দি ও ইংরেজিতে তাঁর বাগ্মিতা, তাঁকে আপের অন্যতম কনিষ্ঠ মুখপাত্রে পরিণত করেছিল।
লোকসভায় জিততে না পারলেও ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে, দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে রাজেন্দ্র নগর থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন রাঘব। বিজেপি প্রার্থীকে ২০ হাজারের বেশি ভোটে ধরাশায়ী করে বিধায়ক হন তিনি। এর পর ৩৩ বছরে রাজ্যসভার টিকিট পাওয়া। প্রথম সুযোগেই বাজিমাত করেছিলেন দিল্লিনিবাসী রাঘব। বর্তমানে ভারতের সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভার সদস্য হিসাবে পঞ্জাবের প্রতিনিধি তিনি।
রাঘব বরাবরই যুব সম্প্রদায়ের কাছে জনপ্রিয়। সংসদে তাঁর বাকপটুতায় মুগ্ধ ‘জেন জ়ি’র একাংশ। রাজ্যসভায় তাঁর বক্তৃতার ভিডিয়ো সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। রাঘব দেশের সর্বকনিষ্ঠ সাংসদদের মধ্যে এক জন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের উত্থানের শুরু থেকেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন রাঘব। তরুণ এই রাজনীতিবিদের বইপ্রীতিও অজানা নয় রাজনৈতিক মহলে।
সুদর্শন এই সাংসদ রাজনীতিতে আসার আগে পেশাদার চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ছিলেন। দিল্লির বিখ্যাত বারাকাম্বা রোডের মডার্ন স্কুল থেকে তাঁর প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে শিক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। সেই একই স্কুলের ছাত্র ছিলেন রাহুল গান্ধী, প্রিয়ঙ্কা গান্ধী বঢরা, এমনকি ইন্দিরা গান্ধীও। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই রাঘব সুবক্তা ও তার্কিক হিসাবে জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলেন।
আরও পড়ুন:
স্কুলশিক্ষা শেষ করার পর রাঘব ২০০৯ সালে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাণিজ্যে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০১১ সালে দেশের অন্যতম কঠিন পরীক্ষায় পাশ করার পর ইনস্টিটিউট অফ চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অফ ইন্ডিয়া থেকে চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্সির ডিগ্রি অর্জন করেন।
তার পর উচ্চশিক্ষার জন্য রাঘব পাড়ি দেন ইংল্যান্ডে। লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্সের বিজ়নেস অ্যাডমিনেষ্ট্রেশনের প্রাক্তনী রাঘব। সেখান থেকে পাবলিক পলিসির উপর একটি সার্টিফিকেশন কোর্স করেন তিনি। এর পর সেখানকার পাঠ সমাপ্ত করে দেশে ফেরেন।
২০২৫ সালের ৫ থেকে ১৩ মার্চ পর্যন্ত হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলে (এইচকেএস) গ্লোবাল লিডারশিপ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। বিশ্ব জুড়ে তরুণ এবং প্রভাবশালী নেতাদের একটি প্ল্যাটফর্ম এটি। সেখানে এক জন বিশ্বব্যাপী তরুণ নেতার মুখ হিসাবে নির্বাচিত হন রাঘব।
ভারতীয় সাংসদ হিসাবে হার্ভার্ডের মতো বিশ্বমানের মঞ্চে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেয়েছেন এই তরুণ রাজনীতিবিদ। তাঁর আর্থিক ও গাণিতিক বিশ্লেষণের অসাধারণ ক্ষমতার নেপথ্যে রয়েছে তাঁর একাধিক বিদেশি ডিগ্রি। ২০২৫ সালে তাঁকে মূল বক্তা হিসাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল সোলে অনুষ্ঠিত এশিয়ান লিডারশিপ কনফারেন্সেও।
আরও পড়ুন:
রাজনীতিতে পুরোপুরি যোগ দেওয়ার আগে তিনি বিশ্বের তাবড় কিছু অ্যাকাউন্ট্যান্সি ও অডিট ফার্মে কাজ করেছেন। ডেলয়েট, গ্র্যান্ট থর্নটনের মতো বহুজাতিক সংস্থায় আর্থিক পরামর্শদাতা ও বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেছেন রাঘব।
রাঘবের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় ২৩ বছর বয়সে। ২০১১ সালে অণ্ণা হজারের নেতৃত্বাধীন ‘ইন্ডিয়া এগেনস্ট করাপশন’ আন্দোলনে যোগদানের মাধ্যমে। তিনি ২০১২ সালে আম আদমি পার্টির (এএপি) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন।
মাত্র ২৬ বছর বয়সে তাঁকে আপের আর্থিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব চেপেছিল রাঘবের কাঁধেই। খ্যাতনামী সংস্থায় চাকরির সুবাদে আর্থিক ও আইনি অভিজ্ঞতার কারণেই আপে থাকাকালীন দলের বাজেট সংক্রান্ত বিষয়গুলি দেখাশোনা করতেন রাঘব। গুরুত্বপূর্ণ আইনি খসড়া (যেমন দিল্লি লোকপাল বিল) তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি। সেই একই অভিজ্ঞতাকে সংসদীয় কাজে ও অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণে ব্যবহার করেন রাঘব।
২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দিল্লির রাজেন্দ্র নগর নির্বাচনী এলাকা থেকে দিল্লি বিধানসভার বিধায়ক ছিলেন রাঘব। দিল্লিতে আম আদমি পার্টির সরকারের সময় রাঘব দিল্লি জল বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
পিআরএস লেজিসলেটিভ রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, বাজেট ২০২৬ অধিবেশন চলাকালে রাঘবের উপস্থিতি ছিল ৯৭ শতাংশ। তিনি সংসদে ৫৭টি বিতর্কে অংশ নিয়েছেন এবং ৩৫০টি প্রশ্ন তুলে নাস্তানাবুদ করেছেন শাসকদলকে।
রাঘবের মতো তাঁর ঘরনি পরিণীতিও উচ্চশিক্ষিত। বলিউড অভিনেত্রীর শিক্ষাগত যোগ্যতাও চোখধাঁধানো। ম্যাঞ্চেস্টার বিজ়নেস স্কুলে ব্যবসা, অর্থনীতি এবং বিনিয়োগ নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন তিনি। তিনটি বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করার পর সেখানে সঙ্গীত নিয়েও পড়াশোনা করেছিলেন নায়িকা।
২০২২ সালের লন্ডনের এক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে রাজনীতিবিদ রাঘবের সঙ্গে আলাপ হয় পরিণীতির। আধ ঘণ্টার কথোপকথনে রাঘবকে ভাল লেগে যায় অভিনেত্রীর। এক বছর গোপনে সম্পর্কে থাকার পর রাঘবকে বিয়ে করেন পরিণীতি।
২০২৩ সালের মে মাসে নয়াদিল্লির কপূরথলা হাউসে রাঘবের সঙ্গে বাগ্দান সেরে ফেলেন পরিণীতি। বাগ্দানের চার মাস পর সেপ্টেম্বরে রাজস্থানের উদয়পুরে লেক পিচোলার ধারে রাঘব এবং পরিণীতির চারহাত এক হয়। ২০২৫ সালের অক্টোবরে পুত্র নীরের জন্ম দেন অভিনেত্রী।
গত শুক্রবার দিল্লি থেকে সাংবাদিক বৈঠক করে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার কথা রাঘব নিজেই ঘোষণা করেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন রাজ্যসভায় আপের আরও দুই সাংসদ সন্দীপ পাঠক এবং অশোক মিত্তল। তাঁরাও কেজরীর হাত ছাড়েন। এর পরেই আপ ছাড়েন স্বাতী মালিওয়াল, রাজেন্দ্র গুপ্ত, বিক্রমজিৎ সাহনি, হরভজন সিংহ। রাজ্যসভায় আপের ১০ জন সাংসদ ছিলেন। তাঁদের মধ্যে সাত জনই দলবদল করেছেন।