বাবা ট্রাকচালক, ভাল ভাবে খাবার জুটত না! টাকার জন্য বিভিন্ন রাজ্যে খেপ খেলতেন আরসিবির তরুণ কোটিপতি পেসার
ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম আকর্ষণীয় দিক হল, অনেক সংগ্রাম-তপস্যা-সাধনা করে বড় টুর্নামেন্টে খেলার সুযোগ পান খেলোয়াড়েরা। বাঁ-হাতি ফাস্ট বোলার মঙ্গেশ সেই রাস্তা পেরিয়েই আইপিএলের মাঠে পৌঁছেছেন।
গত বছরের চ্যাম্পিয়ন দল ছিল তারা। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই এ বছর তাদের থেকে প্রত্যাশা আরও বেশি ছিল। তবে গত বছর যেখানে শেষ করেছিল, সেখান থেকেই নতুন আইপিএল শুরু করেছে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু। শনিবার প্রথম ম্যাচে হায়দরাবাদকে ৬ উইকেটে হারিয়ে দিয়েছে তারা।
প্রথমে ব্যাট করে হায়দরাবাদ তোলে ২০১/৯। জবাবে ৪ উইকেট হারিয়েই জয়ের রান তুলে দেয় বেঙ্গালুরু। দেবদত্ত পডিক্কল এবং বিরাট কোহলি অর্ধশতরান করেন। অধিনায়ক রজত পাটীদারের ইনিংসও ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সব মিলিয়ে শুরুটা ভালই হয়েছে কোহলিদের।
এ বছর বেঙ্গালুরু দলে এসেছেন বেঙ্কটেশ আয়ার, মঙ্গেশ যাদব, জর্ডন কক্স, ভিকি ওস্তওয়াল এবং সাত্ত্বিক দেসাই। তাঁদের নিয়ে তৃপ্ত কোচ অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার। তবে এঁদের মধ্যে বিশেষ করে নজর কেড়েছেন মঙ্গেশ।
ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম আকর্ষণীয় দিক হল, অনেক সংগ্রাম-তপস্যা-সাধনা করে বড় টুর্নামেন্টে খেলার সুযোগ পান খেলোয়াড়েরা। বাঁ-হাতি ফাস্ট বোলার মঙ্গেশও সেই রাস্তা পেরিয়েই আইপিএলের মাঠে পৌঁছেছেন।
তবে গরিব পরিবারের সন্তান মঙ্গেশ তাঁর পরিস্থিতিকে দুর্বলতা নয়, বরং শক্তিতে পরিণত করেছেন। আইপিএলের মিনি-নিলামে মঙ্গেশকে ৫.২ কোটি টাকায় কিনেছিল আরসিবি। কিন্তু তা কেবল মঙ্গেশের জয় ছিল না। বরং তা এক বাবারও জয় ছিল, যিনি তাঁর ছেলের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন ট্রাক চালিয়ে।
আরও পড়ুন:
মধ্যপ্রদেশের বাসিন্দা মঙ্গেশ বড় হয়েছেন অনেক সংগ্রাম করে, অভাব-অনটনের মধ্যে। তাঁর বাবা রামঅবধ যাদব পেশায় ট্রাকচালক। ট্রাক চালিয়ে পরিবারের ভরণপোষণ করতেন তিনি। তার জন্য রোজ ভোর ৩টেয় ঘুম থেকে উঠতে হত রামঅবধকে। বিপজ্জনক রাস্তায় বেরিয়ে পড়তেন ট্রাক নিয়ে। দীর্ঘ রাস্তা অতিক্রম করার কারণে অনেক সময় বাড়ি ফেরার সময়ের নিশ্চয়তা থাকত না তাঁর।
ছেলের ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্নকে সমর্থন করতে গিয়ে রামঅবধকে অনেক প্রতিকূলতা সহ্য করতে হয়েছে। আইপিএলে মঙ্গেশের সাফল্যের আগে পর্যন্ত মধ্যপ্রদেশের ছিন্দওয়াড়া শহর থেকে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার দূরে বরগাঁওয়ের একটি ভাড়াবাড়িতে থাকতেন তাঁরা।
বছরের পর বছর ধরে পরিবারের আর্থিক অবস্থা খারাপ থাকার কারণে পুত্র মঙ্গেশের ক্রিকেট কোচিং, সরঞ্জাম এবং যাতায়াতের খরচ মেটাতে রামঅবধকে ঋণ অবধি নিতে হয়েছিল। এক জন ট্রাকচালক হিসাবে রামঅবধের জীবন ছিল অত্যন্ত কঠিন। জীবনে ছিল অবিরাম চাপ, অক্লান্ত পরিশ্রম। ছেলের ক্রিকেট কোচিং এবং অন্যান্য খরচের জন্য কী ভাবে টাকা জোগাড় করবেন, সেই দুশ্চিন্তায় প্রায়ই বিনিদ্র রাত কাটাতেন তিনি।
সম্প্রতি ‘আরসিবি বোল্ড ডায়েরিজ়’ অনুষ্ঠানে রামঅবধ বলেন, ‘‘টাকার জন্য আমায় অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। মাঝেমাঝে রাতে ঘুম আসত না। শুধু ভাবতাম ছেলের জন্য কী ভাবে টাকা জোগাড় করব। এক জন ট্রাক ড্রাইভারের জীবন আসলে কোনও জীবনই নয়। খাওয়ার বা স্নান করারও সময় পাওয়া যায় না। ট্রাক ভর্তি থাকলে মাল নামানোর চিন্তা করতে হয়, আর খালি হলে আবার তা ভর্তি করার চিন্তা করতে হয়।”
আরও পড়ুন:
বাবার মতো মঙ্গেশের লড়াইও কম ছিল না। পেশাদার ক্রিকেটে প্রবেশের আগে টেনিস-বল টুর্নামেন্ট খেলতেন তিনি। এর জন্য মঙ্গেশ প্রায়শই ট্রেনের অসংরক্ষিত কামরা এবং সরকারি বাসে চেপে উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ এবং ছত্তীসগঢ়ের বিভিন্ন প্রান্তে খেলতে যেতেন। সামান্য অর্থও উপার্জন করতেন সেখান থেকে। তাঁর কাছে অর্থ উপার্জনের চেয়েও বড় অর্জন ছিল, বাবার কাছে টাকার জন্য হাত না পাতা।
১৬ বছর বয়সেই পেশাদার ক্রিকেটে প্রবেশ করেন মঙ্গেশ। স্থানীয় টুর্নামেন্টে অসাধারণ নৈপুণ্য দেখানোর পর পরিবারের এক পরিচিত তাঁকে নয়ডায় নিয়ে যান। সেখানে ওয়ান্ডার ক্রিকেট ক্লাবের কোচ ফুলচাঁদ শর্মা মঙ্গেশের প্রতিভা চিনতে পারেন। তিন বছরের জন্য মঙ্গেশের হস্টেলের ফি মকুব করে দেওয়া হয়। মঙ্গেশ স্বীকার করেছেন, কোচ ফুলচাঁদের সমর্থন ছাড়া তিনি হয়তো কখনওই পেশাদার ক্রিকেটে প্রবেশ করতে পারতেন না।
মঙ্গেশের কথায়, ‘‘আজ আমি যদি ক্রিকেট খেলতে পারি, তবে তা ফুলচাঁদ স্যরের কারণেই। আমি যখন দিল্লি যাই, বাবা অনেক কষ্টে আমায় ২৪,০০০ টাকা দিয়েছিলেন। আমি জানি না প্রথম মাসেই সেই টাকা কী ভাবে শেষ হয়ে গিয়েছিল।’’
অন্য দিকে মঙ্গেশের কোচ ফুলচাঁদ সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, ‘‘মঙ্গেশ দিল্লিতে এক জনের সঙ্গে থাকছিল। আমি দেখলাম ও ভাল বোলার। কিন্তু ওর কাছে খাওয়ার মতো টাকাও ছিল না। আমি ওকে হস্টেলে এসে থাকতে বললাম। ওখান থেকেই ওর আসল যাত্রা শুরু হয়। কারও টাকা আছে কী নেই, তাতে আমার কিছু যায়-আসে না। খেলোয়াড় যদি ভাল হয়, তা হলে সে আসতে পারে, খেতে পারে, থাকতে পারে এবং অনুশীলন করতে পারে।’’
২০২৫ সালের মধ্যপ্রদেশ টি-টোয়েন্টি লিগে মঙ্গেশের উত্থান। সেখানে তিনি গ্বালিয়র চিতাসের হয়ে ৬ ম্যাচে ১৪টি উইকেট নেন। টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ও নির্বাচিত হন। মঙ্গেশের চিত্তাকর্ষক পারফরম্যান্সের কারণে তিনি মুম্বই ইন্ডিয়ান্স, দিল্লি ক্যাপিটালস, রাজস্থান রয়্যালস এবং রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু-সহ বেশ কয়েকটি আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজ়ির ট্রায়ালে আমন্ত্রণ পান।
এর পরে মধ্যপ্রদেশের সিনিয়র দলে জায়গা করে নেন মঙ্গেশ। ২০২৫-২৬ সালের সৈয়দ মুশতাক আলি ট্রফিতে অভিষেক হয় তাঁর। সেখানে তিনি দু’ম্যাচে তিনটি উইকেট নেন এবং পঞ্জাবের বিপক্ষে ১২ বলে ২৮ রান করে তাঁর ব্যাটিং প্রতিভারও প্রদর্শন করেন।
আইপিএল ট্রায়ালে মঙ্গেশ যাদবের বোলিংয়ের ক্ষমতা পরীক্ষা করেন দীনেশ কার্তিক। তাঁকে নতুন বল থেকে শুরু করে ডেথ ওভার পর্যন্ত ম্যাচের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বোলিং করতে দেন। মঙ্গেশ বলেন, ‘‘ট্রায়ালের সময় দীনেশ স্যর আমার কাছে এসে বললেন, ‘তুমি ভাল বোলিং করছ। এ বার এই বলটা করে দেখাও।’ তিনি আমায় বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বোলিং করিয়েছিলেন। নতুন বলে, পঞ্চম ওভারে, দশম ওভারে, চতুর্দশ ওভারে, এমনকি অষ্টাদশ ও বিংশতম ওভারেও। ওই পর্যায়ের এক জন খেলোয়াড় কী ভাবে চিন্তা করেন, তা বোঝাটা আমার জন্য বেশ আশ্চর্যজনক ছিল।’’
এত কিছুর পর আইপিএলে সুযোগ পেয়েছেন মঙ্গেশ। তা-ও আবার বিরাট কোহলির দল বেঙ্গালুরুতে। মঙ্গেশের আইপিএল চুক্তি তাঁর পরিবারের জীবনও বদলে দিয়েছে। বাবা রামঅবধের বছরের পর বছরের আত্মত্যাগের যথার্থ সম্মান দিয়েছেন তিনি।
মঙ্গেশের সাফল্য তাঁর পরিবারে গর্ব এবং মর্যাদাও এনে দিয়েছে। মঙ্গেশের আইপিএল চুক্তি প্রসঙ্গে তাঁর বাবা বলেন, ‘‘আমি কখনও ভাবিনি এক জন ট্রাক ড্রাইভার এত সম্মান পেতে পারে। ছেলের কাছে যা চেয়েছি, মঙ্গেশ আমার জন্য তার চেয়েও বেশি করেছে।’’
মঙ্গেশ আইপিএলে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পর আর্থিক স্বস্তি ফিরেছে তাঁর পরিবারের জীবনে। যদিও বেঙ্গালুরুর শনিবারের ম্যাচ খেলেননি মঙ্গেশ। তবে আইপিএলে খুব শীঘ্রই তাঁর অভিষেক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।