ইচ্ছা করেই যুদ্ধে ‘হারলেন’ ট্রাম্প! ‘ম্যাডম্যান থিয়োরি’ সামনে এনে ষড়যন্ত্রতত্ত্বের আভাস দিলেন চিনা নস্ত্রাদামুস
প্রেডিক্টিভ হিস্ট্রির উপস্থাপক অধ্যাপক জুয়েকিন জিয়াঙের মতে এই তত্ত্বটি মূলত ট্রাম্পের কূটনীতি এবং তাঁর অপ্রত্যাশিত আচরণের একটি চুলচেরা বিশ্লেষণ। ট্রাম্পের কৌশলের প্রধান অংশ ছিল ইরানকে সব সময় উদ্বেগের মধ্যে রাখা। জিয়াঙের মতে, নিজের ও আমেরিকার দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের কথা ভেবে ট্রাম্প এই নীতিটি বেছে নিয়েছেন।
জেনেবুঝেই ‘পরাজয়’ স্বীকার করেছেন। যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে ইরানের কাছে নতিস্বীকারের ভান করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দিন ছ’য়েক আগে পশ্চিম এশিয়ায় চলমান যুদ্ধের আবহে নতুন এক ষড়যন্ত্রতত্ত্বের কথা উঠে এসেছে। এই তত্ত্ব যাঁর মস্তিষ্কপ্রসূত তিনি এর আগেও বেশ কয়েকটি ভবিষ্যদ্বাণী করে হইচই ফেলে দিয়েছেন।
তিনি ‘চিনা নস্ত্রাদামুস’। প্রেডিক্টিভ হিস্ট্রির উপস্থাপক অধ্যাপক জুয়েকিন জিয়াং। তিনি তাঁর ইউটিউবে নতুন একটি ভিডিয়োয় দাবি করেছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প ইচ্ছাকৃত ভাবেই আমেরিকা ও ইরানের যুদ্ধে নতিস্বীকার করতে চান। ইরানের উপর চরম আঘাত নেমে আসতে পারে এমন হুঁশিয়ারি দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সংঘর্ষবিরতির কথা ঘোষণা করেন ট্রাম্প। একে আপাতদৃষ্টিতে লড়াইয়ে সমঝোতা বা পিছু হটার বার্তা বলে মনে হতে পারে।
জিয়াঙের এই তত্ত্বটি মূলত ট্রাম্পের কূটনীতি এবং তাঁর ‘অপ্রত্যাশিত’ আচরণের একটি চুলচেরা বিশ্লেষণ। কারণ সরাসরি যুদ্ধে হেরে যাওয়ার পরিকল্পনা করা আমেরিকার মতো সুপারপাওয়ার দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের জন্য অত্যন্ত অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তির ইচ্ছাকৃত ভাবে হেরে যাওয়া মানে বিশ্বমঞ্চে নিজের প্রভাব চিরতরে হারানো। কোনও মার্কিন প্রেসিডেন্টই চাইবেন না তাঁর আমলে আমেরিকার আধিপত্য ক্ষুণ্ণ হোক।
কিন্তু ট্রাম্প সেটাই করতে পারেন। জিয়াঙের মতে, নিজের ও আমেরিকার দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের কথা ভেবে ট্রাম্প এই নীতিটি বেছে নিয়েছেন। অধ্যাপক জিয়াং বা তাঁর মতো গবেষকদের দ্বারা আলোচিত এই তত্ত্বটি বেশ চমকপ্রদ এবং প্রচলিত আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছকে ফেলা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বহু আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক।
জিয়াং তাঁর ভিডিয়োয় এই ষড়যন্ত্রতত্ত্বের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জানিয়েছেন, কী ভাবে ট্রাম্প পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত, বিশেষ করে জ্বালানি পরিকাঠামো এবং সরবরাহ শৃঙ্খলকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আমেরিকার মাটি শক্ত করার জন্য ইরানের হাতে সন্ধিপ্রস্তাব তুলে দিয়েছেন। ‘চিনা নস্ত্রাদামুস’-এর মতে এই পরিকল্পনা একেবারেই আকস্মিক নয়, বরং গোটাটাই ঠান্ডা মাথার পরিকল্পনা।
আরও পড়ুন:
ট্রাম্পের বিদেশনীতির ক্ষেত্রে প্রায়শই ‘ম্যাডম্যান থিয়োরি’ ব্যবহারের কথা উল্লেখ করা হয়। এই তত্ত্বটির মূল ধারণা হল, প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রকে এটা বিশ্বাস করানো যে, দেশটির নেতা এতটাই খামখেয়ালি, অস্থির বা আক্রমণাত্মক যে তিনি যে কোনও সময় চরম কোনও পদক্ষেপ (যেমন যুদ্ধ বা পারমাণবিক আক্রমণ) করতে দু’বার ভাববেন না।
ট্রাম্পের কৌশলের প্রধান অংশ ছিল ইরানকে সব সময় উদ্বেগের মধ্যে রাখা। তিনি এক দিকে যেমন আলোচনার কথা বলতেন, অন্য দিকে সমাজমাধ্যমে সরাসরি যুদ্ধের হুমকি দিতেন। এই অপ্রত্যাশিত আচরণ ইরানকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধায় ফেলে দিয়েছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এ-হেন পরিকল্পনাকে তারিফ না করে পারেননি জিয়াং। ট্রাম্পকে ক্ষুরধার মস্তিষ্কের অধিকারী বলে আখ্যা দিয়েছেন তিনি।
ইরান হরমুজ়ে অবরোধ করার ফলে পশ্চিম এশিয়া থেকে ২০ শতাংশ তেলের আমদানির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ, এমনকি আমেরিকাতেও জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। হরমুজ়ের মতো সঙ্কীর্ণ জলপথের দখল নিয়ে গোটা বিশ্বকে নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছে মোজ়তবা খামেনেই সরকার। শুধু জ্বালানি নয়, গুরুত্বপূর্ণ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ায় রাসায়নিক সরবরাহের ক্ষেত্রেও বাধা তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে।
ইরানে আমেরিকা স্থলযুদ্ধ শুরু করলে তা শুধু পশ্চিম এশিয়ার তেলের বাজারের জন্যই বিপর্যয় ডেকে আনত না। সমীক্ষক সংস্থা জেপি মরগ্যান আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল, যুদ্ধ আর কয়েক দিন গড়ালে এপ্রিলের শেষে প্রায় গোটা বিশ্ব জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার মতো চরম সঙ্কটের মুখোমুখি হত। পেট্রল, ডিজ়েলের পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়া থেকে সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা বেড়েছে অ্যামোনিয়া, ফসফেট, হিলিয়াম, সালফারের মতো রাসায়নিক উপাদানের ক্ষেত্রেও।
আরও পড়ুন:
পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারের সার সরবরাহ শৃঙ্খল বিপুল চাপের মধ্যে। ইউরিয়া ও ডাইঅ্যামোনিয়াম ফসফেট আমদানির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পশ্চিম এশিয়া থেকেই হয়ে থাকে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠতে পারত। বিশ্ব জুড়ে সারের ঘাটতি ও দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সারের আমদানি-রফতানি শৃঙ্খল ভেঙে পড়লে খাদ্যসঙ্কটের মুখে পড়়ার আশঙ্কা তৈরি হত আগামী দিনে। সে আশঙ্কা এখনও বজায় থাকলেও যুদ্ধবিরতিতে কিছুটা কমেছে।
জিয়াংয়ের মতে, ট্রাম্পের কাছে আমেরিকার বৈশ্বিক আধিপত্য রক্ষা করার চেয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তোলাই এই পরিকল্পনার নেপথ্যকারণ। চিনা অধ্যাপক মনে করছেন, যদি যুদ্ধে জেতার খরচ (টাকা, জনবল, রাজনৈতিক ভাবমূর্তি) যুদ্ধের ফলাফলের চেয়ে বেশি হয়, তবে হেরে যাওয়া বা সংঘাত দীর্ঘায়িত করা বেশি লাভজনক হতে পারে। সমরকুশলীদের ভাষায় একে বলা হয় ‘স্ট্র্যাটেজিক রিট্রিট’ বা পরিকল্পিত ভাবে পিছিয়ে আসা। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করা এবং নিজের সম্পদ বাঁচিয়ে রাখাই এখানে ট্রাম্পের মূল উদ্দেশ্য।
যখন বিশ্ববাজারে টালমাটাল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তখন দেশগুলো বৈশ্বিক বাজারের দিকে না তাকিয়ে স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টা করে। আমেরিকার মতো সম্পদশালী দেশের জন্য তা সুবিধাজনক, কারণ তাদের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বেশি। এই সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছেন টাম্প। আমেরিকার হাতেও যথেষ্ট তেলসম্পদ রয়েছে। সম্প্রতি ভেনেজ়ুয়েলার নিয়ন্ত্রণ হাতে নেওয়ার পর বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলভান্ডারও কুক্ষিগত হয়েছে ওয়াশিংটনের। বাকি শুধু কানাডা।
উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার তেলসম্পদ ইউরোপ, পূর্ব এশিয়ায় বেচে চড়া মুনাফা কামাতে চান প্রেসিডেন্ট অফ আমেরিকা। এমনটাই উঠে এসেছে জিয়াঙের তত্ত্বে। কারণ ব্যবসায়ী ট্রাম্প ভাল মতোই জানেন ইউরোপ বা এশিয়ার দেশগুলি, যারা উপসাগরীয় দেশের তেলের ওপর নির্ভরশীল, তারা সঙ্কটে পড়লে বিকল্প খুঁজবে। জ্বালানি তেলের সরবরাহ শৃঙ্খলের অভিমুখ আমেরিকার দিকে ঘোরানোর জন্য হেরে যাওয়ার অভিনয় করতে বিন্দুমাত্র চিন্তিত হবেন না ট্রাম্প।
জিয়াঙের ধারণা, পশ্চিম এশিয়ায় চলমান বিশৃঙ্খলা আসলে বাণিজ্যিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু পরিবর্তনের একটি হাতিয়ার মাত্র। তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে মার্কিন ট্রেজ়ারি বন্ডও চাঙ্গা। ইউরোপ-সহ এশিয়ার একাধিক দেশ সোনা বা স্থানীয় বন্ডে বিনিয়োগ ছেড়ে ডলারে বিনিয়োগ শুরু করেছে। এই তালিকায় সবচেয়ে উপরে রয়েছে জাপান। তার পরই রয়েছে ব্রিটেন। তৃতীয় স্থানে চিন। ফলে শক্তিশালী হচ্ছে ডলার। কোষাগার ভরছে ওয়াশিংটনের।
জিয়াঙের তত্ত্ব বলছে যুদ্ধে ‘হেরে’ গিয়ে বা পিছু হটে আমেরিকা যদি তার বৈশ্বিক দায়বদ্ধতা কমিয়ে আনে, তবে ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক মুনাফার বিশাল অর্থ তারা নিজেদের অভ্যন্তরীণ পরিকাঠামোয় বিনিয়োগ করতে পারে। এতে ট্রাম্প হয়তো বৈশ্বিক নেতা হিসাবে কিছুটা মর্যাদা হারাবেন, কিন্তু অর্থনৈতিক ভাবে আরও শক্তিশালী হবে আমেরিকা।
জিয়াংয়ের তত্ত্ব অনুযায়ী, এটি ট্রাম্পের কোনও দুর্বলতা নয়। এটি ছিল ইরানকে মিথ্যা নিরাপত্তার বোধ দেওয়া। এর মাধ্যমে তিনি ইরানকে আলোচনার টেবিলে দুর্বল অবস্থায় আনতে চেয়েছিলেন। এই তত্ত্বের মূল ভিত্তি হল ট্রাম্পের মতো নেতা যদি মনে করেন যে যুদ্ধে জেতার চেয়ে ‘পরাজিত’ হওয়া বা সংঘাত এড়িয়ে যাওয়া তাঁর রাজনৈতিক লক্ষ্যের জন্য বেশি কার্যকর, তবে তিনি সেই পথই বেছে নেবেন।
পশ্চিম এশিয়ায় চলমান যুদ্ধের আবহে জিয়াঙের সেই অনলাইন বক্তৃতাটি সমাজমাধ্যমে নতুন করে নজর কেড়েছে। আগের দু’টি বক্তব্য নির্ভুল ভাবে মিলে যাওয়ায় সমাজমাধ্যমে অনেকেই তাঁকে ‘চিনের নস্ত্রাদামুস’ বলে ডাকতে শুরু করেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট সম্পর্কে চিনা অধ্যাপক তিনটি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। তার মধ্যে দু’টি ইতিমধ্যেই সত্যি বলে প্রমাণিত হয়েছে।
জিয়াং তাঁর তৃতীয় ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে পূর্বাভাসটি দু’বছর আগে জানিয়ে রেখেছেন সেটি হল, এই যুদ্ধে আমেরিকার পরাজয় ঘটবে! তুলনামূলক কম শক্তিধর রাষ্ট্রের কাছে মাথা নোয়াতে হতে পারে মার্কিন ফৌজকে, এমনটাই দাবি করেছিলেন জিয়াং। সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই অধ্যাপক জিয়াঙের সাহসী ভবিষ্যদ্বাণীগুলি বিশ্ব জুড়ে কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।