দুষ্টু ছবির দুনিয়ার বেতাজ বাদশা, ৪৪ হাজার কোটির সম্পত্তি! ৪৩ বছরে মৃত কন্টেন্ট প্ল্যাটফর্ম অনলিফ্যানসের মালিক
ইউক্রেনের বন্দর শহর ওডেসায় এক ইহুদি পরিবারে রাডভিনস্কির জন্ম। শৈশবেই পরিবারের সঙ্গে আমেরিকার শিকাগোয় চলে যান তিনি। পড়াশোনা, বড় হয়ে ওঠা আমেরিকাতেই।
মাত্র ৪৩ বছর বয়সে মৃত্যু হল ব্রিটেন-ভিত্তিক পর্ন কন্টেন্ট প্ল্যাটফর্ম অনলিফ্যানসের মালিক লিয়োনিড রাডভিনস্কির। দীর্ঘ দিন ধরে ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন তিনি। সোমবার মৃত্যু হয়েছে তাঁর।
লন্ডন-ভিত্তিক অনলাইন পর্নোগ্রাফি প্ল্যাটফর্মটি একটি ইমেল বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘‘আমরা অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে লিয়ো রাডভিনস্কির মৃত্যুর খবর জানাচ্ছি। ক্যানসারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর শান্তিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি। এই কঠিন সময়ে তাঁর পরিবার গোপনীয়তা রক্ষার অনুরোধ জানিয়েছে।’’
ইউক্রেনের বন্দর শহর ওডেসায় এক ইহুদি পরিবারে রাডভিনস্কির জন্ম। শৈশবেই পরিবারের সঙ্গে আমেরিকার শিকাগোয় চলে যান তিনি। পড়াশোনা, বড় হয়ে ওঠা আমেরিকাতেই।
২০০২ সালে নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন রাডভিনস্কি। বিয়ে করেছিলেন কেটি চাডনোভস্কিকে। চার সন্তান রয়েছে দম্পতির। পরিবার নিয়ে ফ্লোরিডায় বসবাস করতেন তিনি।
২০১৮ সালে অনলিফ্যানসের মূল সংস্থা ফিনিক্স ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড কিনেছিলেন রাডভিনস্কি। ইউক্রেনের ওডেসা থেকে শুরু করে আমেরিকার শিকাগো হয়ে ফ্লোরিডা— অনলিফ্যানসের মালিক রাডভিনস্কির যাত্রাপথ ছিল দেখার মতো।
আরও পড়ুন:
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তৈরি প্ল্যাটফর্মটিকে একটি শত কোটি ডলারের ব্যবসায় পরিণত করেছিলেন রাডভিনস্কি। ২০০৯ সালে একটি বিনিয়োগ সংস্থাও তৈরি করেছিলেন তিনি, যা বিভিন্ন প্রযুক্তি সংস্থায় বিনিয়োগ করত।
অনলিফ্যানসের যাত্রা শুরু ব্রিটিশ পিতা-পুত্র গাই এবং টিম স্টোকলির হাত ধরে। ২০১৬ সালে ওয়েবসাইটটি তৈরি করেছিলেন উদ্যোক্তা জুটি। কিন্তু ওয়েবসাইটটিকে লাভজনক সংস্থায় পরিণত করতে ব্যর্থ হন গাই এবং টিম।
রাডভিনস্কি ২০১৮ সালে অনলিফ্যানসের মূল সংস্থার সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ার পিতা-পুত্রের থেকে কিনে নেন। মালিকানা হাতে পেয়েই পর্ন কন্টেন্ট প্ল্যাটফর্মের খোলনলচে বদলে দেন রাডভিনস্কি। ব্যাবসায়িক মডেলেও পরিবর্তন আনেন। রাডভিনস্কিই সংস্থাটিকে দাঁড় করান এবং অনলিফ্যানসকে পৃথিবীর অন্যতম লাভজনক সংস্থায় পরিবর্তন করেন।
বর্তমানে অনলিফ্যানস অনলাইন পর্নোগ্রাফি শিল্পের শীর্ষস্থানে রয়েছে। বিষয়স্রষ্টাদের (কন্টেন্ট ক্রিয়েটর) সাবস্ক্রিপশনের মাধ্যমে তাঁদের কন্টেন্টের জন্য সরাসরি মূল্য ধার্য করার সুযোগ দেওয়ার কারণেই এটি সম্ভব হয়েছে। বিনিময়ে বিক্রি এবং ‘সাবস্ক্রিপশন ফি’র উপর ২০ শতাংশ কমিশন নেয় সংস্থাটি।
আরও পড়ুন:
সংবাদসংস্থা রয়টার্সের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে দুষ্টু ওয়েসাইটটিতে ৩০ কোটিরও বেশি ব্যবহারকারী রয়েছেন এবং এটির আয় ১০০ কোটি ডলারের বেশি।
২০২৫ সালের আর্থিক এবং বিপণন সংস্থা বারচার্টের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, রাজস্ব-দক্ষতার দিক থেকে প্রযুক্তি সংস্থা এনভিডিয়া, অ্যাপ্ল এবং মেটাকে টেক্কা দিয়েছে প্রাপ্তবয়স্কদের ওয়েবসাইট অনলিফ্যান্স! ব্রিটেন-ভিত্তিক এই ওয়েবসাইটই নাকি এখন বিশ্বের সবচেয়ে রাজস্ব-দক্ষ (রেভেনিউ-এফিশিয়েন্ট) সংস্থা। রাজস্ব-দক্ষ বলতে বোঝায়, একটি সংস্থা কতটা কার্যকর ভাবে টাকা, সময়, শ্রম বা অন্য ব্যবহৃত সম্পদের সাপেক্ষে বেশি আয় করে।
সেই রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের বিষয়় (কন্টেন্ট) তৈরির সংস্থায় কাজ করেন ৫০ জনেরও কম কর্মী। কর্মীপ্রতি তিন কোটি ৭৬ লক্ষ ডলার আয় করে দুষ্টু তারকাদের প্ল্যাটফর্মটি, যা এনভিডিয়া, অ্যাপল় এবং মেটার মতো প্রথম সারির প্রযুক্তি সংস্থাকে বিশাল ব্যবধানে পিছনে ফেলে দিয়েছে। লক্ষ লক্ষ স্বাধীন বিষয়স্রষ্টা (কন্টেন্ট ক্রিয়েটর) অনলিফ্যানসে প্রতিনিয়ত ছবি এবং ভিডিয়ো আপলোড করেন।
রাডভিনস্কির মৃত্যুর পর এখন অনলিফ্যানসের ভবিষ্যৎ এবং এর মালিকানা কার কাছে যাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সাল থেকে অনলিফ্যানসের মূল সংস্থা ফিনিক্সে রাডভিনস্কির অংশীদারি এলআর ফিনিক্স ট্রাস্টের হাতে রয়েছে।
তবে জানুয়ারিতে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, সান ফ্রান্সিসকো-ভিত্তিক বিনিয়োগ সংস্থা আর্কিটেক্ট ক্যাপিটালের কাছে তাদের ৬০ শতাংশ শেয়ার বিক্রির বিষয়টি খতিয়ে দেখছে অনলিফ্যানস। সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ওই চুক্তি হলে ওয়েবসাইটটির সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ৫৫০ কোটি ডলার হতে পারে।
রাডভিনস্কির মৃত্যুর পর আলোচনা শুরু হয়েছে, তাঁর মোট সম্পত্তির পরিমাণ নিয়েও। কোভিড অতিমারির সময় অনলিফ্যানসের জনপ্রিয়তা তুমুল বৃদ্ধি পেয়েছিল। সেই সঙ্গে বৃদ্ধি পায় রাডভিনস্কির সম্পত্তির পরিমাণও।
২০২১ সালে ফোর্বসের শতকোটিপতিদের তালিকায় প্রবেশ করেন রাডভিনস্কি। সে বছর দুষ্টু প্ল্যাটফর্ম থেকে লভ্যাংশ হিসাবে প্রায় ১৮০ কোটি ডলার আয় করেছিলেন তিনি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মৃত্যুর সময় রাডভিনস্কির মোট সম্পত্তির পরিমাণ ৪৭০ কোটি ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৪৪ হাজার ১০০ কোটি টাকা)।
আলোচনার আলোকবৃত্তে কোনও দিনই থাকতে পছন্দ করতেন না রাডভিনস্কি। একান্তেই জীবনযাপন করতেন। খুব কমই জনসমক্ষে সাক্ষাৎকার এবং বিবৃতি দিতেন। বিশ্বব্যাপী বেশ কয়েকটি জনহিতকর প্রকল্পের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি।
রাডভিনস্কির ওয়েবসাইট অনুযায়ী, রাডভিনস্কি মেমোরিয়াল স্লোন কেটারিং ক্যানসার সেন্টার এবং ওয়েস্ট সাবার্বান হিউম্যান সোসাইটি-সহ বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত অনুদান দিতেন তিনি। যুক্ত ছিলেন আরও বেশ কয়েকটি সামাজিক প্রকল্পের সঙ্গে।