‘আমরা ভারত নই যে এক ইশারায় তেল পেয়ে যাব’, ভাঁড়ার ফুরোতে থাকায় উদ্বিগ্ন পাকিস্তানের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী
ইরান-মার্কিন সংঘাতকে কেন্দ্র করে চলতে থাকা ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে পাকিস্তানের জ্বালানি মজুত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পাক পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী আলি পরভেজ় মালিক।
ইরান এবং আমেরিকার মধ্যে শান্তিচুক্তি করিয়ে নিজেদের ‘শান্তির দূত’ প্রমাণ করতে মরিয়া পাকিস্তান। দু’পক্ষের সঙ্গেই নিরন্তর আলোচনা চালাচ্ছে তারা। এর মধ্যেই প্রকাশ্যে ভারতের প্রতিবেশী দেশটির হাঁড়ির হাল। আর সেই হাল প্রকাশ্যে এনেছেন খোদ সে দেশের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী।
ইরান-মার্কিন সংঘাতকে কেন্দ্র করে চলতে থাকা ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে পাকিস্তানের জ্বালানি মজুত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পাক পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী আলি পরভেজ় মালিক।
পাক টেলিভিশন চ্যানেল সামা টিভির ‘নাদিম মালিক লাইভ’ অনুষ্ঠানে কথা বলার সময় দেশের নাগরিকদের সতর্ক করে পরভেজ় জানিয়েছেন, পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের কোনও শেষ দেখতে পাচ্ছেন না তিনি এবং এটি আন্তর্জাতিক জ্বালানির বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
ওই অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের সীমিত কৌশলগত মজুত এবং জরুরি জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার উপর আলোকপাত করেন পাক পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী। উদ্বেগও প্রকাশ করেন ইসলামাবাদের হাতে থাকা অবশিষ্ট তেল নিয়ে।
সাক্ষাৎকার চলাকালীন পাকিস্তানের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী জানিয়েছেন, পাকিস্তানে বর্তমানে মাত্র ৫ থেকে ৭ দিনের অপরিশোধিত তেল মজুত রয়েছে। অন্য দিকে, দেশের এক দিনের চাহিদা মেটাতে পারে, এমন পরিমাণ পেট্রলও মজুত নেই। পুরো বিষয়টি দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে বলেও দাবি করেছেন পরভেজ়।
আরও পড়ুন:
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পরভেজ়। পাক পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী উল্লেখ করেছেন, দুবাইয়ের অপরিশোধিত তেলের দাম যে পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে, তা আন্তর্জাতিক বাজারে চরম অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
পাকিস্তানের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রীর মতে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের জ্বালানি মজুত করার ক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি প্রস্তুতি উন্নত করার প্রয়োজনীয়তার দিকে নজর দেওয়া উচিত ইসলামাবাদের। তাঁর কথায়, ‘‘আন্তর্জাতিক বাজারে ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও ইসলামাবাদকে অবশ্যই তার জ্বালানি প্রস্তুতি পুনর্গঠন করতে হবে।’’
যদিও পাকিস্তানের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রীর আশ্বাস, জনগণের দুর্ভোগ কমাতে চেষ্টা করছে সরকার এবং যেখানে সম্ভব ভর্তুকি দেওয়ার চেষ্টা করেছে। ইরান-মার্কিন সংঘাতকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাপী অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি সত্ত্বেও পেট্রলের জোগান নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ় শরিফ বর্তমান পরিস্থিতির দিকে কড়া নজর রাখছেন বলেও দাবি পরভেজ়ের।
জ্বালানি মজুত বিষয়ে পাকিস্তানের বেহাল দশা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ভারতের প্রসঙ্গও শোনা গিয়েছে পাক পেট্রোলিয়াম মন্ত্রীর মুখে। পরভেজ় বলেন, “আমাদের কোনও তেলের মজুত নেই। আমরা বাণিজ্যিক মজুতের উপর নির্ভর করে চলি। আমরা ভারতের মতো নই, যারা এক ইশারা বা স্বাক্ষরেই ৬০-৭০ দিনের তেলের মজুত পেয়ে যেতে পারে।”
আরও পড়ুন:
এক জন সাংবাদিক পাকিস্তানের কৌশলগত তেলের মজুত আছে কি না জানতে চাইলে পরভেজ় স্পষ্ট করেছেন, ইসালামাবাদের হাতে একেবারেই এ রকম কোনও তেলের মজুত নেই।
দেশের অর্থনীতি এবং পরিবহণ ব্যবস্থায় পেট্রল-ডিজ়েলের গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে পরভেজ় এ-ও জানিয়েছেন, পাকিস্তানের জ্বালানি নিরাপত্তা উন্নত করার জন্য প্রধানমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার ফলস্বরূপ একটি ৩০ দিনের অপরিশোধিত তেল কর্মসূচি প্রস্তুত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
২০০২ সাল থেকে ডিজ়েলের মূল্য নির্ধারণ কোন উপায়ে হয় সে কথা উল্লেখ করে ওই প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্নও তুলেছেন পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী পরভেজ়। তিনি যুক্তি দিয়েছেন, যদি বিশ্বব্যাপী ডিজ়েলের দাম ১০০ ডলারে নির্ধারণ করা হয়, তবে ন্যায্যতা এবং দক্ষতার জন্য স্থানীয় মূল্য নির্ধারণ এবং শোধনাগারের উৎপাদনও পর্যালোচনা করা উচিত।
পরভেজ়ের দাবি, পাকিস্তানের বর্তমান সরকার দেশের জ্বালানি সংক্রান্ত পুরনো আর কোনও ব্যবস্থা চালু রাখতে চায় না। পাকিস্তানের তেল শোধনাগারগুলিকে আধুনিকীকরণ এবং নিয়ন্ত্রণমুক্তিকরণের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার উপরও জোর দিয়েছেন তিনি।
পাকিস্তানের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী এ-ও জানিয়েছেন, পাকিস্তান ন্যূনতম কৌশলগত মজুতের ওপর নির্ভর না করে বাণিজ্যিক তেল মজুতের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তাঁর মতে, সমস্ত গবেষণা ও নীতিগত কাঠামো প্রস্তুত রয়েছে এবং সরকার এখন দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি স্থিতিশীলতা শক্তিশালী করার দিকে মন দিয়েছে। জ্বালানির মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থায় সাম্প্রতিক পরিবর্তনগুলি কোনও বাহ্যিক চাপের কারণে হয়নি বলেও জানিয়েছেন তিনি।
তেলের মজুত নিয়ে কথা বলার সময় দেশের করনীতি নিয়েও কথা বলেছেন পরভেজ়। পরামর্শ দিয়েছেন, ব্যাপক পরোক্ষ কাঠামোর পরিবর্তে ভোগের পরিমাণের উপর ভিত্তি করে কর আদায় করা উচিত। তাঁর যুক্তি, পরোক্ষ কর মুদ্রাস্ফীতির জন্য দায়ী এবং তা কমানো উচিত।
পেট্রোলিয়াম মন্ত্রীর ওই সাক্ষাৎকারের পর দেশের জ্বালানি মজুত নিয়ে হইচই পড়েছে পাকিস্তানে। আন্তর্জাতিক মহলেও আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের দাবি, ইরান এবং আমেরিকার মধ্যে শান্তিচুক্তি করানোর আগে দেশের অর্থনীতির দিকে নজর দেওয়া উচিত পাকিস্তানের। মহান হওয়ার চেষ্টা করার আগে জ্বালানি মজুত নিয়ে মাথা ঘামানো উচিত।