এআইয়ের খাঁড়া কাদের উপর? চাকরিতে ঝুঁকি মাপতে আস্ত ট্র্যাকিং ব্যবস্থা বানিয়ে ফেলল কৃত্রিম মেধা সংস্থা! কাজ করবে কী ভাবে?
অ্যানথ্রোপিকের লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) বা এআই মডেল ‘ক্লড’ উন্নত যুক্তি, সুরক্ষাব্যবস্থা এবং অন্য প্রযুক্তিগত সমস্যা সমাধানের জন্য বিখ্যাত।
পেশাদার সংস্থায় কিছুটা উঁচু পদের চাকরিতে (হোয়াইট কলার জব) কৃত্রিম মেধার প্রভাব বুঝতে এবং নজরদারি চালাতে একটি প্রাথমিক সতর্কতা ব্যবস্থা তৈরি করেছে এআই সংস্থা অ্যানথ্রোপিক! তেমনটাই উঠে এল মিডিয়া সংস্থা অ্যাক্সিওসের একটি প্রতিবেদনে।
ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, এআই সংস্থাটি জানিয়েছে যে, তারা একটি প্রাথমিক সতর্কতা ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছে। ওই প্রাথমিক সতর্কতা ব্যবস্থা এমন ভাবেই তৈরি করা হচ্ছে যে, কৃত্রিম মেধা হোয়াইট কলার চাকরিগুলির বাজারে থাবা বসাবে কি না তা শনাক্ত করতে পারবে।
অ্যানথ্রোপিকের লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) বা এআই মডেল ‘ক্লড’ উন্নত যুক্তি, সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং অন্য প্রযুক্তিগত সমস্যা সমাধানের জন্য বিখ্যাত। এখন সংস্থাটি একটি নতুন সূচক বা ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করেছে যার লক্ষ্য হল এলএলএম-এর জন্য বিভিন্ন পেশা কতটা ঝুঁকির মুখে রয়েছে তা ট্র্যাক করা।
অ্যানথ্রোপিকের তরফে জানানো হয়েছে, এখনও পর্যন্ত প্রাথমিক পর্যায়ে ওই সতর্কতা সূচক ব্যবহার করা হয়েছে। তবে কৃত্রিম মেধা বর্তমানে চাকরির বাজারে কোপ ফেলেছে এবং প্রচুর চাকরি কেড়ে নিচ্ছে তার সপক্ষে বড় কোনও প্রমাণ মেলেনি। যে প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে তা অত্যন্ত সীমিত।
যদিও অ্যানথ্রোপিকের দাবি, ওই সতর্কতা সূচক সম্পূর্ণ রূপে তৈরি করা গেলে অর্থনীতিবিদেরা ভবিষ্যতের চাকরির বাজারে তৈরি হওয়ার আশঙ্কা আরও সঠিক ভাবে শনাক্ত করতে পারবেন। অ্যানথ্রোপিকের দুই অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিম ম্যাসেনকফ এবং পিটার ম্যাকক্রোরি একটি নতুন গবেষণাপত্রে ব্যাখ্যা করেছেন যে, ওই সূচক ব্যবহারের লক্ষ্য হল সম্ভাব্য অর্থনৈতিক পরিবর্তনগুলি প্রকট হওয়ার আগেই তা শনাক্ত করা।
আরও পড়ুন:
এআই নিয়ে বর্তমানে তৈরি হওয়া উদ্বেগ এবং ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে অ্যানথ্রোপিকের বিশ্বাস, ওই ট্র্যাকিং ব্যবস্থা শ্রম বাজারের সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলি শনাক্ত করতে অর্থনীতিবিদদের সাহায্য করতে পারে, যা অন্য কোনও ভাবে বোঝা কঠিন হতে পারে।
গবেষকরা বলেছেন, ‘‘এখনই এই সূচক তৈরি করা গেলে চাকরির বাজারে কৃত্রিম মেধার প্রভাব আবির্ভূত হওয়ার আগেই ভবিষ্যতের ফলাফল এবং অর্থনৈতিক ব্যাঘাতকে আরও নির্ভরযোগ্য ভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হবে। প্রভাব পড়ার পরের বিশ্লেষণের জন্য বসে থাকতে হবে না।’’
বাস্তবের দুনিয়ায় কর্মসংস্থানের উপর কৃত্রিম মেধার প্রভাব কী ভাবে পরিমাপ করা যায়, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে চলমান বিতর্কের মধ্যে এই সূচক তৈরির কথা জানিয়েছে অ্যানথ্রোপিক, যা নিজেও একটি এআই সংস্থা।
উন্নত এআই সিস্টেমগুলি চাকরির বাজারকে উল্লেখযোগ্য ভাবে ব্যাহত করতে পারে, তা নিয়ে সতর্ক করে যে প্রযুক্তিকর্তারা সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার হয়েছেন, এআই সংস্থা অ্যানথ্রোপিকের সিইও দারিয়ো আমোদেই তাঁদের মধ্যে অন্যতম।
আরও পড়ুন:
অ্যানথ্রোপিকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং সিইও দারিয়ো স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিদ্যায় স্নাতক এবং প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটেশনাল নিউরোসায়েন্সে পিএইচডি করেছেন। আগে ওপেনএআইয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি।
যখন কোনও কর্মক্ষেত্রের একটি বড় অংশ স্বয়ংক্রিয় করা সম্ভব হয় এবং সেই কাজগুলি কৃত্রিম মেধার সাহায্যে পরিচালিত করা সম্ভব হয়, তখনই ওই কর্মক্ষেত্রের চাকরিগুলি ঝুঁকির মুখে পড়ে। কৃত্রিম মেধার চাকরি কেড়ে নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
কিন্তু কী ভাবে কাজ করবে অ্যানথ্রোপিকের সূচক? এআই সংস্থা জানিয়েছে, সূচকটি বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত নির্দিষ্ট কাজগুলি পরীক্ষা করবে এবং এলএলএম কোন কাজগুলি পরিচালনা করতে সক্ষম, তা অনুমান করবে। বেশ কিছু তথ্য বিশ্লেষণ করেও দেখা হবে যে, এআই কোন কাজগুলি ইতিমধ্যেই করতে পারছে।
অ্যানথ্রোপিকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যে কাজগুলি বেশি চিন্তাভাবনার, অর্থাৎ যা মানবকেন্দ্রিক, যেমন কোডিং এবং সফ্টঅয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো ক্ষেত্র ক্রমশ কৃত্রিম মেধাকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। গণিত এবং বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও একই।
এআই সংস্থাটি মনে করছে, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে ‘কম্পিউটার প্রোগ্রামার’ বা কোডারদের চাকরি। কৃত্রিম মেধা কোডারদের কাজের প্রায় ৭৫ শতাংশ করতে সক্ষম বলেও সংস্থাটি জানিয়েছে। ঝুঁকির মুখে থাকা অন্য চাকরিগুলির মধ্যে রয়েছে গ্রাহক পরিষেবা প্রতিনিধি, ‘ডেটা এন্ট্রি’ কর্মী এবং মেডিক্যাল রেকর্ড বিশেষজ্ঞদের চাকরি। তেমনটাই মত অ্যানথ্রোপিকের।
কয়েক দিন আগেই দারিয়ো জানিয়েছিলেন, ক্রমশ কোডিং করার কাজে সিদ্ধহস্ত হচ্ছে এআই মডেলগুলি। কিন্তু সফ্টঅয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বৃহত্তর কাজগুলিতে দড় হতে এআইয়ের আরও কিছুটা সময় লাগবে। তিনি বলেছিলেন, ‘‘আমি মনে করি এই সমস্ত কাজ শীঘ্রই এআইয়ের দখলে আসবে।’’
চাকরির বাজারে অটোমেশন নিয়ে উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও অ্যানথ্রোপিক দাবি করেছে, এখনও পর্যন্ত খুব কমই প্রমাণ রয়েছে যে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ চাকরিতে কর্মীরা উচ্চ বেকারত্বের সম্মুখীন হচ্ছেন।
তবে অনেক চাকরিই ভবিষ্যতে থাকবে, যার সঙ্গে এআই অটোমেশনের কোনও সম্পর্ক নেই। অ্যানথ্রোপিকের অনুমান, পৃথিবীর প্রায় ৩০ শতাংশ পেশা ঝুঁকির মুখে নেই। এগুলির মধ্যে বেশির ভাগই শারীরিক কাজ এবং মানুষের উপস্থিতির উপর ব্যাপক ভাবে নির্ভর করে, যেমন গৃহকর্মী, উপকূলরক্ষীবাহিনী ইত্যাদি।
অ্যানথ্রোপিকের গবেষকেরা মনে করছেন, কৃত্রিম মেধার অটোমেশন বর্তমানে যে স্তরে রয়েছে, ভবিষ্যতে তার থেকে অনেক বেশি উন্নত হবে। এর অর্থ কৃত্রিম মেধা প্রযুক্তি ভবিষ্যতে চাকরির উপর অনেক বেশি প্রভাব ফেলতে পারে। আর সে কারণেই একটি সূচক বা ট্র্যাকিং সিস্টেম তৈরি করতে উঠেপড়ে লেগেছেন তাঁরা, যা মূলত ‘হোয়াইট কলার’ চাকরিগুলির ঝুঁকি মাপবে।
‘হোয়াইট কলার’ চাকরি নিয়ে সম্প্রতি উদ্বেগের কথা শুনিয়েছিলেন মাইক্রোসফ্টের এআই প্রধান মুস্তাফা সুলেমানও। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, খুব শীঘ্রই বেশির ভাগ ‘হোয়াইট কলার’ চাকরি কেড়ে নিতে পারে কৃত্রিম মেধা। আর তা হতে পারে বছরখানেকের মধ্যেই। শুধু কোডারেরা নন, আইনজীবী এবং হিসাবরক্ষকের মতো পেশাদারেরাও তাঁদের কাজ এআইয়ের সাহায্যে স্বয়ংক্রিয় ভাবে করতে পারবেন। ফলে এই সব ক্ষেত্রে কমবে পেশাদারদের চাহিদা। তেমনটাই দাবি করেছিলেন মুস্তাফা।