নিশ্চিহ্ন রাজনৈতিক-সামরিক নেতৃত্ব, ধ্বংস পরিকাঠামো, কোটি কোটি ডলারের ক্ষতি! এ কেমন ‘বিজয়ী’ মার খাওয়া ইরান
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরানকে ‘বিজয়ী’ বলে মনে করছেন বিশ্লেষক থেকে শুরু করে নেটপ্রভাবীদের একাংশ। কিন্তু সত্যিই কি তাই? ‘গ্রাউন্ড জ়িরো’র পরিসংখ্যান কিন্তু সম্পূর্ণ অন্য কথা বলছে।
দু’সপ্তাহের সংঘর্ষবিরতি। সেই সঙ্গে শান্তি বৈঠকে বিবাদ মিটিয়ে নেওয়ার বার্তা। দেখে মনে হচ্ছে ইরানি রণাঙ্গন ছেড়ে যেন পালাতে পারলে ‘ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়বে’ আমেরিকার! এর উপর ভিত্তি করে অনেকেই বলতে শুরু করেছেন, পশ্চিম এশিয়ার লড়াইয়ে সম্পূর্ণ ‘পরাজিত’ হয়েছে মার্কিন ফৌজ। যদিও তুল্যমূল্য বিচারে সাবেক পারস্যকে ‘বিজয়ী’ ঘোষণা করা নিয়ে বেশ আপত্তি রয়েছে সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশের।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইজ়রায়েলকে সঙ্গে নিয়ে ইরানে সামরিক অভিযানে নামে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা। লড়াইয়ের প্রথম দিনই তেহরানের গুপ্তঘাঁটিতে আক্রমণ শানায় দুই ‘সুপার পাওয়ার’-এর বিমানবাহিনী। আর তাতে প্রাণ হারান সাবেক পারস্যের শিয়া ধর্মগুরু তথা সর্বোচ্চ নেতা (সু্প্রিম লিডার) আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই, তাঁর পরিবারের বেশ কয়েক জন সদস্য-সহ তাঁর নিয়ন্ত্রণে থাকা আধা সেনা ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসির একগুচ্ছ কমান্ডার।
পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইরানের রাজনৈতিক এবং সামরিক নেতৃত্বকে সাফ করে দেয় আমেরিকা ও ইহুদিদের বায়ুসেনা। কারও কারও দাবি, ওই তারিখে আইআরজিসির মোট ৪০ জন কমান্ডারকে হারিয়ে একরকম ‘পঙ্গু’ হয়ে পড়ে তেহরান। যদিও এই সংখ্যা নিয়ে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক, সামরিক নজরদারি সংস্থা, সংবাদমাধ্যম এবং সমাজমাধ্যম ব্যবহারকারীদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
সংঘর্ষ শুরু হওয়ার কিছু ক্ষণের মধ্যেই আলি খামেনেইয়ের মৃত্যুর খবর স্বীকার করে নেয় ইরান। পাশাপাশি, ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজ়াদেহ, প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের সচিব আলি শামখানি, সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অফ জেনারেল স্টাফ আব্দুর রহিম মুসাভি এবং আইআরজিসি কমান্ডার মহম্মদ পাকপুরের নিহত হওয়ার কথাও বিবৃতি দিয়ে জানায় তেহরান। তবে ৪০ জন কমান্ডারের প্রাণ হারানোর খবরকে মান্যতা দেয়নি তারা।
মার্চের প্রথম সপ্তাহে শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ দিকের বন্দর শহর গল থেকে মাত্র ৪০ নটিক্যাল মাইল দূরে ফ্রিগেট শ্রেণির ইরানি রণতরী আইআরআইএস ডেনাকে টর্পেডো ছুড়ে ধ্বংস করে মার্কিন ডুবোজাহাজ ইউএসএস শার্টল। যুদ্ধজাহাজটি সমুদ্রে তলিয়ে যাওয়ায় ৮০-র বেশি নৌযোদ্ধাকে হারায় তেহরান। পরবর্তী সময়ে তাঁদের নৌবাহিনীকে পারস্য উপসাগরের বাইরে আর বেরিয়ে আসতে দেখা যায়নি।
আরও পড়ুন:
গত ১৭ মার্চ বিমানহামলায় মৃত্যু হয় ইরানের সাবেক স্পিকার ও নিরাপত্তা উপদেষ্টা আলি লারিজানির। ওই দিনই আইআরজিসির বাসিজ় বাহিনীর প্রধান গোলামরেজা সোলেইমনিকে উড়িয়ে দেয় মার্কিন-ইহুদিদের যৌথ ফৌজ। এ ছাড়া ২৬ মার্চ তাঁদের হামলায় সাবেক পারস্যের নৌসেনা প্রধান আলিরেজ়া তাংসিরির মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছে ইজ়রায়েল। যদিও এ ব্যাপারে এখনও মুখে কুলুপ এঁটে আছে তেহরান।
লড়াইয়ের শুরুতেই নিজেদের অবস্থান মজবুত করতে কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রাস্তা হরমুজ় প্রণালী অবরুদ্ধ করে আইআরজিসি। বাছাই করা কিছু দেশের জাহাজকে ওই এলাকা পার হওয়ার ‘ছাড়পত্র’ দিয়েছে তারা। এ-হেন ১৬৭ কিলোমিটার লম্বা ও ৩৩ কিলোমিটার চওড়া সঙ্কীর্ণ জলপথের ‘দ্বাররক্ষী’ ছিলেন তাংসিরি। ইহুদি গণমাধ্যম ‘দ্য জেরুজ়ালেম পোস্ট’ জানিয়েছে, বন্দর আব্বাস শহরে চলা বিমানহামলায় মৃত্যু হয় তাঁর।
এ ছাড়া আলি খামেনেইয়ের পুত্র বছর ৫৬-র মোজতবাকে নিয়েও তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। বাবার মৃত্যুর পর তাঁকেই সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) হিসাবে বেছে নেয় তেহরান। কিন্তু, সেই ঘোষণার ৩-৪ দিনের মাথায় মোজতবার শারীরিক অবস্থা নিয়ে বিস্ফোরক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় ব্রিটিশ গণমাধ্যম ‘দ্য সান’-এ। গোয়েন্দা সূত্রকে উদ্ধৃত করে তাঁদের দাবি, যৌথ বাহিনীর হামলায় মারাত্মক ভাবে জখম হয়েছেন তিনি। শুধু তা-ই নয়, হারিয়েছেন পা-ও।
গোড়ার দিকে ‘দ্য সান’-এর বক্তব্য ছিল, জখম মোজতবাকে অত্যন্ত গোপনে রাশিয়া নিয়ে গিয়েছে আইআরজিসি। মস্কোতে চিকিৎসা হচ্ছে তাঁর। যদিও সেটা পত্রপাঠ খারিজ করে দেন ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজ়েশকিয়ান। অন্য সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে বিবৃতি দেয় ক্রেমলিনও। জানায়, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা তাঁদের দেশে নেই। ইচ্ছাকৃত ভাবে মিথ্যা খবর ছড়ানো হচ্ছে। যদিও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ২৮ ফেব্রুয়ারির পর থেকে এক বারের জন্যও প্রকাশ্যে দেখা যায়নি তাঁকে।
আরও পড়ুন:
এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে মোজতবা খামেনেইকে নিয়ে প্রকাশ করা দ্বিতীয় প্রতিবেদনে আরও কিছু চাঞ্চল্যকর দাবি করেছে ‘দ্য সান’। ব্রিটিশ গণমাধ্যমটি জানিয়েছে, ইরানের কুম শহরে চলছে তাঁর চিকিৎসা। তবে শারীরিক ভাবে ‘অক্ষম’ হয়ে পড়েছেন তিনি। সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো অবস্থা নেই তাঁর। আর এই তথ্য প্রকাশ্যে আসতেই তেহরানের নেতৃত্বের কাঠামো নিয়ে নতুন করে উঠছে একাধিক প্রশ্ন।
‘দ্য সান’-এর দাবি, তেহরান থেকে ১৪০ কিলোমিটার দূরের ধর্মীয় শহর কুমে অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে আছেন মোজতবা। তাঁর ব্যাপারে অনেক দিন আগেই মার্কিন এবং ইজ়রায়েলি গুপ্তচরেরা খবর পেয়েছেন। কিন্তু ইচ্ছা করেই সেটা প্রকাশ্যে আনেননি তাঁরা। অন্য দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে এ ব্যাপারে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর কথায়, ‘‘মোজতবা আর বেঁচে নেই। যদিও বা বেঁচে থাকেন, তা হলে চলার মতো পরিস্থিতিতে নেই।’’
রাজনৈতিক এবং সামরিক নেতৃত্বকে বাদ দিলে পরিকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতিও ইরানের নেহাত কম হয়নি। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই তেহরান থেকে ৩৬ কিলোমিটার দূরে কারাজ়ের সঙ্গে সংযোগরক্ষাকারী সাবেক পারস্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং দীর্ঘতম সেতু বি ১-এ মুহুর্মুহু বোমাবর্ষণ করে ইজ়রায়েল এবং আমেরিকা। ফলে চোখের নিমেষে ভেঙে পড়ে এর একাংশ। পরে এই অভিযানের একটি ভিডিয়োও প্রকাশ করেন ট্রাম্প।
এ ছাড়া গত ১৮ মার্চ ইরানের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র সাউথ পার্সে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইহুদি বিমানবাহিনী। সেখানে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কতটা, তা অবশ্য এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। পাশাপাশি, মুহুর্মুহু বোমাবর্ষণ করে তেহরানের প্রায় প্রতিটি পরমাণু গবেষণাকেন্দ্রকে একরকম গুঁড়িয়ে দিয়েছে আমেরিকা। ওই পরিকাঠামো দ্বিতীয় বারের জন্য তৈরি করা তাদের পক্ষে বেশ কঠিন।
সম্প্রতি ইরানে ঢুকে হামলা চালানোর সময় তেহরানের প্রত্যাঘাতে ধ্বংস হয় দু’টি ‘এফ-১৫ই স্টাইক ইগল’ মার্কিন লড়াকু জেট। যদিও শেষ মুহূর্তে ককপিট থেকে বেরিয়ে প্রাণে বেঁচে যান তাদের যোদ্ধা পাইলটেরা। সাবেক পারস্যের ভিতরেই আত্মগোপন করে ছিলেন তাঁরা। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ‘বায়ুবীর’দের যুদ্ধবন্দি করার ‘মেগা সুযোগ’ চলে এসেছিল আইআরজিসির হাতে। কিন্তু, সেখানেও ব্যর্থ হয় সর্বোচ্চ নেতার (সুপ্রিম লিডার) নিয়ন্ত্রণে থাকা এই আধা সেনা।
ইরানের মাটিতে মার্কিন যুদ্ধবিমান ‘এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল’ ভেঙে পড়ার কিছু ক্ষণের মধ্যেই প্রথম পাইলটকে উদ্ধার করে আমেরিকা। তার ৪৮ ঘণ্টা পরে রুদ্ধশ্বাস অভিযান চালিয়ে শত্রু দেশের ভিতর থেকে তুলে নিয়ে আসা হয় দ্বিতীয় পাইলটকে। তাঁকে অবশ্য হন্যে হয়ে খুঁজছিল তেহরানের ফৌজ। এর জন্য মোটা অঙ্কের পুরস্কারও ঘোষণা করে তাঁরা।
ধ্বংসপ্রাপ্ত দ্বিতীয় বিমানের পাইলটের সাঙ্কেতিক নাম ছিল ‘ডুড ৪৪ ব্রাভো’। ককপিট থেকে বেরোনোর পর দু’দিন ধরে একটি পাহাড়ের ফাটলে লুকিয়ে প্রাণ বাঁচান তিনি। উদ্ধারের জন্য ১৭৬টি বিমানে কয়েকশো বিশেষ কমান্ডোকে অভিযানে নামায় আমেরিকা। সাত ঠিকানায় ৪৫ ঘণ্টা ৫৬ মিনিট ধরে চলে তল্লাশি। অবশেষে সফল ভাবে তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হয় তাঁরা।
পশ্চিমি সংবাদপত্রগুলির একাংশ আবার জানিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে কোমর ভেঙে গিয়েছে ইরানের। বর্তমানে প্রায় দেউলিয়ার দরজায় দাঁড়িয়ে আছে তেহরান। আর তাই, সংঘর্ষবিরতি হতেই আর্থিক হাল ফেরাতে হরমুজ় প্রণালীতে পণ্যবাহী জাহাজপিছু ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত ট্রানজ়িট ফি বা টোল (শুল্ক বা মাসুল) আদায় করছে ইরানি সামরিক বাহিনী আইআরজিসি। পাশাপাশি, ওই সামুদ্রিক রাস্তাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণেই রাখতে চায় তারা।
পরিসংখ্যান বলছে, ইরানি মুদ্রা রিয়ালের মান সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। বর্তমানে ১ ডলারের নিরিখে রিয়ালের মান ১১ লক্ষ থেকে ১৩ লক্ষ পর্যন্ত ওঠানামা করছে। সেখানকার আমজনতার জমানো টাকার কোনও মূল্যই অবশিষ্ট নেই। লড়াই শুরুর আগেও তেহরানে মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ৫০ শতাংশে পৌঁছেছিল। পাঁচ সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা প্রাণঘাতী সংঘাতের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছে বলে জানিয়েছে ওয়াকিবহাল মহল।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, এই সমস্ত ঘটনা এবং পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে ইরানের লড়াইয়ে কতটা সাফল্য পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। উল্টো দিকে আমেরিকা বা ইজ়রায়েলের কোনও শীর্ষ সেনা অফিসার বা রাজনৈতিক নেতার গায়ে আঁচড় পর্যন্ত কাটতে পারেনি তেহরান। ফলে একতরফা ভাবে সাবেক পারস্যকে জয়ী ঘোষণা করা যে ‘সত্যের অপলাপ’ হবে, তা বলাই বাহুল্য।
জোড়া ‘সুপার পাওয়ার’-এর সঙ্গে লড়াইয়ে একটি জায়গায় এগিয়ে আছে তেহরান। রাজনৈতিক এবং সামরিক নেতৃত্বকে হারিয়েও মাথা নত করেনি তারা। আত্মসমর্পণের বদলে পাল্টা প্রত্যাঘাত শানিয়ে আমেরিকার বেশ কিছু যুদ্ধবিমান এবং অত্যাধুনিক রেডারকে ধ্বংস করেছে আইআরজিসি। তা ছাড়া শান্তি বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে ১০ দফা শর্ত রেখেছে ইরান। এর অর্ধেকও ওয়াশিংটন মানতে রাজি হলে তারা যে ‘নৈতিক জয়’ পাবে, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।