Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২১ মে ২০২২ ই-পেপার

URL Copied

চিত্র সংবাদ

Sindhutai Sapkal: সদ্যোজাতের জন্য ভিক্ষে! সংসারে অবাঞ্ছিত সিন্ধুতাই হয়ে ওঠেন হাজার ‘অনাথের মা’

নিজস্ব প্রতিবেদন
কলকাতা ১৭ জানুয়ারি ২০২২ ১৩:৫৮
মাথার উপরে মা-বাবার ছায়া থাকলেও অনাথের মতো মানুষ হয়েছেন। মেয়ে বলে জুটেছে গঞ্জনাও। এমনকি, ছাড়তে হয়েছে স্কুলের পড়াশোনা। ‘দুশ্চরিত্রা’ অপবাদে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তাড়িয়ে দিয়েছিলেন স্বামী। তবে শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও হার মানেননি সিন্ধুতাই। সারা জীবন ধরে তিল তিল করে জমানো সাহস আর জেদে ভর করেই আশ্রয় দিয়েছিলেন হাজার অনাথ শিশুকে। হয়ে উঠেছিলেন ‘অনাথের মা’!

চলতি মাসের ৪ তারিখ পুণের একটি বেসরকারি হাসপাতালে প্রয়াত হন সিন্ধুতাই। বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর। তাঁর মৃত্যুসংবাদে শোকজ্ঞাপন করেছেন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী উদ্ধব ঠাকরে থেকে শুরু করে সমাজের বহু বিশিষ্ট। তবে এক দিনে সমাজের ‘বিশিষ্টদের’ মাঝে জায়গা করে নেননি সিন্ধুতাই।
Advertisement
সিন্ধুতাইয়ের জন্ম হয়েছিল মহারাষ্ট্রের ওয়ারধা জেলায় পিম্পরি মেঘে নামে এক অখ্যাত গ্রামে। তার আগের বছরে দেশ স্বাধীন হয়েছে। তবে তখনও যেন স্বাধীনতার হাওয়া ঢোকেনি অভিমান সাঠের সংসারে। নভেম্বরের ১৪ তারিখে একটি ফুটফুটে শিশুকন্যার জন্ম মেনে নিতে পারেনি তাঁর পরিবার। শিশুটির ‘অপরাধ’— সে মেয়ে! ফলে নিজের পরিবারের কাছেই অনাথের মতো বড় হয়ে উঠেছিলেন সিন্ধুতাই।

খেলাধুলো করে কাটানোর বয়সে সিন্ধুতাইয়ের কপালে জুটেছে অহরহ কটাক্ষ। ভাইবোনদের কাছে তাঁর ডাকনাম হয়ে গিয়েছিল ‘ন্যাকড়া’।
Advertisement
গরু চরিয়ে সংসার চালাতেন সিন্ধুতাইয়ের বাবা অভিমান। অভাব নিত্যসঙ্গী। তা সত্ত্বেও মেয়েকে স্কুলে পাঠিয়েছিলেন। তবে নুন আনতে পান্তা ফুরোয় যে সংসারে, সেখানে মেয়ের পড়াশোনার জন্য পয়সা খরচ করা কেন? স্ত্রীর এই যুক্তির কাছে হার মেনে মেয়েকে স্কুলে যেতে বারণ করেন অভিমান। সে সময় সিন্ধুতাই চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী।

স্কুলের পাঠ চোকানোর পর এ বার নাবালিকার বিয়ে স্থির করে সিন্ধুতাইয়ের পরিবার। ১০ বছরের মেয়ের জন্য পাত্রও খুঁজে বার করে তারা। ৩০ বছরের শ্রীহরি সপকাল। ফলে সে বয়সেই মা-বাবার আশ্রয় ছেড়ে শ্রীহরির সংসারে ঠাঁই পান সিন্ধুতাই। ২০ বছর বয়সে তিন সন্তানের মা। তবে বেশি দিন সে সুখও সইল না।

চতুর্থ সন্তানের জন্মের আগে সিন্ধুতাইয়ের জীবনে ফের বিপত্তি। অভিযোগ, গ্রামের কর্তাব্যক্তিদের অপমান করেছিলেন সিন্ধুতাই। তার প্রতিশোধ নিতেই স্ত্রীর চরিত্র নিয়ে শ্রীহরির কাছে নালিশ করেন তাঁরা। এর পর স্ত্রীর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলেন শ্রীহরিও। ন’মাসের অন্তঃসত্ত্বা সিন্ধুতাইকে মারধর করে বাড়ি থেকে বার করে দেন তিনি।

বাড়ি থেকে বার করে দেওয়ার দিনেই একটি গোয়ালে কন্যাসন্তানের জন্ম দেন সিন্ধুতাই। সদ্যোজাতকে খাওয়াবেন কী? কোনও উপায় না পেয়ে শিশুসন্তানকে সঙ্গে নিয়ে রেল স্টেশনে, রাস্তায় ভিক্ষাবৃত্তি শুরু করেন। সারা দিন ঘোরাঘুরির পর রাতে মেয়েকে নিয়ে একটি শ্মশানে ঠাঁই নিতেন সিন্ধুতাই।

ভিক্ষাবৃত্তির সময়ই বহু অনাথ শিশুকে একই কাজ করতে দেখেছিলেন সিন্ধুতাই। সে সময় থেকেই তাদের জন্য কিছু একটা করার কথা ভেবেছিলেন। অনাথ শিশুদের আশ্রয় দেওয়ার চিন্তা-ভাবনা করতে শুরু করেন তিনি। তবে সে ভাবনা বাস্তবায়িত করা তো মুখের কথা নয়!

নিজের রোজগারের টাকায় অনাথ শিশুদের জন্য একটি আশ্রম গড়ে তোলেন সিন্ধুতাই। অমরাবতী জেলার পাহাড়ি এলাকায় চিখলদরায় অনাথ শিশুদের জন্য প্রথম আশ্রমটি খুলেছিলেন তিনি। তার পর থেকে সারা জীবন ধরে ঘরহারাদের আশ্রয়ের খোঁজ করে গিয়েছেন সিন্ধুতাই।

অনাথআশ্রমের পর এ বার ঘরহারাদের দেখাশোনায় নিজের সংস্থাও খুলে ফেলেন সিন্ধুতাই। রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো নাবালিকা-কিশোরীদের চিখলদরায় নতুন ঠিকানা ঠাঁই হয় ‘সাবিত্রীবাই ফুলে গালর্স হস্টেল’। সেটিই সিন্ধতাইয়ের প্রথম স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।

প্রথাগত ভাবে স্কুলের গণ্ডি না পেরোলেও বেশ গুছিয়ে কথাবার্তা বলতে পারতেন সিন্ধুতাই। এক বার তিনি বলেছিলেন, ‘‘খিদের জ্বালায় মুখে কথা ফুটে গিয়েছে।’’ মানুষজনের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের দক্ষতাও এই আশ্রয়দাত্রীর জীবনে কাজে এসেছে। ধীরে ধীরে ন’টি সংস্থা গড়ে তুলেছিলেন তিনি।

সারা জীবন ধরে প্রায় ১,৪০০ জন অনাথের আশ্রয়দাত্রী হয়ে উঠেছিলেন সিন্ধুতাই। তাঁদের অনেকের কাছে সিন্ধুতাই নয়, তিনি পরিচিত ছিলেন ‘অনাথের মা’ হিসাবে। আশ্রয়হীনদের পাশাপাশি সরকারি প্রকল্পের জেরে জমিহারাদের জন্যও সরব হয়েছেন সিন্ধুতাই। অমরাবতীতে ব্যাঘ্র সংরক্ষণ প্রকল্পের কাজে ৮৪টি গ্রামের আদিবাসীদের উচ্ছেদের বিরোধিতা করেছিলেন তিনি।

জীবদ্দশায় একাধিক সম্মান, শিরোপা পেয়েছেন। ২০১০ সালে তাঁর জীবনকাহিনি বড়পর্দায় ফুটে উঠেছিল। মরাঠি ভাষার ফিল্ম ‘মি সিন্ধুতাই সপকাল’-এ। লন্ডন ফিল্মোৎসবে তা পুরস্কারের বাছাই তালিকায় জায়গা করে নেয়। ২০২১ সালে তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানে ভূষিত করে ভারত সরকার।