‘অক্টোপাসের শুঁড়’ কেটে ইরানের ক্ষমতা খর্ব! ‘অভ্যন্তরীণ চক্র’ ভাঙতে ডলার দিয়ে কোন কোন কাঁটা উপড়োবে আমেরিকা?
তেহরানের ধর্মীয় শাসনকে উৎখাত করার লক্ষ্যে ইরানের মোজতবা-সহ প্রথম সারির ১০ জন সামরিক কর্তা ও নেতার মাথার দাম ঘোষণা করেছে মার্কিন বিদেশমন্ত্রক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে যে, তারা যে তালিকা প্রকাশ করেছেন তাতে যে নামগুলি উঠে এসেছে তাঁরা তেহরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা কাঠামোর মূল চালিকাশক্তি। এই কর্মকর্তারা সম্মিলিত ভাবে ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) পরিচালনা করেন।
৮৬ বছরের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই নিহত হওয়ার পর ইরানের কুর্সিতে তাঁর ৫৬ বছর বয়সি পুত্র। যুদ্ধবিধ্বস্ত তেহরানকে নেতৃত্বে দিচ্ছেন মোজতবা খামেনেই। চলতি বছরের ৯ মার্চ তাঁকে সুপ্রিম লিডার হিসাবে বেছে নিয়েছে সাবেক পারস্যের শিয়া ধর্মগুরুদের প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস’। বাবা মারা যাওয়ার পর যাবতীয় রাজপাট চলে এসেছে তাঁর হাতে। আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসির নিয়ন্ত্রণও রয়েছে মোজতবার কাছে।
যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে দেশকে নেতৃত্ব দিয়ে খবরের শিরোনামে এসেছেন খামেনেই-পুত্র মোজতবা। আনুষ্ঠানিক ভাবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্বভার পাওয়ার পরই আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। যুদ্ধে নিহত পরিবার ও ইরানি সেনাদের মৃত্যুর প্রতিশোধস্পৃহায় গর্জে উঠেছেন খামেনেইয়ের পুত্র। তাঁর সম্পর্কে একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল ইরানি শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে ‘সক্ষম’ এবং ‘বলশালী’ নেতা হলেন মোজতবা।
মোজতবা ক্ষমতার শীর্ষে ওঠার আগেই তাঁকে নিকেশ করার হুমকি দিয়ে রেখেছিলেন ইজ়রায়েল। প্রয়াত আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের উত্তরসূরি হিসাবে যিনিই স্থলাভিষিক্ত হোন, তাঁকে হত্যা করা হবে! এই ভাষাতেই ইরানকে হুঁশিয়ারি দেয় তেল আভিভ। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তেহরানের সূত্রকে উদ্ধৃত করে সংবাদসংস্থা রয়টার্স জানায় ইরানের মধ্যে মোজতবার উপর হামলা চালিয়েছে ইজ়রায়েল এবং মার্কিন যৌথ বাহিনী।
সেই হামলায় জখম হলেও জীবিত রয়েছেন ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজ়েশকিয়ানের পুত্র ইউসুফ পেজ়েশকিয়ানের দাবি, দেশের নতুন সর্বোচ্চ নেতা নিরাপদ এবং সুস্থ আছেন। যদিও এক মার্কিন সংবাদমাধ্যম তেহরানের এক চিকিৎসকের সূত্র উদ্ধৃত করে ইউসুফের দাবিকে নস্যাৎ করে দিয়েছে। ইরানের ‘সন্ত্রাসবাদী জমানার নেতা’ হিসাবে যাঁর নামই উঠে আসুক না তাকে নিকেশ করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে ইজ়রায়েল। তাতে সম্পূর্ণ মদত রয়েছে আমেরিকার।
এই আবহে তেহরানের ইসলামীয় প্রজাতন্ত্রকে উৎখাত করার লক্ষ্যে মোজতবা-সহ প্রথম সারির ১০ জন সামরিক কর্তা ও নেতার মাথার দাম ঘোষণা করেছে মার্কিন বিদেশ মন্ত্রক। মোজতবার টিকির নাগাল পেতে এক কোটি ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় ৯২.৪৭ কোটি) পুরস্কারমূল্য ঘোষণা করেছে ওয়াশিংটন। ১৩ মার্চ মার্কিন বিদেশ মন্ত্রক ‘রিওয়ার্ডস ফর জাস্টিস’ নামে সেই পুরস্কারের কথা ঘোষণা করেছে। যাতে বলা হয়েছে ইরানি নেতাদের হালহকিকত জানাতে পারলে মিলবে মোটা ইনাম।
আরও পড়ুন:
এই তালিকায় রয়েছেন ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা তথা নিহত আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের পুত্র মোজতবা, সর্বোচ্চ নেতার দফতরের ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ আলি আসগর হেজ়াই, ইরানের নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানি, ধর্মগুরু ও রাজনীতিবিদ ইসমাইল খতিব, আইআরজিসির শীর্ষ কমান্ডার ইয়াহিয়া রহিম সাফাভি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ইস্কান্দার মোমেনি -সহ বেশ কয়েক জন শীর্ষকর্তা। এছাড়াও রয়েছেন, আইআরজিসি আর এক কমান্ডার, সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা, প্রতিরক্ষা পরিষদের সচিব এবং সেনা দফতরের প্রধান-সহ আরও কয়েক জন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, তাদের প্রকাশিত তালিকায় থাকা নামগুলি তেহরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা কাঠামোর মূল চালিকাশক্তি। এই কর্মকর্তারা সম্মিলিত ভাবে ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোরকে (আইআরজিসি) পরিচালনা করছেন। ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, হত্যা, অপহরণ, রকেট হামলা, ড্রোন হামলা এবং উন্নত অস্ত্র সরবরাহ-সহ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত জড়িয়ে আছে ওই বাহিনী, অভিযোগ মার্কিন বিদেশ মন্ত্রকের।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের উপর যৌথ হামলার দু’সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও শাসনকর্তাদের বাগে আনতে পারছে না ‘সুপার পাওয়ার’ আমেরিকা ও তার মিত্ররা। উল্টে প্রত্যাঘাতে নাস্তানাবুদ করে ছাড়ছে ইরানের সামরিক বাহিনী। আর এই সামরিক বাহিনীকে সুচারু ভাবে পরিচালনা করে আসছেন মুষ্ঠিমেয় কিছু নেতা। ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোরের ছত্রছায়ায় থাকা ইরানের প্রক্সি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণভার রয়েছে এই শীর্ষনেতাদের হাতেই বলে অভিযোগ তুলেছে আমেরিকা।
আমেরিকার মতে সর্বোচ্চ নেতার প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হয় এই হামাস, হুথি, হিজবুল্লার মতো সশস্ত্র সংগঠনগুলি। ইরানের মদতপুষ্ট সশস্ত্রবাহিনীর ডানা ছাঁটতে তাই মূল হোতাদের জালবন্দি করতে উঠেপড়ে লেগেছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশাল অর্থের লোভ দেখিয়ে ইরানের ক্ষমতা কাঠামোর অভ্যন্তরীণ বৃত্তটি অকেজো করতে চাইছেন মার্কিন গোয়েন্দারা বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।
আরও পড়ুন:
মার্কিন সূত্রের খবর, আইআরজিসির তত্ত্বাবধানে পশ্চিম এশিয়ায় ইরান সমর্থিত সশস্ত্র এবং রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলির একটি নেটওয়ার্কের চাকে ঢিল মারাই হল বিদেশ মন্ত্রকের উদ্দেশ্য। বিশ্ব জুড়ে সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা, অর্থের জোগান এবং নির্দেশ, সমস্তটাই পরিচালিত হয় আইআরজিসির বিভিন্ন শাখা পরিচালনা ও নির্দেশনার সঙ্গে যুক্ত প্রধান নেতাদের অঙ্গুলিহেলনেই। নেটওয়ার্কের ‘অক্টোপাসের’ শুঁড়গুলিকে এক এক করে বিচ্ছিন্ন করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে আমেরিকা।
আমেরিকার বার বার অভিযোগ তুলেছে আইআরজিসি মার্কিন মিত্রদেশগুলির উপর আক্রমণ করার জন্য হিজবুল্লাহ এবং হামাসের মতো সংগঠনকে প্রয়োজনীয় হাতিয়ার সরবরাহ করে আসছে। ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর আশ্রয়স্থল বলে সিরিয়া ও ইরাককে ধরা হয়। ইরাকে থাকা আমেরিকার সামরিক ঘাঁটিতে কয়েক ডজন হামলা চালিয়েছে এই সমস্ত বিদ্রোহী গোষ্ঠী।
যদিও এই সংগঠনগুলির পৃষ্ঠপোষকতার সব ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে তেহরান। সূত্র অনুসারে, এই পুরস্কারের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট করে দিয়েছে যে ইরানের আঞ্চলিক কার্যকলাপের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ের চারপাশের নেতৃত্ব নেটওয়ার্কের হাতেই রয়েছে।
নতুন সর্বোচ্চ নেতার অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহকারী ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি ডিভিশনের প্রধান আলি আসগর হেজ়াই। ইরানের অন্যতম শক্তিশালী ‘পর্দার আড়ালের ব্যক্তি’ হিসাবে পরিচিতি রয়েছে তাঁর। খামেনেইয়ের আমলে, বিশেষ করে ২০০৯ এবং ২০১৯ সালের সরকার বিরোধী বিক্ষোভ দমন-পীড়নে নিরাপত্তা বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়ার পেছনে তাঁর ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ তুলেছে ওয়াশিংটন।
এক্স হ্যান্ডলে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে নির্মূল করে দেওয়া সরাসরি হুমকি দিয়েছিলেন যিনি সেই নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানিকেও নেটওয়ার্কের ‘বড় মাথা’ বলে চিহ্নিত করেছে আমেরিকা। ‘‘আপনার থেকেও বড়রা ইরানকে নির্মূল করতে পারেনি। নিজেরটা দেখুন, নাহলে আপনাকেই নির্মূল করে দেওয়া হবে।’’ এই ভাষাতেই ট্রাম্পকে হুমকি দিয়েছিলেন তিনি। নিহত খামেনেই-এর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠবৃত্তের সদস্য আইআরজিসি প্রাক্তন কমান্ডার লারিজানি।
১৯৮০-’৮৮ সাল পর্যন্ত চলা ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা ইয়াহিয়া রহিম সাফাভি বর্তমানে রয়েছেন আইআরজিসির শীর্ষ কম্যান্ডার পদে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেইয়ের প্রধান সামরিক উপদেষ্টা ছিলেন তিনি। ২০০৬ সালে পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে জড়িত থাকার কারণে রাষ্ট্রপুঞ্জের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় নাম রয়েছে তাঁর। ইরানের সামরিক কৌশল এবং আঞ্চলিক নীতি নির্ধারণে অন্যতম প্রভাবশালী বলে ধরা হয়ে এই সাফাভিকে।
পেশায় ধর্মগুরু হলেও ১৯৮৫ সালে আইআরজিসির গোয়েন্দা শাখায় যোগদান করেছিলেন ইসমাইল খতিব। পরে খতিবকে ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির মন্ত্রিসভার গোয়েন্দা মন্ত্রী হিসাবে নিযুক্ত করা হয়। খতিবের উপাধি হুজ্জাত আল-ইসলাম । ইংরেজিতে এর অর্থ ইসলামের প্রমাণ। খতিব ছিলেন খামেনেইয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং আয়াতোল্লা রুহুল্লা খোমেইনির একনিষ্ঠ সমর্থক।
আইআরজিসি-র মাথাদের খোঁজ চালাতে যে ‘রিওয়ার্ডস ফর জাস্টিস’ কর্মসূচিটি আমেরিকা ব্যবহার করেছে তাতে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধে তথ্য প্রদানের জন্য বিপুল অর্থ পুরস্কার হিসাবে দেওয়া হয়। মার্কিন সামরিক বাহিনীর মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ানো ইরানির মাথারা কোথায় আত্মগোপন করে আছেন তা জানানোর জন্য তথ্যদাতাকে টর বা সিগন্যালের মাধ্যমে তথ্য পাঠানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশাল অঙ্কের পুরস্কারের পাশাপাশি পুনর্বাসনেরও সুযোগ পাবেন বলে জানিয়েছে আমেরিকার বিদেশ মন্ত্রক।
আমেরিকার এই পদক্ষেপকে সমর্থন জানিয়েছেন ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুও। তিনি দাবি, বর্তমান সামরিক চাপ ইরানি জনগণের সামনে সরকার উৎখাতের জন্য অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করছে। হরমুজ় প্রণালীতে সংঘাতের ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ এবং সামুদ্রিক বাণিজ্য ব্যহত হওয়ার ফলে ওয়াশিংটন হুঁশিয়ারি দিয়েছিল যে অনেক কিছুর বিনিময়ে এর খেসারত দিতে হবে তেহরানকে। তার পরই ইরানের কোমর ভাঙতে নয়া চাল চেলেছে আমেরিকা। আইআরজিসির কমান্ড কাঠামোকে ভেতর থেকে ভেঙে ফেলার জন্য প্রয়োজনীয় অনুঘটক হতে পারে ‘রিওয়ার্ডস ফর জাস্টিস’, মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।