পর পর বৈঠক, বার বার ক্ষমতার হাতবদল, সচিবকে অপসারণ এবং পুনর্বহাল! স্পষ্ট হচ্ছে টিভিএস গোষ্ঠীর ভাঙনের ছবি?
সুন্দরম ক্লেটনের প্রথম বৈঠকটি হয় ২৭ মার্চ। পরেরটি হয় তিন দিন পর ৩০ মার্চ। প্রথম বৈঠকে কোম্পানির সচিব পিডি দেব কিষণের পদত্যাগপত্র গৃহীত হলেও পরবর্তী বৈঠকে তাঁকে সচিবপদে পুনর্বহাল করা হয়।
বহুজাতিক মোটরবাইক প্রস্তুতকারক সংস্থা টিভিএস-এর পরিবারে ভাঙন! সংস্থার পরিচালনা পর্ষদ পর্যন্ত পৌঁছোল টিভিএস গোষ্ঠীর প্রোমোটার এবং চেয়ারম্যান বেণু শ্রীনিবাসন এবং তাঁর কন্যা তথা ম্যানেজিং ডিরেক্টর লক্ষ্মী বেণুর মতপার্থক্য।
সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইকনমিক টাইমস’-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে সংস্থার পরিচালনা পর্ষদ দু’টি বৈঠক করেছে। আর সেই দুই বৈঠকেই ঘটে গিয়েছে অদ্ভুত ঘটনা। সেই ঘটনা এবং সিদ্ধান্তগুলির প্রেক্ষিতেই শ্রীনিবাসন এবং তাঁর কন্যা লক্ষ্মীর মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে বলে খবর।
টিভিএস গোষ্ঠীর পরিবারের অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা মূল সংস্থা সুন্দরম ক্লেটনের (বর্তমানে টিভিএস হোল্ডিংস লিমিটেড) বোর্ডরুমে প্রকাশ পাওয়ায় সংস্থাটির নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচালনা নিয়ে ইতিমধ্যেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। টিভিএস মোটরের ‘হোল্ডিং’ সংস্থা হিসাবে কাজ করে সুন্দরম ক্লেটন।
সুন্দরম ক্লেটনের প্রথম বৈঠকটি হয় ২৭ মার্চ। পরেরটি হয় তিন দিন পর ৩০ মার্চ। প্রথম বৈঠকে কোম্পানির সচিব পিডি দেব কিষণের পদত্যাগপত্র গৃহীত হলেও পরবর্তী বৈঠকে তাঁকে সচিবপদে পুনর্বহাল করা হয়। সূত্রের খবর, ওই কর্মকর্তাকে অপসারণের সিদ্ধান্ত নাকি লক্ষ্মীর ছিল।
সূত্রের খবর, গত সপ্তাহের শেষে তড়িঘড়ি করে ডাকা একটি বৈঠকে সংস্থার সচিবকে অপসারণের সিদ্ধান্তটি দ্রুত পাশ করান ম্যানেজিং ডিরেক্টর লক্ষ্মী। পূর্ববর্তী সচিবকে তাঁর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আগে তাঁর জায়গায় নতুন এক জনকে নিয়োগও করা হয়। ২৭ মার্চের সেই বৈঠকে সচিবের পদত্যাগের কারণ লক্ষ্মীর উত্থাপিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সংক্রান্ত উদ্বেগ বলেই মনে করা হচ্ছিল।
আরও পড়ুন:
লক্ষ্মী নাকি উল্লেখ করেছিলেন যে, সংস্থার সচিব সুন্দরম ক্লেটনের পাকাপাকি কর্মী নন এবং তিনি অন্য একটি সংস্থার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। সূত্রের খবর, সচিবের আনুগত্য নিয়েও নাকি প্রশ্ন তুলেছিলেন লক্ষ্মী।
এর তিন দিন পর তড়িঘড়ি আরও একটি বৈঠক ডাকা হয় পরিচালনা পর্ষদের তরফে। সেখানে সমস্ত সিদ্ধান্ত উল্টে যায়। পুনর্বহাল করা হয় সচিবকে। সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়, সংস্থাটি নাকি এখন তাঁকে পূর্ণকালীন কর্মী হিসাবে নিয়োগ করে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করছে।
সুন্দরম ক্লেটনের বোর্ডরুমে ২৭ মার্চ এবং ৩০ মার্চের দু’টি বৈঠকের ঘটনাপ্রবাহের পর সংস্থার চেয়ারম্যান আর গোপালন তাঁর পদ থেকে সরে দাঁড়ান। ৩০ মার্চের বৈঠকে এগ্জ়িকিউটিভ চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন শ্রীনিবাসন। যদিও গোপালন এখনও সংস্থার স্বতন্ত্র পরিচালক (ইনডিপেন্ডন্ট ডিরেক্টর) হিসাবে বহাল রয়েছেন।
এই পরিস্থিতি গোপালনকে উভয়সঙ্কটের মধ্যে ফেলেছে। তাঁকে এক দিকে যেমন ব্যবসায়িক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে, তেমনই অন্য দিকে তাঁর পরিবারের পরিবর্তনশীল গতিপ্রকৃতির মধ্যেও ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে।
আরও পড়ুন:
তবে একাধিক সূত্রকে উদ্ধৃত করে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, টিভিএস গোষ্ঠীর অন্দরে যে ধরনের পরিবর্তনগুলি হচ্ছে তা সাধারণত একটি কাঠামোগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে হয়। এমনকি কোন পদে কে বসবেন, তা-ও ঠিক হয় প্রক্রিয়া মেনেই। তবে এ ক্ষেত্রে তেমনটা হয়নি। যে পদ্ধতিতে সংস্থার সচিব পিডি দেব কিষণের পদত্যাগপত্র গ্রহণ এবং পরে তা প্রত্যাহার হয়েছে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রশ্ন উঠছে সংস্থার প্রশাসনিক অস্থিতিশীলতা নিয়েও।
২০২২ সালে একটি পারিবারিক সিদ্ধান্তে টিভিএস গোষ্ঠীর ব্যবসাগুলি ভাই-বোনদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। লক্ষ্মীকে সুন্দরম ক্লেটনের নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাঁর ভাই সুদর্শন বেণু গোষ্ঠীর প্রধান বিনিয়োগ শাখা টিভিএস হোল্ডিংসের দায়িত্ব নেন, যা টিভিএস মোটর কোম্পানি লিমিটেডেরও মূল সংস্থা।
ওয়াকিবহাল মহলের দাবি, তার পর থেকেই নাকি শ্রীনিবাসন এবং সন্তানদের মধ্যে সম্পর্কের সমীকরণে পরিবর্তন আসে। যদিও ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, বর্তমানে শ্রীনিবাসন এবং তাঁর পুত্র সুদর্শনের মধ্যে এক ধরনের সদ্ভাব তৈরি হয়েছে। অন্য দিকে, কন্যা লক্ষ্মী তাঁর মা মল্লিকা শ্রীনিবাসনের ঘনিষ্ঠ বলেই প্রথম থেকে শোনা যায়।
সুন্দরম ক্লেটনে চলা ক্ষমতা হস্তান্তরের পালা বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘সিকিউরিটিজ় অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অফ ইন্ডিয়া’ বা সেবির নজরে এসেছে বলে খবর। বিষয়টি নাকি খতিয়েও দেখতে শুরু করেছে তারা। ক্ষমতার লড়াই এবং সংস্থাটির পরিচালনা সংক্রান্ত উদ্বেগের কারণে তদন্তের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।
যদিও সূত্রের খবর, বিষয়টিকে সমস্যা হিসাবে দেখতে নারাজ সংস্থার কর্তারা। অনেকেই নাকি মনে করছেন, এই সমস্যা সাময়িক। যদিও অনেকে আবার মনে করছেন, সংস্থার অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের ভরসা নষ্ট করতে পারে।
সুন্দরম ক্লেটনের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে অবগত এক কর্তা সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, “সচিবের বিষয়টি উত্থাপন করেছিলেন লক্ষ্মী। তিনি প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার প্রতি অত্যন্ত মনোযোগী, তাই তিনি বিষয়টি উত্থাপন করেন।”
ওই ব্যক্তি আরও বলেন, “সংস্থার সচিবকে অবশ্যই একজন পূর্ণকালীন কর্মচারী হতে হবে এবং তাঁকে বোর্ডের এক স্তর নীচে থাকতে হবে। অন্য কোনও সংস্থার অধীনে চাকরিও করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে সেই নিয়ম মানা হচ্ছিল না।”
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংস্থাটিতে ঘটে যাওয়া এই সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ আপাতদৃষ্টিতে লক্ষ্মী এবং তাঁর বাবা শ্রীনিবাসনের মধ্যে মতবিরোধের ইঙ্গিত দিচ্ছিল। তবে, সূত্রগুলি জানিয়েছে, শ্রীনিবাসনের এগ্জ়িকিউটিভ চেয়ারম্যান হওয়াকে বোর্ড এবং পরিবার সর্বসম্মতিক্রমে স্বাগত জানিয়েছে।