সেনাপ্রধান থেকে অ্যাটর্নি জেনারেল, যুদ্ধের মধ্যে পর পর ছাঁটাই! ইরানে নয়, কেন আমেরিকাতেই ‘জমানা বদলাচ্ছেন’ ট্রাম্প?
ইরান যুদ্ধের মধ্যেই নজিরবিহীন ভাবে সেনাসর্বাধিনায়ক আর্মি চিফ অফ স্টাফ, জেনারেল র্যান্ডি জর্জকে বরখাস্ত করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চাকরি গিয়েছে অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডিরও। তেহরানে ‘রেজ়িম চেঞ্জের’ আগে যুক্তরাষ্ট্রের ঘরের মাটিতেই ‘জমানা বদল’? উঠছে প্রশ্ন।
ইরান যুদ্ধের মধ্যেই সেনাপ্রধানকে বরখাস্ত! চাকরি গিয়েছে তাঁর অধস্তন একাধিক শীর্ষ ফৌজি অফিসারের। এ ছাড়া পদ খুইয়েছেন স্বয়ং অ্যাটর্নি জেনারেল। নিন্দুকদের দাবি, অচিরেই কোপ পড়বে গুপ্তচর সংস্থার প্রধান, গোয়েন্দাপ্রধান এবং গণমাধ্যম সচিবের উপর। পারফরম্যান্সের অভাব, না কি ‘জমানা বদল’-এর (পড়ুন রেজ়িম চেঞ্জ) নামে নিজের ঘরের ‘ট্রয়ের ঘোড়া’দের চিহ্নিত করে দরজা দেখাচ্ছেন দোর্দণ্ডপ্রতাপ প্রেসিডেন্ট? এই নিয়ে আটলান্টিক এবং প্রশান্ত মহাসাগরের পারের ‘সুপার পাওয়ার’ দেশটিতে পড়ে গিয়েছে শোরগোল।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিনে ইজ়রায়েলকে সঙ্গে নিয়ে ইরান যুদ্ধ শুরু করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। লড়াইয়ের গোড়াতেই তেহরানে ‘রেজ়িম চেঞ্জ’ বা ‘জমানা বদলের’ ডাক দেন তিনি। কিন্তু, এপ্রিল আসতে না আসতেই প্রশ্নের মুখে পড়ে তাঁর একাধিক পদক্ষেপ। এর মধ্যে অন্যতম হল সেনাসর্বাধিনায়কের অপসারণ। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সংঘর্ষ পরিস্থিতিতে তা নজিরবিহীন বলেই জানিয়েছেন সামরিক বিশ্লেষকেরা। অন্য দিকে এই ইস্যুতে ‘দ্য আটলান্টিক’ নামের পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে একটি প্রতিবেদন।
মার্কিন পত্রিকাটির দাবি, ইরানে নয়, আপাতত নিজের ঘরেই (পড়ুন প্রশাসন) ‘রেজ়িম চেঞ্জ’ বা ‘জমানা বদল’ করতে চাইছেন ট্রাম্প। আর তাই বেছে বেছে পূর্বসূরি জো বাইডেন জমানার যাবতীয় অফিসারদের সরাচ্ছেন তিনি। তা ছাড়া কোনও প্রশ্ন না করে তাঁর নির্দেশ পালন করবেন, এমন ব্যক্তিদেরই গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখতে চান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। সেখানে ‘বিদ্রোহী’, ‘নেতিবাচক’ বা ‘সাবধানি’ আধিকারিকদের একেবারেই পছন্দ নয় তাঁর।
বিশ্লেষকদের দাবি, এর শুরুটা আর্মি চিফ অফ স্টাফ জেনারেল র্যান্ডি জর্জকে দিয়ে করেছেন ট্রাম্প। গত ২ এপ্রিল তাঁকে পদ থেকে সরে দাঁড়াতে বলেন মার্কিন যুদ্ধসচিব পিট হেগসেথ। সংবাদসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই দিনই সন্ধ্যার মধ্যে একটি বিবৃতি দেয় যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ দফতরের সদর কার্যালয় পেন্টাগন। সেখানে বরখাস্তের কথা বলা হয়নি। পেন্টাগনের বিবৃতি অনুযায়ী, ‘‘আমেরিকার ৪১তম সেনা সর্বাধিনায়ক (আর্মি চিফ অফ স্টাফ) হিসাবে অবসরগ্রহণ করেছেন জেনারেল র্যান্ডি জর্জ।’’
চার তারাযুক্ত (ফোর স্টার) জেনারেল জর্জের আর্মি চিফ অফ স্টাফ হিসাবে কার্যকালের মেয়াদ আরও দেড় বছর বাকি ছিল। তার আগেই কেন তাঁকে সরানো হল, সেই প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব এখনও দেয়নি পেন্টাগন। তবে হোয়াইট হাউসের আনাচকানাচ থেকে উঠে আসছে নানা তত্ত্ব। এর মধ্যে সবচেয়ে জোরালোটি হল, ট্রাম্পের নীতির সঙ্গে সাযুজ্য রেখে চলতে না পারা, যার জেরে যুদ্ধসচিব পিট হেগসেথের রোষেও পড়েন তিনি।
আরও পড়ুন:
এ বছরের জানুয়ারির শুরুতেই ভেনেজ়ুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে বড় সাফল্য পায় মার্কিন ফৌজ। দক্ষিণ আমেরিকার দেশটিতে ঢুকে সস্ত্রীক সেখানকার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে আসে যুক্তরাষ্ট্রের ডেল্টা ফোর্স। এর জেরে রাতারাতি কারাকাসের যাবতীয় খনিজ তেলের নিয়ন্ত্রণ হাতে পেয়ে যান ট্রাম্প। পাশাপাশি, আরও এক বার ‘সুপার পাওয়ার’ হিসাবে সারা বিশ্বে প্রতিষ্ঠা হয় ওয়াশিংটনের শক্তি।
সাবেক সেনাকর্তাদের বড় অংশই মনে করেন, ইরানেও ভেনেজ়ুয়েলার মতো সাফল্য পেতে চাইছেন ট্রাম্প। তেহরানের প্রত্যাঘাতের জেরে বাস্তবে যা অসম্ভব। জেনারেল জর্জ হয়তো সেটাই ‘একগুঁয়ে’ প্রেসিডেন্টকে বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন, যার জেরে চাকরি হারাতে হল তাঁকে। বাইডেন জমানায় আর্মি চিফ অফ স্টাফ হিসাবে নিয়োগপত্র পান জর্জ। তাঁর অপসারণের প্রভাব বাহিনীর নীচুতলায় পড়লে পশ্চিম এশিয়ায় লড়াইয়ের মধ্যে পরিস্থিতি যে জটিল হবে, তা বলাই বাহুল্য।
পেন্টাগনের দুই আধিকারিককে উদ্ধৃত করে রয়টার্স জানিয়েছে, জর্জের পাশাপাশি এপ্রিলে সেনা প্রশিক্ষক বিভাগের (আর্মি ট্রান্সফরমেশন অ্যান্ড ট্রেনিং কমান্ড) অফিসার জেনারেল ডেভিড হোডনে এবং চ্যাপলেন কোরের প্রধান মেজর জেনারেল উইলিয়াম গ্রিনকেও বরখাস্ত করেছেন হেগসেথ। সূত্রের খবর, ট্রাম্পের কঠোর জাতীয় নিরাপত্তা নীতির সঙ্গে সাযুজ্য রেখে আমেরিকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে চাইছেন তিনি। এর জেরে তাঁর কলমের খোঁচায় চাকরি যাচ্ছে একের পর এক শীর্ষ সেনা অফিসারের।
এ বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি একসঙ্গে পাঁচ জন ফৌজি আধিকারিককে বরখাস্ত করেন হেগসেথ। তাঁরা হলেন, জয়েন্ট চিফ্স অফ স্টাফ, এয়ারফোর্স জেনারেল সি কিউ ব্রাউন, চিফ অফ নেভাল অপারেশন্স, অ্যাডমিরাল লিসা ফ্রাঞ্চেত্তি, জ্যাগ (জাজ় অ্যাডভোকেট জেনারেল) আর্মি, লেফটেন্যান্ট জেনারেল তৃতীয় জোসেফ বার্জার, জ্যাগ এয়ারফোর্স, লেফটেন্যান্ট জেনারেল চার্লস এল প্লামার এবং জ্যাগ নেভি রেয়ার অ্যাডমিরাল লিয়া এম রেনল্ড্স। এদের অধিকাংশই ফোর স্টার জেনারেল বলে জানা গিয়েছে।
আরও পড়ুন:
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এই পাঁচ জনের বরখাস্ত প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার ছ’দিনের মাথায় (পড়ুন ২৮ ফেব্রুয়ারি) ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করে মার্কিন সেনা। তার সাঙ্কেতিক নাম ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। আক্রমণের নীলনকশা তৈরিতে জয়েন্ট চিফ্স অফ স্টাফ, এয়ারফোর্স জেনারেল ব্রাউন এবং চিফ অফ নেভাল অপারেশন্স, অ্যাডমিরাল ফ্রাঞ্চেত্তির কোনও ভূমিকা ছিল কি না, তা অবশ্য জানা যায়নি। তবে হামলার ব্যাপারে আপত্তি তোলায় তাঁদের চাকরি গিয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
এ ছাড়া চ্যাপলিন কোরের প্রধান মেজর জেনারেল গ্রিনের বরখাস্ত নিয়ে একটা তত্ত্ব প্রকাশ্যে এসেছে। মার্কিন গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, অবিলম্বে ইরানে স্থল অভিযান (গ্রাউন্ড অপারেশন) শুরু করতে চাইছেন ট্রাম্প। সেই লক্ষ্যে পশ্চিম এশিয়ায় সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধি করেছেন তিনি। পাশাপাশি, সেখানে পাঠানো হয়েছে ‘উভচর’ যুদ্ধে পটু ইউএসএস ত্রিপোলিকে। সংশ্লিষ্ট রণতরীটিতে ২,৫০০-এর বেশি সৈন্য আছে বলে সূত্র মারফত মিলেছে খবর।
কিন্তু সমস্যার জায়গা হল, ইরানে ‘গ্রাউন্ড অপারেশন’ শুরু হওয়ার আগেই আমেরিকা জুড়ে ট্রাম্পের নীতি নিয়ে উত্তাল হচ্ছে বিক্ষোভ। প্রেসিডেন্টকে ‘রাজা’র সঙ্গে তুলনা করে যুক্তরাষ্ট্রবাসীকে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করতে দেখা গিয়েছে। এর আঁচ পড়েছে সেনাবাহিনীতেও। সূত্রের খবর, মার্কিন সৈনিকদের একাংশ পশ্চিম এশিয়ার রণাঙ্গনে যেতে নারাজ। এ ব্যাপারে তাঁদের বোঝানোর দায়িত্ব নাকি ছিল মেজর জেনারেল গ্রিনের। কিন্তু এ ব্যাপারে তাঁর পারফরম্যান্স একেবারেই মনঃপূত হয়নি হেগসেথের।
সেনা আধিকারিকদের বাদ দিলে ২ এপ্রিল কাজ হারান মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি। তাঁর অপসারণের খবর অবশ্য নিজের সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ পোস্ট করে সবাইকে জানান ট্রাম্প। ‘এপস্টিন ফাইলে’ নাম উঠে আসায় যৌন কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। সেই মামলায় আদালতে সরকার পক্ষের আইনজীবী ছিলেন বন্ডি। তাঁর সাহায্যে গোটা বিষয়টাকে ধামাচাপা দিতে চেয়ে ব্যর্থ হন ‘পোটাস’ (প্রেসিডেন্ট অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস), যার খেসারত দিল হল অ্যাটর্নি জেনারেলকে, বলছেন বিশ্লেষকেরা।
মার্কিন পত্রিকা ‘দ্য আটলান্টিক’ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তকারী গোয়েন্দা সংস্থা ‘ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন’ বা এফবিআইয়ের ডিরেক্টর পদে থাকা ভারতীয় বংশোদ্ভূত কাশ পটেলকে এ বার বরখাস্ত করবেন ট্রাম্প। ২০২১ সালে নির্বাচনে হেরে গিয়ে হোয়াইট হাউস ছাড়তে চাননি তিনি। শুধু তা-ই নয়, ওই সময় ট্রাম্পের সমর্থকদের বিরুদ্ধে ‘ক্যাপিটল হিলে’ তাণ্ডব চালানোর অভিযোগ ওঠে। বাইডেন জমানায় সেই ঘটনার তদন্তে নামে এফবিআই।
‘দ্য আটলান্টিক’-এর দাবি, কুর্সিতে বসার পর ওই ঘটনার তদন্তে জড়িত একাধিক আধিকারিককে অন্যত্র সরিয়েছেন কাশ। কিন্তু, তাতেও তাঁর উপর একেবারেই সন্তুষ্ট নন ট্রাম্প। এ ছাড়া প্রেসিডেন্টের হাতে ছাঁটাই হতে পারেন জাতীয় গোয়েন্দাসংস্থা ‘ইউনাইটেড স্টেটস ডিরেক্টর অফ ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স’-এর প্রধান তথা আর এক ভারতীয় বংশোদ্ভূত তুলসী গাবার্ড। যদিও এ ব্যাপারে এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি ‘পোটাস’।
সম্প্রতি, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার প্রাক্তন ডেপুটি ডিরেক্টর জো কেন্ট দাবি করেন, ইরানের দিক থেকে আমেরিকার এখনই কোনও নিরাপত্তাগত ঝুঁকি নেই। একটি সূত্রের দাবি, তার পরেই কেন্টকে পদত্যাগ করতে বলা হয়। সেই সময় নাকি নিজের ডেপুটির ‘যথাযথ’ সমালোচনা করেননি তুলসী। এর জেরে তিনি ট্রাম্পের বিরক্তির কারণ হয়ে উঠেছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
দ্বিতীয় বারের জন্য ক্ষমতায় আসার পর হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব হিসাবে ক্যারোলিন লিভিটকে নিয়োগ করেন ট্রাম্প। সম্প্রতি প্রকাশ্যে তাঁর সমালোচনা করেন প্রেসিডেন্ট। বলেন, ‘‘কেউ কেউ বলছেন আমার জনপ্রিয়তা ৯৩ শতাংশ কমে গিয়েছে। কারও মতে সেটা ৯৭ শতাংশ। কোনটা ঠিক, আমি সেটা জানি না। তবে নিশ্চয়ই ক্যারোলিন ঠিকমতো কাজ করছেন না। নইলে সূচক নীচের দিকে যায় কী ভাবে?’’
এর মধ্যেই আবার বিমানহামলা চালিয়ে ইরানের দীর্ঘতম সেতু বি-১কের কিছুটা অংশ উড়িয়ে দিয়েছে মার্কিন এবং ইজ়রায়েলি বায়ুসেনা। ওই অভিযানের ছবি পোস্ট করে তেহরানকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ট্রাম্প। পাল্টা পশ্চিম এশিয়ার আটটা সেতু ধ্বংসের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে সাবেক পারস্যের শিয়া ফৌজ। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের ‘জমানাবদল’ লড়াইয়ে আদৌ কোনও প্রভাব ফেলে কি না, সেটাই এখন দেখার।