থাকে বিশেষ রাসায়নিক! কেন সহজে ওঠে না ভোটের কালি? তৈরি করে কারা? নেপথ্যে অনেক ইতিহাস, রহস্য
আগে বাঁ হাতের তর্জনীর নখ আর চামড়ার সংযোগস্থলেই লাগানো হত ভোটের কালি। এখন লম্বা করে একেবারে নখের উপরিভাগ থেকে তর্জনীর প্রথম গাঁটের আগে পর্যন্ত। স্বভাবতই কালি লাগে বেশি।
এ কালি একেবারেই কলঙ্কের নয়, গর্বের। গণতন্ত্রের উৎসব ভোট দিতে গিয়ে বাঁ হাতের তর্জনীর উপর লাগে এই কালি। ভোট দিয়ে বেরিয়ে অনেকেই গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের অহঙ্কার ধরে রাখেন নিজস্বীতে। কমবয়সিদের মধ্যে সেই প্রবণতা বেশি।
জেরক্স মেশিন থেকে ফাউন্টেন পেন, চাইনিজ ইঙ্ক থেকে ভুসো— হরেক রকম কালি বাজারে মিলতে পারে, কিন্তু মাথা কুটে মরলেও ভোটের কালির দোয়াত জুটবে না। খোলা বাজারে এই কালি বিক্রিই হয় না। বরাত দিয়ে বানাতে হয়।
ভোটের এই ‘কালি-কথা’ অনেক রহস্যে মোড়া। ইতিহাসও দীর্ঘ দিনের। ভারতে ভোটের কালির ব্যবহার শুরু হয় ১৯৬২ সালে। দেশে তৃতীয় লোকসভা নির্বাচনের সময় থেকে। ঠিক হয়, ভোটে কারচুপি বন্ধ করতে ভোটারদের বাঁ হাতের তর্জনীতে কালি লাগিয়ে দেওয়া হবে। সেই শুরু। কালের নিয়মে কালি লাগানোর নিয়ম বদলেছে। কালি বদলায়নি।
সবাই ‘ভোটের কালি’ বলে চিনলেও এর আসল নাম ‘ইনডেলিবল ইঙ্ক’। অর্থাৎ, যে কালি সহজে বদলে ফেলা যায় না, মুছে ফেলা যায় না। পাল্স পোলিও টিকাপ্রাপক খুদেদের হাতে ‘ইনডেলিবল ইঙ্ক’ লাগানো হলেও প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ভোটের কালি অন্য রকম।
নির্বাচন কমিশন যে কালি ব্যবহার করে, তা খোলা বাজারে কিনতে পাওয়া যায় না। কমিশন বরাত দিয়ে বানায়। এই কালি বানানোর অথরিটি রয়েছে গোটা দেশে মোটে দু’-একটি সংস্থার হাতেই। তার মধ্যে প্রধান মাইসুরু পেন্টস অ্যান্ড ভার্নিশ লিমিটেড। সংক্ষেপে ‘এমপিভিএল’। বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো ভোটের কালি নির্মাতা।
আরও পড়ুন:
মাইসুরুর এক কোণে ১৬ একর জায়গা জুড়ে থাকা এমপিভিএলের কারখানায় নির্বাচন কমিশনের প্রয়োজন অনুযায়ী এই কালি তৈরি করা হয়। এই সংস্থার ইতিহাসও দীর্ঘ। ১৯৩৭ সালে মাইসুরুর রাজপরিবারের উদ্যোগে তৈরি হয়েছিল ‘মাইসোর ল্যাক ফ্যাক্টরি’ নামে এক সংস্থা।
স্বাধীনতার পরে সংস্থাটি অধিগ্রহণ করে কর্নাটক সরকার। শুরুতে গালা তৈরির সংস্থা হিসাবে পরিচিতি থাকলেও এখন অন্যান্য সামগ্রীর পাশাপাশি ভোটের কালিও বানায় এমপিভিএল। ইভিএম-এর যুগে মূলত কালি কিনলেও আগে ব্যালট বাক্স সিল করার জন্য এই সংস্থা থেকেই গালা কিনত নির্বাচন কমিশন।
শুধু ভারতই নয়, এই সংস্থার কালি ভোটের জন্য যায় বিশ্বের অন্য অনেক দেশেও। মাইসুরুর এমপিভিএল সংস্থার চাহিদা দিন দিন বেড়েছে। শুধু ভোটারসংখ্যা বাড়ার জন্যই নয়, নির্বাচন কমিশনের পরিবর্তিত নিয়মে এখন কালি লাগেও বেশি।
আগে বাঁ হাতের তর্জনীর নখ আর চামড়ার সংযোগস্থলেই লাগানো হত ভোটের কালি। এখন লম্বা করে একেবারে নখের উপরিভাগ থেকে তর্জনীর প্রথম গাঁটের আগে পর্যন্ত। স্বভাবতই কালি লাগে বেশি।
আরও পড়ুন:
পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনেও সেই ভোটের কালি ব্যবহার হচ্ছে। নির্বাচনের জন্য লক্ষ লক্ষ শিশি কালির প্রয়োজন হয়। তৈরিতে খরচ হয় কোটি কোটি টাকা। ১০ মিলিগ্রামের একটি শিশি থেকে প্রায় ৭০০ জন ভোটারের নখে কালি লাগানো যেতে পারে।
কিন্তু আসল প্রশ্ন হল, কী থাকে এই কালিতে? কেন তা সহজে মুছে ফেলা যায় না? এর নেপথ্যে রয়েছে কঠোর গোপনীয়তা। ১৯৬২ সালে কালির ফর্মুলা তৈরি করেছিল ‘ন্যাশনাল ফিজ়িক্যাল ল্যাবরেটরি’। গোপন সেই ফর্মুলা তুলে দেওয়া হয়েছিল এমপিভিএল-এর হাতে। এখনও পর্যন্ত সংস্থা গোপনই রেখেছে সেই ফর্মুলা।
শোনা যায়, সংস্থার দু’জন কর্মী অর্ধেক অর্ধেক ফর্মুলা জানেন। এটাই নিয়ম। তাঁরা অবসর নেওয়ার আগে বিশ্বস্ত উত্তরসূরি বেছে নেন। বলে দিয়ে যান ফর্মুলার কথা। এ ভাবেই চলতে থাকে। উৎপাদনে অনেকে যুক্ত থাকলেও উপাদানের কথা কেউই পুরোটা জানেন না।
যদিও অনেকে মনে করেন ‘সিলভার নাইট্রেট’ এই কালির অন্যতম উপাদান। এ ছাড়াও কিছু রাসায়নিক এবং রং থাকে। আর চট করে শুকিয়ে যাওয়ার জন্য দেওয়া থাকে অ্যালকোহল।
মূলত ‘সিলভার নাইট্রেট’ থাকার কারণেই নাকি আঙুলে লাগার পরে চামড়ার প্রোটিনের সঙ্গে বিক্রিয়ায় আটকে যায়। আর সূর্যের আলো পেলে অতিবেগনি রশ্মির গুণে কালচে রং হয়ে আঙুলে চেপে বসে।
শুধু তা-ই নয়, ‘সিলভার নাইট্রেট’-এর পরিমাণের উপরে নির্ভর করে কত দিন সেই দাগ স্থায়ী হবে। তবে সেটা এমন পরিমাণেই দেওয়া হয়, যাতে চামড়ার কোনও ক্ষতি না হয়। ভারতে যে কালি ব্যবহার করা হয়, তা খুব জোর দুই থেকে তিন সপ্তাহ স্থায়ী হয়।
চট করে নখ-চামড়া থেকে না ছাড়ার গুণ থাকলেও ভোটের কালিকে নাকি হারানো যায়। নানা নামে বার বার ভোট দিয়ে গর্ব করতেন এবং করেন যে সব অসৎ ভোটারেরা, তাঁদের কাছে অনেক কারসাজির কথাও শোনা যায়। যদিও কালি লাগানোর আগে ও পরে নানা কৌশলে সাফল্য সত্যিই কতটা মেলে, তা জানা সম্ভব হয়নি।