হরমুজ়ে চমকাচ্ছে ইরান, বিরল খনিজ নিয়ে চিন! সবার মুখ বন্ধ করার অনন্য ‘জাদুকাঠি’ হাতে মুচকি হাসছেন ট্রাম্প
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপর চাপ বাড়াতে হরমুজ় প্রণালী অবরুদ্ধ করে রেখেছে ইরান। অন্য দিকে বিরল খনিজ নিয়ে হুমকি দিতে দেখা যাচ্ছে চিনকে। বিশ্লেষকদের দাবি, আমেরিকার হাতে এমন একটি যৌগ আছে যাতে লড়াই ছেড়ে পালাতে বাধ্য হতে পারে তার প্রতিপক্ষেরা।
কখনও ইরান, কখনও আবার চিন। ‘সুপার পাওয়ার’ আমেরিকাকে যখন-তখন চমকাচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপর চাপ বাড়াতে আলাদা আলাদা রণকৌশল তাদের। তেহরান যেমন অবরুদ্ধ রেখেছে পারস্য উপসাগরের হরমুজ় প্রণালী। অন্য দিকে প্রায়ই বিরল খনিজের (রেয়ার আর্থ মিনারেল্স) সরবরাহ বন্ধ করার হুমকি দিয়ে থাকে বেজিং। যদিও বিশ্লেষকেরা বলছেন, এক সেকেন্ডে বিশ্বকে থমকে দেওয়ার ‘জাদুকাঠি’ রয়েছে ওয়াশিংটনেরই হাতে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেই ‘মন্ত্রপূত জাদুদণ্ড’টির নাম বিশুদ্ধ কোয়ার্জ়, ২১ শতকের অর্থনীতিতে যার গুরুত্ব অপরিসীম। মাইক্রোচিপ, সৌরপ্যানেল, কাচ এবং অন্যান্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সামগ্রী তৈরির অত্যাবশ্যক উপাদান হিসাবে ব্যবহার হয় এই যৌগ। এর পরিশুদ্ধ রূপ বর্তমানে একমাত্র মেলে আমেরিকার উত্তর ক্যারোলিনার সমুদ্রসৈকতের বালিতে।
বিশ্বের সব দেশেই কম-বেশি কোয়ার্জ় মেলে। সংশ্লিষ্ট যৌগটি মূলত মিশে থাকে বালিতে। যদিও সেই কোয়ার্জ় একেবারেই পরিশুদ্ধ নয়। বালিতে লোহা ও ম্যাগনেশিয়ামের মতো পদার্থের সঙ্গে মিশে থাকে এই যৌথ। অন্য দিকে আবার মাইক্রোচিপ বা সৌরপ্যানেলের মতো সামগ্রী নির্মাণে চাই ৯৯ শতাংশেরও বেশি বিশুদ্ধ কোয়ার্জ়। আর সেখানেই এগিয়ে আছে আমেরিকা।
একটা উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টা বুঝে নেওয়া যেতে পারে। ফ্রান্সের ফ্রন্টেনব্লু শহরে যে কোয়ার্জ় মেলে তার বিশুদ্ধতার পরিমাণ ৯৯.৯৭ শতাংশ। এ ছাড়া ৯৯.৯৮ শতাংশ বিশুদ্ধ কোয়ার্জ় পাওয়া যায় স্কটল্যান্ডের লোছালাইন এলাকার বালিতে। কিন্তু এগুলির কোনওটাই মাইক্রোচিপ বা সৌরপ্যানেল তৈরির কাঁচামাল হিসাবে উপযুক্ত নয়। সেখানে ব্যবহার হয় আরও বিশুদ্ধ যৌগ।
বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, মাইক্রোচিপ বা সৌরপ্যানেল নির্মাণে যে কোয়ার্জ় ব্যবহার হয়ে থাকে, তার বিশুদ্ধতার পরিমাণ হতে হবে ৯৯.৯৯৯৯৯৯৯৯৯ শতাংশ। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, উৎপাদনকেন্দ্রের রকমফেরের উপর এই সংখ্যার পরিবর্তন হতে পারে। বর্তমানে বিশ্বের দু’টি দেশে রয়েছে মাইক্রোচিপ নির্মাণের হাব। সেগুলি হল গণপ্রজাতন্ত্রী চিন (পিপল্স রিপাবলিক অফ চায়না) এবং সাবেক ফরমোজ়া বা তাইওয়ান (রিপাবলিক অফ চায়না)।
আরও পড়ুন:
পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, তুলনামূলক ভাবে কিছুটা কম বিশুদ্ধ কোয়ার্জ় দিয়ে মাইক্রোচিপ নির্মাণ করে বেজিং। অন্য দিকে, তাইপের কারখানাগুলিতে ব্যবহার হচ্ছে ৯৯.৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯ শতাংশ বিশুদ্ধ কোয়ার্জ়। আর তাই তাদের তৈরি সেমিকন্ডাক্টরের দুনিয়া জুড়ে সুখ্যাতি রয়েছে। ড্রাগনের তৈরি চিপ এখনও সেই জায়গায় পৌঁছোতে পারেনি বলেই মনে করে ওয়াকিবহাল মহল।
বর্তমানে বিশ্বের একটি জায়গাতেই এতটা বিশুদ্ধ কোয়ার্জ় পাওয়া যায়। সেটা যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর ক্যারোলিনা রাজ্যের স্প্রুস পাইন এলাকায় অবস্থিত। মার্কিন সরকার সেখানকার যৌগ বিভিন্ন দেশে রফতানি করে থাকে। তা ছাড়া সেখান থেকে কোয়ার্জ় যায় চিন এবং তাইওয়ানে। সামরিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ভবিষ্যতে ওয়াশিংটন-বেজিং সম্পর্ক আরও জটিল হলে সংশ্লিষ্ট যৌগটির সরবরাহ বন্ধ করে ড্রাগনকে বিপদে ফেলতে পারে আমেরিকা।
আর তাই এই একটি ব্যাপারে মার্কিন নির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘ দিন ধরেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে চিন। গত বছরের (পড়ুন ২০২৫) জুলাইয়ে উচ্চ মানের বিশুদ্ধ কোয়ার্জ়ের বিশাল ভান্ডারের হদিস মেলার কথা ঘোষণা করে বেজিঙের প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রক। এর পরই দুনিয়া জুড়ে পড়ে যায় শোরগোল। যদিও তখন বিশুদ্ধতার মাত্রা জানায়নি ড্রাগন।
চিনের প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রকের বিবৃতি অনুযায়ী, হেনান প্রদেশের কিনলিং এবং উইঘুর মুসলিম অধ্যুষিত স্বায়ত্তশাসিত শিনজিয়াং প্রদেশের আলতাই এলাকার মাটির গভীরে জমা রয়েছে ওই ‘কুবেরের ধন’। খুব শীঘ্রই এর উত্তোলন শুরু করবে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিঙের প্রশাসন। সূত্রের খবর, এ বছরের মাঝামাঝি থেকে বাণিজ্যিক ভাবে কোয়ার্জ় উত্তোলন শুরু করবে বেজিং।
আরও পড়ুন:
ড্রাগন প্রশাসন জানিয়েছে, ওই এলাকাগুলির ভূগর্ভস্থ কোয়ার্জ়ের আনুমানিক পরিমাণ ৩ কোটি ৫০ লক্ষ মেট্রিক টন। সংশ্লিষ্ট খনিজ পদার্থটিতে মিশে আছে ন্যূনতম ৯৯.৯৯৫ শতাংশ সিলিকন ডাই-অক্সাইড। অর্থাৎ, হদিস মেলা কোয়ার্জ়ের গুণগত মান খুব ভাল বলেই মনে করছে তারা। এগুলিকে অনায়াসেই সেমিকন্ডাক্টর-গ্রেড সিলিকন ওয়েফার, ফোটোভোলটাইক সেল এবং অত্যাধুনিক অপটিক্যাল উপাদান তৈরিতে ব্যবহার করা যাবে বলে আশাবাদী বেজিং।
জিনপিং প্রশাসনের দাবি, ভূগর্ভস্থ কোয়ার্জ়ের আনুমানিক বাজারমূল্য ১৪০ কোটি ইউরো। ভারতীয় মুদ্রায় সেটা প্রায় ১৫ হাজার ৩২ কোটি টাকা। তবে এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। কারণ কোয়ার্জ়ের দাম তার বিশুদ্ধতার উপর নির্ভরশীল। বেজিঙের খনিজের মান যে ‘ভাল’ তার কোনও আন্তর্জাতিক প্রমাণ নেই। সেই কারণেই এই ইস্যুতে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন তাঁরা।
চিনে কোয়ার্জ়ের হদিস মিলতেই যৌগটির গুণগত মান নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে ওয়ার্ল্ড-এনার্জি এবং বেজিঙের জনপ্রিয় গণমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস। তাদের দাবি, বিশুদ্ধতার বাইরে গিয়েও অর্থনীতিতে এর আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। কারণ, আগামী দিনের ‘গেম চেঞ্জার’ হতে চলা সংশ্লিষ্ট যৌগটির বেশ কিছু অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন, এর উচ্চ তাপমাত্রা সহ্য করার ক্ষমতা।
দ্বিতীয়ত, ক্ষয়প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং অপটিক্যাল স্বচ্ছতা থাকার দরুন অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সামগ্রী নির্মাণে এর বহুল ব্যবহার হচ্ছে। এত দিন পর্যন্ত মূলত আমেরিকা থেকে কোয়ার্জ় আমদানি করত চিন। এই খাতে বেজিঙের খরচ দাঁড়িয়েছে বছরে ১৫০ কোটি ডলার। সেটার পুরোটাই এ বার সাশ্রয় করতে চাইছে ড্রাগন সরকার। পাশাপাশি, ব্যাপক ভাবে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি করার সুযোগ রয়েছে মান্দারিনভাষীদের।
সূত্রের খবর, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর ক্যারোলিনার স্প্রুস পাইন খনির ৮০ শতাংশ কোয়ার্জ় আমদানি করছে চিন। সাবেক সেনাকর্তারা মনে করেন, এই নির্ভরশীলতার কারণেই ওয়াশিংটনকে চ্যালেঞ্জ করার ব্যাপারে অনেক সময় দ্বিতীয় বার ভাবতে হচ্ছে বেজিংকে। হেনান প্রদেশের খনি সেই চিন্তা দূর করবে বলে আশাবাদী ড্রাগন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।
বিশ্লেষকদের কেউ কেউ আবার মনে করেন, চিনের কিনলিং এবং আলতায় উচ্চ মানের বিশুদ্ধ কোয়ার্জ়ের বিপুল ভান্ডারের হদিস মেলায় সংশ্লিষ্ট খনিজটির বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খল পুরোপুরি পাল্টে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে সেমিকন্ডাক্টর এবং সৌরশক্তি শিল্পে বেজিঙের একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী রয়েছে। ভূগর্ভস্থ ‘কুবেরের ধন’ হাতে পাওয়ায় অচিরেই মান্দারিনভাষীরা তাদের সবাইকে ছাপিয়ে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
চিনের একাধিক গবেষণা এবং শিল্প সংস্থা বাণিজ্যিক ভাবে কোয়ার্জ় উৎপাদন করে থাকে। বিশুদ্ধতার নিরিখে সেগুলি ৪এন৫ এবং ৪এন৮ স্তরে পৌঁছোতে পেরেছে। অর্থাৎ, কৃত্রিম ভাবে তৈরি কোয়ার্জ়ে সিলিকন ডাই-অক্সাইড থাকছে যথাক্রমে ৯৯.৯৯৫ এবং ৯৯.৯৯৮।
গ্লোবাল টাইমসের দাবি, খনিতে যে যৌগ পাওয়া গিয়েছে সেগুলিও একই রকম গুণগত মানসম্পন্ন বলে মনে করা হচ্ছে। তবে প্রয়োজনে কিছু ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কোয়ার্জ়গুলিকে পরিশোধন করতে হতে পারে। সেই পরিকাঠামো বেজিঙের রয়েছে। যদিও সেটা বেশ ব্যয়বহুল হতে পারে।
এ বছর জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে চিনের সফরে যাওয়ার কথা আছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের। সেখানে ড্রাগন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিঙের মুখোমুখি হবেন তিনি। তাঁদের বৈঠকে বিরল খনিজ, সেমিকন্ডাক্টর এবং কোয়ার্জ়ের মতো বিষয়গুলি উঠবে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।