Advertisement
E-Paper

খামেনেইকে মেরেও ইরানকে বাগে আনতে পারছে না আমেরিকা! কেন ‘বিলায়ত-অল-ফকীহ’কে ডরাচ্ছে ওয়াশিংটন?

১৯৭৯ সালের ‘ইসলামীয় বিপ্লব’-এর পর ‘বিলায়ত অল-ফকীহ’ তত্ত্বটি ইরানের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ‘বিলায়ত অল-ফকীহ’ হল এমন একটি শাসনপদ্ধতি যেখানে এক জন শীর্ষস্থানীয় ধর্মীয় নেতা রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসাবে কাজ করেন, যাতে রাষ্ট্র পরিচালনার কোনও সিদ্ধান্তই ইসলামি আদর্শের বাইরে না যায়।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ০৭ মার্চ ২০২৬ ১৪:৩৮
Iranian doctrine
০১ / ১৯

১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ইরানি রাজতন্ত্রকে উৎখাত করে রাতারাতি কট্টরপন্থী দেশে পরিণত হয় ইরান। পশ্চিমি সংস্কৃতির ধারক ও বাহক ছিল তৎকালীন শাসক তথা ইরানি রাজপরিবার। পশ্চিমি সংস্কৃতিকে সমূলে ধ্বংস করার জন্য ‘ইরান বিপ্লবের’ নায়কেরা সাবেক পারস্যদেশের শাসনতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দেন। সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করা একটি শাসনব্যবস্থা বা মতাদর্শের প্রচলন হয় উপসাগরীয় রাষ্ট্রটিতে।

Iranian doctrine
০২ / ১৯

সহজ কথায় বলতে গেলে, এটি শুধুমাত্র শাসনব্যবস্থা নয়, বরং একটি মতাদর্শ, যা পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকার আধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই তারা আমেরিকাকে পরম শত্রু বলে ভাবতে শুরু করে। আটলান্টিকের পারের দেশটির পশ্চিম এশিয়ায় ‘দাদাগিরি’ খর্ব করতে কট্টরপন্থা অবলম্বন করে পুরোপুরি শিয়া ধর্মাবলম্বী শাসনব্যবস্থা কায়েম করেন ‘ইসলামীয় বিপ্লবের’ নেতারা।

Iranian doctrine
০৩ / ১৯

শিয়া ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, ইসলামের প্রকৃত নেতা বা ‘ইমাম’ বর্তমানে অদৃশ্য অবস্থায় আছেন। ঐতিহ্যগত ভাবে বিশ্বাস করা হত যে, হজরত মহম্মদের ১২তম বংশধর ইমাম মাহদী ফিরে না আসা পর্যন্ত কোনও পূর্ণাঙ্গ ইসলামি সরকার গঠন করা সম্ভব নয়। কিন্তু ১৯৭০-এর দশকে রুহুল্লা মুসাভি খোমেইনি এই ধারণা পরিবর্তন করে ‘বিলায়ত অল-ফকীহ’ তত্ত্বটি ইরানের জনগণের সামনে খাড়া করেন।

Iranian doctrine
০৪ / ১৯

তত্ত্বের সারমর্ম হল ইমামের অনুপস্থিতিতে সমাজ পরিচালনার দায়িত্ব একজন যোগ্য, ন্যায়পরায়ণ এবং ইসলামি আইনে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তির ওপর ন্যস্ত থাকবে। ‘ফকীহ’ শব্দের অর্থ, যিনি ইসলামি আইন বা ফিকহ শাস্ত্রে সর্বোচ্চ পণ্ডিত। আর ‘বিলায়ত’-এর অর্থ হল অভিভাবকত্ব বা শাসন করার ক্ষমতা। অর্থাৎ, এক জন শীর্ষস্থানীয় মুসলিম ধর্মতত্ত্ববিদ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতা হিসাবে দায়িত্ব পালন করবেন।

Iranian doctrine
০৫ / ১৯

১৯৭৯ সালের ‘ইসলামীয় বিপ্লব’-এর পর এই তত্ত্বটি ইরানের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ‘ইসলামীয় বিপ্লব’-এর পর ইরানকে কট্টরপন্থী শিয়া রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে তোলেন খোমেইনি। দেশের সর্বোচ্চ নেতা বা সুপ্রিম লিডারের পদ গ্রহণ করেন তিনি। এর ফলে দেশটির শাসনব্যবস্থা দু’টি স্তরে বিভক্ত হয়ে পড়ে। সর্বোচ্চ নেতা যিনি, তাঁকেই ‘বলী-এ-ফকীহ’ বলে মানা হবে। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁর সিদ্ধান্তই জনগণের শিরোধার্য বলে গণ্য হবে।

Iranian doctrine
০৬ / ১৯

তিনি সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন না, বরং বিশেষজ্ঞদের একটি পরিষদ তাঁকে মনোনীত করে। সামরিক বাহিনী, বিচার বিভাগ এবং বিদেশনীতির ওপর তাঁর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে। বিপ্লবের পর রুহুল্লা খোমেইনি ও আয়াতোল্লা আলি খামেনেই এই পদ অলঙ্কৃত করেছেন। আপাতত এই পদ আনুষ্ঠানিক ভাবে শূন্যই পড়ে রয়েছে।

Iranian doctrine
০৭ / ১৯

দ্বিতীয় স্তরটি হল জনগণের নির্বাচিত সরকার। জনগণের ভোটে এক জন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। পার্লামেন্ট বা সংসদও রয়েছে। তবে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রতিটি বড় সিদ্ধান্তে সর্বোচ্চ নেতার অনুমোদন প্রয়োজন। কট্টরপন্থী নিয়মগুলি যাতে আরও কঠোর ভাবে নাগরিকদের উপর প্রয়োগ করা হয়, সে বিষয়ে নজরদারি করেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতাই।

Iranian doctrine
০৮ / ১৯

রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে ইসলামি শরিয়া আইন যাতে পুরোদস্তুর বজায় থাকে তা দেখার দায়িত্ব সর্বোচ্চ নেতার। একই সঙ্গে মুসলিমদের স্বার্থ রক্ষা করা ও পশ্চিমের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব থেকে শিয়া মুলুকটিকে মুক্ত রাখা। সহজ কথায়, ‘বিলায়ত অল-ফকীহ’ হল এমন একটি শাসনপদ্ধতি যেখানে এক জন শীর্ষস্থানীয় ধর্মীয় নেতা রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসাবে কাজ করেন, যাতে রাষ্ট্র পরিচালনার কোনও সিদ্ধান্তই ইসলামি আদর্শের বাইরে না যায়।

Iranian doctrine
০৯ / ১৯

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘বিলায়ত আল-ফকীহ’কে শুধুমাত্র ধর্মীয় শাসন বলে উল্লেখ করা পুরোপুরি ঠিক নয়। এখন এটি একটি সুসংগঠিত সামরিক ও রাজনৈতিক জোটের কেন্দ্রবিন্দু। আমেরিকা মনে করে, যত ক্ষণ এই ব্যবস্থা টিকে থাকবে, তত ক্ষণ পশ্চিম এশিয়ায় তাদের একক আধিপত্য ফিরে পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

Iranian doctrine
১০ / ১৯

‘বিলায়ত অল-ফকীহ’ ব্যবস্থার মূলমন্ত্রই হল সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করা। ইরানের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই তারা আমেরিকাকে চরম শত্রু বলে চিহ্নিত করেছে। এই মতাদর্শটি বিশ্বাস করে যে, মুসলিম বিশ্বের ওপর পশ্চিমি দেশগুলি যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ চাপিয়ে রেখেছে, তার শিকল ভাঙতে হবে। আর এই ‘বিলায়ত অল-ফকীহ’ হল ওয়াশিংটনের কাছে আঞ্চলিক স্বার্থের জন্য একটি বড়সড় হুমকি।

Iranian doctrine
১১ / ১৯

আমেরিকার সবচেয়ে ভয়ের কারণ হল এই তত্ত্বটি কেবল ইরানের সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়। ‘বিলায়ত অল-ফকীহ’ তত্ত্ব অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতা বা ‘বলী-এ-ফকীহ’ বিশ্বের সকল মুসলিমের (বিশেষ করে শিয়া সম্প্রদায়ের) আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক নেতা। লেবাননের হিজ়বুল্লা, ইরাকের হাশদ আল-শাবি এবং ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরাও এই মতাদর্শের ছাতার তলায় আশ্রয় নিয়েছে। এই সশস্ত্র গোষ্ঠীরা নিজের দেশের চেয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার ‘ফতোয়া’ বা আদেশকে বেশি গুরুত্ব দেয়। এই অন্ধ আনুগত্য আমেরিকার মিত্র দেশগুলির (সৌদি আরব, ইজ়রায়েল) স্থিতিশীলতা নষ্ট করে দিতে পারে বলে ওয়াশিংটন মনে করে।

Iranian doctrine
১২ / ১৯

১৯৬০ এবং ১৯৭০-এর দশকে নানা অস্থিরতার মধ্যে দিয়ে এগিয়েছিল ইরানের রাজনীতি। এই সময় রাজশাসনের বিরুদ্ধে বার বার রাস্তায় নেমে ছাত্রসমাজ, বিদ্বজ্জন ও ধর্মগুরুদের গলা ফাটাতে দেখা গিয়েছিল। পশ্চিম এশিয়ায় প্রভাব বাড়াতে ইরানে পশ্চিমি আধুনিকীকরণকে প্রবল ভাবে হাওয়া দিতে শুরু করে ওয়াশিংটন, যাকে সন্দেহের চোখে দেখেছিলেন খোমেইনি-সহ অন্য ধর্মগুরুরা।

Iranian doctrine
১৩ / ১৯

আমেরিকা বিশ্ব জুড়ে যে উদার গণতন্ত্রের প্রচার করে, তার ঠিক বিপরীত মতাদর্শে বিশ্বাসী ‘বিলায়ত অল-ফকীহ’। একটি শক্তিশালী এবং কার্যকর ‘বিকল্প’ হিসাবে সাবেক পারস্যভূমিতে সেই মতাদর্শের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে মরিয়া ছিলেন খোমেইনি ও খামেনেইয়ের মতো ধর্মগুরুরা। পশ্চিমি ধাঁচের গণতন্ত্র ছাড়াও একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রকাঠামো চালানো সম্ভব তা প্রমাণ করতে বদ্ধপরিকর শিয়া মুলুকের শাসনকর্তারা।

Iranian doctrine
১৪ / ১৯

এখানেই সিঁদুরে মেঘ দেখছে আমেরিকা। এই ধরনের কট্টরপন্থী ও বিপ্লবী মতাদর্শ যদি অন্যান্য মুসলিম দেশে জনপ্রিয় হয়, তবে আমেরিকার প্রভাব-প্রতিপত্তিতে ফাটল দেখা দিতে পারে বলে মনে করছেন অনেকেই। সুচতুর ভাবে ধর্মীয় জিগির তুলে আরব দেশগুলির আমজনতাকে খেপিয়ে তুলছে ইরান, এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। এই অবস্থা জারি থাকলে তা পশ্চিম এশিয়ার মিত্র দেশগুলিতে মার্কিন সরকারের সামরিক উপস্থিতি, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং অস্তিত্বের জন্য চিরস্থায়ী ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

Iranian doctrine
১৫ / ১৯

ওয়াশিংটনের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, ইরানের ‘বিলায়ত অল-ফকীহ’ ব্যবস্থার শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। হামাস এবং হিজ়বুল্লার সঙ্গে ইজ়রায়েলের যে সংঘাত চলছে, তার নেপথ্যেও এই মতাদর্শগত ঐক্য কাজ করছে বলে মনে করে আমেরিকা। পেন্টাগনের কর্তারা মনে করেন, তাদের হয়ে ছায়াযুদ্ধ লড়া বাহিনীগুলোর মাধ্যমে ইজ়রায়েলকে কোণঠাসা করে ফেলতে চায় তেহরান, যাতে পরোক্ষ ভাবে আমেরিকার প্রভাব খর্ব করা যায়।

Iranian doctrine
১৬ / ১৯

তার উদাহরণ হল ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথি। ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলবর্তী অঞ্চলে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীটি যথেষ্ট সক্রিয়। এরা লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে আক্রমণ করে বিশ্ববাণিজ্যে যে অচলাবস্থা তৈরি করছে, তা আমেরিকার অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানানোর শামিল। ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীও হাত গুটিয়ে বসে নেই। প্রতিনিয়ত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন ও রকেট হামলা চালাচ্ছে তারা। মূল লক্ষ্য হল পশ্চিম এশিয়া থেকে আমেরিকার নিয়ন্ত্রণকে পুরোপুরি উৎখাত করা।

Iranian doctrine
১৭ / ১৯

আরও একটি বিষয় আমেরিকার কাছে মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তা হল পশ্চিম এশিয়ার দেশটির সঙ্গে চিন ও রাশিয়ার কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমীকরণ। সাবেক পারস্য দেশের শাসকেরা এখন কেবল ধর্মীয় শক্তিতে সীমাবদ্ধ থাকতে চান না। সুপার পাওয়ার দেশটির সঙ্গে চোখে চোখ রেখে লড়াই করতে তাঁরা রাশিয়া ও চিনের সঙ্গে কৌশলগত জোটের পথে এগিয়ে গিয়েছেন।

Iranian doctrine
১৮ / ১৯

ইরানের তৈরি ‘শাহেদ’ ড্রোন রাশিয়ার হাতে পৌঁছেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের খেলা ঘুরিয়ে দিয়েছে চালকবিহীন উড়ুক্কু যানগুলি। আবার চিনের স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ব্যবহার, ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সামগ্রী আমদানি করে এবং ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্রের বরাত দিয়ে সামরিক দৌত্য স্থাপন করেছে তেহরান, যা আমেরিকার কাছে একটি অশনিসঙ্কেত। কারণ ইরান আমেরিকার শত্রুদেশ বলে পরিচিত চিন ও রাশিয়ার সামরিক প্রযুক্তির জোগানদার হয়ে উঠেছে।

Iranian doctrine
১৯ / ১৯

সম্প্রতি ব্রিকস এবং সাংহাই সহযোগী সংস্থায় যোগ দিয়েছে ইরান। ডলার নির্ভরতা কমিয়ে আমেরিকার অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাকে অকেজো করার চেষ্টা করছে পারস্য উপসাগরীয় রাষ্ট্রটি। তাই আমেরিকার কাছে ইরানের ক্ষমতা পরিবর্তন করতে তীব্র প্রত্যাঘাত ছাড়া আর কোনও রাস্তা নেই বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ। অন্য দিকে, ইরানে গৃহযুদ্ধ বাধিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে আমেরিকা। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেখানকার বিদ্রোহী কুর্দ বাহিনীকে হাতিয়ার দিয়ে সহায়তা করতে পারে ওয়াশিংটন।

সব ছবি: সংগৃহীত।

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও গ্যালারি

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy