E-Paper

বুদ্ধবিহীন বামিয়ান উপত্যকা

আফগানিস্তানের বামিয়ান উপত্যকার বিশাল বুদ্ধমূর্তিগুলি ছিল কুষাণ আমলের গান্ধার শিল্পকলার বিশিষ্ট নিদর্শন। প্রাচীন কাল থেকে বৌদ্ধ পরিব্রাজক ও শ্রমণরা গড়ে তুলেছিলেন এই স্থাপত্য-ভাস্কর্য। চেঙ্গিস খান কিংবা ঔরঙ্গজেবের আক্রমণ এড়াতে পারলেও মূর্তিগুলি ধ্বংস করতে সফল হয়েছিল তালিবানি নেতা মোল্লা মহম্মদ ওমর। এই মার্চেই পূর্ণ হল সেই ক্ষতির পঁচিশ বছর। 

অমিতাভ বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২৯ মার্চ ২০২৬ ০৮:৫৪
দ্রষ্টব্য: বুদ্ধমূর্তির স্থলে এখন শুধুই শূন্যস্থান।

দ্রষ্টব্য: বুদ্ধমূর্তির স্থলে এখন শুধুই শূন্যস্থান।

হোটেলের তিন তলার ঘরে ঢুকে দেখি, উত্তরের বারান্দা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে পুব-পশ্চিম বিস্তৃত বামিয়ান পাহাড়। প্রথম দেখায় যতটা চমক, ততটাই বেদনাবোধ হয় ওই পাহাড়ের গায়েই বিশাল গর্ত দু’টি দেখে। ওখানেই ছিল বুদ্ধের দু’টি মূর্তি। ২০০১ সালের মার্চে তালিবান নেতা মোল্লা মহম্মদ ওমরের নির্দেশে ডায়নামাইট দিয়ে মূর্তিদু’টি ধ্বংস করা হয়। আফগানিস্তানে কারও কোনও মূর্তি থাকবে না, এমনই ছিল সেই আদেশ।

খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতক থেকেই হিন্দুকুশ পর্বতের বামিয়ান উপত্যকার এই স্থান ছিল চিন এবং পশ্চিমি বিশ্বের সংযোগকারী ঐতিহাসিক রেশম পথের একটি অন্যতম অংশ। তখন ভারত উপমহাদেশের পশ্চিম প্রান্ত ছিল আফগানিস্তান। এই পথ দিয়েই যাতায়াত ছিল বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের পরিব্রাজকদের। এই পথেই গড়ে উঠেছিল একাধিক বৌদ্ধ বিহার, এবং ধর্ম দর্শন ও শিল্পকলার ক্ষেত্র। কংগ্লোমারেট বালিপাথরের পাহাড়ের গায়ে প্রাকৃতিক ক্ষয়ে তৈরি হয়েছিল নানা আকারের গর্ত। পথে পরিশ্রান্ত বৌদ্ধ শ্রমণেরা সেই গর্তগুলোকে খোদাই করে ছোট ছোট গুহা তৈরি করে বিশ্রাম নিতেন। গুহার দেওয়ালে এবং উপরের ছাদে উজ্জ্বল রঙের নানা ধর্মীয় প্রতিকৃতি ও আনুষঙ্গিক আলঙ্কারিক ছবি আঁকা হত। গান্ধার প্রদেশের এই চিত্রকলা পরে গান্ধার শিল্পকলা নামে শিল্পবিশ্বে খ্যাতিলাভ করে।

শতকের পর শতক এভাবেই বিশ্রামের জন্য ব্যহৃত হত জায়গাটি। এই ভাবে চলতে চলতে একদিন শ্রমণ-পরিব্রাজকরা মনে করলেন, এখানে বুদ্ধের একটা প্রমাণ আকারের প্রতিমূর্তি গড়ে তোলা যেতে পারে। তখনও পর্যন্ত বুদ্ধের কোনও প্রমাণ আকারের পূর্ণাবয়ব বিগ্রহ ছিল না। দ্বিতীয় শতকে কুষাণ রাজত্বকালে বামিয়ান অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্মের স্থিতি হয়। এই সময় থেকে বুদ্ধের মূর্তি উৎকীর্ণ হতে শুরু হয় পাথরে, স্বর্ণমুদ্রাতেও। তৃতীয় শতকেই সাসানীয় আমলে কুষাণ রাজত্ব আংশিক শেষ হয়।

প্রাচীন গ্রিক মূর্তিশিল্পের খ্যাতি খ্রিস্টজন্মের আগে থেকে। আলেকজ়ান্ডার মেসোপটেমিয়া ছেড়ে ভারত উপমহাদেশে আসার পথে গান্ধার এলাকায় কিছু সময় ছিলেন। তখন সেখানে এই মূর্তি তৈরির প্রচলন করেন। এর অব্যবহিত পরেই মৌর্যসম্রাট অশোক এই এলাকায় বৌদ্ধধর্মের জোরদার প্রচার ও প্রসার ঘটান। শুরু হয় ইন্দো-গ্রিক সাম্রাজ্য। তবে কুষাণ সাম্রাজ্য মধ্য এশিয়া থেকে বামিয়ানে এলে খ্রিস্টীয় প্রথম থেকে তৃতীয় শতকের মধ্যে বুদ্ধের ছোট ছোট মূর্তি তৈরি করার মাধ্যমে গড়ে ওঠে গ্রিক-বৌদ্ধ রীতির সংমিশ্রণ শিল্পকলা, যার অন্য নাম গান্ধার শিল্প। মূলত বুদ্ধ-সংক্রান্ত শিল্প-বিষয়কেই গান্ধার শিল্প বলা হয়। গান্ধার ভাস্কর্যশিল্পের আগে বুদ্ধের নানা প্রতীকী আকৃতির শিল্পচর্চা হত, যেমন— বোধিবৃক্ষ, শূন্য সিংহাসন, আরোহীহীন ঘোড়া, বুদ্ধের পায়ের ছাপ, ধর্মচক্র। তখনও পর্যন্ত বুদ্ধের পূর্ণাবয়ব মূর্তি তৈরির অনুমতি ছিল না। তবে দণ্ডায়মান এবং বোধিসত্ত্ব মৈত্রেয় মূর্তি তৈরি করেই প্রথম মনুষ্যাকারে বুদ্ধের মূর্তি তৈরি হয় কুষাণ যুগে, এবং তা-ও এই গান্ধার শিল্পেই। অনুমতি এসেছিল কার কাছ থেকে, সে নিয়ে আজও বিতর্ক রয়েছে। প্রথমে ছোট পাথরের মূর্তিতে বুদ্ধের গৃহত্যাগ এবং সমবেত ভক্তমণ্ডলের কেন্দ্রে উপবিষ্ট বুদ্ধ উপদেশ দান করছেন ইত্যাদি ‘রিলিফ’ মূর্তি তৈরি হয়। পঞ্চম শতক পর্যন্ত মূর্তি এবং অলঙ্করণসমৃদ্ধ গান্ধার শিল্প পূর্ণ বিকশিত হয়।

কাবুল থেকে ১৩০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে, সমুদ্রতল থেকে আড়াই হাজার মিটার উচ্চতায় বামিয়ান পাহাড়ে বালিপাথর কেটে খোদাই করে বুদ্ধের প্রথম মূর্তিটি তৈরি হয়েছিল পূর্ব দিকে, তাই তাকে বলা হয় ‘ইস্টার্ন বুদ্ধ’। এই মূর্তিটি ছিল আটত্রিশ মিটার উঁচু। নীচ থেকে উপর পর্যন্ত আটটা তল আছে এবং প্রতি তলে আর্ট গ্যালারি আছে, যদিও বেশির ভাগ রঙিন চিত্রকলা নষ্ট হয়ে গেছে। উপরে ওঠার পাহাড়-কাটা পাথরের সিঁড়িগুলো বেশ উঁচু। পশ্চিমে আর একটি বুদ্ধমূর্তি ছিল, যার নাম ‘ওয়েস্টার্ন বুদ্ধ’। এর উচ্চতা বেশি, পঞ্চান্ন মিটার। বর্তমানে কোনওটায় আর মূর্তি দেখা যায় না। ভাঙা খণ্ড সব জড়ো করে কয়েকটা জায়গায় রাখা আছে। ভাঙার পর কার্বন ডেটিং করে জানা গেছে, পুবের বুদ্ধ তৈরি হয়েছে ৫৪৪ থেকে ৫৯৫ সালে, এবং পশ্চিমের বুদ্ধ তৈরি হয়েছে ৫৯১ থেকে ৬৪৪ সালে। এর ফলে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, মূর্তিগুলো নির্মিত হয়েছেহুন সাম্রাজ্যকালে।

বড় মূর্তিটি পুরুষ, নাম ‘সলসল’ অর্থাৎ ব্রহ্মাণ্ডের মধ্য দিয়ে আসা আলো। আর ছোটটির নাম ‘শাহ মামা’ অর্থাৎ রানি মা। মনে করা হয় এটি একটি নারীমূর্তি, কিন্তু নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না। আর এক অভিমত হল, এই দুই বিশাল দণ্ডায়মান মূর্তির বিভিন্ন মুদ্রা পর্যবেক্ষণ করে বলা যায়— একটি বৈরোচন বুদ্ধ ও অন্যটি শাক্যমুনি (গৌতম বুদ্ধ)। প্রধানত মহাযান এবং বজ্রযানেই এঁদের উল্লেখ ছিল। ধ্বংসের পর ছোট মূর্তিটির মাথা ও হাতের পিছনের দিকের অবয়বের কিছুটা আভাস পাওয়া যায়। এর মাথার উপরের ছাদে সূর্যদেবতার রঙিন ম্যুরাল ছিল, যা সম্ভবত ষষ্ঠ থেকে অষ্টম দশকের মধ্যে তৈরি। পাহাড়ের বালিপাথর কেটে সামনের অংশ তৈরি হলেও পিছনের অংশ পুরোটাই পাহাড়ের পাথরের সঙ্গে মিশে আছে। শরীরের বিভিন্ন অংশ ফুটিয়ে তোলার জন্য মাটির সঙ্গে খড় মিশিয়ে তার উপর আস্তরের প্রলেপ দেওয়া। হাত-মুখ সমেত নানা অংশ রঙিন করা হয়েছিল সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা নষ্ট হয়ে যায়। এই দুটো মূর্তির মাঝে আরও একটি অপেক্ষাকৃত ছোট গর্ত দেখা গেল, যেখানে সম্ভবত আরও একটি মূর্তি ছিল— তবে সে সম্পর্কে বিশদে কিছু জানা যায় না।

সারা পাহাড়ের গা জুড়ে নীচ থেকে উপরে অসংখ্য গুহা যেখানে বৌদ্ধ ভিক্ষুকেরা বিশ্রাম নিতেন, উপাসনা করতেন। কিছু গুহার দেওয়ালে নষ্ট হয়ে যাওয়া চিত্রকলার অবশেষ দেখা যায়। কিছু চিত্র এবং অলঙ্করণ ইসলামিক আক্রমণের আগে পর্যন্ত হয়েছে বলে গবেষণায় জানা গেছে।

চিনা বৌদ্ধ পরিব্রাজক হিউয়েন সাং ৬৩০ সালের এপ্রিলে এসেছিলেন বামিয়ানে। তাঁর লেখা অনুসারে, এই জায়গায় দশেরও অধিক বৌদ্ধ বিহার এবং সহস্রাধিক শ্রমণ সমেত বিশাল ধর্মীয় স্থান ছিল। উভয় বুদ্ধমূর্তিই সোনা এবং নানাবিধ রত্নখচিত অলঙ্কারে সজ্জিত ছিল। এ ছাড়াও তিনি একটি শায়িত বুদ্ধমূর্তিরও উল্লেখ করেছেন।

বামিয়ান পাহাড়ের নীচে কয়েকটা গ্রাম রয়েছে। যেমন বামিয়ান গ্রাম, লাল গ্রাম (লাল রঙের বালিপাথরের তৈরি) ইত্যাদি, যা ওই পাহাড়ের পাথর দিয়েই তৈরি। প্রতি গ্রামে উঁচুতে একটা কেল্লা বা দুর্গ রয়েছে। সিঁড়ি দিয়ে উপরে ওঠা যায়। গ্রামে এখন আর কেউ থাকে না। মূর্তি ধ্বংস করার আগে গ্রামগুলো খালি করে দেওয়া হয়। এমনকি গুহাগুলোর ভিতরেও লোকের বসবাস ছিল। তাঁরাও চলে গিয়েছিলেন। পরে আবার ফিরে এসেছিল প্রায় সাতশো আশ্রয়হীন পরিবার।

মোঙ্গল সম্রাট চেঙ্গিস খান ১২২১ সালে বামিয়ান আক্রমণ করেন। প্রথমে দূরে বসে এলাকা দখলের চেষ্টা করেছিলেন গ্রামের প্রধানদের সঙ্গে আলাপ চালিয়ে। সে সময় কোনও ভাবে তাঁর নাতির হত্যার খবর তাঁর কাছে আসে। এর পর উপত্যকায় ঢুকে, গ্রামের পর গ্রাম নষ্ট করে, লোকজন মেরে তাড়িয়ে তুলকালাম করলেও বামিয়ান বুদ্ধের গায়ে হাত পড়েনি। এর পর সতেরো শতকে মোগল সম্রাট ঔরঙ্গজেব তাঁর কামান-বাহিনিকে আদেশ করেন মূর্তি ভেঙে দেওয়ার জন্য। তখনও বুদ্ধমূর্তি বেঁচে গেলেও কিছু ক্ষতি হয়েছিল। ২০০১ সালে তালিবান নেতার আদেশে প্রথমে কামান দেগে নানা ভাবে মূর্তি ধ্বংসের চেষ্টা হয়, কিন্তু তাতে কাজ না হওয়ায় শেষে ডায়নামাইট ফাটিয়ে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য বলে স্বীকৃত এই মূর্তি দুটো উড়িয়ে দেওয়া হয়।

স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়ার পর আফগানিস্তানে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায়। প্রায় পাঁচ দশক পর দেশ প্রজাতন্ত্র হলে নানা সময় অশান্ত হয়ে ওঠে। বিশ্বের দুই প্রধান শক্তিশালী দেশ পর্যায়ক্রমে শাসকদের উপর প্রভাব বিস্তার করে বারংবার শাসক পাল্টায়। ২০০১-এ তালিবান আংশিক দখল নেয় এবং কুড়ি বছর পর কাবুলে তাদের শাসন বলবৎ হয়। এই অশান্ত আবহাওয়ার ধাক্কা বামিয়ানেও পড়ে।

বামিয়ান উপত্যকায় রয়েছে আরও দর্শনীয় স্থান, যেমন নীল হ্রদ। বহুকাল ধরেই এই জায়গায় পর্যটকের আনাগোনা লেগে থাকে সারা বছর ধরেই। তা থেকে সরকারের আয়ও হয়। বুদ্ধমূর্তিই সবচেয়ে বড় আকর্ষণ দেশি ও বিদেশি পর্যটকদের কাছে। ২০০১-এর পর পশ্চিমি দেশগুলো পর্যটকদের আফগানিস্তান যেতে নিরুৎসাহ করা সত্ত্বেও এখনও কিছু পর্যটক আসছেন। বর্তমান তালিবান সরকার ২০০১-এর ভুল বুঝতে পেরেছে এবং তা পর্যটনশিল্পে আঘাত করেছে, স্বীকার করেছে। এখন তারা চেষ্টা করছে কোনও ভাবে মূর্তিদুটো নতুন করে স্থাপিত করা যায় কি না। এ সম্ভাবনা নিয়ে জাপান এবং আরও কিছু দেশের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে। সরকারি সূত্রে প্রচার হচ্ছে বামিয়ানে আসার জন্য। সাম্প্রতিক কালে ছ’মাসে এক লক্ষ সত্তর হাজার পর্যটক এসেছেন, যদিও সবাই স্বদেশি। বিদেশি পর্যটক আড়াই হাজারের মতো। শুধু বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরাই নন, শিল্পানুরাগীরাও এক অব্যক্ত কষ্টে যেন মূক হয়ে উঠছেন এই ভয়াবহ ধ্বংসের সামনে দাঁড়িয়ে। ধর্মীয় ও সামাজিক বিধিনিষেধ শিথিল করে মহিলা-সহ সব নাগরিকদের যদি সম্মান ও স্বাধীনতা দেওয়া হয়, তবে পর্যটকরাও নিশ্চিন্তে বামিয়ান ও আফগানিস্তান ভ্রমণে আবার দলে দলে আসবেন। বামিয়ান বুদ্ধ এতটাই বিখ্যাত যে, বামিয়ানে বুদ্ধ নেই জেনেও পর্যটক আসছেন— এটাই অবাক করে। বামিয়ান ছাড়ার আগে হোটেলের ঘরের বারান্দায় যেতেই আবার ধাক্কা, যেন বামিয়ানের বালিপাথরের পাহাড় তার শূন্য গহ্বর দুটো দেখিয়ে সশস্ত্র মানুষের নির্দয় বর্বরতার কথাই নীরবে বলে চলেছে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

taliban Afghanistan

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy