E-Paper

অলি বারবার ফিরে যায়

জলবায়ু পরিবর্তনে ভেঙে যাচ্ছে ফুল ও পরাগমিলনকারীদের সম্পর্ক। ফুলের মালিক রাতে ফোটা ফুলদের মুখে গুঁজে দেয় হ্যালোজেনের আলো, কেটে ফেলে ফুলে ভরা গাছ, ঘাস-মারা বিষ দিয়ে উজাড় করে দেয় সেই সব ঘাসফুল, যারা সারা বছর খাবার জোগায় মৌমাছি-প্রজাপতিদের। আমরা চোখ বন্ধ করে থাকি। 

নীলাঞ্জন মিশ্র

শেষ আপডেট: ১৫ মার্চ ২০২৬ ০৮:১৫

মাইলের পর মাইল চলেছি। ফাল্গুনী মানভূম। গ্রামের নাম ‘ভালোবাসা’। ধূ-ধূ মাঠে গরু-ছাগল ছেড়ে রাখালরা জিরিয়ে নিচ্ছেন ঢুলু-ঢুলু। অলখে ডুংরির উপরে বসে মাথায় মোহনচূড়াটি দিয়ে তিনি বাঁশি ধরেছেন বুঝতে পারছি। মদিরাময় রৌদ্রে তারই ঘ্রাণ, তারই মায়া ভেসে যাচ্ছে। ছোটদের ইস্কুলের মাঠে গান বাজছে, ‘ওরে গৃহবাসী খোল্‌, দ্বার খোল্‌, লাগল যে দোল/ স্থলে জলে বনতলে লাগল যে দোল’। দ্বার খুলেছে, গানে গানে দোল বাজছে, অঙ্গে অঙ্গে আবির, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ভাবনায় যে দোল, সে দোল কই? ত্রয়োদশীকে তো দেখছি না। আমি বলছি পলাশের কথা। গাছে পলাশ তো ফোটে না, গাছ যেন পলাশ পরে। ত্রয়োদশী যেমন পরেন এই দোলকালে তাঁর নৃত্যসাজ। মাঘের শেষেই তাঁর এসে পড়ার কথা। গোটা মানভূম জুড়ে এই ফাল্গুনে জ্বলে ওঠার কথা আগুন। কিন্তু প্রায় পলাশহীন কেটে গেল এবারের দোল উৎসব।

মানভুঁই ভাষায় বয়োজ্যেষ্ঠরা বলছেন, গত মরসুমে এত বৃষ্টি হয়েছে, এত ঠান্ডা পড়েছে, তারই জন্য পলাশ ফুলের আসতে এত দেরি। পুরুলিয়া রঙিন হতে আরও দশ-পনেরো দিন। আমের বকুলও এসেছে দেরিতে। বসন্তের ঘোষণায় দেখা গেল দু’-এক জন ফাল্গুনমঞ্জরী, ঘন নীল আকাশের বুকে গুটিকয়েক লাল ফুল ফুটিয়ে রামকিঙ্করের ভাস্কর্যের মতো উদ্বাহু ত্রিলোকবিহারী শিমুল আর মনখারাপ করে বসে থাকা মানবাজার গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভিতর একলা এক গামহার, যাঁর আর এক নাম ভ্রমরপ্রিয়া। বসন্তে পলাশ, রুদ্রপলাশ, শিমুলের ভিড়ে শেষোক্ত গাছের নাম তেমন না শোনা গেলেও অঙ্গে অঙ্গে সহস্র ফুল ফুটিয়ে, উঠানময় হরিদ্রাভ পাপড়ি ঝরিয়ে, সারা দিন ভ্রমর পরিবেষ্টিত হয়ে তিনি এখন মনমোহন! ফুল ফুটলে রাজ্যের যত ভ্রমরের ঠিকানা তিনি। পুষ্পরসের আশে তারা সব আসে। তাই তিনি ভ্রমরপ্রিয়া। পূর্বোল্লিখিত গানে রবিঠাকুর কী সুন্দর করে লিখেছেন, ‘মউমাছি ফিরে যাচি ফুলের দখিনা,/ পাখায় বাজায় তার ভিখারির বীণা’। কবির চোখ এড়ায় না কিচ্ছুটি।

এর আগে যে কাল গেছে, কার্তিক অঘ্রান পৌষ মাঘ, প্রকৃতি খানিক কৃপণ হয়ে যান, বড় অভাবী মাস। মানুষও এক কালে খাবার শুকিয়ে রাখত এমন দিনগুলোর জন্য (এখন যদিও তার বাজার-ভরা সময়-অসময়ের খাবার। প্রচুর খাবার নষ্ট, আর অস্বাস্থ্যের ছড়াছড়িও বটে)। মৌমাছিদের এ সময়ে খাবারের অভাব ঘটে। গোটা জনপদে হয়তো দেখবেন কিছু ঘাসফুল, আর আনাজপাতি বাদে ফুটে আছে দেশি কুল, নিশিন্দা ইত্যাদির ফুল। দু’টি ফুলই এত ছোট, যাতে বাঘা মৌমাছি কিংবা পৃথুলা ভ্রমর এসে বসতে পারবেন না ভাল করে। এমনও হয়, তাঁরা এসে ফুলটি জড়িয়ে বসলেন, আর দেহভারে ফুলসুদ্ধ খুলে পড়েও গেলেন। তবু অভাব বড় বালাই। একা, কয়েক জন কিংবা কয়েক হাজার মৌমাছির বড় সংসার, যার যেমন, তার তেমন খোরাকি তো লাগে! তাই জোগাড়ে হিমশিম!

তার মধ্যে চার দিকে কেবল মানুষের ঘরবাড়ির জন্য জমি জবরদখল, এক দলের পাহাড় জঙ্গল নদী মালভূমি কেনা-বেচার নিত্য নিলাম, মারদাঙ্গা কাড়াকাড়ি, খাবার বলতে কেবল মানুষের খাবার ফলানোর দামামা আর তার বিষময় আয়োজন। আদি পৃথিবীর শত সহস্র পরাগমিলনকারীরা আর যান কোথায়! তাদের অপেক্ষা থাকে এই বসন্তের। দীর্ঘ তাপপ্রবাহ, আর্দ্র বর্ষাকাল, আর প্রবল ঠান্ডা অতিক্রম করে বসন্তে ফুলের মিছিল নামবে। যে যার রঙে গন্ধে আমন্ত্রণ জানাবেন রসিকদের। পৃথুলা ভ্রমর বা বাঘা মৌমাছি সকলেই পাবেন তাঁদের মনের মতো ফুল। প্রাণভরে সকালে-বিকালে নিয়ে যাবেন পুষ্পরস ও রেণু। এই হল পৃথিবীর দোল।

রবীন্দ্রনাথ স্থলে জলে বনতলে যে দোল লাগার কথা বলেছেন, সে দোল আসলে লেগেছিল বহু আগে ডাইনোসর যুগের শেষের দিকে। মানে? মানে এক দিন এত রকমের রঙিন ফুল ছিল না পৃথিবীতে। ছিল মূলত ব্যক্তবীজী উদ্ভিদের দল, যারা হাওয়ায় পরাগ উড়িয়ে অপেক্ষা করতো পরাগমিলনের। হাওয়ায় হাওয়ায় কত পরাগ আর ওড়াবে? কত পরাগ জলে ভেসে যাবে? কতটুকু সম্ভাবনা থাকবে নিশ্চিত মিলনের? গাছ যে স্থবির! মিলন ও বিস্তার নিশ্চিত ও সহজ করতে হলে তাকে যে আরও কিছু ভাবতে হবে। যদিও তখন ‘বিটল’ (আমরা তাদের কাউকে কাউকে অন্য নামে অন্য কর্মে চিনি, যেমন গুবরে পোকা, জোনাকি ইত্যাদি), ‘থ্রিপস’রা পরাগমিলন ঘটাত, তবে নতুন ভাবনা ও আয়োজনের প্রয়োজন ছিল অনস্বীকার্য। সেই ভাবনা থেকে এল আজকের বর্ণময় ফুলের দল। দোল লাগল সারা পৃথিবী জুড়ে। ওই রবিঠাকুরের গানের মতো ‘স্থলে জলে বনতলে’। বিশ্ব জুড়ে সংখ্যায় বৈচিেত্র‍ বেড়ে উঠতে লাগল অ্যাঞ্জিয়োস্পার্ম বা গুপ্তবীজী উদ্ভিদরা। যারা নানা রঙের, নানা আকারের ফুল ফোটাবে, সেই ফুলে থাকবে রস ও পরাগরেণু। থাকবে নানা রকমের ঘ্রাণ। ফুলের গায়ে থাকবে বিবিধ নকশা যা মৌমাছিদের রসান্বেষণে সহায়তা করবে। এক দল বোলতা বিবর্তিত হয়ে মৌমাছির জন্ম হল, যারা ফুলে ফুলে পরাগ ও রস সংগ্রহের সময় পরাগমিলন ঘটাবে। পরাগমিলনের পরে ডিম্বাশয় পরিণত হবে ফলে। সেই ফলের ভিতর থাকবে ভবিষ্যতের বীজ। ফল খাওয়ার পর নানা প্রাণীর বিষ্ঠার মাধ্যমে বীজ নির্গত হয়ে নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়বে। সেই বীজ থেকে জন্ম নেবে চারা। এইভাবে অগ্রসর হয়ে যাবে গাছেরা। তবে শুধু বিষ্ঠা নয়, তুলোর যেমন বীজ ফেটে উড়ে উড়ে যায় এ দিক-ও দিক, হঠাৎ যাদবপুর থানার কাছে এক দিন দেখি যেন তুষার ঝরে পড়ছে। কোনও ফল আটকে যায় লোমশ প্রাণীর শরীরে। পাখিরা খেতে খেতে ফলের বীজ নিয়ে চলে যায় এ দিক-ও দিক। আবার বড় বাদাম টুকরো করে এখানে ওখানে মাটিতে গুঁজে পরে খাবে বলে ভুলে যায় কোনও ইঁদুর। পরে সেখান থেকে গাছ হয়ে যায়। প্রসঙ্গত মনে পড়ে, ইঁদুর আমাদের ঘৃণার পাত্র হলেও জনজাতি মানুষের গল্পে তিনি কৃষকের বীজের মহাজন।

ফুল থেকে ফল আর বীজে চলে গিয়েছিলাম। আবার ফিরি। পরাগমিলনকারীদের যার যেমন আকার, তার জন্য তেমন ফুল জন্মেছে। সুন্দরবনের জঙ্গলে নথের মতো যে ছোট্ট কনক বাইন ফুটেছে, তার ফুলে আসবেন তারই মতো ছোট স্টিংলেস মৌমাছি। যাদের জিভ ছোট, তাদের জন্য তেমনই ফুল ফোটে, যেমন ভোমরাদের দেখা পাওয়া যাবে জারুল, বকুল, নোনা, আকন্দ ফুলে। কবি, গীতিকারদের চোখ এড়ায় না কিছু। তাই তো গানে গানে জানা যায় ‘অলির কথা শুনে বকুল হাসে’। অলি মানে আমরা জানি, ভ্রমর। রবীন্দ্রনাথ লেখেন, ‘জেনেছি তোমাকে তাই জানাতে রচিনু এই ছন্দ/ মৌমাছির বন্ধু হে আকন্দ’।

পৃথিবীতে কম-বেশি বিশ হাজার প্রজাতির মৌমাছি আছে। তারা বেশির ভাগই মাটিকে আশ্রয় করে একা থাকে। চাক বাঁধা মৌমাছির সংখ্যা খুবই কম। দুর্ভাগ্যবশত উপযোগিতাবাদের এই বাজারে বাণিজ্যসফল মধুমৌমাছি ছাড়া আর কারও কথা লেখা হয় না স্কুলের জীবনবিজ্ঞান বইয়ে। কোটি কোটি মানুষের জানা-ই হয় না— তার বাগানে, তার ফুলের টবের মাটিতে আরও অনেক মৌমাছি নীরবে বাসা করে আছে। তারা মানুষকে মধু দেয় না, কিন্তু সকলেই দক্ষ পরাগমিলনকারী, যারা না থাকলে আমাদের খাবারের থালা হয়ে আসতছোট। এখানে মৌমাছি বলতে রবীন্দ্রনাথ যে ভোমরাকে বোঝাচ্ছেন, তা জানা যাবে আকন্দ গাছের কাছে দাঁড়ালে।

যাদের বড় জিভ, তাদের জন্য আবার তেমন ফুল, যেমন প্রায় ত্রিশ সেন্টিমিটার লম্বা জিভ নিয়ে ‘হক মথ’ কিংবা বাঁকানো লম্বা বাঁশির মতো ঠোঁটওয়ালা হামিং বার্ডের জন্ম হয়েছে তেমনই গভীর ফুলে রস সংগ্রহের জন্য। কোনও মৌমাছির সম্পর্ক কেবল এক বা কয়েক প্রজাতির ফুলের সঙ্গে, কারও অনায়াস যাতায়াত বহু প্রজাতির ফুলে। বাঘামৌমাছি বা দেশীয় মৌমাছিদের বিস্তার যেমন মানুষের পেঁয়াজখেত থেকে বাঘের জঙ্গলে ফোটা খলশি ফুল পর্যন্ত। এই পলাশ, কুর্চি, শিমুলেও তারা সারা দিন ভিড় করে থাকে। আবার টমেটো, লঙ্কা, বেগুনের ফুলকে বুকে জড়িয়ে নির্দিষ্ট সুরেনা ঝাঁকালে তাদের পরাগমিলন হয় না বলেসে-সব ফুলের সঙ্গে গভীরতর সম্পর্ক নানা আকারের ভোমরার।

দিনের পরাগমিলনের দায়িত্বে নানা রকম মাছি মৌমাছি, প্রজাপতি, পাখি, বিটল। রাতে পরাগমিলনের দায়িত্বে মথ, বাদুড়, কিছু বিটল, কিছু মৌমাছি। ইস্কুলের ছোট জীবনবিজ্ঞান বইয়ের দৌলতে মাছি কেবলই কলেরা-বাহক। দুনিয়ায় যে আরও নানা প্রজাতির মাছি আছে, তারা যে দুর্দান্ত পরাগমিলনকারী, তারা যে অনেকেই বাগানের নানা পোকা, পোকার লার্ভা খেয়ে আমাদের উপকার করে, সে কথা লেখা নেই৷ এই যে আম ফলবে, আমাদের রসনা তৃপ্ত হবে, আম নিয়ে অনেক প্রবন্ধ লেখা হবে, এই আমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরাগমিলনকারী হল কয়েক প্রজাতির মাছি। সেই সব হোভারফ্লাইদের দেখে অনেক বাগানী পোকা বলে ভয় পান।

নানা চেহারা আর নানা আকারের ফুলের কথা হচ্ছিল। বিটলদের জন্য ফুটে ওঠা রাতের ফুলেরা মোটাসোটা, গোল বাটির মতো, কারণ তারা পরাগমিলনকারী হিসেবে একটু জাঁদরেল! মৌমাছিরা তুলনায় অনেক নরম। অপরাজিতার বুকে মৌমাছির সন্তর্পণে প্রবেশ দেখলে তা বোঝা যায়। বড় চেহারার ফলবাদুড়দের জন্য ফোটা শিমুলফুল ঘণ্টার মতো বড়সড় বেশ শক্তপোক্ত। শুধু বাদুড় তো নয়, সারা দিন তাতে হরেক পাখি, হনুমান অবধি এসে ঘুরেফিরে যায়। রাতে ফোটা বেশির ভাগ ফুল সাদা হলেও হলুদ ঝিঙাফুল ফোটে সন্ধের মুখে। তাকে নিয়ে ঝুমুর গান আছে অংশুমান রায়ের কণ্ঠে, ‘সাঁঝে ফুটে ঝিঙাফুল সকালে মলিন গো’। এই সাঁঝে ফোটা ঝিঙাফুলের পরাগমিলনে হাজির হয় নানা রকমের মথ। তাই সন্ধের দিকে ফসলের খেতে বিষ দেওয়া কোনও ভাবেই নিরাপদ বা সঙ্গত নয়। আমরা রাতে ঘুমোই বলে কি রাতে ফুল ফোটা বা পরাগমিলন বন্ধ থাকবে!

শিমুল লাল হয়, আবার সাদাও হয়। সন্ধে হলেই তাতে এসে হাজির হয় বাদুড়েরা। পরাগমিলনের জন্য বাদুড়দের উপর তারা খুব নির্ভর করে। শিমুলের পরাগ লোমশ শরীরে নিয়ে তারা অনায়াসে উড়ে যায় দূরে দূরে। যে পরাগমিলনকারীর চেহারা ভারী, যে গাছে বেশি দূর উঠতে পারবে না বা মগডালে চড়তে পারবে না, তার জন্য ফুল ফোটে মাটির কাছাকাছি বা কাণ্ডের গায়ে। কেউ আকৃষ্ট হয় সাদা বা সাদার কাছাকাছি নানা রঙে, কেউ পছন্দ করে নীল ও হলুদের নানা শেড, কেউ লাল রং। কোনও ফুলে হালকা গন্ধ, কারও বেশ গাঢ় মিষ্টি ঘ্রাণ, কারও গায়ে পচা গন্ধ। আবার সময়েরও ব্যাপার আছে! ভোরবেলা জারুলতলা কী মনোরম নরম গন্ধে ম-ম করে। তেমন সুন্দর বাহারি তার ফুল। একে একে ভোমরারা আসে। পরাগ সংগ্রহ করে প্রাণ ভরে। তার পর গরম খুব বেড়ে ওঠার আগেই তাদের সকালের কাজ যেই শেষ করে, অমনই জারুল ফুলের গন্ধ কমে আসতে থাকে। এই গন্ধ, রং, সব পরাগমিলনকারীদের আকৃষ্ট করার জন্য।

জলবায়ুর দিক থেকে ভাবলেও বৈচিত্র‍ আছে। একই দেশের উপকূল অঞ্চলে মধ্যাহ্নের চড়া রোদে যখন মৌমাছি তেমন নেই, ছায়ায় বা চাকে জিরোচ্ছে, তখনই কচ্ছের মতো শুকনো গরম অঞ্চলে ছেচল্লিশ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় দল বেঁধে ঘুরে ঘুরে পরাগমিলন করে চলেছে খুদে লাল মৌমাছির দল। তাদের পিছন-পিছন ঘুরেছি। বালুময় গ্রীষ্মের দেশে তাদের মরুর মসিহা মনে হত। এক-এক ছোঁয়ায় সব গাছে ফুল থেকে কেমন ফল ধরে উঠত। নিজেকে সে অঞ্চলের কৃষক বলে কল্পনা করলেই মনে হত, ভাগ্যিস এই খুদে লাল মৌমাছিরা ছিল! আবার গভীর রাতে মাইনাস পনেরো ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ঘন নীল আপেলের পরাগমিলনে বেরিয়ে পড়ে এক ছোট মথ।

আমাদের কত অজস্র গান, কবিতা, ছড়ায় বিধৃত নানা রকম ফুল, পাখি, ভোমরা, মৌমাছির কথা। কখনও নজরুলের কলমে নিমফুলের মৌ পান করে ভোমরা ঝিম মেরে যাচ্ছে, তাকে দেখে হেসে লুটিয়ে পড়ছে ফুলের দেশের বৌরা। কখনও পদকর্তা রাধারমণ ভ্রমরকে বলছেন, ‘ভ্রমর কইয়ো গিয়া/ শ্রীকৃষ্ণবিচ্ছেদের অনলে (আমার) অঙ্গ যায় জ্বলিয়া’। রবীন্দ্রনাথ দেখছেন, ‘অলি বারবার ফিরে যায়, অলি বারবার ফিরে আসে/ তবে তো ফুল বিকাশে’। এমন কত প্রাণের গান ভাবা যেত না আশপাশে এরা না থাকলে, কিন্তু বাস্তব কী বলে? মানুষের খাবার জোগাতে, বসত জোগাতে এত জমি কৃষিজমিতে পরিণত হচ্ছে, এত নগরায়ণ হচ্ছে যে, পরাগমিলনকারীরা সব বেঘর হয়ে যাচ্ছে দিনে-রাতে। রাষ্ট্র, শিল্পপতিদের কাছে জঙ্গল পাহাড় নদী দ্বীপ বেচে দিলে তারা নির্দয় ভাবে গাছপালাশূন্য করে ফেলছে সব জায়গা। যে-সব জনজাতি মানুষেরা চিরকাল কুড়িয়ে খেয়েছেন শাক পাতা কন্দ ফল মূল, বা প্রয়োজনে সামান্য শিকার করে কিছু মাছ মাংস, যাঁরা তেল নুন কৃত্রিম মিষ্টি মশলার ব্যবহার জানতেন না, তাঁদের জঙ্গল থেকে উৎখাত করে উন্নয়নের নামে চাষ করতে শেখানো হচ্ছে জোর করে। সব জমি চাষের জন্য অধিকার করলে যে প্রচুর পশুপাখির বিশেষ ক্ষতি হয়ে যাবে, এ কথা তাঁরা জানতেন।

অধিকার বলতে আমরা তথাকথিত ভদ্রলোকেরা কেবল মানুষের অধিকার, মানুষের খাবার বুঝি। ভাবি না, আমাদের ভোগের অনাচারে রোজ বেঘর হয়ে যাচ্ছে কত পশুপাখি। যে মৌমাছি আমাদেরই জন্য পরাগমিলন করে এসেছে, সে দেখছে তার মাটির নীচের বাসা আর নেই। তার সন্তানসন্ততি সব নিহত হয়েছে আমাদের হাতে। জলবায়ু পরিবর্তনে ভেঙে যাচ্ছে ফুল ও পরাগমিলনকারীদের সম্পর্ক। পুরুলিয়ায় পলাশ যেমন দেরিতে আসছে, পাহাড়ে তেমন উষ্ণায়নের কারণে অনেক আগে ফুটে উঠেছে রডোডেনড্রন ফুল। ফুল তো শুধু উষ্ণতা নয়, দিনের দৈর্ঘ্যের উপর নির্ভর করেও প্রস্ফুটিত হয়। তাই পরাগমিলনকারীদের মনে মনে যে ফুলপঞ্জিকা, তা ভেঙে-ভেঙে যাচ্ছে। ফুল ফুটে দেখছে মৌমাছিরা নেই, অথবা মৌমাছিরা ঘুম ভেঙে দেখছে, ফুল তখনও ফোটেনি। এর ফলে দু’জনেরই জীবন-মরণ সঙ্কট দেখা দিয়েছে। অতিরিক্ত অতিবেগুনি রশ্মি নিঃসরণের ফলে ফুলদের রং বদলে যাচ্ছে। তাতে খুব অসুবিধে হচ্ছে পরাগমিলনকারীদের। আমরা তাদের নিয়ে অনেক গান গাই, কবিতা লিখি, কিন্তু তাদের সৃষ্টির ইতিহাস, বিজ্ঞান, দর্শনের জায়গা থেকে তাদের জানার কথা ভাবিনি। তাই ফুলের মালিক রাতে ফোটা ফুলেদের মুখে গুঁজে দেয় হ্যালোজেনের আলো, কেটে ফেলে ফুলে ভরা গাছ, পরিচ্ছন্নতার নামে ঘাস-মারা বিষ দিয়ে উজাড় করে দেয় সেই সব ঘাসফুলদের, যারা সারা বছর রিলে রেসের মতো ফুটে থেকে খাবার জুগিয়ে যায় মৌমাছি-প্রজাপতিদের।

এত অজ্ঞতা নিয়ে বাঁচা বড় মুশকিল। অন্যকে জানার মধ্য দিয়েই তো নিজেকে জানা হয়। যাকে জানি না, তাকে ভালবাসতে পারি না। যাকে ভালবাসি না, তার সংরক্ষণের কথাও ভাবা যায় না। আমরা ভাবি, নিজেদের আমরা খুব ভালবাসি। আসলে বাসি না। এটাও ভাবের ঘরে চুরি। বিভ্রম।

সত্যি সত্যি ভালবাসলে ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করতাম। দেশ-বিদেশের নানা বীজ কোম্পানির জিনোত্তর বীজ, বাঁজা বীজের অপব্যবহার সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হতাম। ব্যাপক সার-বিষ ব্যবহারের প্রতিবাদ করে জানাতাম, শ্রমার্জিত টাকায় বিষ খাব না। যে ফসল ফলাতে এত মাছি, মৌমাছি, মথ, প্রজাপতি, বাদুড়, বিটল, পাখি ও অজস্র জীবহত্যা করতে হয়, সেই খাবার কিছুতেই গ্রহণ করব না। কৃষি ও কৃষককে আমরা সম্মান দিইনি। তবু মানুষের উপরেই ভরসা রাখতে হয়। এই তো ক’দিন আগে পেরু দেশের মৌমাছিরা আইনি অধিকার পেয়েছে। আমাজ়নের আদিম মৌমাছিরা আদালতে লড়তে পারবে তাদের বিরুদ্ধে মানুষ কোনও অন্যায় আচরণ করলে? তাদের হয়ে লড়বেন মানুষই। পেরুর সেই অঞ্চলের জনজাতি মানুষেরা। কীটনাশক স্প্রে করা যাবে না, জঙ্গল ধ্বংস করা যাবে না, যা-যা তাদের সুস্থ ভাবে বাঁচার ও বংশবিস্তারের জন্য লাগে, সব কিছুর বিশুদ্ধতা বজায় রাখতে হবে। এই পৃথিবীর এক প্রান্তে যদি এমন ঘটনা সম্ভব হয়, তবে আমাদের দেশেও হবে। এমনিতেও জঙ্গলের সঙ্গে নিবিড় ভাবে সম্পর্ক রেখে চলা এ দেশের জনজাতি মানুষেরা এমন করেই তো আগলে রেখেছেন সব কিছুকে। আমরা প্রযুক্তি ও নগদ টাকা-নির্ভর সভ্যতা, উন্নয়ন, উত্তরণের আত্মহন্তা অহঙ্কারে মজে থেকে তাঁদের অনগ্রসর ভেবেছি। দূরে সরিয়ে রেখেছি। আমাদের মতো করে গড়ে তুলতে চেয়েছি।

আমাদের এই সঙ্কীর্ণ মনটাকে বড় করার একান্ত প্রয়োজন আজ। চার দিকে বিরাট ধ্বংসের আগাম ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। নানা উপসর্গ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। পাহাড়ের আপেলফুল থেকে পিঁয়াজ পটল কিংবা বেগুনের খেত, কফির বাগিচা, ফুল ফুটে গন্ধ ছড়ালেও স্থানীয় মৌমাছিদের দেখা মিলছে না তেমন করে। ফলন ক্রমে কমছে। কমছে বীজের অঙ্কুরোদ্গমের হার। তবু এত কিছুর মাঝে মানুষেই ভরসা রেখে বলতে হচ্ছে, আমাদের ভাবনায়, দেখায় আমূল বদল আনার সময় আজ। যে ফুল পরেছি খোঁপায়, যে ফুল সাজিয়েছি বাগানে, যে ফুল কিনেছি কিছু দাম দিয়ে, সে আসলে এই পৃথিবীতে কয়েক কোটি বছর ধরে বিপুল প্রাণপরম্পরার জোয়ার বইয়ে নিয়ে চলেছে। তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজার হাজার পরাগমিলনকারীর জীবন। সে শুধু আমাদের নান্দনিক দেখনদারির ক্রীড়নক নয়। কথায় কথায় আমাদের ভিত্তিহীন প্রেম-ভালবাসার সহজলভ্য উপমা হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার জন্য সে জন্মায়নি। পরাগমিলন না হলে সারা পৃথিবী থেমে যাবে। বিরাট ব্রহ্মাণ্ডের মাঝে যুগপৎ এই সৃষ্টির সৌন্দর্য ও তার বিপন্নতা আমাদের কি অন্যতর শপথে অনুপ্রাণিত করবে না আবার?

এই দুর্দিনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে আবার ফিরে যাই। লোভের বিরুদ্ধে সংগ্রামের কথা বলে গেছেন যিনি বারংবার, যিনি তাকিয়েছেন গভীর ভাবে বিশ্বপ্রাণের দিকে—

‘ক্ষুদ্র ফুল, আপনার সৌরভের সনে

নিয়ে আসে স্বাধীনতা, গভীর আশ্বাস--

ক্ষুদ্র ফুল দেখে যদি কারো পড়ে মনে

বৃহৎ জগৎ আর বৃহৎ আকাশ...’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Pollination

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy