Advertisement
০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩
Bengali Story

ডাক দিয়ে যাই...

সত্যিই কিআমাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে ভিনগ্রহের প্রাণী, মানে ই টি-রা? আমরাই শুনতে পাই না সে ডাক? হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিজ্ঞানীর দাবি তেমনই। ই টি-র অস্তিত্বে যে-বিজ্ঞানীরা পাত্তা দেন না, তাঁরাও কেন উড়িয়ে দিতে পারছেন না এঁর বক্তব্য?

আমাদের নক্ষত্র সূর্যের কাছাকাছি থাকায় শুক্র গ্রহের উষ্ণতা চারশো ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি।

আমাদের নক্ষত্র সূর্যের কাছাকাছি থাকায় শুক্র গ্রহের উষ্ণতা চারশো ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি।

পথিক গুহ
কলকাতা শেষ আপডেট: ২৭ নভেম্বর ২০২২ ০৯:১০
Share: Save:

কথাটা বলেছিলেন বার্ট্রান্ড রাসেল। ঘোর নাস্তিক ছিলেন তিনি। এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, “ধরুন, আপনার সঙ্গে এক দিন দেখা হয়ে গেল ঈশ্বরের। তা হলে তাঁকে প্রথম কী জিজ্ঞাসা করবেন আপনি?” একটুও না ভেবে রাসেল উত্তর দিয়েছিলেন, “ইফ ইউ ওয়্যার রিয়েলি দেয়ার, হোয়াই ডিড ইউ মেক ইয়োর প্রেজ়েন্স সো ইনসিগনিফিক্যান্টলি ফেল্ট?” ছিলেই যদি বাপু, তা হলে তোমার উপস্থিতিটা আমাদের আরও বেশি করে বোঝালে না কেন?

Advertisement

ঈশ্বরের কথা থাক, রাসেলের ওই মন্তব্যটা আরও বেশি করে খাটে ভিনগ্রহের জীব বা এক্সট্রাটেরেস্ট্রিয়ালদের (ই টি) সম্পর্কে। প্রাণ কী? এ প্রশ্নের উত্তর এখনও পর্যন্ত কেউ দিতে পারেননি। তবে ১৯৫২ সালে স্ট্যানলি লয়েড মিলার এবং হ্যারল্ড ক্লেটন ইউরে যে পরীক্ষা করেছিলেন, তা প্রমাণ করে দিয়েছিল, প্রাণের জন্য প্রয়োজনীয় যৌগ আদিম পৃথিবীতে তৈরি হওয়া সম্ভব। দরকার শুধু জল, মিথেন, অ্যামোনিয়া, হাইড্রোজেন— আর ঘন ঘন ইলেকট্রিক স্পার্ক। যে অবস্থা আদিম পৃথিবীতে অবশ্যই ছিল। রাসায়নিক বিক্রিয়ায় যে প্রাণের উদ্ভব, সে কথা অনেক দিন ধরে বলছিলেন রুশ বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ইভানোভিচ ওপারিন এবং কলকাতার ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিক্যাল ইনস্টিটিউটের গবেষক জন বার্ডন স্যান্ডারসন হ্যাল্ডেন।

আদিম পৃথিবীর মতো পরিস্থিতি ছিল লক্ষ কোটি গ্রহেও। এ ব্যাপারে প্রায়ই তুলনা দেওয়া হয় শুক্র আর মঙ্গল গ্রহের। আমাদের নক্ষত্র সূর্যের কাছাকাছি থাকায় শুক্র গ্রহের উষ্ণতা চারশো ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি। সুতরাং প্রাণ থাকার প্রশ্ন নেই। আর মঙ্গলে? সেখানে তাপমাত্রা মাইনাসের অনেক নীচে। অত কম উষ্ণতায় প্রাণ টিকে থাকতে পারে না। দুই গ্রহেই জল তরল থাকতে পারবে না। কিন্তু ব্রহ্মাণ্ডে আছে অন্য গ্যালাক্সি, অন্য নক্ষত্র। সেই সব নক্ষত্র-আবর্তনকারী গ্রহ আছে। সূর্যের থেকে পৃথিবীর যা দূরত্ব, যার ফলে এখানে জল থাকতে পারে তরল অবস্থায়, তেমন দূরত্বে অন্য নক্ষত্র-আবর্তনকারী গ্রহ থাকতে তো বাধা নেই। পৃথিবীর মতো গ্রহকে বলে হ্যাবিটেবল প্ল্যানেট বা বাসযোগ্য গ্রহ। এ রকম বাসযোগ্য গ্রহ আরও আছে।

অন্য নক্ষত্রের চার পাশে আবর্তনকারী গ্রহকে বলে এক্সোপ্ল্যানেট। শুধু গ্রহ হলেই চলবে না। প্রাণীর বাসযোগ্য হতে হবে। বাসযোগ্য গ্রহ তাই এক্সোপ্ল্যানেটের একটা ভাগ। এক্সোপ্ল্যানেট অনুসন্ধান বেশি দিনের পুরনো গবেষণা নয়। কল্পবিজ্ঞান-কাহিনির বাইরে সত্যিকারের এক্সোপ্ল্যানেট আবিষ্কৃত হয় ১৯৯২ সালে। এ বছরের পয়লা সেপ্টেম্বর অবধি হিসেব, ৫১৫৭টি এক্সোপ্ল্যানেট আবিষ্কৃত হয়েছে। সেগুলো আবর্তন করছে ৩৭৯৪টি নক্ষত্রের চারপাশে। ৫১৫৭টা এক্সোপ্ল্যানেট-এর মধ্যে বাসযোগ্য গ্রহ না জানি কত! ১৯৯৫ সালের ৫১ পেগাসি বি (ডিমিডিয়াম) গ্রহ আবিষ্কার নিয়ে বিস্তর হইচই হয়েছিল। গ্রহটি খুঁজে পেয়েছিলেন সুইটজ়ারল্যান্ডের দুই জ্যোতির্বিজ্ঞানী মিশেল মেয়র এবং দিদিয়ার কুইলজ। মেয়র ও কুইলজ ২০১৯ সালে নোবেল প্রাইজ়ও পান ওই আবিষ্কারের জন্য। পরে জানা যায়, গ্রহটি ভারী। ওজন পৃথিবীর দেড়শো গুণ। শুধু তাই নয়, গ্রহটি নক্ষত্রের চার দিকে পাক খাচ্ছে মাত্র চার দিনে, মানে তা নক্ষত্রের যথেষ্ট কাছে। কাছে থাকায় তার উষ্ণতাও খুব বেশি। ১৮০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মানে ৫১ পেগাসি বি এক্সোপ্ল্যানেট বটে, তবে বাসযোগ্য গ্রহ নয়। ২০০৯ সালে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা মহাশূন্যে পাঠিয়েছে ভ্রাম্যমাণ টেলিস্কোপ কেপলার। বাসযোগ্য গ্রহ খোঁজা ওই দূরবিনের আসল উদ্দেশ্য। হিসেব বলছে, আমাদের এই মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতেই আছে দেড়শো কোটি থেকে ২৪০ কোটি বাসযোগ্য গ্রহ। এদের মধ্যে কিছু গ্রহতেও রাসায়নিক বিক্রিয়ায় প্রাণ তৈরি হলে, তেনাদের দেখা নেই কেন?

Advertisement

প্রশ্নটা রাসেলের মতো হয়ে গেল। ধাঁধাটাকে ‘ফের্মি প্যারাডক্স’ বলা হয়। ইতালির নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী এনরিকো ফের্মির নাম অনুসারে। ১৯৫০ সালের গ্রীষ্মকাল। ফের্মি তখন আমেরিকার লস আলামসে। যেখানে তৈরি হচ্ছে অ্যাটম বোমা। এক দিন ফের্মি লাঞ্চ করতে যাচ্ছেন। সঙ্গে তিন বিজ্ঞানী। এমিল কোনোপিনস্কি, হার্বার্ট ইয়র্ক এবং এডওয়ার্ড টেলার। লাঞ্চ করতে যাওয়ার পথে ওঁরা আলোচনা করছিলেন নিউ ইয়র্ক শহরের একটা ঘটনা। রাত্রিবেলা শহর থেকে ময়লা ফেলার ড্রামগুলো উধাও হচ্ছে। তা দেখে ‘নিউ ইয়র্কার’ পত্রিকা অ্যালান ডান-এর আঁকা কার্টুন ছেপেছে। বিষয়বস্তু বেশ মজাদার। নিউ ইয়র্ক শহরে রাতের অন্ধকারে নেমেছে অনেক আনআইডেন্টিফায়েড ফ্লাইং অবজেক্ট (ইউএফও)। উড়ন্ত চাকি। সে সব থেকে পিলপিল করে বেরোচ্ছে লিটল গ্রিন মেন। ভিনগ্রহের জীব। ই টি। যাদের একটা অ্যান্টেনা। কার্টুনে দেখা যাচ্ছে, ওই সব ই টি-রা নিউ ইয়র্কের রাস্তা থেকে জঞ্জালের ড্রাম নিয়ে উড়ন্ত চাকিতে জমা করছে। কেন? ওগুলো নিয়ে পালাবে বলে।

লাঞ্চ করতে করতে ফের্মি তিন বিজ্ঞানীকে বললেন, ‘নিউ ইয়র্কার’ পত্রিকার কার্টুনে ডান কিন্তু একটা জিনিস খুব ভাল ভাবে করেছেন। আপাত অসংলগ্ন দুটো ব্যাপারকে উনি জুড়েছেন। ফের্মির মন্তব্য, অবশ্যই, ঠাট্টাচ্ছলে। কিন্তু তার যুক্তি লক্ষণীয়। তিনি যা বলতে চাইলেন, তা বিজ্ঞানেরই নির্যাস। বিজ্ঞানের মূল উদ্দেশ্য ব্রহ্মাণ্ডের নানা জটিলতা সরল করা। যত ভাবে সমাধা হয় সেই কাজ, তার অন্যতম হল আপাত-সম্পর্কহীন একাধিক ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র আবিষ্কার। গাছের আপেল পড়ছে মাটিতে। চাঁদ পৃথিবীর চার দিকে ঘুরছে। আইজ্যাক নিউটন বিজ্ঞানী, কারণ তিনিও দুটো আলাদা ব্যাপারের মধ্যে আবিষ্কার করেছিলেন যোগাযোগ। দেখিয়ে দিয়েছিলেন, ও দু’টির মূলে কারণ একটাই। গ্র্যাভিটি। তিন বিজ্ঞানীর উদ্দেশে ফের্মির মন্তব্যে ব্যঙ্গ থাকলেও, তার সঙ্গে ছিল বিজ্ঞানের যুক্তি। তিনি বলতে চেয়েছিলেন, আর যা-ই হোক, কার্টুনের প্রতিপাদ্যে কিন্তু বিজ্ঞানের মূল নীতির প্রতিফলন ঘটেছে। বিচ্ছিন্ন দুটো ব্যাপারের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপিত হয়েছে। কোন দুটো ব্যাপার? ওই যে অনেকে দাবি করে, তারা নাকি উড়ন্ত চাকি স্বচক্ষে দেখেছেন, আর ওই যে নিউ ইয়র্কের রাস্তা থেকে জঞ্জালের ড্রামগুলো উধাও হচ্ছে।

‘নিউ ইয়র্কার’ পত্রিকায় কার্টুনের আলোচনায় সে দিন ফের্মি এর পর চলে গিয়েছেন ভিন্ন প্রসঙ্গে। উড়ন্ত চাকি বস্তুটা বাস্তবে সম্ভব কি না, সেই আলোচনায়। কল্পবিজ্ঞানে দাবি করা হয়, উড়ন্ত চাকি নিমেষে পাড়ি দেয় ব্রহ্মাণ্ডের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত। তার মানে, ওরা ছুটতে পারে আলোর চেয়ে (সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার) অনেক অনেক বেশি গতিতে। সেটা কি সম্ভব? আলবার্ট আইনস্টাইনের তত্ত্ব অনুযায়ী, এই ব্রহ্মাণ্ডে কোনও কিছুরই তো ক্ষমতা নেই গতিতে আলোকে হারিয়ে দেওয়ার। সুতরাং, এই উড়ন্ত চাকি জিনিসটা কতখানি বাস্তব?

ফের্মি প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন টেলারের দিকে, “এডওয়ার্ড, তোমার কী মনে হয়? আগামী দশ বছরের মধ্যে কোনও কিছুর আলোর চেয়ে বেশি স্পিডে ছোটার সম্ভাবনা কতটা?” টেলার জবাব দিলেন, “টেন টু দি পাওয়ার মাইনাস সিক্স।” অর্থাৎ, টেলারের মতে, উড়ন্ত চাকি সত্যি হওয়ার সম্ভাবনা দশ লক্ষের মধ্যে এক। টেলারের জবাব শুনে ফের্মির মন্তব্য: “নাহ্! ওটা খুব কম হয়ে গেল। আমার মনে হয় সম্ভাবনাটা হবে দশের মধ্যে এক।” আসলে এটাও একটা বিদ্রুপ। সম্ভাবনাটা অস্বাভাবিক বাড়িয়ে দিয়ে ফের্মি এটাই বোঝাতে চাইলেন যে, উড়ন্ত চাকি জিনিসটা আদ্যন্ত গাঁজাখুরি!

টেলার, ইয়র্ক এবং কোনোপিনস্কিকে এর পর ফের্মি বুঝিয়ে দেন একটা হিসাব। আমাদের এই মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে কতগুলো নক্ষত্র?

তার মধ্যে কতগুলো নক্ষত্রের থাকতে পারে পৃথিবীর মতো গ্রহ? সেই গ্রহগুলোতে বিবর্তন যথাযথ এগোলে মানুষের মতো প্রাণী থাকতে পারে কতগুলোতে? তাদের মধ্যে উন্নত প্রযুক্তি থাকতে পারে কতগুলো গ্রহে? দেখা গেল, সংখ্যাটা বিরাট। ফলে ভিনগ্রহীদের অনেক আগেই পৃথিবীতে পদার্পণ করার কথা। এবং এখনও পর্যন্ত বহু বার। কিন্তু কই, তেমনটা তো হয়নি। এই বাস্তব পরিস্থিতির দিকে তাকিয়ে টেলার, ইয়র্ক এবং কোনোপিনস্কির উদ্দেশ্যে ফের্মি ছুড়ে দিয়েছিলেন তাঁর সেই বিখ্যাত প্রশ্নটা: “হোয়্যার ইজ় এভরিবডি?” ইটি-রা সব তা হলে গেল কোথায়? যদি এতটাই সম্ভাব্য হয় তেনাদের অস্তিত্ব, তা হলে তেনাদের দেখা মিলছে না কেন?

এক জন জ্যোতির্বিজ্ঞানী, যিনি বিশ্বাস করতেন তিনি বেঁচে থাকাকালীন ইটি-রা দেখা দেবে, তিনি মারা গেলেন সম্প্রতি। এ বছরই ২ সেপ্টেম্বর প্রয়াত হলেন ফ্রাঙ্ক ড্রেক, তাঁর বয়স হয়েছিল ৯২। প্রয়াত হলেন ক্যালিফর্নিয়ার অ্যাপটস-এ নিজের বাড়িতেই। মৃত্যুসংবাদ জানিয়ে তাঁর মেয়ে, বিজ্ঞান-সাংবাদিক নাদিয়া ড্রেক বলেছেন, “আ টাইটান ইন লাইফ। ড্যাড লিভস আ টাইটানিক লেগ্যাসি।” ঠিক কথা। ১৯৬২ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘ইন্টেলিজেন্ট লাইফ ইন দ্য স্পেস’ গ্রন্থে ড্রেক লিখেছিলেন, “এই মুহূর্তে নিশ্চয়ই বুদ্ধিমান সভ্যতার পাঠানো বেতারসঙ্কেত পৃথিবীতে এসে পড়ছে। সেই সমস্ত বেতারসঙ্কেত ঠিক কম্পাঙ্কে ধরার জন্য টেলিস্কোপ বানানো যেতে পারে। তা হলে কোনও না কোনও নক্ষত্র থেকে নিশ্চয়ই উত্তর আসবে সেই সব প্রশ্নের, যা মানুষ যুগ যুগ ধরে জানতে চেয়েছে। এই বিশ্বে মানুষ কি একাকী?”

ড্রেক স্মরণীয় হয়ে থাকবেন তাঁর নামে একটা ফর্মুলার জন্য, যা তিনি উদ্ভাবন করেছিলেন ১৯৬১ সালে। ইটি-দের খোঁজা একটা সম্ভাব্যতার ব্যাপার। সেই সম্ভাব্যতার সন্ধানেই ড্রেক ইকোয়েশন। যে ফর্মুলা, ড্রেক দাবি করেছিলেন, আমাদের এই মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষমতাসম্পন্ন ইটি-সভ্যতার সংখ্যা নির্ণয় করবে। শুধু মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে কেন? হ্যাঁ, ড্রেকের মতে গ্যালাক্সিগুলোর মধ্যে দূরত্ব এত বেশি যে, অন্য গ্যালাক্সি থেকে ইটি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবে— এমন আশা করা বাতুলতা।

ড্রেক বললেন, মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষমতাসম্পন্ন ইটি-সভ্যতার সংখ্যা যদি N হয়, তা হলে,

N=R*×fp×nc×fl×fi×fc×L

যেখানে—

R*= মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে প্রতি বছর সূর্যের মতো যতগুলো নক্ষত্র জন্মায়;

fp= সেই নক্ষত্রগুলোর যত অংশের চারপাশে গ্রহ পরিবার গড়ে ওঠে;

nc= সেই পরিবারগুলোর প্রত্যেকটায় যতগুলো পৃথিবীর মতো গ্রহ থাকে;

fl= সেই গ্রহগুলোর যত অংশের মধ্যে প্রাণের আবির্ভাব ঘটে;

fi= তাদের যত অংশে প্রাণী বুদ্ধিমান হয়ে ওঠে;

fc= সেই বুদ্ধিমান জীবদের যত অংশ গ্যালাক্সিতে অন্য গ্রহের বাসিন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগের উপযোগী প্রযুক্তিগত উন্নতিঅর্জন করে;

L= এ রকম উন্নত সভ্যতার আয়ুষ্কাল।

শুধু সম্ভাব্যতার গণনা করাই নয়, ড্রেক অনেক রেডিয়ো মেসেজও পাঠিয়েছেন ইটি-র উদ্দেশে। যেমন তিনি ১৯৭৪ সালে পাঠিয়েছিলেন এম-১৩ নক্ষত্রপুঞ্জের উদ্দেশে। ওখানে আছে তিন লক্ষ নক্ষত্র। তাদের কোনও কোনওটার চার পাশে নিশ্চয়ই আবর্তন করছে গ্রহ। কোথাও থেকে রেডিয়ো মেসেজের উত্তর যদি আসে, সেই আশায়। রেডিয়ো মেসেজে কী ছিল? ৭৩টা সারি আর ২৩টি কলামে সাজানো ১ আর ০-এর সমাহার। ইটি-রা যদি বুদ্ধিমান হয়, তা হলে ওই মেসেজ পড়ে বুঝতে পারবে ওতে কম্পিউটারের ভাষায় লেখা আছে অনেক কিছু। মানুষের আকার, প্রাণের অণু ডিএনএ, সৌরমণ্ডল এবং রেডিয়ো টেলিস্কোপের আদল। মুশকিল হল এম-১৩ নক্ষত্রপুঞ্জের দূরত্ব। তা ২৫০০০ আলোকবর্ষ দূরে। রেডিয়ো মেসেজ ছুটবে আলোর বেগে। অত বেগে ছুটলেও গন্তব্যে পৌঁছতে সময় লাগবে ২৫০০০ বছর। ইটি-রা সেই মেসেজের উত্তর দিলে তা পৃথিবীতে এসে পৌঁছবে আরও ২৫০০০ বছর পর। চিঠি যেতে আসতে ৫০০০০ বছর। আলোর বেগে (ব্রহ্মাণ্ডের সর্বাধিক গতিবেগ) গেলেও এই সময় লাগবে। ব্রহ্মাণ্ড সুবিশাল। ইটি-র সঙ্গে যোগাযোগে এটা একটা বড় বাধা।

ইটি-সমর্থক বিজ্ঞানীরা, বাঁ দিকে, ফ্রাঙ্ক ড্রেক এবং ডান দিকে, আব্রাহাম লোয়েব। ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স।

ইটি-সমর্থক বিজ্ঞানীরা, বাঁ দিকে, ফ্রাঙ্ক ড্রেক এবং ডান দিকে, আব্রাহাম লোয়েব। ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স।

সে বাধা অতিক্রম করে— এবং ড্রেকের ভবিষ্যদ্বাণী সফল করে তাঁর জীবদ্দশাতেই— ইটি-রা প্রোব পাঠিয়েছে। কিছু জ্যোতির্বিজ্ঞানী দাবি করেছেন, ভিনগ্রহীদের পাঠানো সেই প্রোব উড়ে গেছে সৌরমণ্ডলের ভিতর দিয়ে। হ্যাঁ, আবার বলছি, এমন দাবি যাঁরা করেছেন, তাঁরা বিজ্ঞানীই। এমনিতে তো ফ্লাইং সসার দেখেছেন বলে দাবি করেছেন অনেকেই। দাবি করেন, গরু ভেড়া, এমনকি মানুষকেও হাপিশ করে দেয় সেই সব উড়ন্ত চাকি। সে সব পাগলের প্রলাপ নয়, এঁরা দস্তুরমতো জ্যোতির্বিজ্ঞানী।

২০১৭ সালের ১৯ অক্টোবর। কানাডার জ্যোতির্বিজ্ঞানী রবার্ট ওয়েরিক প্যান-স্টারস-১ মানমন্দিরের তোলা রাতের আকাশের পর পর কয়েক দিনের ছবি দেখেছিলেন। ওই টেলিস্কোপ হাওয়াইতে মাউই দ্বীপে হালেয়াকাটায় ৩২০০ মিটার উঁচুতে পরিত্যক্ত এক আগ্নেয়গিরির পাশে অবস্থিত। অত্যাধুনিক ক্যামেরা দিয়ে রাতের আকাশের ছবি তোলা যায় সেখানে। ছবি দেখতে গিয়ে চমকে ওঠেন ওয়েরিক।

জিনিসটা ছোট— শহরের একটা পাড়ার সাইজ়ের। মহাশূন্যের মধ্যে দিয়ে ছোটার সময় ওটার ঔজ্জ্বল্য বার বার ওঠানামা করছিল। কখনও কখনও ঔজ্জ্বল্য দশ গুণ কমে যাচ্ছিল। যা থেকে মনে হয়, জিনিসটার আকৃতি হয় রোগা এবং লম্বা, সিগারের মতো। নয়তো চ্যাপ্টা এবং গোল, পিৎজ়ার মতো। সূর্যের চার দিকে উপবৃত্তাকার পথে ঘোরার বদলে ওটার পথ মোটামুটি ভাবে সরলরেখা। সবচেয়ে বিস্ময়ের হল এর গতিবেগ। ওটা যে বেগে ছোটার কথা, তার চার গুণ বেগে ছুটছে। ছোটার কথা ঘণ্টায় ৭০০০০ কিলোমিটার, আসলে ছুটছে ২,৯০,০০০ কিলোমিটার। হাওয়াইয়ে লোকেরা নাম দিল ‘ওমুয়ামুয়া’ অর্থাৎ, পর্যবেক্ষক। আবিষ্কারের কিছু দিন পরই ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়ন (আইএইউ)-এর অধিবেশন। আইএইউ জ্যোতির্বিজ্ঞানে কোনও বস্তুর নাম দেয়। আইএইউ ‘ওমুয়ামুয়া’-র নাম দিল সি/২০১৭ ইউ ১। ‘সি’ হল কমেট। পরে নাম হয়, এ/২০১৭ ইউ ১। ‘এ’ হল অ্যাস্টেরয়েড। চূড়ান্ত নাম ঠিক হয় ১ আই/২০১৭। ‘আই’ হল ইন্টারস্টেলার।

মহাজাগতিক বস্তুর বেগ নির্ধারণ করে গ্র্যাভিটি। গ্র্যাভিটি ‘ওমুয়ামুয়ার’ বেগ ব্যাখ্যা করতে পারে না। কখনও কখনও ধূমকেতুর বেগ বেশি হয়, কারণ ধূমকেতুকে ধাক্কা দেয় লেজ থেকে বেরোনো গ্যাস। ‘ওমুয়ামুয়া’-র লেজ ছিল না। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা বলেছে, ‘একটা অদ্ভুত বস্তু’। আবিষ্কারের পর থেকেই ওয়েরিক ‘ওমুয়ামুয়া’-র দিকে অন্য জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের দৃষ্টি দিতে বলেন। তাঁরাও সিদ্ধান্ত নেন, ‘ওমুয়ামুয়া’ এক অদ্ভুত বস্তু।

‘দি অ্যাস্ট্রোফিজ়িক্যাল জার্নাল লেটারস’ পত্রিকায় একটি পেপার লেখেন শমুয়েল বিয়ালি এবং আব্রাহাম লোয়েব। বিয়ালি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্টডক। আর লোয়েব? তিনি কেউকেটা বিজ্ঞানী। তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ব্ল্যাক হোল ইনিশিয়েটিভ’-এর ভূতপূর্ব ডিরেক্টর। ‘হার্ভার্ড-স্মিথসোনিয়ান সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজ়িক্স’-এর ইনস্টিটিউট ফর থিয়োরি অ্যান্ড কম্পিউটেশন-এর ডিরেক্টর, ন্যাশনাল অ্যাকাডেমির বোর্ড অব ফিজ়িক্স অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোনমি-র প্রধান এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা পর্ষদের অন্যতম সদস্য। ‘ওমুয়ামুয়া’-র চরিত্র বিশ্লেষণ করে বিয়ালি এবং লোয়েব, ‘দি অ্যাস্ট্রোফিজ়িক্যাল জার্নাল লেটারস’-এ লিখলেন, “ওটা বানানো। বানিয়েছে ইটি-রা। হয়তো ওটা পরিত্যক্ত যান যা মহাশূন্যে ভেসে বেড়াচ্ছে। অথবা ‘ওমুয়ামুয়া’ একটা ‘ফুলি অপারেশনাল প্রোব’, যা ইটি-রা পাঠিয়েছে আমাদের এই সৌরমণ্ডল পরখ করে দেখতে। দ্বিতীয় সম্ভাবনাই সত্যি এই কারণে যে, পরিত্যক্ত যান হলে ‘ওমুয়ামুয়া’-কে আমাদের দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা হত খুব— খু-উ-ব— কম।”

‘সায়েন্টিফিক আমেরিকান’ পত্রিকার ওয়েবসাইটে একটি ব্লগ লিখে লোয়েব স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন শার্লক হোমসের মন্তব্য, “হোয়েন ইউ হ্যাভ এক্সক্লুডেড দ্য ইমপসিব্‌ল, হোয়াটএভার রিমেন্‌স, হাউএভার ইমপ্রোব্যাবল, মাস্ট বি দ্য ট্রুথ।” একখানি বই লিখেছেন লোয়েব, ‘একস্ট্রাটেরেস্ট্রিয়াল: দ্য ফার্স্ট সাইন অব ইন্টেলিজেন্ট লাইফ বিয়ন্ড আর্থ’। মিডিয়ার হুড়োহুড়ি। লোয়োবের জীবনকাহিনি নিয়ে চলচ্চিত্র তৈরি করতে চাইছে ফিল্ম কোম্পানি।

রে রে করে উঠলেন অনেক জ্যোতির্বিজ্ঞানী। ওহায়ো স্টেট ইউনিভার্সিটির জ্যোতির্বিজ্ঞানী পল এম সাটার লিখলেন, “নাহ্! ‘ওমুয়ামুয়া’ ভিনগ্রহীদের বানানো জাহাজ নয়। (লোয়েব) এটা বলে বিজ্ঞানীদের অপমান করেছেন।” অ্যারিজ়োনা ইউনিভার্সিটির জ্যোতির্বিজ্ঞানের অধ্যাপক বেনজামিন ওয়েনার টুইট করলেন, “‘ওমুয়ামুয়া’ সম্পর্কে লোয়েবের থিয়োরি স্রেফ একটা গুজব। আমাদের বিরক্তির সীমা নেই। গুজবের পেছনে ছোটার ইচ্ছেও নেই।” তাঁর মতে, ‘ওমুয়ামুয়া’-র উপাদান হিমায়িত হাইড্রোজেন গ্যাস। ও রকম উপাদান হলেই আকার ওই রকমই হয়।

নিন্দেমন্দয় পাত্তা দিচ্ছেন না লোয়েব। কোরিয়া অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড স্পেস সায়েন্স ইনস্টিটিউট-এর বিজ্ঞানী থিয়েস হোয়াং-এর সঙ্গে আরও একটা পেপার লিখেছেন ‘দি অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল জার্নাল লেটার্স’ পত্রিকায়। এ বারের উদ্দেশ্য হিমায়িত হাইড্রোজেন তত্ত্ব নস্যাৎ করা। বক্তব্য, ‘ওমুয়ামুয়া’-র উপাদান হিমায়িত হাইড্রোজেন হওয়া কোনও মতেই সম্ভব নয়, কারণ হিমায়িত হাইড্রোজেন মহাজাগতিক যাত্রায় গলে যাবেই—“‘ওমুয়ামুয়া’ মাস্ট হ্যাভ বিন ডিজ়াইন্‌ড, বিল্ট অ্যান্ড লঞ্চড বাই অ্যান এক্সট্রাটেরেস্ট্রিয়াল ইন্টেলিজেন্স।”

লোয়েবের হিরো হলেন ইটালিয়ান বিজ্ঞানী গালিলেয়ো গালিলেই। কথিত আছে, ১৬৩৩ খ্রিস্টাব্দে বিচারকালে চার্চের সামনে নতজানু হয়ে এই প্রবাদপ্রতিম বিজ্ঞানী ক্ষমাপ্রার্থনা করেছিলেন। সেই ক্ষমাপ্রার্থনার সময়ও তিনি চুপি চুপি বলেছিলেন, ‘এপ্পার সাই মুভে’ (এবং তবুও ঘোরে)। সূর্যের চার দিকে পৃথিবীর ঘোরার কথা বলেছিলেন গালিলেয়ো। সিলিকন ভ্যালি উদ্যোগপতি ইউজিন ঝং-এর দশ লক্ষ ডলার অর্থসাহায্যে লোয়েব এখন তৈরি করেছেন গালিলেয়ো প্রজেক্ট। প্রকল্পের ট্যাগলাইনটি চমৎকার। ‘ডেয়ারিং টু লুক থ্রু নিউ টেলিস্কোপস’। দূরবিনে ইটি-দের প্রযুক্তি খুঁজে বেড়ানো। সাহস থাকে তো খোঁজো। জানি, প্রতিষ্ঠিত জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের নিন্দেমন্দ কপালে জুটবে। সে উপেক্ষা করার সাহস থাকে তো খোঁজো।

বছরের শুরুতে ‘সায়েন্স’ জার্নাল ছেপেছে লোয়েবের প্রোফাইল। হেডলাইন, ‘প্যারানর্মাল অ্যাকটিভিটি’। হেডলাইনের নীচে লেখা, ‘হোয়াই ইজ় হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি অ্যাস্ট্রোফিজ়িসিস্ট স্টাডি লোয়েব ওয়ার্কিং উইথ আর্ডেন্ট ইউএফও বিলিভার্স?’ ইউএফও যারা বিশ্বাস করে, তারা তো কট্টর বিজ্ঞানের চোখে অপাঙ্‌ক্তেয়। ‘সায়েন্স’ জার্নাল কট্টর বিজ্ঞানের সমর্থক। তবে কেন লোয়েবের প্রোফাইল এই জার্নালে ছাপা হল?

লোয়েবের প্রশংসা করেছেন এক জন। এরিক ফন দানিকেন। হ্যাঁ, ‘চ্যারিয়ট অব দ্য গড্স?’ (বাংলায় রূপান্তরিত, ‘দেবতারা কি গ্রহান্তরের মানুষ?’) গ্রন্থের রচয়িতা। সে বই নিয়ে পরে তৈরি হয় টিভি তথ্যচিত্র। ‘ইন সার্চ অব এনশিয়েন্ট অ্যাস্ট্রোনটস’। দানিকেনের দাবি, ভিনগ্রহীরা পৃথিবীতে নেমেছিলেন সুদূর অতীতে। প্রাচীন মহাকাব্যে, পুঁথিতে যা লেখা আছে, তা সব সত্যি। দেবতারা আর কিছু নন, গ্রহান্তরের জীব। তাঁরা এই পৃথিবীর মানুষের চেয়ে বেশি বলশালী। তাই তাঁদের কীর্তিকলাপ দেখে মানুষ স্তম্ভিত। এই কলকাতায় দানিকেন এসেছিলেন দু’-দু’বার। ১৯৭৭ এবং ১৯৮৩ সালে। প্রথম বার বক্তৃতা দিয়েছিলেন রাজাবাজার সায়েন্স কলেজে। সে বক্তৃতায় গেটক্র্যাশ হয়েছিল। এখন দানিকেনের বয়স ৮৭। তিনি বলেছেন, “ভিনগ্রহীদের কথা বলতে সাহস লাগে। কোনও বিজ্ঞানী চান না উপহাসের পাত্র হতে। লোয়েবের সাহস দেখে আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি। আসলে সময় সব জিনিস পাল্টে দেয়।”

আজ বা কাল, ভিনগ্রহীদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হবেই। এমন তো হতে পারে না যে, বিপুল এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে শুধু পৃথিবী গ্রহটাই সুজলা-সুফলা। অন্য বাসযোগ্য গ্রহেও নিশ্চয়ই অস্তিত্ব আছে প্রাণের। তাদের সঙ্গে মোলাকাত অনিবার্য। দেখা হলে, কী ভাবে সাড়া দেব আমরা? যোগাযোগের ভাষা কী হবে আমাদের? এই পৃথিবীতেই কত ভাষা! এক ভাষার লোকজন অন্যের ভাষা বোঝে না। দেখা হলে বোবার মতো থাকে। সুতরাং, কী ভাষায় কথা ‘বলব’ আমরা দেখা হলে?

সমস্যার সমাধান করতে পারে গণিত। যেমনটি ভেবেছিলেন প্রয়াত জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সাগান। সাগান উৎসাহী ছিলেন ভিনগ্রহীদের ব্যাপারে। ১৯৬২ সালে রুশ বিজ্ঞানী আইয়োসিফ সামুইলোভিচ স্‌ক্লোভস্কি-র সঙ্গে লিখেছিলেন ‘ইনটেলিজেন্ট লাইফ অন দ্য ইউনিভার্স’। ১৯৭৬ সালে মঙ্গলগ্রহে প্রাণ খুঁজতে যে দুটো ভাইকিং পাঠানো হয়েছিল, সে দুটো কী উপায়ে ওখানে প্রাণ খুঁজবে, তা বলে দিয়েছিলেন সাগান। সেই জ্যোতির্বিজ্ঞানী ১৯৮৫ সালে লিখেছিলেন কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস ‘কন্ট্যাক্ট’। হ্যাঁ, অবশ্যই ইটি খুঁজে পাওয়া নিয়ে।

নায়িকা এলি আরওয়ে। ক্যালিফর্নিয়ার মফেট ফিল্ড-এ ‘সার্চ ফর একস্ট্রাটেরেস্ট্রিয়াল ইন্টেলিজেন্স অফিস’-এ কর্মরত বিজ্ঞানী জিল টারটার-কে দেখে অনুপ্রাণিত চরিত্র। ১৯৯৭ সালে উপন্যাসটি চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত হলে যে চরিত্রে অভিনয় করেন জোডি ফস্টার। সেই এলি প্রথম কী করে বুঝতে পারলেন ইটি-রা সিগন্যাল পাঠাচ্ছে? যখন তিনি দেখলেন, ইটি-রা সঙ্কেত পাঠাচ্ছে মৌলিক সংখ্যা অনুযায়ী রেডিয়ো পালসে।

মৌলিক সংখ্যা কী? যে সব সংখ্যাকে এক আর সেই সংখ্যার গুণফল ব্যতীত অন্য কোনও সংখ্যাদ্বয়ের গুণফল হিসেবে প্রকাশ করা যায় না। যেমন, ২, ৫, ৭, ১১ বা ১৩। ৪=২×২ কিংবা ৬=২×৩, তাই মৌলিক নয়। প্রযুক্তিতে উন্নত ভিনগ্রহীরা নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে চাইলে তাদের সংখ্যাজ্ঞান আবশ্যক। আর, যাদের সংখ্যাজ্ঞান আছে, তারা মৌলিক চিনতে পারবেই। সুতরাং, বুদ্ধিমান প্রাণীরা নিশ্চয়ই সিগন্যাল পাঠাচ্ছে। ১ (সাগান আগে ১-কে মৌলিক ভাবতেন, এখন আর তা ভাবা হয় না)-২-৩-৫-৭-১১-১৩...। ৫৯-৬১-৬৭-৭১-... এভাবে মৌলিক সংখ্যা ৯০৭ অবধি গুনে, তার পর আবার ১-২-৩-৫-৭-১১-১৩...। কোনও দুরূহ সমস্যার কী সহজ সমাধান! সাগানের পক্ষেই এ রকম ভাবা সম্ভব হয়েছিল।

গ্রহান্তরবাদ: ‘ওমুয়ামুয়া’— এটি ভিনগ্রহীদের প্রোব কি না, তা নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স।

গ্রহান্তরবাদ: ‘ওমুয়ামুয়া’— এটি ভিনগ্রহীদের প্রোব কি না, তা নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স।

এ প্রসঙ্গে একটা কথা মনে পড়ে গেল। ২০১০ সালে হায়দরাবাদ শহরে গণিতজ্ঞদের বিশ্ব সম্মেলন। ইন্টারন্যাশনাল কংগ্রেস অব ম্যাথমেটিশিয়ানস (আইসিএম)। যা এখন প্রতি চার বছর অন্তর আয়োজন করা হয় বিশ্বের বিভিন্ন শহরে। উদ্যোক্তারা ইন্টারন্যাশনাল ম্যাথমেটিক্যাল ইউনিয়ন (আইএমইউ)। আইসিএম ১৮৯৭ সালে প্রথম অনুষ্ঠিত হয় জ়ুরিখ শহরে। ২০১০-এ হায়দরাবাদের আগে ২০০৬ সালে আইসিএম অনুষ্ঠিত হয় স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদ শহরে। হায়দরাবাদের পর ২০১৪ সালে যেমন অনুষ্ঠিত হয় দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সোল শহরে।

আইসিএম-এর সবচেয়ে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান ফিল্ডস মেডেল প্রদান। সবাই জানেন, গণিতের ক্ষেত্রে নোবেল প্রাইজ়ের ব্যবস্থা নেই। গণিতে নোবেল প্রাইজ় ধরা হয় ওই ফিল্ডস মেডেলকে। কানাডার গণিতজ্ঞ জন ফিল্ডস এই পুরস্কার চালু করেছিলেন। প্রতিশ্রুতিমান গণিতজ্ঞকে দেওয়া হয় ওই মেডেল। তাই ৪০ বছরের কমবয়সি ৩ বা ৪ জন গণিতজ্ঞকে দেওয়া হয় ওই মেডেল। দেন আয়োজক দেশের রাষ্ট্রপ্রধান। হায়দরাবাদে যেমন চার জনকে ফিল্ডস মেডেল দেন তৎকালীন ভারতীয় রাষ্ট্রপতি প্রতিভা পাটিল। একটা কথা এখানে উল্লেখ করতেই হবে। ফিল্ডস মেডেলের পুরস্কারমূল্য কিন্তু খুব কম। মাত্র ১৫ হাজার ডলার। যেখানে নোবেল প্রাইজ়ের অর্থমূল্য প্রায় দশ লক্ষ ডলার। তা হোক, তবু গণিতের ক্ষেত্রে ফিল্ডস মেডেলের গুরুত্ব নোবেল প্রাইজ়ের সমান।

হায়দরাবাদের আইসিএম থেকে প্রথম শুরু হয় আরও কিছু পুরস্কার। যেমন চার্ন মেডেল। চিনা গণিতজ্ঞ শিং-শেন চার্ন-এর নামে শুরু হয় ওই মেডেল। গণিতে সারা জীবনের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ওই পুরস্কার। অর্থমূল্য আড়াই লক্ষ ডলার। প্রথম বার চার্ন মেডেল দেওয়া হয় আমেরিকান গণিতজ্ঞ লুই নিরেনবার্গ-কে। আইসিএম কভার করতে আমি হায়দরাবাদে উপস্থিত। সিদ্ধান্ত নিই নিরেনবার্গকে ইন্টারভিউ করতে হবে। নিরেনবার্গ রাজি হয়ে যান।

নির্দিষ্ট সময়ে নিরেনবার্গের কাছে হাজির হই। আমার প্রশ্ন শুনে নিরেনবার্গ বিরক্ত হন। এত বিরক্ত যে, তিনি আমার কাগজকেও অপমান করতে ছাড়েন না। আমার কী প্রশ্নে এত বিরক্ত হন নিরেনবার্গ, এ বার তা বলব। আমার প্রশ্ন ছিল: আপনি কি মনে করেন যে, ইটি-দের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগের গণিতই হবে একমাত্র ভাষা? আমার প্রশ্ন শুনে নিরেনবার্গ কী উত্তর দিলেন? উনি বললেন, আপনার কাগজ কি ইটি ছাড়া কিছু ভাবে না? কী প্রশ্নের কী উত্তর!

চার্ন মেডেল-প্রাপক আমি জিজ্ঞাসা করতে পারলাম না, আনন্দবাজার পত্রিকা সব সময়ই ইটি নিয়ে ভাবে না নিশ্চয়ই, তবে ইটি-র সঙ্গে কী ভাষায় কথা ‘বলা’ হবে, তা যে মানবসভ্যতার এক বিরাট প্রশ্ন, তা কি আপনি অস্বীকার করতে পারেন?

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.