বিয়ের চব্বিশ বছর পর ইতুর সঙ্গে ট্রায়াল পিরিয়ডে সেপারেশনে থাকার মধ্যে যতখানি লজ্জা মিশে আছে, তার চেয়েও বেশি বোধহয় সঙ্কোচ। বন্ধুবান্ধব, চেনা পরিচিত, আত্মীয়স্বজনের ভ্রুকুটির মুখোমুখি হওয়ার সঙ্কোচ। পুজোয় দেশের বাড়ি পৌঁছে বিষয়টা জানাজানি হতেই প্রশ্নবাণে পাগল হওয়ার দশা অনীশের।
“আশ্চর্য! এতগুলো দিন তোমরা তা হলে এক সঙ্গে কাটালে কী করে দাদাভাই? বৌমণি তো মানুষ খারাপ নয়! শুধু একটু অ্যাটেনশন চায়। কাজের চাপে যেটা তুমি ওকে মোটেই দাও না!” ঝাঁঝালো স্বরে শিখা বলল। চেন্নাইতে থাকে। অনীশের খুড়তুতো বোন। ছোট থেকেই ইতুর ন্যাওটা ছিল।
মনে মনে অনীশ ভাবল, ‘থাকি মুম্বইয়ে। বছরে এক বার মাত্র পুজোর সময় বরানগরে আসি। সবাই মিলে ক’টা দিন আনন্দ করে কেটে যায়। এতে একটা গোটা মানুষকে চেনা যায়? জানিস এই দশ বছরে কতটা পাল্টে গেছে তোদের বৌমণি?’
মুখে যদিও কিছু বলল না। বলে লাভ নেই।
“এই তিপ্পান্ন বছর বয়সে এসে তোর মনে হল বৌয়ের থেকে আলাদা হওয়ার কথা? নাকি অন্য কোথাও ফেঁসেছিস? ডুবে ডুবে জল খাচ্ছ চাঁদু?” ছেলেবেলার বন্ধু বাসবের সঙ্গে দেখা হতেই সে সুযোগ বুঝে হুল ফোটাল। অনীশ দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করল। এ ছাড়া আর কী-ই বা করার আছে ওর।
সাবেক আমলের পুজো। বাড়ির ঠাকুরদালানে এখন একচালার প্রতিমা নামিয়ে আনা হয়েছে। ঢাক বাজছে উচ্চগ্রামে। আজ বিসর্জন। ডাকের সাজে সপরিবার মা দুর্গা। দেবীমূর্তির পিছনে রঙিন চালচিত্রের একেবারে শীর্ষে নন্দীভৃঙ্গী নিয়ে শিব। হরপার্বতীর সাংসারিক জীবনের নানা খুঁটিনাটি। অন্য বার বাড়ির মেয়েদের সঙ্গে আজকের দিনে সিঁদুর খেলায় মেতে উঠত ইতু। এ বার ওকে ছাড়া সব কেমন অর্থহীন। নাহ্, এ বছরটা কলকাতায় না এলেই ভাল ছিল। এর বদলে গোয়ায় চলে যেতে পারত। সি-বিচে বসে থাকত বিয়ারের ক্যান হাতে। কিচ্ছু ভাল লাগছে না। বাবা-মা কেউই আর বেঁচে নেই। খবরটা ওদের শুনতে হয়নি, এই যা বাঁচোয়া।
অনীশ আর ইতুর একমাত্র সন্তান সপ্তর্ষি ওরফে রিকু টেক্সাসে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে। অ্যাসাইনমেন্ট থাকায় সে এ বার পুজোয় দেশে আসতে পারেনি। মাসখানেক আগে অনীশের কাছে ফোনে খবরটা শুনে অদ্ভুত নির্লিপ্ত স্বরে বলেছিল রিকু, “জাস্ট চিল বাবা। বোথ অব ইউ আর ইনকমপ্যাটিবল উইথ ইচ আদার। হোয়াট টু ডু? লেট’স অল অ্যাডমিট দ্যাট।”
‘ইনকমপ্যাটিবল’ শব্দটা তিরের মতো বিঁধেছিল অনীশকে। অথচ কী সহজেই না উচ্চারণ করল ছেলে! জেন-জ়ি বলেই পারল। ওরা অনীশদের মতো নয়। ঘোর বাস্তববাদী।
বাড়ির মেয়েদের ভিড় এড়িয়ে সরে আসতেই হঠাৎ অর্ধবৃত্তাকার চালচিত্রের পিছন দিকটায় চোখ পড়ল অনীশের। সামনের দিকে যত জৌলুস আর রঙের চেকনাই, মাটি-লেপা পিছনটা ততখানিই ক্ষয়াটে, বিবর্ণ। অনেকটা যেন ওদের চব্বিশ বছরের দাম্পত্যের মতো। বাইরে থেকে চকচকে, সাজানো-গোছানো। কিন্তু ভিতরে ভিতরে ঘুণ ধরে গিয়ে...
পাঞ্জাবির পকেটের ভিতর থেকে মুঠোফোনটা ককিয়ে উঠছিল অনেক ক্ষণ ধরেই। ঢাকের আওয়াজে শুনতে পায়নি। ঠাকুরদালান থেকে দ্রুত পায়ে হাঁটতে হাঁটতে সে চলে এল ঘাটে। বাড়ির খুব কাছেই গঙ্গা। স্ক্রিনে নম্বরটা দেখে অবাক হয়ে গেল অনীশ। ইতুর ফোন!
“হঠাৎ? কী ব্যাপার?”
“রিকুর ফোনে কিছুতেই লাইন পাচ্ছি না। তুমি এক বার ট্রাই করবে প্লিজ়?” ও পাশের স্বরটা কাঁপছে। একমাত্র টেনশনেই ইতুর এ রকম হয়। ওর শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে অনীশ পরিচিত।
“রিকুকে ফোন করব কেন খামোখা? ওখানে তো রাত। ও হয়তো ঘুমোচ্ছে ওর অ্যাপার্টমেন্টে...”
মুখের কথা শেষ না হতেই ও পাশ থেকে ইতুর তীক্ষ্ণ স্বর ভেসে এল, “দিব্যি বন্ধুবান্ধব আর আড্ডা নিয়ে আছ। নিউজ় দেখেছ? গত কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে টেক্সাসের কী অবস্থা জানো? সেই তো, ছেলের চিন্তা একা আমারই...”
একটা কঠিন জবাব ঠোঁটের ডগায় চলে এসেছিল অনীশের। অনেক কষ্টে সে নিজেকে সংবরণ করল। অভিযোগ আর অভিযোগ! ইতু মানেই অভিযোগের ডালি! গত দশ বছরে প্রতি মুহূর্তে ইতু বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে, এক জন স্বামী ও বাবা হিসেবে অনীশ কতখানি অপদার্থ। ফলত নিত্যদিনের ঝগড়া, কথা কাটাকাটি আর শেষ দিকে বিছানা বদল। সংসারে নিজেকে নিংড়ে দিয়েও নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারেনি অনীশ।
অবশ্য আজ আর তার প্রয়োজনও নেই।
ফোন কেটে দিয়ে ছেলের নম্বরে ট্রাই করতে করতে এর পরের ভাবনাগুলো ভেবে রাখছিল ও।
*****
ঘণ্টাখানেক পর ইতুকে ফোনে ধরতেই ইতু বলল, “কোনও খবর পেলে?”
“হ্যাঁ। সব ঠিক আছে। সুশান্তকে মনে আছে তোমার? আমার এক্স কোলিগ? ওর এক বন্ধু কাছাকাছিই থাকে। সে গিয়ে খোঁজ নিয়েছে। রিকুদের অ্যাপার্টমেন্ট অবধি জল ওঠেনি। কিন্তু সেফটির জন্য ওরা একটা লাইব্রেরির তিনতলায় গিয়ে উঠেছে। যথেষ্ট খাবারদাবার, জল, ওষুধপত্র সঙ্গে নিয়েই। ওর বন্ধুরাও আছে। সো ডোন্ট ওরি।”
“তা হলে ফোনে পাচ্ছি না কেন রিকুকে?” ইতুর গলাটা আর্তনাদের মতো শোনাল।
ধমকের সুরে বলল অনীশ, “সিগন্যাল নেই। পেলেই তোমাকে করবে। আমাদের ছেলে ঠিক আছে ইতু। বিলিভ মি। অনেক স্ট্রেস গেছে। এখন একটু চোখ বুজে থাকো তো! প্লিজ়!” বহু দিন পর ‘তোমার ছেলে’ না বলে ‘আমাদের ছেলে’ বলতে পেরে অনীশের মনটা বেশ ফুরফুরে হয়ে গেল।
“আচ্ছা। তা-ই করি। তুমিও সাবধানে থেকো। ওষুধগুলো সময়মতো খেয়ো। ছাড়ছি, কেমন?” ও পাশে ইতুর স্বর এখন অনেকটা স্বাভাবিক। সেই স্বরে কি কিছুটা আবেগ? একটা মৃতপ্রায় সম্পর্কের জন্য? তা হলে কি আর একটু ভাবা দরকার? এত সহজে সব কিছু ফুরিয়ে যায় কখনও? সম্ভব?
নিরঞ্জনের জন্য প্রতিমা ঘাটে আনা হয়েছে। প্রতিমাকে সাত পাক ঘোরানোর সময় অনীশের চোখ আবারও চলে গেল অর্ধগোলাকার চালচিত্রের পিছন দিকটায়। উঁচু-নিচু এবড়োখেবড়ো অংশে এখন গোধূলির রাঙা আলো সরাসরি গিয়ে পড়েছে। জায়গাটা আর আগের মতো মলিন লাগছে না। বরং জোড়াতালি দেওয়া খরখরে রুক্ষ বুক সোনালি আলোর স্পর্শে পেলব। যেন কোনও অদৃশ্য শিল্পী ভালবাসার রঙে অনৈসর্গিক এক পটচিত্র ফুটিয়ে তুলছে ওখানে।
অনীশ পলকহীন চোখে সেই ছবিটার গড়েওঠা দেখছিল।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)