E-Paper

পবনঠাকুরের পিঁড়ি

তার ঘরের টিনের চাল কাঁপে ঝড়ের হাওয়ায়। ধুলোয় ভরে যায় চারিদিক। পারুলবালা নাতি-নাতনিদের বলল, “তোরা কোঠাঘরে যা গিয়া, এইখানে থাকস না— আমার টিনের চাল, বিপদ হইবো।”

শান্তনু দে

শেষ আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬ ০৭:০৩
ছবি: তারকনাথ মুখোপাধ্যায়

ছবি: তারকনাথ মুখোপাধ্যায়

বৈশাখ মাসের বিকেল। আকাশে ঘন কালো মেঘ করেছে। কালো মেঘের স্লেটের মতো আকাশে সবুজ গাছপালাগুলোর কী বাঁধনছেঁড়া আকুলিবিকুলি! এখনই ঝড় উঠবে।

ভাশুরের নাতি-নাতনিদের সঙ্গে নিজের ঘরের বারান্দায় বসে পুরনো দিনের গল্প করছে পারুলবালা। এক দিকে ভাশুরের দোতলা বাড়ি। তাঁর পাঁচ ছেলের ভরভর্তি সংসার। মাঝখানে একফালি উঠোন, কাঁঠাল গাছ, নারকেল গাছ, কুয়োতলা, তুলসীমন্দির। কুয়োতলার এক পাশে পারুলবালার এক-কুঠুরি ঘর আর বারান্দা। একা বিধবার ওতেই চলে যায়।

ভাশুরের নাতি-নাতনিগুলো গরমের ছুটির দুপুরে আসে। তাদেরকে ফেলে আসা জীবনের গল্প বলে পারুলবালা, “আমাগো দ্যাশ আসলে ওইটা, এখন বাংলাদ্যাশ হইছে, ভাগ হইয়া গেল, বড়কত্তা, কত্তারা ঠিক করল চইলা আসবো এই দ্যাশে। যা কিছু জমিজমা আছিল কিছু বন্দোবস্ত কইরা, বাকি সব ফাইলা... বাক্সপ্যাঁটরা লইয়া আমাগো দ্যাশ ছাইড়া …” কথা শেষ হওয়ার আগেই ঝড় উঠল।

পারুলবালা উতলা, ভয় পাচ্ছে যেন। তার ঘরের টিনের চাল কাঁপে ঝড়ের হাওয়ায়। ধুলোয় ভরে যায় চারিদিক। পারুলবালা নাতি-নাতনিদের বলল, “তোরা কোঠাঘরে যা গিয়া, এইখানে থাকস না— আমার টিনের চাল, বিপদ হইবো।”

নাতি-নাতনিরা পারুলঠাকমার কথা শুনল না। এখানে কী সুন্দর হাওয়া লাগে, বারান্দা ঘেরা নয়, বৃষ্টির ছাঁট আসে, গোলা পায়রাগুলো এদিক-ওদিক থেকে ছিটকে এসে পারুলবালার টিনের ঘরের চালার তলায় তাদের বাসায় ফিরছে। উঠোনে জল জমলে এখান থেকে সহজেই নৌকা ভাসানো যাবে। সে নৌকা ভাসতে ভাসতে উঠোনের নদী পেরিয়ে গেট পার হয়ে যাবে।

পারুলবালার আর ওদের দিকে তাকানোর জো নেই। কালবৈশাখী ঝড়ের দাপট বাড়ছে। পারুলবালা ছোটে তার ঠাকুরঘরে। সেখানে ঠাকুরের আসনের পাশে রাখা একটি পিঁড়ি নিয়ে আসে বাইরে। গঙ্গাজলে ধুয়ে, বাতাসা দিয়ে, ধূপ জ্বালিয়ে পিঁড়ি পেতে দেয় উঠোনের এক পাশে। বিড়বিড় করে বলে, “হে পবনঠাকুর শান্ত হও, শান্ত হইয়া বইসো তোমার পিঁড়েতে। শান্ত হও ঠাকুর…”

নাতি-নাতনিরা অবাক। নাতি বলল, “এ কী করো, ওই ঝড়-জলে পিঁড়ি পাতো কেন, কে বসবে? কার ভীমরতি হয়েছে?”

পারুলবালা বলল, “তোরা এখনকার পোলাপান, তোরা এই সব জানস না, আর জানলেও মানস না। এইটা করন লাগে, দেবতা ক্রুদ্ধ হইলে ছারেখারে যাইবো সব। পবনঠাকুর হইলেন ঝড়ের দেবতা, তেনারে ডাইকা বসাইতে হয়। জল-বাতাসা দিতে হয়। না হইলে ঝড় থামবো না।”

পারুলবালার ভাশুরের নাতি বুবুল ক্লাস সেভেনে পড়ে। সে জানে, স্থানীয়ভাবে নিম্নচাপের কারণে কালবৈশাখী ঝড় হয়। আর ওই যে শিবের জটা বা কালো মহিষের মতো কালো কালো মেঘ, ওর নাম কিউমুলোনিম্বাস।

সে কথা পারুলবালাকে বলতেই সে রেগে ওঠে, ধমক দেয়, “চুপ কর, দুই পাতা ইংরাজি পইড়া সব জাইনা গেছস? অবিশ্বাসী হইতে নাই। দেবতার কোপে পড়বি।”

নাতনি দোলা ক্লাস ফোর, দাদার মতো পাকা বুদ্ধি হয়নি। সে একটু ভেবে বলে, “তুমি যে পবনঠাকুরকে ডাকছ, ঠাকুর তোমার কথা শুনবে? ঝড় থেমে যাবে এখনই?”

পারুলবালা বলে, “শুনবো, তেমন কইরা ডাকতে পারলে ঠিকই শুনবো। সেই যে মহাভারতের একখান গল্প কইছিলাম তোগো, রাজা পাণ্ডু আছিল নপুংসক। তাহার দুই পত্নী। সন্তান হয় নাই। তহন দেবতাদের ডাক পড়িল— ধর্মদেব, পবনদেব, ইন্দ্রদেব… তাঁরা আইলেন… রানির সন্তান হইল— যুধিষ্ঠির, ভীমসেন, অর্জুন… তেমন ভাবে ডাকলে মাইনষের ডাকেও দেবতা সাড়া দেন।”

কিন্তু ঝড় কমল না, বরং আরও বেগ বাড়ল। বাড়ির উঠোনের নারকেল গাছ অসম্ভব রকমের দুলছে, যেন ভেঙে পড়ার উপক্রম। দূরের গাছগুলোর অবস্থাও তেমন। শোঁ শোঁ করে হাওয়ার শব্দ হচ্ছে। কড়-কড়া-কড় বাজ পড়ল ধারেকাছে কোথাও। তার আগে আকাশ জুড়ে সাপের মতো বিদ্যুতের খেলা। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নেমেছে বৃষ্টি।

বৃষ্টির তীর এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিচ্ছে সন্তানহীনা বিধবা পারুলবালাকে। সাদা থান, সাদা শনের মতো চুল লেপ্টে আছে অঙ্গে। হাতজোড় করে পবনঠাকুরের উদ্দেশে বিড়বিড় করছে বৃদ্ধা, “হে পবনঠাকুর, শান্ত হও, ঝড় থামায়ে দাও।”

ছোট নাতি-নাতনিগুলো এতক্ষণ মেজঠাকমার কাণ্ড দেখে মজা পাচ্ছিল, ঝড়ের দাপটে তারাও এখন ভয়ে জড়োসড়ো। পারুলবালার দেখাদেখি তারাও বিশ্বাস করছে, পবনঠাকুর খেপে গেছেন। তাই এত ঝড়।

দোলা বুবুলকে বলল, “দাদা, তুই মেজঠাকমার কথা মানিসনি, পবনঠাকুর রেগে গেছে। তাই এত ঝড় দিচ্ছে। তুই হাতজোড় করে ক্ষমা চেয়ে নে।”

বুবুল বলল, “আমার কী দোষ, আমাদের ভুগোল বইয়ে তো তা-ই লেখা আছে।”

তার পর বোনের কথামতো হাতজোড় করে বলল, “হে পবনঠাকুর, বইয়ের সব কথা আমি বিশ্বাস করি না। আমি জানি, তুমিই ঝড় দিচ্ছ। ঝড় থামিয়ে দাও। তোমার পিঁড়েতে বোসো…”

পারুলবালা হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে আছে পিঁড়ের দিকে চোখ করে। তার মনের মধ্যেও চলছে স্মৃিতর উথালপাথাল।

কতই না ঝড় দেখেছে পারুলবালা। দেশভাগ দেখেছে। ঝড়ের দাপটে শিকড় উপড়ে যাওয়া গাছের মতো নিজের দেশ ছেড়ে চলে আসতে হয়েছে সীমান্তপারের অন্য দেশে।

যার সঙ্গে পারুলবালার বিয়ে হয়, সে যেন কেমনধারা পুরুষ! শীতল। স্বামীর এক দূরসম্পর্কের ভাই তাদের বাড়িতেই থাকত। তার ছিল দেখার মতো পৌরুষ। পারুলবালার তখন পূর্ণযৌবন। সে হয়তো কুন্তীর মতো করে পবনঠাকুরকে ডেকেছিল। পবনঠাকুর সাড়াও দিয়েছিল তখন, যুবতী পারুলবালা সে রাতে ভয়ে দোর খোলেনি।

ক্রুদ্ধ পবনঠাকুর সেই থেকে ভয় দেখান পারুলবালাকে, বৃদ্ধা করজোড়ে বলে, “শান্ত হও পবনঠাকুর। পিঁড়ি পাইত্যা রাইখাছি, শান্ত হও…”

ঝড় থামে না। আরও তেড়েফুঁড়ে আসে।


(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bengali Story

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy