E-Paper

কর্পূর

বিরক্ত হয়েছিল উত্তম। দীপা হার মানেনি। দেখিয়েছিল, দরজার বাইরে উল্টে আছে ধুনুচি। ছড়ানো ছাইয়ে, পায়ের ছাপ।

অন্বেষা রায়

শেষ আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬ ০৭:১৩
ছবি: তারকনাথ মুখোপাধ্যায়।

ছবি: তারকনাথ মুখোপাধ্যায়।

কর্পূর জমানোর অদ্ভুত ছেলেমানুষি শখ দীপার। একটা বাহারি কৌটোয় সে কর্পূরের দানা জমায়। মহার্ঘ জিনিসের মতো আগলে রাখে। ঠাট্টা করলে বলে, “জিনিসটা সাধারণ হোক বা অসাধারণ, আমার ব্যক্তিগত, এটাই আসল কথা।”

উত্তমদের বড় পরিবার। রাত ছাড়া দু’জনে একা হতে পারত না। সেখানেও মাঝেমধ্যে উত্তমের ছোড়দার ছেলেটা এসে শুত। চার বছরের রিন্টুকে একফোঁটা বিশ্বাস করত না দীপা। বলত, ও নাকি দীপার কর্পূর চুরি করে। তাদের স্বামী-স্ত্রীর কথা পাঁচকান করে।

রিন্টুর অনুপস্থিতিতে উত্তম যখন ঘনিয়ে আসত, দীপার হাত চেপে বসত ওর ঠোঁটে। দরজা দেখিয়ে ফিসফিস করে বলত, “শুনছে।”

এক-এক সময়, উত্তম বেয়াড়া উল্লাসে পাল্টা জবাব দিত।

“শুনুক গে। নিজেরই বৌ, লজ্জা কী?”

আবছা অন্ধকারে শিহরিত হয়ে উঠত দীপা। ফিসফিস করে বলত, “মনের কথাও শুনছে যে।”

এক দিন সংসারে টাকা দেওয়ার প্রসঙ্গে প্রবল ঝড় উঠল উত্তমদের একান্নবর্তী পরিবারে। উত্তেজনায় জ্ঞানশূন্য হয়ে উত্তমের বৌদি মুখের আগল খুলে দিলেন। দেখা গেল, দীপার সন্দেহ ভিত্তিহীন নয়। উত্তম যে বৌয়ের জন্য চকোলেট আনে, পুজোয় শাশুড়িকে ঢাকাই শাড়ি দেয়, শালির বিয়েতে সোনার দুলও দিয়েছে— এই সব অতি গোপনীয় সংবাদও বৌদির হেফাজতে মজুত।

স্তম্ভিত উত্তম তর্ক জিততে পারেনি। কষ্ট হয়েছিল। সে এ বাড়ির ছেলে হতে পারে, কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ। খানিক একান্ত পরিসর কি তার প্রাপ্য নয়?

দীপাকে নিয়ে বাড়ি ছেড়েছিল উত্তম। ভাড়া নিয়েছিল শ্যামবাজারে। বাড়ির মালকিন, এক সহৃদয় মহিলা। নানা গল্প করতেন দীপার সঙ্গে। সেই বাড়িতে প্রতি সন্ধেবেলা ধুনোর সঙ্গে কর্পূর মিশিয়ে, চৌকাঠে রাখত দীপা। প্রথম কয়েকটা দিন বেশ ছিল। চার দেওয়ালের পরিসরে সুখী হয়েছিল দু’জনে। হঠাৎ এক দিন দীপার মনে হল, বাড়িওয়ালি তাদের দরজায় কান পাতে।

বিরক্ত হয়েছিল উত্তম। দীপা হার মানেনি। দেখিয়েছিল, দরজার বাইরে উল্টে আছে ধুনুচি। ছড়ানো ছাইয়ে, পায়ের ছাপ।

নিজস্ব আড়ালটুকুর জন্য ওরা এর পর ফ্ল্যাট নিয়েছিল। মালিক অন্য পাড়ার বাসিন্দা। মিশুকে প্রতিবেশীরাও ছিলেন পুরু দেওয়ালের ব্যবধানে। পেতলের চমৎকার একটি ধূপদানিতে প্রতিদিন কর্পূর জ্বালাত দীপা। আদরে, অন্ধকারে ডুবে যেতে যেতে ওরা সন্তান আনার কথা ভাবত।

কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই সন্দিগ্ধ হয়ে উঠেছিল দীপা। পড়শি কাকিমাটি অতিরিক্ত কৌতূহলী না? দরজা খুললেই উঁকিঝুঁকি। যখন-তখন চলে আসা। এক দিন হঠাৎ কর্পূরের কৌটো খুঁজে না পেয়ে দীপা সাংঘাতিক একটা কাণ্ড করে বসল। সটান পাশের ফ্ল্যাটে হাজির হয়ে বলল, “কেন নিয়েছেন আমার কর্পূরের কৌটো?”

লজ্জায় মাটিতে মিশে গিয়েছিল উত্তম, কিন্তু প্রতিবাদ করার আগেই ভদ্রমহিলার মেয়ে বলেছিল, “মায়ের এটা অসুখ বৌদি। কখন যে কার জিনিস তুলে আনবে, ঠিক নেই। কিছু মনে কোরো না।”

ফেরতও দিয়েছিল কৌটোটা। তবুও দীপার মন নরম হয়নি। অতএব বাড়ি বদল। একাধিক বার। পদোন্নতি আর বদলির জেরে পাল্টেছে শহর এবং দেশও। দীপার সন্দেহ কমেনি। আত্মীয়, বন্ধু, প্রতিবেশী, সহকর্মী কিংবা কাজের লোক। এক-এক সময় এক-এক জন।

বর্তমানে, শহরের আধুনিকতম আবাসনে, একাশি তলায় থাকে দীপা আর উত্তম। দীপার শান্তির জন্যেই এখানে দরজায় ডিজিটাল লক, এআই-ঋদ্ধ যন্ত্র প্রেক্সা ছাড়া কাছাকাছি কেউ নেই। প্রেক্সা-কে যা আদেশ করবে, বাধ্য ভৃত্যের মতো পালন করবে। আত্মীয়-বন্ধুরা হাসিমুখে উপস্থিত সমাজমাধ্যমের কোমলতায়। তবুও দীপার সন্দেহ যায় না। সব সময় বলবে, কে যেন তাকিয়ে আছে ওর দিকে। দরজায় আড়ি পেতে শুনে যাচ্ছে কথা।

উত্তমের মনে হয়, একটি সন্তান এলে সব ঠিক হয়ে যাবে আগের মতো। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও সন্তান আসছে না। সম্প্রতি একটি বিখ্যাত নার্সিংহোমে কথা বলেছে উত্তম। একই সঙ্গে মনের এবং শরীরের চিকিৎসা চলছে দীপার। ডাক্তারের নির্দেশেই ওষুধ খাচ্ছে নিয়মিত। আকাশছোঁয়া দাম সে-সব ওষুধের। লক্ষ লক্ষ টাকার প্যাকেজে বেড়াতে যাচ্ছে দু’জনে। তবুও শান্তি নেই দীপার মনে। আদরে ঢেকে দিলেও ছিটকে সরে যায়। আতঙ্কিত স্বরে বলে, “বিছানার পাশে কে দাঁড়িয়ে আছে না?” “দরজার বাইরেটা দেখো তো। কেউ শুনছে যেন।”

ধৈর্য রাখতে রীতিমতো বেগ পেতে হয় উত্তমকে। তারই মধ্যে আজ চরম হল।

অফিসে ফোন করে কান্নাকাটি জুড়ে দিল দীপা। সাংঘাতিক বিপদ ঘটে গেছে। জরুরি কাজ ফেলে হন্তদন্ত হয়ে বাড়ি ফিরল উত্তম। দেখল, গোটা বাড়ি লন্ডভন্ড। শুনল, দীপার কর্পূরের কৌটো চুরি হয়েছে। রাগে, বিরক্তিতে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল উত্তমের। চিৎকার করে বলল, “তোমার ওই খেলনা চুরি করে কার কী লাভ দীপা? কেউ নেই। কেউ তোমার কথা শুনছে না। তাকাও... দেখো চার দিকে...”

দীপাও চিৎকার করে উঠল পাগলিনীর মতো। বলল, “আছে। এইখানেই লুকিয়ে আছে। চোর নয়, ডাকাত। সব লুঠ করে নেবে এক দিন। খোঁজো... খুঁজে বার করো ওকে।”

বলতে বলতে হাতের কাছের সমস্ত জিনিস ছুড়ে ছুড়ে ফেলতে থাকে দীপা। মোবাইল, স্মার্টওয়াচ, গাড়ির চাবি এমনকি প্রেক্সাকেও ছুড়ে ফেলে দিল। ক্রোধের আতিশয্যে সপাটে স্ত্রীর গালে আঘাত করল উত্তম। আর ঠিক তখনই তীব্র কর্পূরের গন্ধে চমকে উঠল দু’জনে। কোথা থেকে আসছে গন্ধটা? খুঁজতে শুরু করে ওরা।

উত্তম ভাবে, এক বার কৌটোটা খুঁজে পেলেই প্রমাণ হয়ে যাবে যে, জিনিসটা কখনও চুরিই যায়নি। দীপা ভাবে, গন্ধের উৎস পেলেই ধরা পড়ে যাবে চোর। তখন আর বাড়ি বদলাতে হবে না তাকে। ঘর ওলটপালট করে খুঁজতে থাকে দু’জনে।

দেখে না, বাইরে অঝোরধারায় ঝরছে কর্পূরের বৃষ্টি। রাস্তায়, দোকানে, বস্তিতে, শপিং মলে ঝরে পড়ছে দীপার ব্যক্তিগত কর্পূর।


(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bengali Story

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy