E-Paper

শিখা জ্বেলে যাই

কাণ্ড দেখো! বাড়ির জানলা-দরজা হাট করে খোলা। এ কী, এই ঝড়-ঝঞ্ঝায় রূপ বারান্দায় দাঁড়িয়ে কেন? চুল এলোমেলো।

শাশ্বতী নন্দী

শেষ আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬ ০৬:৫৮
ছবি: অসীম হালদার।

ছবি: অসীম হালদার।

ভোরের ভাঙা ঘুমে আবিষ্কার করলাম, ‘গীতবিতান’টা হাতে নিয়েই কাল রাতে ঘুমিয়ে পড়েছি। এত ক্লান্ত ছিলাম! নতুন বাড়িঘর গোছগাছ, কম কাজ! আজকাল গান না গাইলেও, ‘গীতবিতান’ পড়াটা আমার নেশা। মনের ভার হালকা হয়ে যায়। হঠাৎ মোবাইল বাজল।

“গুড মর্নিং। ঘুম ভাঙালাম?” ও-পারে অপরূপ, আমার স্বামী।

আইনত এখনও স্বামী, কারণ ও ডিভোর্স পেপারে আজও সই করেনি। হাই তুলতে তুলতে বলি, “এত ভোরে, তুমি!”

“তুমি তো জানো, আমি বরাবর সূর্য ওঠার আগেই তো চোখ মেলি, লাবণী! তার পর হারমোনিয়াম নিয়ে বসা। ঠাকুমা বলতেন, সূর্যোদয় এক সম্ভাবনার গান, সূর্যাস্ত সমস্ত যুদ্ধ থামার গান। যাক, নতুন বাড়ি কেমন লাগছে?”

“এখানে অনেক রোদ আর আলো।”

“উঁহু, তোমার মেয়ে রূপকথাই তোমার রোদ আর আলো। ওর কাছে ফিরে যাও। ও ওখানে একা। এত অভিমান ভাল নয়। ওকে ছেড়ে আসা তোমার ভুল সিদ্ধান্ত। যেমন গানটা ছেড়ে দেওয়া, তোমার আর একটা ভুল। এক সময় আমার সবচেয়ে প্রিয় ছাত্রী ছিলে তুমি!”

“গীতবিতানটা যে ছিঁড়ে গেছে।”

“গীতবিতান কি কখনও ছিঁড়ে যেতে পারে! তা ছাড়া গানগুলো এখনও তোমার বুকে। শোনো, আমি এক গরিব গান-মাস্টারমশাই, তুমি বিরাট চাকুরে। তবু আমার কথা মেনে নাও। ফিরে যাও। আমি তোমাকে কখনও ভুল পরামর্শ দিইনি... আজও দেব না...”

অধৈর্য হয়ে বলি, “কিন্তু রূপকথা আর আমায় চায় না তো! ও বাড়িটা এখন বেড়াল-কুকুরের চিড়িয়াখানা। ওদের চিৎকার, বিষ্ঠার দুর্গন্ধ… আমার গা গুলোয়। জানো, আমার উপর ওর বড্ড রাগ। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির চাকরিটা দুম করে ছেড়ে দিল! মাঝে মাঝে মনে হয়, ও আমার থেকে অনেক আলোকবর্ষ দূরে আজকাল বাস করে।”

“দায়ী তুমি। রূপ ছিল এক শান্ত নদী। তুমি ওকে করে ফেললে এক অশান্ত সমুদ্র। মনে আছে, খুব ছোটবেলায়, তুমি যখন কঠিন অঙ্ক শেখাতে, ও ছুটে আসত আমার কাছে। আর বলত, ‘ওই কবিতাটা বলো তো বাবা, আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে, আমি চট করে নদীটাকে এঁকে ফেলি খাতায়।’ শোনো লাবু, তুমি ওকে বিপর্যয়ের সঙ্গে মোকাবিলা করতে শেখাওনি, ধৈর্য ধরতে শেখাওনি, হারতে শেখাওনি। এখন এআই-এর যুগ। হাজার হাজার মানুষের চাকরি নিমেষে এআই গ্রাস করছে। ও আতঙ্কগ্রস্ত। ভাবল, ওকে ব্যর্থ করে তোলার আগে ও নিজেই চাকরি ছেড়ে বেরিয়ে আসবে। কিন্তু তার পর তোমার মুখোমুখি হতেও ওর লজ্জা। তুমি যেন ওর প্রতিদ্বন্দ্বী।”

অনেকক্ষণ কান্না চাপছিলাম, এবার ঝরঝর করে ঝরে গেল চোখের ধারে জমে থাকা সব বাষ্প।

“কাঁদছ কেন? বরং একটা গান গাও।”

“ধুস, এখন আর গান! গাইতে গেলেই সব কান্না হয়ে যায়।”

“শোনো, পৃথিবীতে এসে যে দুঃখ না পায়, বিধাতার কাছ থেকে তার সবটুকু দেনাপাওনা বুঝে নেওয়া হয় না। এখনও সময় আছে। তুমি তো বড়। সব অভিমান ভুলে রূপের কাছে ফিরে যাও। শিখা থেকে শিখা জ্বালাতে হয়। ও তোমার শিখায় বড় হয়েছে। এবার এমন শিখা জ্বালাও, যা দেবালয়ের মঙ্গলদীপের শিখা হয়ে জ্বলে।”

এ কী বর্ষণ শুরু হল! শ্রাবণ তো অনেক দূরে। আকাশ ফালা-ফালা হয়ে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে আজ। সন্ধে থেকেই শুরু হয়েছে। সঙ্গে কালো মেঘের ওড়াউড়ি। রূপকথা বড্ড ভিতু। বাজ পড়লে সোজা মায়ের আঁচলে। এখন তো ওর মা দূরে। এক বার যাব আমাদের ওই গোলাপি বাড়িতে? যদি রাগ করে! ঠিক আছে, ভিতরে ঢুকব না। কাজের দিদিদের বলব, ‘রূপকে একটু সামলে রেখো। আঁচল দিয়ে ঢেকে রেখো। ও ঝড়কে ভয় পায়।’

ক’টা তো মোটে বাড়ির পরে… আমি রাস্তা ধরে ছুটতে শুরু করলাম…

কাণ্ড দেখো! বাড়ির জানলা-দরজা হাট করে খোলা। এ কী, এই ঝড়-ঝঞ্ঝায় রূপ বারান্দায় দাঁড়িয়ে কেন? চুল এলোমেলো।

চলেই আসছিলাম। পিছনে একটা ডাক, “মা!”

আমি ঘাড় ফেরাইনি। অন্য কোনও সন্তান নিশ্চয়ই তার মা-কে ডাকছে।

“ও মা!”

যত আলোকবর্ষ দূর থেকে আসুক, সন্তানের ডাকে একটা আলাদা সুর, আলাদা আদর। আমি চিনতে পেরেছি এবার, তবু…

“মা, কী গো ডাকছি না!”

এবার ঘাড় ফেরাতেই দেখি, বারান্দা থেকে নেমে আসছে ও। মুখ ফ্যাকাশে, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত।

“জানো, আমার সব মেনি আর ডগির ছানারা দুপুর থেকে উধাও। দল বেঁধে বেরিয়ে গেছে। প্রায়ই যায়। কিন্তু আজ এখনও ফিরল না। ভয় করছে। গাড়িগুলো কী স্পিডে যাচ্ছে দেখো। যদি চাপা পড়ে যায়! দিনের আলো নিভে গেছে।”

রূপকথা কাঁদছে। আমি তাকিয়ে দেখছি ওর কান্না। এ কান্নার মধ্যে কেমন নদীর বুকে বৃষ্টি পড়ার শব্দ। ইচ্ছে করছিল জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিই। ভয় লাগছে, যদি আবার ও হারিয়ে যায়! এখনও দূরে, তবু কাছে কাছে।

অস্ফুটে শুধু বলি, “চিন্তা কোরো না, ওরা ঠিক ফিরে আসবে।”

বাড়ির দিকে রওনা দিয়েছিলাম। আবার ডাক, অনেক দূর থেকে যেন ভেসে আসছে কথাগুলো, “মা, তুমি আমার জন্য চিন্তা করতে খুব। এখনও করো? এখনও রোজ রাতে খাওয়ার সময়...”

রূপকথা আরও অনেক কথা বলছে। কিন্তু আমি দাঁড়ালাম না। ছুটতে ছুটতে ঘরে এসে দেখি, সব লন্ডভন্ড। ঝোড়ো হাওয়ায় আমার ছেঁড়া ছেঁড়া গীতবিতানের পৃষ্ঠাগুলো উড়ে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। একটা একটা করে কুড়োলাম ওই পৃষ্ঠা। বইটাকে সুন্দর করে এবার বাঁধাতে হবে। আর রূপের ছোটবেলার ড্রয়িং খাতাগুলোও খুঁজে বার করতে হবে। অপরূপের কথা মনে পড়ছে, ‘শিখায় শিখা জ্বালাও’। আজ সত্যিই কি এক মঙ্গলদীপের শিখা জ্বলে উঠেছিল?


(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bengali Story

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy