E-Paper

বঙ্গজীবনের মায়াঘেরা নববর্ষ

সেই সব দিন এখন সুদূর অতীত। বাড়িতে আত্মীয়সমাগম, হালখাতার নেমন্তন্ন, লুচি-তরকারি, পোলাও-পাঁঠার মাংসের একান্নবর্তী প্রকরণ থেকে এখন পারমাণবিক যাপনে পৌঁছে গিয়েছে বাঙালি। হারিয়েছে নতুন জামার গন্ধ, ফুটবল প্রতিযোগিতা এবং নীল খামের চিঠি। পশ্চিমবঙ্গেই হোক কিংবা প্রবাসে, আজ পয়লা বৈশাখকে বাঙালিয়ানার স্মৃতিচারণের এক প্রহরণ ছাড়া কিছু মনে হয় না।

অগ্নি রায়

শেষ আপডেট: ১২ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৩১

চৈত্র-শেষের বাতাসের ভিতর একটা ছুপা রুস্তম আছে। এক নির্ঘাৎ টেরি-কাটা রোমিয়ো আছে, যে শূন্যের দড়ি বেয়ে যখন তখন উঠে যেতে পারে জুলিয়েটের বারান্দায়। নির্মেঘ আকাশের ছায়া পড়া জলে সে কেঁপে ওঠা প্রতিবিম্ব দেখে নিজেকে কেতাদুরস্ত করে নেয়। কলার তুলে অনন্তের র‌্যাম্পে এক বা দু’বার হেঁটে বোঝাপড়া সেরে নেয়, ‘জন্মের প্রথম শুভক্ষণ’-এ, শেষ বারের মতো দেখা দেওয়ার জন্য সে তৈরি কি না। চৈত্র-শেষের বাতাস বড় অশৈলী কাণ্ডও ঘটায় ভিতরে। তাতে খামখেয়ালি কথা আর ছবি উড়ে আসে যত কিছু খইয়ের মতো, আবার অচিন ঠিকানায় সে পৌঁছেও দেয় রাস্তায় পড়ে থাকা ঝরা পাতার দলকে।

প্রহর শেষের আলোয় রাঙা এই চৈত্র মাসেই সর্বনাশের কথা কী মোক্ষমই না লিখেছিলেন রবিঠাকুর! হোলসেল সেই সর্বনাশের শুরু যুগে যুগে, নববর্ষের ঠিক আগেই, দোলের ঠিক পরেই। তেঁতুলতলার পাশের পাঁচিল শুরু হলে, শেষ এবং নিঝুম হচ্ছে পাড়া। শুরু হচ্ছে তখনও না দেখা-শোনা নতুন এক গ্রহ, যাকে বেপাড়া বলেই ডাকা হত। ঠিক ওই সন্ধি-ভূখণ্ডে, বাইরে থেকে ঘোরানো সিঁড়িওয়ালা জাহাজের মতো এক বাড়ি। বিকেল নামলেই মাথায় লাল রিবন বেঁধে ওই সিঁড়ি আলো করে দাঁড়াত এক রাজহংসী। কখনও সাদা ফ্রক পরে। সত্তর শেষ বা আশির দশক, তখনও ডিজিটাল প্রেম না-জানা, বিস্ময়ে বেদম কাবু হয়ে থাকা যৌবন জানতে পারে, এই তো নতুন ঋতু আসছে। সাড়া জাগিয়ে উৎসবের ঘোর তুলে আসছে সে। নববর্ষে সেই রোজকার ফ্রকের ধরন বদলে গিয়ে নতুন জামার গন্ধ, এক সাইকেল দূরত্ব থেকে যা টের পাওয়া যেত। সে এক ব্যক্তিগত বর্ষবরণের শুরু।

সেই উৎসবে আবাহন সঙ্গীতের মতো প্রাচীন কৌমজীবনের সুর গুনগুন করে। কাকের গলা চড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয় আত্মীয়মুখ, যাঁরা ভোর হওয়ার আগেই রিষড়া, মধ্যমগ্রাম, বিরাটি থেকে প্রথম লোকালে চড়ে চলে আসতেন কলকাতায়। কোনও আগাম নিমন্ত্রণের ধার না ধেরেই। বিয়েবাড়ি, যজ্ঞিবাড়ি হলে বাক্স গুছিয়ে এক সপ্তাহের মতো। বৈশাখ শুরুর উদ্‌যাপনে এক দিন বা শুধুমাত্র একটি সকালের জন্য। সকালের লুচি আর সাদা আলুর তরকারি থেকে দুপুরে কচি পাঁঠার ঝোল যে ভাগ করলে বাড়ে, মাটিতে ঢালাও বিছানা করে নৈশ-আড্ডার রাত অথবা অনেকানেক চায়ের কাপের ধোঁয়া কাটাকুটি খেলা তা জানত। আত্মীয়দের রাখার জন্য আলাদা বাড়ি ভাড়া করার চল তখনও ততটা হয়নি। অনেক অসুবিধের মধ্যেই লেপ্টেলুপ্টে থাকতেন তো সব্বাই দিব্যি। রান্নাঘর থেকে মন-মাতাল গন্ধ ছড়িয়ে পড়ত সুবাতাসে। মহা সমারোহে হে বৈশাখ, হে মৌনী তাপস, আপনি দিব্যি স্বজনে নির্জনে বাঙ্ময় হয়ে উঠতেন। সে ছিল এক বঙ্গজীবনের মায়াঘেরা কথা।

আমার ঠাকুমার একমাত্র বোনের কথা এই বঙ্গজীবনের এক আর্কেটাইপ। আমরা বলতাম মাসিদিদা। রিষড়া থেকে ভোরের ট্রেনে ওখানকার কাঁচাগোল্লা হাতে (দুই ছেলে পালা করে এসে দিয়ে-নিয়ে যেত) এসে অন্তত দশ দিন থেকে যেতেন আমাদের বাড়ি, চৈত্র-শেষ, বৈশাখ-শুরুর সময়টা ধরে। আর এই দশ দিনই অকারণ পুলকের উৎসব চলত যেন। জেলা বরিশাল, একুশে পুত্রাদি নিয়ে স্বামীহারা, ভাতাহীন জীবন পার হয়ে ছেলেদের মানুষ করার পরেও তিনি মালিন্যহীন অপরূপা। সারা দিন লুডো প্রতিযোগিতা চলছে, পাড়ার বন্ধুরা উপচে পড়ছে, যার মধ্যমণি আমার সেই মাসিদিদা। ডিটেকটিভ গল্পের পোকা কিরীটি রায়ের গল্প ফেঁদে বসতেন সেই দিদা পয়লা বৈশাখের আগের ঢিলেঢালা রাতে, আমি আর আমার অত্যাগসহন বন্ধু ঘন হয়ে বসে শুনতাম। বৈশাখ আসার আগেই ঘুম এসে যেত, বন্ধু শুয়ে পড়ত আমার পাশে। সেই বন্ধু হাত ছাড়িয়ে না ফেরার কোনও ঋতুতে চলে গিয়েছে, অথচ প্রতি প্রথম বৈশাখ ভোরে সে আমার পাশে ফিরে ফিরে আসে।

*****

নাহ, স্পেসের কথা তখনও অতটা ভাবেনি বাঙালি। ইএমআই-অভ্যস্ত যাপনে অন্তত একটি গাড়ি, একটি পরমাণু ফ্ল্যাটের সঙ্গে অন্য পরমাণু ফ্ল্যাটের যোজন দূরত্ব থিতু হয়নি। সত্তরের ট্রমা কাটিয়ে আশির দশকের এক সামাজিক শান্তায়ন চলছে তখন লোডশেডিং, বর্ষায় কচুরিপানা-ভাসা বড় রাস্তা, মেটে হলদে থেকে ক্রমশ নিবে যাওয়া রঙের সরকারি আবাসন, অহরহ পাড়ার পাম্প খারাপ হওয়া জল ঢুকে যাওয়া, রেডিয়োয় ফুটবল লিগের ধারাবিবরণীতে অজয় বসু, সুকুমার সমাজপতির উইং থেকে পেনাল্টি বক্সের কাছে পৌঁছে যাওয়া কণ্ঠ এবং দেবব্রত বিশ্বাসের গান— সব কিছু নিয়েই। মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ম্যাচ অথবা ইডেন টেস্ট বা সপ্তাহান্তে সিনেমা দেখতে টিভিওয়ালা বাড়ির সামনে চটির সারি, তবুও মনে হয় এই তো সেদিনও! বিজয়ার সময় ভালমন্দ খাওয়ার ইচ্ছে হলেও প্রতিবেশী, স্বজন, আত্মীয়ের বাড়িতে ঢুকেই ঢিপ, মনে হয় এই তো সেদিনও!

নববর্ষের ছুটির মতো নীল আকাশ আর ওই আকাশের রঙের ইনল্যান্ড লেটার ক্রমশ আঠালো মার্জিনে চলে গিয়ে অন্তর্হিত হল। সেই নীল রঙের কাগুজে বার্তার পথশ্রমের সিলমোহর কে-ই বা দেখেনি! লাল বাক্সের ভিতর থেকে উপচে আসা সে যে কী নীরব মুখরতা, অন্য শহর, মহকুমার বাতাস যাতে লেপ্টে রয়েছে! ডাকপিওনের নিরপেক্ষতার কাছে তখন ঠিকানার উত্তাপ গলে যেত। কারণ নববর্ষের যে উৎসব তার মতো একান্নবর্তী আর কিছু কি তখন ঘটত পরিবারে, এক বিজয়াদশমী ছাড়া? আমার জানা নেই। বড়দের লেখার পর সামান্য জায়গা বরাদ্দ, তাতেই ছোট্ট করে, ‘নববর্ষের প্রণাম জানবেন, ভালবাসা নেবেন’! একটি চিঠিতে চার রকম হাতের লেখায় প্রীতি, শুভেচ্ছা, ভালবাসা, প্রণাম— যার যে রকম। আর সামান্য কুশল জিজ্ঞাসা। চিঠিগুলো জব্বলপুর, পটনা, পুরুলিয়া, কালনা, মধ্যমগ্রামে উড়ে যেতে যেতে কালক্রমে দিগন্তের অন্য পারে চলে গিয়েছে আজ। যোগাযোগ-প্রযুক্তির সেই তিমিররজনী আলো করে থাকা গ্রীষ্ম-শুরুর উৎসবে হে অনাদি পোস্টম্যান, তুমিই তো ছিলে সেই ঈশ্বর, যার জন্য পারিবারিক প্রসন্নতা বিনিময়। মোটা নোটবুক, টেস্ট পেপার, ড্রয়ার, প্যাকেট-সঞ্চিত হয়ে যে চিঠিগুলি এক সময়ে প্রতিটি পরিবারের ইতিহাস গড়ে তুলেছিল যত্নে।

শহরের ক্ষণস্থায়ী বসন্ত বকুল-বিছানো পথে চলে যাচ্ছে এবং তার জায়গা দখল করতে আসছেন যে মৌনী তাপস, তার চিহ্নগুলিও তো ছিল বেশ স্পষ্ট। ক্রিকেট ব্যাট বছরের মতো তাকে তুলে রাখা, শীতবস্ত্র পাকাপাকি ভাবে ন্যাপথালিন-সভ্যতায় ঢুকে পড়া (তখনও দূষণহীন শহরতলিতে কুয়াশা পড়ত বিলক্ষণ, মার্চের ভোরে ঠান্ডা হয়ে থাকত পুকুর), নির্মীয়মাণ বাড়ির থামের আড়াল চুম্বনের ডাকে উড়ে এসে বসা কোকিলের ফিরে যাওয়া, মাঠে ফুটবলের শব্দে বিকেল নামার মতো চিহ্ন।

নববর্ষ আসার আরও মোক্ষম চিহ্ন শহরে চৈত্র সেল, গ্রামে-মফস্সলে শিবের গাজন, মফস্সলে চড়কের মেলা ধর্মপুজো, নীলের উপোস। বসন্ত থেকে গ্রীষ্মে যাওয়ার এই তো সব মাইলফলক। পয়লা বৈশাখের উৎসবের কাছে পৌঁছনোর পথে ‘আকাশের কাজ কিছু নেই জাঁতায় ঘোরায় কালবোশেখী মাস/ ঘুরেছে চড়ক ঠাকুর চিমড়ে সাধু পিঠফোঁড়ানো শলা/ পোলাপান দৌড়ে এলি রগড় রগড় চড়চড়াবড় ঢাক/ গিজিতাং নৃত্য এখন মাটির গরম চাটুতে লাল ধুলো..’ (বারোমাসের জগৎবাড়ি/ জয় গোস্বামী)। আমরা, যারা মফস্সলের নই, আশির দশকের গোড়ায় ততটা শহর না হয়ে ওঠা তিলজলা কসবার কলোনির লাগোয়া ভূখণ্ডে বড় হয়েছি, তাদের ভিতরের ‘গিজিতাং নৃত্যের’ খেই ধরনোর জন্য গাজনের মেলা বসত ইতস্তত অবশ্যই শহুরে সংস্করণে। সেখানে নাগরদোলার ঘূর্ণিতে আট তলা উঁচুতে উঠে আসন্ন বৈশাখী আকাশের কিছুটা কাছাকাছি চলে যাওয়া যেত। অনেক জিলিপি ছিল রসের ধারায়, মাটির খেলনায় ছোবলোদ্যত ভুজঙ্গ আর গোটা চিড়িয়াখানা, একটি চালের দানার মধ্যে অসামান্য ক্যালিগ্রাফিতে হাওড়া ব্রিজ বা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। হয়তো বয়স কম ছিল অথবা প্রযুক্তির উদ্বর্তনে সত্তর থেকে নব্বই পর্যন্ত গতিমন্থরতা ছিল, উন্নয়নের ডামাডোলে আর আর্থিক উদারীকরণের স্বপ্নে প্রাচীন একান্নবর্তী সংস্কার থেকে পরমাণু যাপনে তখনও পৌঁছয়নি বাঙালি। পরিবারে পক্বকেশ প্রবীণ-প্রবীণার গুরুত্ব ছিল, আলাদা করে বৃদ্ধাবাস তৈরি হয়নি। দিদার জন্য জোগাড় করা হত নতুন বাংলা ক্যালেন্ডারে বিভিন্ন পুজো পার্বণের হালহদিস। সেখানে কোনও তারিখ আলো করে বসে আছেন বীণাপাণি, কোথাও চন্দ্রগ্রহণের সংবাদ। দুর্গাপুজোর ছুটির হদিস। যে ক্যালেন্ডারে নেতাজি, শকুন্তলা, তেত্রিশ কোটি দেবদেবী, কালীঘাটের পটচিত্র, আবশ্যক ঠাকুর রবীন্দ্র একাকার হয়ে। সঙ্গে বন্ধুর পারিবারিক দোকানে হালখাতার উৎসবে অনেকগুলো গোল্ড স্পট খেয়ে মুখ জিভ হলুদ করে ফেলার দুপুর। পাঁঠার মাংসের ঝোলের গন্ধ জানলা গলে বেরিয়ে গোটা মহল্লার অপু-দুর্গাদের পেটে চাঁই চাঁই খিদে এনে দেওয়া। সঙ্গে নতুন জামার গন্ধ, একটা ফুটবল প্রতিযোগিতা এবং অনেকগুলো চিঠি। সব মিলিয়ে পয়লা বৈশাখ ঘটে ওঠারও একটা প্রস্তুতি ছিল বাঙালির, ঠিক যেমন দুর্গাপুজো অথবা ভাইফোঁটার উৎসব। আজ যাকে বাঙালিয়ানা ধরে রাখার একটি অনিবার্য প্রহরণ ছাড়া কিছু মনে হয় না— প্রবাসে, বা খোদ পশ্চিমবঙ্গে গিয়েও।

*****

তবে পূর্ববঙ্গের ‘পহেলা বৈশাখ’ স্বাদে গন্ধে অভিজ্ঞতায় এ-পার বাংলার তুলনায় অনেকটাই পৃথক এবং অভিনব। এই বাঙালিয়ানার উপর দিয়ে ঝড়ঝাপটা কিছু কম যায়নি গত পঞ্চাশ বছরে, পশ্চিমবঙ্গের থেকে বেশিই গিয়েছে। তবু নববর্ষ সেখানে নস্টালজিয়া-বিভোর কোনও দৃশ্যকাব্য নয়, বরং সমসময়ের বাস্তব। বাংলাদেশে ছায়ানটের নববর্ষ উৎসব ইউনেস্কো স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। তবে চব্বিশের রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকেই কট্টরপন্থী রাজনীতির অংশ ও সংগঠন বাংলা নববর্ষ উৎসব উদ্‌যাপনের বিরোধিতা করেছে প্রকাশ্যে। ওসমান হাদির মৃত্যু, ছায়ানট তাণ্ডবের একটি উপলক্ষ ছিল। গত ডিসেম্বরে ছ’তলা ভবনের সব সিসি ক্যামেরা-সহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র ভাঙচুর এবং ফোন ও ল্যাপটপ লুঠই নয়, হামলাকারীরা সেই রাতে ছিঁড়ে দিয়েছিল প্রয়াত সন‌্‌জীদা খাতুন, কবি নজরুল ইসলামের ছবি। একই দিনে কট্টরপন্থীদের আক্রমণের শিকার হয়েছিল দুই সংবাদপত্রের অফিস। দেশের ঘোর অনিশ্চিত ও টালমাটাল সময়ে উজ্জ্বল ইতিহাস লিখছিল ছায়ানট। গ্রিক পুরাণ বর্ণিত পাখির মতোই, টুকরো হয়ে যাওয়া সেতার, হারমোনিয়াম, তানপুরার ছাই থেকে জেগে গোটা শহরে ছড়িয়ে দিয়েছিল সুরেলা প্রতিবাদের ভাষা।

কয়েক বছর আগে ঢাকায় পহেলা বৈশাখের ভোরে থাকার সুযোগ হয়েছিল। আর তখনই প্রথম আফসোস হয়, ‘হে নূতন... জন্মের প্রথম শুভক্ষণ’-এ এভাবেই প্রতিবার মুখ দেখাও না কেন সানকি উপচে পড়া পান্তা আর ইলিশভাজায়, আমি যে শহরে থাকি সেখানেও? কেন নেই তুমি ভোরের সোনালি ভুনি খিচুড়ি আর মশলাসঞ্জাত ডিমের ডালনায়? ভোরবেলায় সে কী অপূর্ব যে প্রেম দিয়েছিল পয়লা বৈশাখ! নববর্ষে যাঁরা রমনা বটবৃক্ষের পাদমূলে এক বারের জন্যও দাঁড়াননি, তাঁদের আবেগের ঢেউ দেখার কিছু বাকি রয়ে গিয়েছে। এই আবেগ কলকাতা শহরাঞ্চলে নেই, প্রবাসে তো ছেড়েই দিলাম। যে আবেগযানে চেপে খোঁপায় নাগকেশর, চোখে কুহককাজল আর লালপেড়ে ঢাকাইয়ে সাজা রূপসী বাংলার কাছে বার বার ফিরে আসতে রাজি হওয়া যায় শঙ্খচিল-জন্ম পেলেও। যেখানে বাতাসে অতুলপ্রসাদ আর আকাশে রজনীকান্ত গুঁড়ো হয়ে ছড়িয়ে রয়েছেন। প্রথম সূর্যোদয় রবীন্দ্রনাথের গানে। একটা দেশ, একটা শহর, একটা ভাষা নেমে আসে রাস্তায়। তাপপ্রবাহ অগ্রাহ্য করেই। রাস্তাও তো আর রাস্তা থাকে না, চালগুঁড়োর সাদার পাশে অন্যান্য রঙের আলপনার এক দীর্ঘ রামধনু হয়ে ওঠে।

আসলে বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের ডাক তৈরি হয়েছিল এই বটবৃক্ষকে সাক্ষী রেখে। এই বুড়ো গাছ বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জাতিসত্তার গাছ আসলে। মৌলবাদের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ হয়ে যা তার ঝুরি নামিয়ে যাচ্ছে আজও অটল ভাবে। সমস্ত হিংসা ও চোরাগোপ্তা হিংসার বিরুদ্ধে ছড়িয়ে দিচ্ছে তার উদ্ধত শাখার পতাকা। তাই এর সামনে ভাসতে থাকেন নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীরাও। সেখানে দেখেছি সশস্ত্র পুলিশকে গলা মিলিয়ে গাইতে, ‘ফুলের গন্ধে চমক লেগে উঠেছে মন মেতে,/ ছড়িয়ে আছে আনন্দেরই দান ...’! বাচ্চার হাত থেকে ফুল নিয়ে গাইছেন, ‘ওহে চঞ্চল বেলা না যেতে খেলা কেন তব যায় ঘুচে...’! তখন আর বিষয়টি নিছকই অব্দের চক্রসূচনা থাকে না। হয়ে ওঠে স্বৈরতন্ত্র-বিরোধী বিচ্ছিন্নতাবাদ-বিরোধী ভালবাসার সমবেত বৃন্দগান।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ঢের আগে সেই ’৬৪ সালে তৎকালীন পাক সরকার রবীন্দ্রনাথের গান বেতারে পরিবেশনের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। যা মন থেকে মেনে নেননি পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ। পঞ্চাশ-একশো-দু’শো হতে হতে এই রমনা পার্কে বটগাছের তলায় নববর্ষের সকালে খালি গলায় রবীন্দ্রসঙ্গীতের আয়োজন করতেন মানুষ। সেই আবেগ আজ ওই বটের মতোই প্রবীণ ও মহাকায় হয়ে উঠেছে। সেই আবেগ আজও তার উপর নেমে আসা বাংলা সংস্কৃতির ঘাতকদের অস্ত্রের সঙ্গে বছরের বিভিন্ন সময়ে (শুধু বৈশাখ নয়) লড়াই করতে শেখায়। কারণ ও-পার বাংলায় বাঙালিয়ানার বিষয়টি বদলে গিয়েছিল রক্তের ঋণে। ভাষা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধ তাকে টাটকা, ঘনসংবদ্ধ রূপ দেয়। তা আজও অমলিন।

*****

যদি পাশাপাশি রাখি এ পারের আজকের বর্ষবরণকে? তুলনায় কি সত্যিই বড় একলা লাগে বৈশাখকে? যদি না স্মৃতির জলে ঘাই মারে কিছু প্রাচীন মাছ! উপায়ান্তর নেই বলেই ঘোল খেতে হয় নস্টালজিয়ার। পুরনো পাড়ার কৌমজীবন, একান্নবর্তী হেঁশেলের সুগন্ধ, প্রতিবেশী, স্বজনের না-বলে চলে আসার দিনে ঝাঁপ খায় মন। যে সব দিনে ভালবাসা ভিড় করে আসত।

এ-পার বাংলা এবং বহির্বঙ্গে, অর্থাৎ দেশের বিভিন্ন রাজ্যের প্রবাসীদের মধ্যে গোটা বছরে বাংলা ক্যালেন্ডার জেগে ওঠে মাত্র দু’টি দিনে। নববর্ষ বা পয়লা বৈশাখ, এবং পঁচিশে বৈশাখ। এর বাইরে বর্তমান প্রজন্মের বাঙালির কাছে অন্য বাংলা তারিখ অপাঙ্‌ক্তেয়। তার অস্মিতা অর্থাৎ বাঙালিয়ানা বাঁচিয়ে রাখতে পয়লা এবং পঁচিশ বৈশাখ এক জোড়া স্মারকমাত্র। বৈশাখ থেকে চৈত্রের দীর্ঘ বছর তার উৎসব প্রকৃতি ও পূজা নিয়ে নির্জন সমুদ্রতটের মতো। জেন জ়ি-র পরের প্রজন্ম কালের নিয়মে চলে এলে অন্তত এই দু’টি তারিখও সমগুরুত্ব পাবে কি না, তা আজ আর বুকে হাত রেখে বলা চলে না।

শিল্পবিপ্লবের ঢের আগে, ভূমি কর্ষণের সেই সুফলা দিনে মোগল সম্রাট আকবর বাংলায় কৃষি কর আদায়ের সুবিধার জন্য হিজরি ক্যালেন্ডার বদলে সৌরবর্ষ এবং আরবি হিজরি সনের উপর ভিত্তি করে বাংলা ক্যালেন্ডার অনুসারে কর আদায় শুরু করলেন ষোলো শতকের শেষে। সেই সঙ্গে শুরু হল বঙ্গাব্দের পত্তন। চৈত্রের শেষ দিনে সব কর পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হল। ব্যবসায়ীরা পুরনো খাতা বন্ধ করে নতুন বা হালখাতা খুললেন। জমির মালিকরা খাজনা, শুল্ক, মাশুল শোধ করে মিষ্টিমুখ করালেন অভ্যাগতদের। এই উপলক্ষে উৎসব। সেই হালখাতা এবং কৃষি উৎসব বয়ে এল বিশ শতকের গোড়া পর্যন্ত। তর্কযোগ্য ভাবে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ বিজয়কামনা করে পয়লা বৈশাখে হোমকীর্তন দিয়ে আধুনিক নববর্ষ পালন শুরু।

আজকের বাঙালি জাতিসত্তাকে প্রসারিত অর্থে না ধরলে চলে না। তার কারণ এই নয় যে, এই প্রথম বাঙালি বিশ্বের মুখ দেখেছে। সে তো বহু যুগ আগে থেকেই বাঙালি বর্হিমুখী। আজ বাঙালি সত্তা ভৌগোলিক ভাবে প্রসারিত তার কারণ, গত দেড় দশকে প্রযুক্তি বিস্ফোরণ। আজ যাদবপুরের পাঁচফোড়নের লাইভ ডেমো-তে বার্লিনের বাঙালি চচ্চড়ি রাঁধতে প্রতি সপ্তাহান্তে ব্রতী। গোটা বছর বিশ্বের এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় পেশাদারিত্ব এবং যাপনের প্রয়োজনে বাঙালি মূলত ইংরেজি ক্যালেন্ডারকেই শিরোধার্য করলেও, বাঙালি সত্তা ভাইরাল হয়ে জায়গা নিতে থাকে সমাজমাধ্যমে, রিলে, ডিজিটাল ভাষ্যে।

আর তাই নববর্ষে দিল্লি থেকে ডেনমার্কের বাঙালি ধুতি ঢাকাই, মিষ্টি ও মাছ, ওয়টস্যাপ-টেলিগ্রামে শুভেচ্ছা বিনিময়ে তৎপর।তাকে এই তারিখ ভুলতে দেয় না স্মার্টফোন এবং কিছুটা পূর্ব প্রজন্মের স্মৃতির বিষাদ।

স্মৃতিকাতরতাকে যতই সম্মুখবর্তী স্রোতের শৈবালদাম বলে সরিয়ে রাখতে চাই না কেন, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির আজকের এই নববর্ষ এবং দুর্গাপুজোকেন্দ্রিক বাঙালিয়ানা কিন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তী নস্টালজিয়াজাত। এখানে স্মরণ করি ইতিহাসবিদ গৌতম ভদ্রের ‘বাঙালি হয়ে ওঠার গোড়ার কথা’ নিবন্ধটি, যেখানে তিনি লিখছেন, “বিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকের কবিতা, কলকাতা আর ভারতের রাজধানী নেই, স্বদেশি আন্দোলন দীর্ণ। ঠিক এই সময়ে বাঙালিকে চাগিয়ে তুলতে একটি ঐতিহাসিক পর্যালোচনা তো দরকার, ঘোর স্বাদেশিক সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত চেষ্টার ত্রুটি করেননি, জনপ্রিয় কবিতাটির পাঠও সংস্করণভেদে মাঝে মাঝে বদল করেছিলেন। সিংহলী পুরাণ থেকে বাহুবলী বাঙালি নায়কের বি-দেশ (গ্লোবাল নয়) দখলদারির গল্পটা কীর্তি তালিকার শুরুর দিকেই রেখেছিলেন, ‘আমাদের ছেলে বিজয়সিংহ লঙ্কা করিয়া জয়, সিংহল নামে রেখে গেছে নিজ শৌর্য্যের পরিচয়’।” তবে ওই বাঙালির লঙ্কাবিজয় যে নেহাতই গল্প, সে কথাও উল্লেখ করে তাঁর প্রতীতি, ওটাই নাকি প্রাচীন আখ্যানে বাঙালি গৌরবের সূচনা।

স্বাধীনতার পরই নানাবিধ জটিল সামাজিক রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কারণে বাংলা তার অতীতগৌরব থেকে সরে গিয়ে ক্রমশ দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতের রাজ্যগুলির থেকে ধনে-মানে পিছিয়ে পড়তে থাকল, ফলে তার সমসময়ের আইকন বা জাতিচিহ্ন আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে নিষ্প্রভ হয়ে উঠল— এমনটা বলে দেওয়ার একটা চল রয়েছে, কিন্তু তা বড়ই সরলীকরণ। বরং দেশভাগের পর ওই চূড়ান্ত টানাপড়েনের সময় যে বাঙালিয়ানা তৈরি হয়েছিল তা কেবল ক্যালেন্ডারের এক-আধটা তারিখ বা ‘শ্যামা শাপমোচনের অশ্রুমোচনে’ই আটকে ছিল না। বরং গত শতকের পঞ্চাশ থেকে সত্তর পর্যন্ত বাঙালি সত্তার যে চাল ফোটানো হয়েছিল, তাই দিয়ে এখনও পরমান্ন ভোজন করে চলেছি আমরা। এখনও কোনও রেস্তরাঁর ব্র্যান্ডিং করতে হলে সেই সময়ের গানে, চলচ্চিত্রে কবিতায় ফিরতে হচ্ছে। দক্ষিণ দিল্লির এক অভিজাত পাড়ায় এক বাঙালি রেস্তরাঁয় (যাদের মূল কলকাতাতেই) গত পয়লা বৈশাখে তিন জন নৈশভোজের সময় তিনটি মকটেল নিয়েছিলাম, যাদের নাম যথাক্রমে ‘মিসেস সেন’, ‘ব্যোমকেশ বক্সী’, ‘বহুরূপী’!

এ কথা আজ সবাই মানেন: উত্তমকুমারের মতো বিক্রি, আজকের তারিখেও, বিনোদনের বাজারে অন্য কোনও পণ্য হয় না। সমাজমাধ্যম উথালপাথাল করে তাঁর ছবি এআই প্রযুক্তিতে কিছুটা হালফ্যাশনে। অথচ উত্তমের মৃত্যুর পর প্রায় অর্ধশতক কেটে গেছে। আজও উত্তমের ফুল শার্ট, হেমন্তের গভীর মেলোডি, শচীনকর্তার ভাটিয়ালি, সুচিত্রা-সুপ্রিয়ার রহস্যময় সৌন্দর্য, পাজামা-পাঞ্জাবি পরা সলিল চৌধুরীর ফেলে আসা সুর আর সেই কবেকার অনুরোধের আসরে বাঙালি তার মুকুরকে চিরস্থায়ী ভাবে ফেলে এসেছে। এখনও যাঁরা নিজেরা বাংলা কবিতা লেখেন বা পত্রিকা সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন, তার বাইরের বিস্তীর্ণ পাঠকসমাজের কাছে, শক্তি-সুনীল যুগলবন্দিকে নিয়ে বাংলা কবিতার শেষ মিথায়ন।

দেশভাগের ধাক্কা সামলে নিজের পায়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বাঙালি তার সত্তাকে আবিষ্কার করেছিল, প্রতিকূলতার জমি কর্ষণ করে ধান এবং মান দুটোই কবুল করেছিল। নকশাল আন্দোলন ও স্বপ্নভঙ্গ, বেকারত্ব, জরুরি অবস্থার পর সত্তর দশকের শেষে এক কালান্তক দীর্ঘমেয়াদি সুস্থিতি এল বঙ্গজীবনে, যা তাকে ভিতর থেকে অলস, বেতো, মানিয়ে নেওয়া রাজনীতির তল্পিবাহক করে তুলল। আমরা ঋত্বিক সত্যজিৎ মৃণাল অথবা আরও অতীতচারী হয়ে পরশুরাম শরদিন্দু বা তিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভুবনে, ‘নিশি রাত বাঁকা চাঁদ’ হয়ে ঝুলে রইলাম দীর্ঘ দীর্ঘ দিন। আমাদের বর্তমান জাতিসত্তা ভাঙা রেকর্ডের মতো শুধু নববর্ষের দিনটি উদ্‌যাপনে আটকে গেল।

পুরনো নববর্ষের চিঠিগুলো উড়ে যেতে যেতে দিগন্তের ও-পারে চলে যাচ্ছে। যে ভাবে চাঁপা ফুলের পেয়ালা উজাড় করে চৈত্রদিন তার মধুর খেলা শেষ করবে আগামী পরশু। মিশে যাবে জন্মান্তরে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bengali New Year Bengali New Year Celebration

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy