Advertisement
E-Paper

তোমার ক্যাডার তুমি নাচাও

দেওয়ালের ছড়া, ছবি থেকে হোয়াটসঅ্যাপ রসিকতায় কী ফল হল? শেষ দফার ভোটের সকালে একটা কথাই বলা যায়। এই রঙ্গব্যঙ্গের ট্র্যাডিশন আজকের নয়। রসিকতাপ্রিয় বাঙালি উনিশ শতক থেকেই এমনটা করে আসছে। দীপঙ্কর ভট্টাচার্যক্ষেত্র তৈরিই ছিল বঙ্গভূমে। রসিক বাঙালির চলার পথ বানিয়ে রেখেছিল ‘হরবোলা ভাঁড়’ নামে একটি পত্রিকা, দেড়শো বছর আগে। তথ্য যা মিলছে, এটিই বাংলায় প্রকাশিত প্রথম ব্যঙ্গচিত্রের পত্রিকা।

শেষ আপডেট: ১৯ মে ২০১৯ ০৫:৩০
ভোটচিত্র: ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে দেওয়াল লিখন

ভোটচিত্র: ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে দেওয়াল লিখন

জল পড়ছিল। নড়ছিল পাতাও। অপেক্ষা শুধু মাথা নাড়ার। ৬৭ বছর আগে গণতান্ত্রিক অধিকার অর্জন ও প্রয়োগের দাবিতে শুরু হল নড়াচড়া: ১৯৫২-র সাধারণ নির্বাচন। তার পর ১৯৫৭, চাওয়া-পাওয়ার হিসেব শুরু করল জনমন। হিসেবের খাতায় পাঁচ বছরেই ভূরি ভূরি অসঙ্গতি। আর অসঙ্গতি যেখানে, সেখানে তো জন্ম নেবেই রঙ্গ-ব্যঙ্গ-হাস্য। দেশবাসী মাতল তাতে। বাঁকা চোখের তির্যক নজরে পড়ল নেতা-নেত্রী-মন্ত্রীর ক্রিয়াকাণ্ড। ছড়িয়ে পড়তে লাগল ছড়া-ছবি-টিপ্পনী।

ক্ষেত্র তৈরিই ছিল বঙ্গভূমে। রসিক বাঙালির চলার পথ বানিয়ে রেখেছিল ‘হরবোলা ভাঁড়’ নামে একটি পত্রিকা, দেড়শো বছর আগে। তথ্য যা মিলছে, এটিই বাংলায় প্রকাশিত প্রথম ব্যঙ্গচিত্রের পত্রিকা। ‘হরবোলা ভাঁড়’-এর যোগ্য সহচর হিসেবে অচিরেই প্রকাশ পেয়েছিল আর একটি পত্রিকা— ‘বসন্তক’। এ সব ১৮৭৪ সালের ঘটনা। বাংলায় তখন ইংরেজ শাসন। ওই বছরই পুর আইন সংশোধন করে পুরভোটে নাগরিকদের ভোটদানের অধিকার দেয় শাসক। পরাধীন বাঙালির বুকের ভেতর ক্ষোভ, অতএব শান দাও বিদ্রুপ-কৌতুকে। ভৌগোলিক পরিবেশের কারণে কাব্যরসে বরাবার আর্দ্র বাঙালি মন। রঙ্গ-রসিকতায় তার বংশানুক্রমিক অধিকার। ভোট আসবে আর বাঙালি ব্যঙ্গরসে ভিজবে না!

‘বসন্তক’ ছাপতে শুরু করল একের পর এক ব্যঙ্গ ছবি। পরে জানা যাচ্ছে, সে সব আঁকতেন দুই শিল্পী— গিরীন্দ্রনাথ দত্ত আর প্রাণনাথ দত্ত। কিন্তু শিল্পীদের নাম থাকত না পত্রিকায়। ‘বাংলা কার্টুনে ভোট’ (গ্রন্থনা: শুভেন্দু দাশগুপ্ত) নামক বইয়ে ‘বসন্তক থেকে নেওয়া একটি ছবি ছাপা হয়েছে (বসন্তক, ২য় খণ্ড, ১২শ সংখ্যা, ১৮৭৪) যার ছবি-পরিচিতিতে লেখা ছিল— ‘আমাদের গৌরে মুদি সবে বাটীটির দ্বারটি খুলিয়া কী দেখিলেন।’ ছবিতে খাটো ধুতি, খালি গায়ে টিকিওয়ালা গৌরে মুদি দেখছেন, তাঁর বাড়ির দরজায় হত্যে দিয়ে পড়ে আছেন মান্যগণ্য ভোটপ্রার্থীরা।

‘বসন্তক’-এর পরে হাল ধরল ‘জন্মভূমি’ পত্রিকা। চৈত্র ১২৯৮-এ ‘ভোট ভিক্ষা’ ছড়া বেরোল সেখানে। তৈলিক ভবনে গিয়েছেন ভোটপ্রার্থী। তিনি মান্যগণ্য লোক। ভিক্ষা চাইছেন তিলির কাছে— ‘পাত্র মিত্র সঙ্গে করে যায় বাবু কলু-ঘরে/ গিয়ে পড়ে কলুর চরণে,/ দোহাই তোমার লাগে ভোট দাও আগে ভাগে/ কহি শুন কাতর বচনে।’ আজ ১২৮ বছর পরেও এই ছবি বদলাল কই? ভোটের ছড়ার কথা যখন এসেই গেল, তখন দাদাঠাকুরকেই বা আটকাবে কে? পড়তেই হবে— ‘যিনি তস্কর-দলপতি দৈত্যগুরু,/ তিনি বাক্যদানে আজ কল্পতরু।’ যেন ‘জন্মভূমি’র আগের ছড়ার আরও তীক্ষ্ণ এবং সংহত রূপ নির্মাণ করলেন জঙ্গিপুরের শরৎপণ্ডিত— দাদাঠাকুর। আর ভোটের গান? সেখানেও তিনি সিদ্ধহস্ত। অধুনা বাংলাদেশে ভোটযুদ্ধে গানের যে বিপুল প্রচলন, তার শুরুয়াত কি দাদাঠাকুরই করে যাননি? এ সব হয়তো কেন, নিশ্চিত ভাবেই গবেষণার বিষয়। তবে তাঁর ‘ভোট দিয়ে যা—/ আয় ভোটার আয়/ মাছ কুটলে মুড়ো দিব/ গাই বিয়োলে দুধ দিব...’ গানটি দীর্ঘ সময় পেরিয়ে এসে আজকের নেট-ব্যস্ত প্রজন্মের গোমড়া মুখও বদলে দিতে পারে। এই গান রচনার প্রেক্ষাপটও বেশ মজার। দাদাঠাকুর তখন ‘জঙ্গিপুর সংবাদ’-এর কম্পোজ়িটর, প্রুফ রিডার, মুদ্রক, প্রকাশক, সাংবাদিক, বিক্রেতা এবং সম্পাদক। প্রতিবেশী কার্তিকচন্দ্র সাহা কাতর আবেদন নিয়ে দাদাঠাকুরের সাহায্য প্রার্থনা করলেন। কী ব্যাপার? তাঁর কর মকুবের জন্য চিঠি লিখে দিতে হবে দাদাঠাকুরকে। কিসের কর? ব্যাপারটা খুলেই বলা যাক। কার্তিকচন্দ্র ছিলেন সামান্য চানাচুর-বিক্রেতা। তাঁর ত্রৈমাসিক পুরকর তিন আনা থেকে বেড়ে ছয় আনা হয়ে যাওয়ায় খুব অসুবিধায় পড়েন কার্তিক। দাদাঠাকুর তাঁর হয়ে আবেদনপত্র লিখে দেন পুর কর্তৃপক্ষের কাছে— এক বার, দু’বার, তিন-তিন বার। কিন্তু ফল হয় না। অসহায় কার্তিকের মুখের দিকে তাকিয়ে যন্ত্রণা পান দাদাঠাকুর নিজেও।

অবশেষে সুযোগ এল। পুরসভার চেয়ারম্যানের মৃত্যুতে একটি পদ খালি হলে উপনির্বাচন ঘোষিত হল। দাদাঠাকুর প্রার্থী করে দিলেন কার্তিককে। পুরকর বৃদ্ধির ফলে তাঁর শাপে বর হল। সে কালে নিয়ম ছিল, প্রার্থী হতে গেলে বছরে দেড় টাকা কর কর দিতে হবে। হিসেব মতো কার্তিকচন্দ্রের বার্ষিক দেয় কর দেড় টাকা। ‘জঙ্গিপুর সংবাদ’ পাশে দাঁড়াল কার্তিকচন্দ্রের। দাদাঠাকুর লিখলেন বিখ্যাত গান— ‘ভোট দিয়ে যা—/ আয় ভোটার আয়...’ জয় হল কার্তিকের। ‘জঙ্গিপুর সংবাদ’ সেই খবর ছাপল ফলাও করে: ‘শ্রীযুক্ত কার্ত্তিকচন্দ্র সাহা অধিক সংখ্যক ভোটপ্রাপ্ত হইয়া কমিশনার নির্বাচিত হইয়াছেন।’ দাদাঠাকুর গান লিখলেন, ‘আমি ভোটের লাগিয়া/ ভিখারী সাজিনু/ ফিরিনু গো দ্বারে দ্বারে।’

মুখে মুখে ছড়া কাটতেন দাদাঠাকুর। কলকাতায় এলে ‘বিজলী’ পত্রিকার দফতরে আসতেন, তাঁর বলা ছড়া বললে লিখে নিতেন নলিনীকান্ত সরকার। এক বার দক্ষিণ কলকাতায় এক উপনির্বাচনে দুই সুরেন্দ্রনাথ প্রার্থী হলেন। এক জন হালদার, অন্য জন মল্লিক। ভোটে হালদারের জয় হলে দাদাঠাকুর লিখলেন, ‘হালদারের ফল হলো, মল্লিকেরো fall/ তবে কেন মিছিমিছি এত কোলাহল?’

দাদাঠাকুর ছেড়ে একটু সাম্প্রতিক কালে আসা যাক। কুমারেশ ঘোষ ‘যদি গদি পাই’ নামে এক রসরচনায় ভোটপ্রার্থী ও নির্বাচিতের ছবি এঁকেছেন। ‘গদি পাইবার পূর্বে’ কেমন এই ভোটপ্রার্থীরা? লেখকের কথায়—

বেশি কথা বলে, লোক জড়ো করিয়া।

পরের দুঃখে কাঁদে অযথা।

নিজের দুঃখে হাসে স্বেচ্ছায়।

মণ মণ তেল কেনে পরের চরকার জন্য।

‘যদি গদি পাই কী করি’ জানাইতে থাকে।

‘আর গদি পাইবার পরে’—

শুধু বাণী ও বিবৃতি দিতে থাকে।

নানা রকম উদ্ভট পরিকল্পনা করে।

পরের দুঃখে হাসে বা কাশে।

নিজের দুঃখে উত্তেজিত হইয়া পড়ে।— ইত্যাদি।

উত্তর কলকাতার ‘জেলেপাড়ার সঙ্‌’-এর অন্যতম কর্তা শঙ্করচন্দ্র দেঁড়ে-ই বা অনুচ্চারিত থাকেন কেন? তিনি লিখছেন— ‘কাদের কুলের বৌ গো তুমি কাদের কুলের বৌ?/ পাঁচটি বছর কোথায় ছিলে মুখ দেখেনি কেউ।।/ আসো কেবল ভোটের বেলা সেজে ন’দের নিমাই পাগলা।/ গদি পেলে যাও যে ভুলে আমরা তোমার কেউ।।’

মনে পড়বে পানু পালের ‘ভোটের ভেট’ নামক রচনা। যেখানে একটি চরিত্র বলে— ‘আমাদের প্রফুল্লদা, রেশন ব্যবস্থা ঠিক রাখতে না পেরে কাঁচকলা খাবার উপদেশ দিতে গেলেন কেন? এখন যে প্রশ্নের ঠেলায় আমাদের জীবন যায়!’ প্রবীণ পাঠকের মনে পড়বে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল ঘোষের সেই বিতর্কিত মন্তব্য।

দেওয়ালের গায়েও আশ্চর্য সব ছড়া এক সময় ভোটের হাওয়া তপ্ত রাখত বাংলায়। সত্তরের দশকের একটি দেওয়াল লিখনে সিপিএম ও কংগ্রেস দুই দলের তরজা পর্যবসিত হয়েছিল প্রধান দুই নেতা-নেত্রীর বিয়ের ইঙ্গিত নিয়ে ছড়া কাটায়। ১৯৭৭ সালে কংগ্রেসের ভরাডুবিতে রায়বরেলীতে ইন্দিরা গাঁধী পরাস্ত হন। শেষে কর্নাটকের চিকমাগালুর থেকে উপনির্বাচনে জিতে আসেন তিনি। কংগ্রেস ‘ওয়ালিং’ করল: ‘রায়বেরিলি ভুল করেছে, চিকমাগালুর করেনি।/ সিপিএম জেনে রাখো, ইন্দিরা গাঁধী মরেনি।’ কংগ্রেস তাদের প্রতীক বদলে ‘হাত’ চিহ্ন আনলে সিপিএম লিখেছিল:

‘ঝোঁকের মাথায় নিলি হাত/ ভোটে হ’বি কুপোকাত।’

১৯৭২-এ কংগ্রেস ‘গাই-বাছুর নিয়ে’ সিপিআই-এর সঙ্গে জোট বাঁধলে, সিপিএম লিখেছিল: ‘দিল্লি থেকে এলো গাই,/ সঙ্গে বাছুর সিপিআই।’ ’৬৭-র বাংলায় এক দেওয়াল লিখন ছড়িয়ে পড়েছিল: ‘ইন্দিরা মাসি বাজায় কাঁসি/ প্রফুল্ল বাজায় ঢোল/ আয় অতুল্য ভাত খাবি আয়/ কানা বেগুনের ঝোল।’ কংগ্রেস নির্দ্বিধায় লিখেছে: ‘চীনের চিহ্ন কাস্তে হাতুড়ি, পাকিস্তানের তারা/ এখনো কি বলতে হবে দেশের শত্রু কারা?’ বা ’৯৬-এ জ্যোতিবাবুকে খোঁচা দিয়ে: ‘তোমার হাতে শাসনকাঠি/ তোমার ক্যাডার তুমি নাচাও/ নিজের ছেলে শিল্পপতি/ তখন বলছ শিল্প বাঁচাও!’

এখন নিজের বাড়ির বাইরের দেওয়াল অপরিচ্ছন্ন করতে বাধা দেন অনেকেই। রাজনৈতিক দলগুলিতেও কমেছে শিল্পী-কর্মীর সংখ্যা।

বাড়ছে রঙের দাম, ওয়ালিং-এর খরচ। এখন সোশ্যাল মিডিয়ার দেওয়ালে অনেকাংশেই কুরুচিকর ব্যঙ্গ, কুকথার ছড়াছড়ি। আবার হাস্যরসে ভরপুর ছড়া-ছবিও মন টেনেছে অনেকের। সব দেখেশুনে দাদাঠাকুরের সুরেই সুর মিলিয়ে বলতে হয়: ‘হে স্বায়ত্তশাসনের বাহন, হে ভোট, হে অঘটনঘটনপটীয়ান্‌, তোমার চরণে কোটি কোটি নমস্কার।’

Wall Writing Jokes Politics
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy