আত্মবিশ্বাস ভুল পথে চরমে পৌঁছলে ব্যর্থ বোধির জন্ম হয়। ধরা যাক, এক ভোরে উঠে এত বেশি ফুরফুরে মনে হল, চুল আঁচড়াতেও ভুলে গেলাম, রাতের জামাকাপড়েই গুনগুন করতে করতে বেরিয়ে পড়লাম। সোজা মাছের বাজারে গিয়ে কার্তিকের কাছে। কার্তিকের কাছে টাটকা মাছ মেলে। বাটা লাফাচ্ছে। কাতলা লাফাচ্ছে। যৌবনাবেগে ট্যাংরা ছটফট করছে। ট্যাংরার লাস্যই প্রথমে মনে ধরল। কয়েক ফোঁটা সর্ষের তেল ছড়িয়ে কাঁচা ঝাল! অবচেতনে এক থালা সাদা ভাত ভেসে উঠল!
তৎক্ষণাৎ কার্তিককে বলতে পারতাম— কত করে? বলতে পারতাম— হাফ কেজি। বলতে পারতাম— ডিম দেখে বড়গুলো। নাহ্! সে সব বললাম না। মুখ উপচে বেরিয়ে এল মন। বললাম— পাল্লাটা উল্টে দেখা। আটার গোলা সেঁটে রাখিসনি তো? একগাল হেসেই বললাম। যেন যুগান্তকারী কৌতুকটি উপস্থাপন করছি। কার্তিক অসহায় চোখে তাকালেন। আমার কিছু এল-গেল না। আবারও বললাম— ওজনে মারলে কিন্তু এখানে আর বসতে দেব না! কার্তিক পাল্লা উল্টে দেখালেন। বললাম— আরে, এমনি বললাম! জানি তো!
জানিই যদি, বললাম কেন? কার্তিক আমার পিসতুতো ভাইও নন। তা হলে আপনি না বলে তুইতোকারিই-বা করলাম কেন?
বললাম-করলাম— কারণ, কার্তিক মাছ-বিক্রেতা আর আমি ভাঁড়ু দত্ত। কার্তিকের কাজ মাছ বিক্রি করে পেট চালানো আর আমার কাজ সন্দেহের গৌরচন্দ্রিকায় দিন শুরু করা। কার্তিকের পেশার দায় সহিষ্ণুতা আর আমার নেশার দায় অসহিষ্ণুতা। না, দু’পাত্তরের নেশা নয়। জীবনপাত্র উচ্ছলিয়া অর্জন করা অসহিষ্ণুতার মদ। একই কাজ পুরনো খবরের কাগজ বিক্রির সময় দাদু-ঠাকুমাকেও করতে দেখেছি। এবং প্রতি বার ভুল প্রমাণিত হতেও দেখেছি। আজ পর্যন্ত, অন্তত আমার জীবনে, পাল্লার তলায় আটা সাঁটানো দেখিনি। কিন্তু নিজের-নিজেদের ‘ধর্ম’ পালন করে গিয়েছি।
কার্তিক উল্টে আমাকেই করতে পারতেন প্রশ্ন— কী দাদা! এমন উড়োঝুরো কেন আজ? চুল আঁচড়াননি! উল্টো জামা! বৌ পিটিয়ে এলেন নাকি? কোনও কার্তিক কোনও দিন অবশ্য করেননি সে-সব প্রশ্ন। কার্তিকেরা করতে পারেন না। তাঁরা সংখ্যালঘু হলে আরও পারেন না। তবে, তাঁরা সংখ্যালঘু হলে আমার প্রশ্নও হয়তো বদলে যেত। হয়তো বলতাম— পাল্লার তলায় আঠা দিয়ে আরডিএক্স সাঁটা নেই তো?
আমি মানুষ। তাই আমার দৃঢ় প্রত্যয়— ‘মনুষ্যেতর’দের এ-প্রশ্ন করতেই পারি! হয়তো কার্তিকেরাও একই ধরনের প্রশ্ন করে থাকেন ‘কার্তিকেতর’দের, কে জানে!
যদি পূজা করি মিছা দেবতার
অবিশ্বাস অসহিষ্ণুতার জাতক। অসহিষ্ণুতার জন্ম নানা কারণে হতে পারে। তার মধ্যে অসহায়তাও রয়েছে। তবে, প্রধান কারণ আত্মবিস্মৃতি। এ-আত্ম বা এই আমি শুধু ব্যক্তি নয়, সমষ্টিও। জাতি, সম্প্রদায়, রাষ্ট্র সার্বিক ভাবে যখন আত্মবিস্মৃত হয়, তখন ভিতর থেকে অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে। সত্য উল্টোটাও। অসহিষ্ণুতার ঘড়া ভর্তি হয়ে উঠলে আত্মবিস্মৃতি সুলভপ্রাপ্তি। তখন তিতিক্ষা, ক্ষমা, সহমর্মিতা ধরাছোঁয়ার বাইরে। তখন আমিত্ব-অহঙ্কার-আধিপত্যের গগনচুম্বী দেউল তৈরি। সে দেউলে বাস আশিরনখ মিথ্যার। যদিও সে-মিথ্যাকেই পরম সত্য মনে হয় সে-লগ্নে। ফ্যাসিবাদ, ঔপনিবেশিকতা, সাম্প্রদায়িকতা, লিঙ্গবৈষম্য, ভাষা-রাজনীতি— সর্বত্র সেই মিথ্যারই লীলাকীর্তন।
আনন্দবাদী ঔপনিষদিক রবীন্দ্রনাথ, যিনি ঈশ্বরকে সখা ভাবেন, তিনিও ক্ষমাপ্রধান ধর্ম খ্রিস্টান-ইসলাম ভাবনাসূত্রে প্রাপ্ত ব্রাহ্মচর্যায় তাঁর রচনায়, মূলত গানে, অজস্র বার ক্ষমা চেয়ে গিয়েছেন। কখনও ক্লান্তির জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা, দীনতার কারণে ক্ষমাযাচনা, আবার অজস্র জায়গায় ক্ষমার মাধুর্যকথাও। কিন্তু ভালবাসার জন্য, প্রেমের জন্য ক্ষমা চাননি কখনও। কারণ, প্রেম, বন্ধুতা, ভালবাসা বা সৌহার্দের পাঠশালায় ক্ষমাকে ডেকে আনতে হয় না। হ্যাঁ, আছে— ‘চপলতা আজ যদি কিছু ঘটে/ করিয়ো ক্ষমা’। কিন্তু সে তো রসঘন ছদ্মভাষ। আষাঢ়ের প্রথম দিবসে নবকদম্বের মদিরগন্ধের আকুলতায় ‘আজিকে আচারে ত্রুটি হতে পারে/ করিয়ো ক্ষমা’। আদতে সেখানে আত্মনিবেদনের আর্তিই আসল। কবিতার ‘অবিনয়’ নামটিই প্রমাণ করে, বিলক্ষণ উদ্দেশ্য নেইক্ষমা চাওয়ার।
কিন্তু ক্ষমা নয়, সরাসরি বিচারও চেয়েছেন কবি তাঁর গানে। সে বিচার-প্রার্থনার গতিপ্রকৃতি এমনই, যেখানে শাস্তির নিদানের জন্য হৃদিপ্রস্তুতিও তৈয়ার। ‘আমার বিচার তুমি করো তব আপন করে’— এ-গানের অর্থ একটাই— যদি অসহিষ্ণু হয়ে থাকি, বিচার কোরো। মিথ্যা আচারের বশবর্তী হয়ে যদি জীবন কাটিয়ে থাকি, অবিচার করে থাকি যদি কারও প্রতি, লোভের ফাঁদে পড়ে যদি কষ্ট দিয়ে থাকি কাউকে, ধর্মচ্যুত হয়ে থাকি যদি ভয়ের আবেশে, অন্যের যন্ত্রণায় যদি আনন্দিত হয়ে থাকি, তোমার দেওয়া জীবনকে কৃতকর্মে যদি কালিমালিপ্ত করে থাকি, মোহের ঘোরে যদি নিজেই নিজেকে শেষ করে থাকি, তবে তুমি বিচার করো আমার। আমার কাজ তোমার বিচারঘরে জড়ো করলাম।
এ-গানের আয়োজন আত্মার সঙ্গে প্রতর্কের মতো। খানিক একই আঙ্গিকে রজনীকান্তের গান— ‘তুমি আমার অন্তঃস্থলের খবর জানো/ ভাবতে প্রভু আমি লাজে মরি’। ‘বমাল ধরা’ পড়ে যাওয়ার লজ্জা সে-গানে। কিন্তু যে দুই শব্দ ভাবিয়ে তোলে রবীন্দ্রনাথের গানটিতে, তা হল ‘মিছা দেবতা’।
দেবতা কী ভাবে মিছা হতে পারেন? বাংলার মঙ্গলকাব্যে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য, নিজেদের পূজার্চনা প্রবর্তনের চাহিদায় চাঁদ সদাগরদের অমঙ্গল করার মতো দেবদেবীর অভাব নেই।
ভিন্ন প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন— “ওই তো আমাদের কবিকঙ্কণের চণ্ডী, ওই তো বেহুলাকাব্যের মনসা, ন্যায় ধর্ম সকলের উপরে ওকেই তো পূজা দিতে হইবে, নহিলে হাড় গুঁড়া হইয়া যাইবে। অতএব, যা দেবী রাজ্যশাসনে/ প্রেস্টিজ-রূপেণ সংস্থিতা/নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ/ নমস্তস্যৈ নমোনমঃ”। এঁরাই কি মিছা দেবতা? মনে হয় না। মঙ্গলকাব্যে দেবত্বের বদলে জয়গান মানুষেরই বারমাস্যার। তবে, আজ কবি বেঁচে থাকলে দেশের বর্তমান ধর্মধ্বজাধারী রাজনৈতিক দলগুলির ‘প্রোমোট’ করা দেবদেবীকে যে নিশ্চিত মিছা দেবতাই বলতেন, তা অবশ্য-সত্য। কিন্তু তখনও তো মৌলবাদী, চরমপন্থী বা তৎসম কিংবা তৎভব কোনও ধর্মীয় সংগঠনের নুন-খাওয়া আরাধ্যেরা আজকের মাপে বিরাজমান ছিলেন না। তা হলে?
প্রত্যয় হয়, আদতে এই মিছা দেবতা আমিত্ব আর আপন-স্বার্থে তৈরি করা সেই সব কিছু, যাকে সত্য-শ্রেয়-শ্রেষ্ঠ সিদ্ধান্ত নিয়ে এবং অন্যকে বশ করার হাতিয়ার-প্রতিম বলে গণ্য করে অসহিষ্ণুতার ক্ষমতা-বিগ্রহ করে তুলেছি আমরা। যেমন— আমার সম্প্রদায়, আমার পৈতে-টিকি-টুপির আস্ফালন, আমাদের নারীবিদ্বেষী পুরুষশাস্ত্র, শিশুবিদ্বেষী সাবালকত্ব, ভাষা-হিটলারি, ধনবৈষম্য, নীতিহীন রাজনীতি, ঔদ্ধত্য, লাম্পট্য, পরশ্রীকাতরতা, ঈর্ষা, ক্ষতিবুভুক্ষা, জিঘাংসা, অপমান, দমন, খুন, জখম, ধর্ষণ, মিথ্যাচার— এই সব, এরা সব মিছা দেবতা।
মিছা দেবতার অর্চনা আমার সহিষ্ণুতার জিনকে দমন না করে উঠতে পারলে কী ভাবে আর পরিপূর্ণ শয়তান হয়ে উঠতে সক্ষম হব! হ্যাঁ, উপনিষদ অসীমের আচমন শেখাচ্ছে, বুদ্ধমন্দিরে ঘণ্টা বাজছে, গির্জায় পিয়ানো বেজে উঠল, শান্তিমন্ত্রে আহ্বান করেছে আজান, গুরুদ্বারে কীর্তন রণিত হচ্ছে। কিন্তু আজকের আমার-আমাদের মিছা দেবতা তো সেখানে কোনও দিনই থাকেন না। তিনি থাকেন রাষ্ট্রশক্তির দেউলে। প্রণিধানযোগ্য— প্রথম বিশ্বযুদ্ধেরও আগে, ১৯০২ সালেই রবীন্দ্রনাথ সন্ধান পাচ্ছেন মিছা দেবতার। হয়তো, মিছা দেবতা যুগে-কালে সদাবিরাজমান।
হৃদিমন্দিরে প্রতিষ্ঠিত মিছা দেবতার আশীর্বাদেই আমরা অসহিষ্ণুতার বরপ্রাপ্ত।
ভয়ে হয়ে থাকি ধর্মবিমুখ
মিছা দেবতার অর্চনায় নাস্তিক-আস্তিক ভেদ নেই। এ ক্ষেত্রে নাস্তিকেরও দেবতা থাকে। তবে, নাস্তিকের নয়, সব চেয়ে বেশি বিপজ্জনক আস্তিকের অসহিষ্ণুতা। কারণ, আস্তিক মিছা দেবতাকেই ধর্ম নামে বিক্রি করে। ধর্ম নয়, তথাকথিত আস্তিকের ধর্মতন্ত্র থেকে জন্ম নেয় ধর্মীয় রাজনীতি। তার বর্ণ গিরগিটি-প্রতিম, আকর্ষণ অমোঘ। আজকের ভারত, উপমহাদেশ, বিশ্বের বড় অংশ ধর্ম বলতে যা বোঝে, তা আসলে ধর্মীয় রাজনীতি, রাজনৈতিক মৌলবাদ। প্রায় সকল সম্প্রদায়েরই অবদান রয়েছে ধর্মতন্ত্রের এই অসহিষ্ণু ধ্বংসযজ্ঞে।
রবীন্দ্রনাথ মনে করছেন— “ধর্ম আর ধর্মতন্ত্র এক জিনিস নয়। ও যেন আগুন আর ছাই। ধর্মতন্ত্রের কাছে ধর্ম যখন খাটো হয় তখন নদীর বালি নদীর জলের উপর মোড়লি করিতে থাকে। তখন স্রোত চলে না... সেই অচলতাটাকে লইয়াই মানুষ যখন বুক ফোলায় তখন গণ্ডস্যোপরি বিস্ফোটকং।” এই অচলতা নিয়ে বুক ফোলানোর নিখাদ পরিণতিই অসহিষ্ণুতা, অন্যকে ছোট করার ফিকির খোঁজা। আদতে ধর্মতন্ত্রের রাজনীতি বোঝার জন্য দেশের স্বীকৃত রাজনৈতিক দল খুঁজে বেড়ানোরও প্রয়োজন নেই। মূলগত ভাবে ব্যক্তি-নাগরিকই তার প্রাথমিক শিকার এবং অণু-প্রতিনিধি। এই ব্যক্তি-নাগরিকই সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে কেলাস গঠন করে মৌলবাদী দলে পরিণত হয়।
কিন্তু কোনও ধর্ম মৌলবাদের কথা বলে না। বরং পরমত, পরধর্মকে অধ্যাত্মচিন্তার আর একটি শাখা বলে সম্মান করে। তবে, ধর্মতন্ত্রকে যখন আমরা ধর্ম বলে ডাকি, তখন সবটা উল্টে যায়। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়— “ধর্ম বলে, মানুষকে যদি শ্রদ্ধা না কর তবে অপমানিত ও অপমানকারী কারও কল্যাণ হয় না। কিন্তু ধর্মতন্ত্র বলে, মানুষকে নির্দয়ভাবে অশ্রদ্ধা করিবার বিস্তারিত নিয়মাবলি যদি নিখুঁত করিয়া না মান তবে ধর্মভ্রষ্ট হইবে। ধর্ম বলে, জীবকে নিরর্থক কষ্ট যে দেয় সে আত্মাকেই হনন করে। কিন্তু ধর্মতন্ত্র বলে, যত অসহ্য কষ্টই হ'ক, বিধবা মেয়ের মুখে যে বাপ মা বিশেষ তিথিতে অন্নজল তুলিয়া দেয় সে পাপকে লালন করে... ধর্ম বলে, যে মানুষ যথার্থ মানুষ সে যে-ঘরেই জন্মাক পূজনীয়। ধর্মতন্ত্র বলে, যে মানুষ ব্রাহ্মণ সে যত বড় অভাজনই হ'ক মাথায় পা তুলিবার যোগ্য। অর্থাৎ মুক্তির মন্ত্র পড়ে ধর্ম আর দাসত্বের মন্ত্র পড়ে ধর্মতন্ত্র।”
পারিবারিক ভাবে রামপ্রসাদ হিন্দু ছিলেন। ধরা যাক, আপনি-আমিও হিন্দু। ফারাক নেই? পারিবারিক ভাবে আমির খুসরো মুসলমান ছিলেন। ধরা যাক, আমি-আপনিও মুসলমান। তফাত নেই? শাক্ত পদাবলির ‘যে তোমায় যে ভাবে ডাকে/ তাতে তুমি হও মা রাজি’ গান, কিংবা শ্রীরামকৃষ্ণের নানা ধর্মে দীক্ষাগ্রহণ বা ‘যত মত তত পথ’ দর্শন ধর্মতত্ত্ব, ধর্মতন্ত্র নয়। সহিষ্ণুতা-অসহিষ্ণুতার ভাবনায় ধর্ম-ধর্মতন্ত্রের এই কাটাছেঁড়ার কারণ, এই মুহূর্তে বিশ্ব-অশান্তির অন্যতম ঋত্বিক ধর্মতন্ত্রজনিত অসহিষ্ণুতা; ধনতন্ত্র এবং আগ্রাসনও তার সঙ্গে নাড়ির টানে সংযুক্ত। বিশ্ব-জোড়া ফাঁদ পাতা অসহিষ্ণুতাকেই পরিস্রাবণ প্রক্রিয়ায় আমরা অলিগলিতে প্রতিনিয়ত পেয়ে চলেছি। তারই প্রতিফলন দেশে, প্রতিবেশী দেশে, সর্বত্র। ট্রেনে-বাসে-অটোয় উঠে দেখবেন, সহযাত্রী বা চালক অতি-অনায়াস সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নিয়ে অবমাননামূলক মন্তব্য করে দিচ্ছেন। ভাবছেন না, গাড়ির বাকিদের মধ্যে সংখ্যালঘু থাকতেও পারেন, তাঁর মনে আঘাত লাগতে পারে এবং সর্বোপরি পাল্টা অসহিষ্ণুতার বীজ জন্ম নিতে পারে তাঁর মনে। কারণ, নিউটনের তৃতীয় গতিসূত্র সম্ভবত অসহিষ্ণুতার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
শিরে ধরি যদি মিথ্যা আচার
ধর্মতন্ত্রের কাজ অন্ধ ধর্মবিশ্বাসের প্রতিষ্ঠা ঘটিয়ে মাথায় অসহিষ্ণুতার বীজ রোপণ করা। সহিষ্ণুতা যতই আগুনের মতো তেজি, জলের মতো সরল হোক না কেন, অসহিষ্ণুতার আবেদন মায়াময় এবং ছদ্মবেশী। তা সৎ-সাধারণ মানুষকেও অবচেতন স্তর থেকে অন্যায় করিয়ে নিতে সক্ষম। তার প্রতাপ এমনই যে, ঘনিষ্ঠ মিলনের সময় ভিন্ন ধর্মতন্ত্রবিশ্বাসী প্রেমিক-প্রেমিকাও দেহ-মন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারেন শুধুমাত্র অসহিষ্ণু ধর্মবিশ্বাসে আঘাত লাগলে। ধরা যাক, তাঁরা যে অবস্থানে আছেন, সেখানে তাঁদের পায়ের দিকে দেবদেবী, ধর্মীয় মহামানব বা ধর্ম-প্রতীকের ছবি রয়েছে। ছবিটি যদি এঁদের কারও বিশ্বাস-গণ্ডির মধ্যকার হয় এবং তাতে যদি তিনি আপত্তি করে জানান, ওদিকে পা করে থাকা উচিত নয় আর তাতে যদি দ্বিতীয় জন পরিহাস করেন, মিলনের আগেই সম্পর্কের নিরঞ্জন সুসম্ভব। মজার বিষয়, ওই প্রতীক-ছবির বদলে কালজয়ী কবি বা দার্শনিকের ছবি থাকলে, শিশুর ছবি থাকলে, উলঙ্গ নরনারীর পোর্ট্রেট থাকলেও এমন কিছু ঘটত না। মূল কারণ— অন্ধ ধর্মবিশ্বাস, যা আদতে ‘সামাজিক’ ভাবে খাওয়ানো টোপ। ভিন্ন রাজনৈতিক ভাবাদর্শের নারীপুরুষও ভালবাসার সময় রাজনীতি-বিস্মৃত হতে পারেন, কিন্তু তথাকথিত ধর্মবিশ্বাসে আঘাত সইতে পারেন না। কারণ, ধর্মতন্ত্রের এই আপাত-আবহমানতা, আপাত-উত্তরাধিকার মানুষকে ভিতর থেকে অসহিষ্ণু করে রেখেছে। আর এক কারণ— ভিত্তিগত ভাবে অন্যকে না-জানাও। কুয়োর ব্যাঙের সঙ্গে বাঁশবনের শেয়াল-রাজার প্রচুর ভাবগত মিল। নিজেকে আর নিজের সব কিছুকে শ্রেষ্ঠ ভাবা বন্ধ করতে গেলে আগে তো নিজেকে পেরোতে হয়। বিশালত্বকে অনুভব করা না গেলে সঙ্কীর্ণতাকেই মহত্ত্ব বলে ভ্রম হয়।
তা হলে ধর্মতন্ত্র, যা প্রচলিত অর্থে ধর্ম নামে পরিচিত, তা কি অসহিষ্ণু হতেই শেখায়? উত্তর নিহিত আর একটি প্রশ্নে— ধর্ম বলতে কি ‘রিলিজিয়ন’ বুঝেছি আমরা? ‘পিকে’ ছবির কথা মনে আছে? সে-ছবির নায়ক কোন কোম্পানির ঈশ্বরের কাছে গিয়ে নিজের রিমোট-সেটটি চাইবেন, তা নিয়ে জেরবার। নানা কোম্পানির ঈশ্বর শুধু সমাজ শাসনই করছেন না, সীমান্ত, রাষ্ট্রনীতি, পররাষ্ট্রনীতিও নির্ধারণ করছেন। সে সব নীতিই অসহিষ্ণুতার জারকে চিরঞ্জীব। পিকে রাস্তার ধারে পাথর রেখে সিঁদুর পরিয়ে বলেন— ‘লাগ গ্যয়া ফ্যাক্টরি-মা মেশিন’! সেখানে অচিরে প্রণামী জড়ো হয়। জয়ী অন্ধবিশ্বাস।
আচ্ছা, একই রসায়নে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় সমর্থনে, সংখ্যাগুরুর কৌশল-পরিকল্পনায় দেশের নানা প্রান্তে বহুমূল্য উপাসনালয় তৈরি হতে থাকলে ঈশ্বরের এপিক-নম্বর গুলিয়ে যায় না? তখন কোন বিশেষ নিবিড় সংশোধন দূর করতে পারে সংখ্যালঘুর নিরাপত্তাহীনতা?
এ দেশের অগণন মানুষের এপিকই এখন নববেদান্তে ‘এনুমারায়িত’! প্রতিটি গণনাপত্রে স্বাধীন জীবনের প্রতি অসহিষ্ণুতা, অবিশ্বাস। প্রতিটি শুনানি-কেন্দ্রে বাঁধন ছিঁড়ে দেওয়ার জাঁতাকল-সাধন! সম্ভবত এই সেই গণস্থানমধ্যবর্তী উষ্ণায়নপিঁড়ি, এই সেই অকল্পনীয়-মায়াময় দস্যুপাঠ্য নরক, যেখানে রাষ্ট্রীয় কড়ায় ফুটন্ত দম্ভের তেলে নাগরিকের অস্তিত্ব ভাজা হয়! যেখানে পরমাত্মা বলেন— হে সম্মাননীয় জীবাত্মা নাগরিক, প্রমাণ করুন, আপনি জন্মপরিচয়হীন নন।
পরমাত্মার এহেন পরমাত্মীয়তা উত্তরোত্তর বাড়বে, যত ভোট এগিয়ে আসবে। সঙ্গে বৃদ্ধি পাবে সর্বস্তরের অসহিষ্ণুতাও। লাগাম হারাবে ভাষা, সংস্কৃতি, পরম্পরা। ভাজা অস্তিত্বের শ্লাঘায় আমরা খুশি হয়ে বলব— যাক! রাজনীতিটা বেঁচে গিয়েছে!
আপনি বিনাশ করি আপনায়
ভাজা অস্তিত্ব বিশেষ পছন্দ করে ধর্মতন্ত্র। সে-অস্তিত্ব সংখ্যালঘু, শিশু বা মূলত নারীর হলে রসনা আরও তৃপ্তিময় হয়। অসহিষ্ণুতার সব চেয়ে বড় শিকড় যে ধর্মতন্ত্র, আদতে তার বিশ্বকর্মা পুরুষ-আধিপত্যবাদ এবং পুরুষ-নিয়ন্ত্রিত ধনবৈষ্যমের ফাঁদ। মুখে নারী স্বাধীনতার জয়গান গেয়ে বেড়ানো ধর্মতন্ত্র, রাষ্ট্রশক্তি, রাজনীতি, পরিবার, সমাজ, খেলার মাঠ সবাই মেয়েদের প্রতি ভিতর থেকে অসহিষ্ণু। কারণ, নারীর মেধা-শক্তি পুরুষের চেয়ে কোনও অংশে কম নয়, ক্ষেত্রবিশেষে বেশি। তাই দমিয়ে রাখার অযুতবার্ষিকী পরিকল্পনা। শুধু সমাজমাধ্যমের ‘ট্রোল’ খেয়াল করলেই বোঝা যায়, নারী অনায়াস-শিকার। একই দশা ভিন্ সম্প্রদায়ের, গরিবের।
তবে, পুরুষতন্ত্রের প্রতিনিধি মূলত পুরুষ হলেও শুধুমাত্র পুরুষই নয়। চিন্তাকাঠামো-মাধুর্যে বহু নারীও আদতে পুরুষতান্ত্রিক। সেখানে পুরুষতন্ত্রের পাতা কলসপত্রী ফাঁদে নারীত্ব আপন-অজান্তে অসহায়। রইল বাকি তৃতীয় লিঙ্গ। যে সমাজে মেয়েরাই আজও দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক, সেখানে তৃতীয়-চতুর্থ-পঞ্চম লিঙ্গের প্রতি কোন অসহিষ্ণুতা ধার্য হয়ে রয়েছে, তা জলবৎ অনুমেয়।
এক রোগ অন্য রোগকে নিমন্ত্রণপত্র পাঠিয়ে ডাকে। ধর্মতন্ত্র, ক্ষমতাতন্ত্রের হাত ধরে সর্বস্তরের অসহিষ্ণুতার জীবাণু ছড়িয়ে যায়। নিজের দেশ, সম্প্রদায়, রাজনীতি, নেতা, খেলোয়াড়, কবি, গায়ক কী অসীম ব্যতিক্রমী, অদ্বিতীয় আর কী মারকাটারি সহিষ্ণু, তা বোঝাতে গিয়ে আমরা রোজ যে ভাবে লাগামহীন অসহিষ্ণু হয়ে উঠি জনমঞ্চে, রাষ্ট্রসভায়, লেখায়, ব্যবহারে, পরিবারে, আড্ডায়, তা প্রমাণ দেয়, অসহিষ্ণুতার শপিং মলে কেনাকাটায় অংশ নিয়েছি আমরা। অংশই নিয়েছি যখন, অংশীদারি বুঝে নিতে হবে বইকি!
কর্পোরেট কালচারের মতো রাষ্ট্র ‘টার্গেট’ নির্ধারণ করে দেয় অসহিষ্ণু হওয়ার। কোন ভাষায় কথা বললে দেশি আর কোন ভাষায় কথা বললে বিদেশি, তা ঠিক করে দেয় রাজনীতি। দেশের নাগরিক সংখ্যালঘু হওয়ার ‘অপরাধে’ তাঁকে কাঁটাতারের ও-পারে ঠেলে দেয় রাষ্ট্র। বাঙালির কবির বাংলায় লেখা ‘আমার সোনার বাংলা’ গাইলে রাষ্ট্রদ্রোহের তকমা জোটে। কিন্তু কেন এই দস্যুতা? কারণ, অসহিষ্ণুতা বাড়ানো গেলে ভোটব্যাঙ্ক উপচে পড়ে। তখন রাষ্ট্র-রাজনীতির অপদার্থতার কথা বিস্মৃত হয়ে মানুষ সম্প্রদায়-ধর্মতন্ত্র-গোষ্ঠী জাতীয় মদে বেহুঁশ হয়ে উঠতে পারেন। তখন আমার সত্য আর আপনার সত্যের মধ্যে তুচ্ছ হয়ে যায় সত্যিকারের সত্য।
মনস্বী: শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে মহাত্মা গান্ধী।
পরের পীড়ায় পেয়ে থাকি সুখ
আজকের বিশ্ব ঘোষিত-অঘোষিত ভাবে অসহিষ্ণু। এই মুহূর্তে বিশ্বের যুদ্ধ-মানচিত্রের দিকে তাকালে বিষয়টি বুঝতে সমস্যা হয় না। কিন্তু অন্তত উপমহাদেশের ক্ষেত্রে অসহিষ্ণুতাই শাশ্বত? নয় সম্ভবত। ভারত তথা উপমহাদেশ বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যের আলিম্পনেই সহিষ্ণুতার মন্ত্র পড়ে এসেছে প্রধানত। এ-সত্য চার পাশের প্রায় কোনও ছবি থেকেই আজ আর বোঝা না গেলেও, এখনও সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতির মসি-বাঁশি-ক্যানভাসে তার আলো লেগে। একমাত্র সংস্কৃতিই ধরে রেখেছে ঐক্যের সহিষ্ণুতাকে। এমনকি, ধর্মীয় সহিষ্ণুতাও আজ শুধুমাত্র নিরাপদ সংস্কৃতির সাদামাটা ঘরে। কাশীর বিশ্বনাথ মন্দিরে দেবতাকে সানাই শোনাতে সমস্যা হয়নি উস্তাদ বিসমিল্লা খানের, কোটি-কোটি মানুষের প্রার্থনাকে ‘হরি ওম্’ উচ্চারণে বেঁধে দিতে সমস্যা হয়নি উস্তাদ বড়ে গোলাম আলির। ‘মন তরপত হরিদরশন কো আজ’ গানটির জন্ম দিতে ভাবের অভাব হয়নি সাকিল বদায়ুনি, নৌসাদ বা মহম্মদ রফির। এবং আজ এই মুহূর্তেও হিন্দু বা খ্রিস্টান গায়ক-সুরকার-গীতিকারের পূর্ণ উত্তরাধিকার বজায় রয়েছে সুফি-দরগার অতীন্দ্রিয় পরিবেশনায়। ঠিক একই আয়না দেশ-উপমহাদেশের মূলত গ্রামীণ লোকসংস্কৃতিতে।
হ্যাঁ, বাকি ক্ষেত্রে আমরা পরাজিত। সমাজ যে দিন থেকে সংবাদ বলতে প্রধানত রাজনীতি বুঝেছে, রাজনীতি বলতে বুঝেছে ক্ষমতার প্রদর্শনী, প্রদর্শনী বলতে আত্মপ্রচার বুঝেছে আর আত্মপ্রচার বলতে অন্যকে খর্ব করা বুঝেছে, সে দিন থেকেই সহিষ্ণুতার মৃত্যু ঘটেছে। কিন্তু ভিন্নমত বা প্রতর্ক-বিতর্ক কখনওই সহিষ্ণুতার পথের কাঁটা নয়, বরং রথের রশি। গালিলেয়ো, অ্যারিস্টটল, শ্রীচৈতন্য, শেক্সপিয়র, মার্ক্স, রবীন্দ্রনাথ, লালন, গান্ধীরা নিজেদের মত স্পষ্ট করে বলার চর্যাপদ রেখে গিয়েছেন। কিন্তু অসহিষ্ণুতার ধারাভাষ্য দেননি তাঁরা। প্রথম জীবনের ন্যায়-তার্কিক শ্রীচৈতন্য ‘তৃণাদপি সুনীচেন তরোরিব সহিষ্ণুনা’র কথা বলে গিয়েছেন। ভগবদ্গীতা বলেছে, ‘তান্ তিতিক্ষস্ব’— সহনশীল হওয়ার কথা। তিতিক্ষার কথা বলে গিয়েছে বিশ্বসাহিত্য, বিশ্বসংস্কৃতি।
যদিও সমাজমাধ্যমে সমাজসংস্কারক হয়ে ওঠার পারদর্শিতায় সে-সব ঔদার্য আজ আর আমাদের নয়। আজ আমরা রাত জেগে সেলফোনে ‘লাইভ’ যুদ্ধের রোমাঞ্চ বুঝলেও কেন ‘কোয়ালিটি অব মার্সি ইজ় নট স্ট্রেনড’, বুঝে উঠতে পারি না। পোর্শিয়ার ওই বিখ্যাত সংলাপের মতোই বুঝতে অসমর্থ হই, শাইলক কেন প্রশ্ন করলেন— ইহুদিদের কি চোখ নেই? হাত, ইন্দ্রিয়, স্নেহ, আবেগ নেই?— আদতে, সহিষ্ণুতা এক পক্ষের বিষয়ও নয়। সহিষ্ণুতা সর্বতো-মান্য না হয়ে উঠলে তার কর্মশক্তি বিলুপ্তও হয়। কিন্তু তার পরেও, প্রতর্ক জরুরি হলেও, আঘাত সমাধান নয়।
মহাভারতে যক্ষের ছদ্মবেশধারী যম যুধিষ্ঠিরকে প্রশ্ন করেছেন— পরম ধর্ম কী? যুধিষ্ঠিরের উত্তর— আঘাত না করাই পরম ধর্ম। যুধিষ্ঠির অহিংসা, সহিষ্ণুতার কথা বলছেন। তবে, এটাও ঠিক, যুদ্ধে তিনি আঘাতই করেছেন প্রতিপক্ষকে। না, গুলিয়ে যাওয়ার কিছু নেই। সে কালের ধর্মযুদ্ধ বা এ কালের প্রকৃত বিপ্লব-স্বরাজসংগ্রাম বা অস্তিত্ব রক্ষার ভাবনায় সহিষ্ণুতা-অসহিষ্ণুতার সংজ্ঞা আলাদা। অন্যায়ের সত্য বিরোধিতা অসহিষ্ণুতা নয়। পীড়নের যথার্থ প্রতিবাদ অসহিষ্ণুতা নয়। মৌলবাদের মাদক খাইয়ে, মস্তিষ্ক প্রক্ষালন যন্ত্রে মগজধোলাইয়ের সুবন্দোবস্ত করে, সমাজমাধ্যমে ছদ্মবিপ্লব করে, খাপ পঞ্চায়েতে নিদান শুনিয়ে যাঁরা অন্যের জীবন দুর্বিষহ করে তোলেন, তাঁদের প্রতি অসহিষ্ণু হওয়াও অসহিষ্ণুতা নয়। দার্শনিক অরিন্দম চক্রবর্তী লিখেছেন— “সহিষ্ণুতাকে দেখা উচিত ‘ডাবল নেগেশন’ দিয়ে”— অসহিষ্ণুতার প্রতি অসহিষ্ণুতা।
আদতে, সভ্যতার শিলালিপিতে খোদিত হয়েই রয়েছে সহিষ্ণুতার দিশা-নির্দেশিকা, সাম্যসূত্রী মঙ্গলকামনা— ‘সব্বে সত্তা সুখিতা ভবন্তু’।
আমরা ব্যস্ত। খেয়াল করিনি।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)