E-Paper

যোগ্য-অযোগ্য

এক সময়ে মেঘের স্তর ফাটিয়ে দশমী বা একাদশীর চাঁদ উঁকি মারে। হালকা কাঁপন তুলে খোলা জানলা দিয়ে জোলো বাতাস ঢুকে ঘরময় ঘুরে বেড়াতে থাকে।

সুব্রত নাগ

শেষ আপডেট: ০১ মার্চ ২০২৬ ১০:৫১
ছবি: রৌদ্র মিত্র।

ছবি: রৌদ্র মিত্র।

চাকরিটা অনেকটা হঠাৎ করেই চলে গেল প্রকাশের।

অবশ্য হঠাৎই বা কেন! এ রকম যে হতে পারে, গত কয়েক মাস ধরেই তো আঁচ পাওয়া যাচ্ছিল। চাপা একটা অস্বস্তি অনবরত পাক খেয়ে খেয়ে ফেনিয়ে উঠছিল মাথার মধ্যে। খবরের কাগজ, সোশ্যাল মিডিয়া, চায়ের দোকান, মাছের বাজার— সর্বত্রই প্রশ্নটা ঘুরছিল লোকের মুখে মুখে। সত্যিই কি বাতিল? না কি মাফ? বাতিল হলে কি মুড়ি-মিছরি সবই বাতিল? লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে গেলেও সন্ত্রস্ত থাকত প্রকাশ, এই বুঝি অনিবার্য প্রশ্নটা ধেয়ে এল, “মাস্টারমশাই, আপনার চাকরিটা থাকছে তো?”

কাল সারা রাত ঘুম প্রায় আসেইনি প্রকাশ আর ওর স্ত্রী অহনার চোখে। বেডরুম লাগোয়া একফালি ছোট্ট বারান্দায় দুটো চেয়ারে অনেক রাত অবধি জেগে বসেছিল দু’জনে। সন্ধেবেলায় আচমকা হানা দিয়েছিল কালবৈশাখী। একরাশ ধুলোবালি আর শুকনো পাতা উড়িয়ে ঝোড়ো হাওয়া ঝাপটা মারছিল দরজা-জানলায়। সঙ্গে দোসর হয়েছিল মেঘ-ভাঙা বৃষ্টি। ঝড় আর বৃষ্টির দমকে গুমসানি গরম গেল কমে।

এক সময়ে মেঘের স্তর ফাটিয়ে দশমী বা একাদশীর চাঁদ উঁকি মারে। হালকা কাঁপন তুলে খোলা জানলা দিয়ে জোলো বাতাস ঢুকে ঘরময় ঘুরে বেড়াতে থাকে। আরামে বিছানায় শুতে না শুতেই ঋজু আর রিনি ঘুমে কাদা। মশারি টাঙিয়ে কোণগুলো ভাল করে গুঁজে বারান্দায় এসে অহনা দেখে, প্রকাশ একটার পর একটা সিগারেট খেয়ে যাচ্ছে।

“আজ কিন্তু বড্ড বেশি খাচ্ছ!”

“কী করব? ধোঁয়ার গন্ধে টেনশনটা যদি কমে।”

“কী ছেলেমানুষি করছ?” প্রকাশের ঠোঁট থেকে সিগারেটটা টেনে নিয়ে গ্রিলে ঘষে নিভিয়ে দেয় অহনা। তার পর ছুড়ে ফেলে বাইরে।

অবাক হয় প্রকাশ, “সবে ধরিয়েছিলাম... ফেলে দিলে?”

“হ্যাঁ দিলাম!” মৃদু ঝাঁঝ অহনার গলায়, “শরীরের বারোটা বাজবে তো! খামোখা টেনশন করে...”

“খামোখা মানে? খামোখা টেনশন করছি আমি!” এক মুহূর্তের জন্য প্রকাশের চড়া গলা নিস্তব্ধ মাঝরাতকে চিরে দেয়। পরক্ষণেই অবশ্য সামলে নেয় প্রকাশ। চাপা গলায় বলে, “কাল থেকে হয়তো জীবনটাই ওলট পালট হয়ে যাবে আমাদের, নিশ্চিন্ত শব্দটাই হয়তো জীবন থেকে মুছে যাবে এর পর, আর তুমি বলছ খামোখা টেনশন করছি!”

প্রকাশকে শান্ত হওয়ার সময়টুকু দেয় অহনা। তার পর বলে, “টেনশন হওয়াই তো স্বাভাবিক, কিন্তু টেনশন করে কোনও সলিউশন বেরোবে কি? আর তুমি তো একা নও, হাজার হাজার ক্যান্ডিডেট রয়েছে...”

“তা রয়েছে,” অহনার কথাটা লুফে নেয় প্রকাশ, ‘‘তারাও হয়তো আমাদের মতোই রাত জাগছে...”

প্রতিবেশী বিকাশবাবুদের বাড়ির আমগাছ দুটোতে এ বার প্রচুর মুকুল ধরেছে। থেকে থেকে হালকা হাওয়া খেললেই মায়াবী গন্ধের আবেশ নাকে ঝাপটা মারে। অবশ্য আজকের ঝড়ের দাপট সামলে কতগুলো আর অবশিষ্ট আছে কে জানে!

আলগা একটা হাসি বোধ হয় ফুটেছিল প্রকাশের মুখে। অবাক হয় অহনা, “হাসছ যে বড়?”

“আনন্দ কিংবা খুশিতে নয়,” মাথা নাড়ায় প্রকাশ, “হাসছি সন্ধেবেলার কালবৈশাখীর কথা ভেবে। পনেরো-কুড়ি মিনিটের একটা স্পেলে তাণ্ডব চালিয়ে কী ভাবে চার পাশ তছনছ করে দিয়ে গেল!”

অহনা স্বামীর কথার দিশা না পেয়ে বলে, “কালবৈশাখীর ঝড় তো এমনই হয়...”

“ধরো যদি, এ রকমই একটা কালবৈশাখী কাল দুপুরে আমাদের উপর আছড়ে পড়ে? থেঁতলে দেয়, উপড়ে ফেলে দেয় আমাদের আনন্দ-হাসি, আশা-আকাঙ্ক্ষা, শখ-আহ্লাদ, বর্তমান-ভবিষ্যৎ, সব কিছু? আজকের প্রাকৃতিক কালবৈশাখী আগামী কালের সামাজিক বা মানসিক কালবৈশাখীর পূর্বাভাস নয় তো?”

“ওভাবে ভাবছ কেন?” অহনা বোঝাতে চেষ্টা করে, “কালবৈশাখীর ঝড় বেশি ক্ষণ থাকে না, এভাবেও তো ভাবতে পারো। দেখো না, এখন আকাশ একদম পরিষ্কার! ঝড়, মেঘ, বৃষ্টি, কোনও কিছুর চিহ্ন নেই।”

মাথা উঁচু করে তাকায় প্রকাশ। সত্যিই, একছিটে মেঘও আকাশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত কোথাও নেই! অর্ধগোলাকার চাঁদটা বীরদর্পে আকাশময় রাজত্ব করছে। অকৃপণ জ্যোৎস্নার ফালি জানলা আর মশারির ফাঁক গলে ঋজু আর রিনির মুখের উপর পড়ছে। কী নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে ওরা! পশ্চিম দিকে কাঠা দশেক নিচু ঘাসজমি এখনও ফাঁকা, জমে থাকা জলে সরের মতো ঘন জ্যোৎস্না নেমে এসেছে।

অহনা প্রকাশের পিঠে হাত রাখে, “এ বার শোবে চলো, রাত দেড়টা বেজে গেছে।”

“হ্যাঁ চলো,” উঠতেই যাচ্ছিল প্রকাশ। কিন্তু হঠাৎই মনে হল একটা জরুরি প্রশ্ন, হয়তো সবচেয়ে জরুরি, এই মুহূর্তে অহনাকে করা দরকার। দু’হাতের আলতো টানে স্ত্রীকে নিজের দিকে ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করে, “তুমি তো অন্তত বিশ্বাস করো যে, আমি সত্যিই যোগ্য?”

মুখ তোলে অহনা। তার পর অদ্ভুত গলায় প্রশ্নটা প্রকাশের দিকেই ফিরিয়ে দেয়, “তুমি নিজে জানো তো তুমি সত্যিই যোগ্য কি না...”

হিমেল জোলো বাতাস, না কি অহনার প্রশ্ন... কিসে যেন এক বার কেঁপে উঠল প্রকাশ। রাতচরা কোনও পাখি ডানা ঝাপটে উড়ে গেল। দু’হাতের বেড়ে এখনও আটকে আছে জ্যোৎস্না-ভেজা অহনা। এই শরীরের প্রতিটি আঁকবাঁক কত চেনা! মাথার চুলে মাখা তেলের গন্ধ, গালে মাখা ক্রিমের গন্ধ, সবই তো চেনা। তবু এই রাতের গভীরে এক চিলতে ব্যালকনিতে গড়ে ওঠা রহস্যের খাসমহলে অহনাকে কী ভীষণ অচেনা লাগছে!

বিড়বিড় করে প্রকাশ, “এত কঠিন প্রশ্ন কেন করো তুমি?”

*****

স্কুলে নাইন বি-র ক্লাস টিচার প্রকাশ। রোল-কল শেষ করে ইংরেজি কবিতার বইটা টেনে নিয়ে সবে জিজ্ঞেস করেছে, “যে পোয়েমটা কাল পড়ানো হয়েছে, তার সারমর্মটুকু কে কে বলতে পারবে? রেজ় ইয়োর হ্যান্ডস— হাত তোলো...”

কোনও হাত ওঠার আগেই প্যান্টের বাঁ পকেটে রাখা ফোনটা বেজে উঠল। সচরাচর জরুরি ফোন ছাড়া ক্লাসে ফোন-কল রিসিভ করে না প্রকাশ। মোবাইলটা বার করে দেখে, ক্লার্ক বিনয়ের ফোন! ধরব না, ধরব না করেও ফোনটা রিসিভ করে প্রকাশ আর করতেই... ওপাশ থেকে হাঁউমাউ করে ওঠে বিনয়, “সর্বনাশ হয়ে গেল প্রকাশদা, ভার্ডিক্ট দিয়েদিল কোর্ট!”

“ক্-কী রায় দিল কোর্ট?” গলাটা কেঁপে গেল প্রকাশের।

“ক্যানসেল! হোল প্যানেল ক্যানসেল!” বিনয় যেন আর্তনাদ করে ওঠে, “আমি, আপনি, নীহারদা... সবার চাকরি বাতিল।”

আরও কিছু হয়তো বলতে যাচ্ছিল বিনয়, কিন্তু তার আগেই প্রকাশের ডান হাতের যান্ত্রিক আঙুল ফোন অফ করে দেয়। মুহূর্তের জন্য মনে হল চার পাশটা যেন এক বার দুলে উঠল; ঝাপসা হয়ে গেল দৃষ্টি! হালকা হয়ে গেল বুকের ভিতরটা; দু’-তিনটে বিট পরিষ্কার মিস করল হার্ট। ক্লাসরুমের চেয়ার-টেবিল, সামনে সারি সারি বেঞ্চে বসে থাকা ছাত্রদের মুখ, খোলা কবিতার বই, হাতের চক-ডাস্টার, পিছনে ব্ল্যাকবোর্ড... সব এক লহমায় শেষ!

“পোয়েমের সামারিটা লেখো...” ধরা গলায় কোনও রকমে কথাগুলো বলে বারান্দায় এসে দাঁড়ায় প্রকাশ। এই মুহূর্তে ছাত্রদের কাছ থেকে একটু আড়াল দরকার। এদিকের বারান্দা থেকে স্কুলের মাঠটা পরিষ্কার দেখা যায়। মাঠের এক পাশে স্কুল হস্টেল; মিড-ডে মিলের রান্নাঘর, অন্য দিকে ছোট একটা পুকুর, পুকুর ঘিরে কয়েকটা তালগাছের জটলা, তার পর স্কুলের বাউন্ডারি ওয়াল। সব কিছু ঠিক আছে! শুধু তাদের মতো কিছু হতভাগার জীবন আচমকা ধাক্কা খেয়ে, দুমড়ে মুচড়ে একটা বিরাট শূন্য হয়ে গেল!

*****

সেকেন্ড পিরিয়ডটা অফ থাকে প্রকাশের। অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টারের টেবিলে রোল-কলের খাতা রেখে টিচার্স রুমে এসে বসতেই চার-পাঁচ জন সিনিয়ার টিচার হইহই করে ঘিরে ধরলেন। ফিজ়িক্সের তাপসদা সটান বলেন, “একদম ভেঙে পড়বে না। আমরা টিচাররা সবাই তোমাদের সঙ্গে আছি। আমরা জানি, এই স্কুলের স্টুডেন্টরা, তাদের গার্জেনরা, সবাই জানে তুমি, নীহার কতটা যোগ্য।”

“আপনি, আমি আর পাঁচ জনে ভেবে তো লাভ নেই,” লাইফ সায়েন্সের বিভাসদা মাথা নাড়েন, “আসল কথা কোর্ট কী ভাবল! সেখানে তো একেবারে ফাঁসির অর্ডার দিয়ে দিল!”

“হাল ছেড়ো না তোমরা,” তাপসদা সাহস জোগান, “হায়ার কোর্টে অ্যাপিল করো।”

“কী ফালতু কথা বলছেন?” ভুল শুধরে দেন বিভাসদা, “হায়েস্ট কোর্টে রায় দিয়েছে, চ্যালেঞ্জ জানাতে আর কোন হায়ার কোর্টে যাবে?”

ফিচেল সমীর ফুট কাটে, “ইন্টারন্যাশন্যাল কোর্টে গেলে হয় না? প্রাগ্ না কোথায় যেন?”

“ইয়ার্কি মেরো না!” দাবড়ানি দেন তাপসদা, “দেখছ একটা হাইলি সেনসিটিভ ইস্যু; ও তোমার হাই কোর্ট হোক বা সুপ্রিম কোর্ট! যোগ্য, অযোগ্য আলাদা করবে না? সবাই সাজা পাবে? দিস ইজ় নট জাস্টিস।”

নানা রকম বক্তব্য, উপদেশ, আশঙ্কা পেশ করে বাকি টিচাররা যখন নিজের নিজের ক্লাসে চলে গেলেন, প্রকাশ আবিষ্কার করল ফাঁকা টিচার্স রুমে ও আর নীহার পাশাপাশি বসে আছে। শহরের নামকরা স্কুলের দুই খারিজ হওয়া টিচার! প্রকাশ আড়চোখে জরিপ করে নীহারকে। ইতিহাসের টিচার, আচ্ছা, ও কি যোগ্য? তাপসদা যা-ই বলুক, স্কুলে স্টুডেন্টদের কাছে টিচার হিসেবে মোটেই কদর নেই নীহারের। উঁচু ক্লাসের ছেলেরা তো পিছন থেকে ‘ডবল রিডিং’ বলে আওয়াজ দেয়।

“বাড়িতে জানালে?” নীহারই প্রথম নীরবতা ভাঙে।

গলাটা শুকিয়ে গিয়েছিল। বোতল থেকে দু’ঢোঁক জল গলায় ঢেলে প্রকাশ বলে, “নাহ্‌, এমনিতেই জেনে যাবে। ব্রেকিং নিউজ় বলে টিভিতে নিশ্চয়ই দেখাতে শুরু করে দিয়েছে এতক্ষণে।”

“ভাবলে কিছু?”

“কিসের ব্যাপারে?”

“এখন আমাদের কী করা উচিত! কোথায় যাব আমরা?”

হতাশ ভাবে দু’দিকে মাথা নাড়ে প্রকাশ, “নাথিং! কিচ্ছু ভাবিনি। মাথাটাই তো কাজ করছে না।”

নীহার ইতস্তত করে। তার পর বলে, “বোনের বিয়েটা বোধহয় ক্যানসেল হয়ে গেল!”

“সে কী!” চমকে ওঠে প্রকাশ, “সামনের মাসেই তো?”

“আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব— অর্ধেকের উপর নিমন্ত্রণ করা হয়ে গেছে; কবে লজ বুক করেছি! থার্টি পার্সেন্ট অ্যাডভান্স দিয়ে ফেলেছি। কেটারার, ডেকোরেটর, ফুলের সাজ, শাড়ি-গয়না কেনাকাটা সব কমপ্লিট, এখন যদি বিয়েটা ক্যানসেল হয়, তা হলে অবস্থা কী দাঁড়ায় বলো তো?”

“কিন্তু বিয়েটা ক্যানসেল হবে কেন?” জানতে চায় প্রকাশ।

“পরশু ছেলের বাবা ফোন করেছিল। বলল, কোর্টের রায়ে যদি আমার চাকরিটা যায়, তা হলে ওরা অন্য রকম ভাবতে বাধ্য হবে।”

“আশ্চর্য! এতে তোমাদের দোষটা কোথায়?” অবাক হয়ে জিজ্ঞেসকরে প্রকাশ।

“গড নোজ়! কোর্টের রায়ে চাকরি খারিজ হওয়ার পরেও যদি আমাদের সঙ্গে কুটুম্বিতা করেন, তা হলে নাকি ওঁদের সামাজিক সম্মান নষ্ট হবে!” নীহার চেয়ারে মাথাটা হেলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে, “যে ভয়টা পাচ্ছিলাম, সেটাই সত্যি হল। এই ধাক্কা এখন নিজে সামলাব না বোনটাকে সামলাব! এই বাজারে এতগুলো টাকা ইনভেস্টেড হয়ে আছে...”

মাথাটা দপদপ করতে শুরু করেছে প্রকাশের। ইদানীং এই উৎপাতটা শুরু হয়েছে! প্রচণ্ড টেনশন হলেই মাথা জুড়ে টাট্টুঘোড়ার নাচন শুরু হয়। মাইগ্রেন বোধহয়!

নীহারের মতো বোনের ঝামেলা হয়তো নেই প্রকাশের; কিন্তু হাউস বিল্ডিং ব্যাঙ্ক লোন আছে, প্রতি মাসে কুড়ি হাজার টাকা ইএমআই কাটে। বাচ্চা দুটোকে নামী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করেছে। আজ এই, কাল ওই... খরচের মা-বাপ নেই। সামলাবে কী করে? এক মুহূর্তে জীবনটা রঙিন থেকে থেকে সাদা-কালো হয়ে গেল!

সেকেন্ড পিরিয়ড শেষ হওয়ার ঘণ্টা বাজতেই নতুন একটা অস্বস্তি শুরু হল প্রকাশের। সেভেন এ-র ক্লাস আছে এই পিরিয়ডে। কী করবে? যাবে ক্লাসে? কোর্টের রায়ে খারিজ হয়ে যাওয়া এক জন টিচারের কি উচিত ক্লাসে যাওয়া? টিচার তকমাটাই যখন অফিশিয়ালি মুছে গেল, তখন কোনও এক প্রকাশ মাস্টারের কী আদৌ আর কোনও অধিকার আছে সাবজেক্ট টিচার হিসেবে ক্লাস নেওয়ার?

সাত-পাঁচ ভেবে হেডমাস্টারের কাছে গিয়ে সমস্যাটা খুলে বলে। হেডমাস্টার অসিতবাবু শুকনো গলায় বলেন, “এক্ষুনি স্কুল প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এই কথাটাই হচ্ছিল। হোয়াট শুড উই ডু?”

“দেখুন, ক্লাস নিতে আপত্তি নেই। কিন্তু নিলে আবার কনটেম্পট অব কোর্ট হবে না তো?”

হেডমাস্টার কিছুক্ষণ মাথা চুলকান, কপালে বাড়তি দুটো ভাঁজ পড়ে। ফোনে কারও সঙ্গে দু’-চার বার হুঁ-হাঁ করেন। তার পর বলেন, “আজকের দিনটা যেমন চলছে তেমনই চলুক, অ্যাজ় ইউজ়ুয়াল ক্লাসে যান। ডিআই অফিসে এক বার খোঁজ নেব; রাতে এম সি-র মেম্বারদের সঙ্গেও কথা বলব। দেখি ওঁরা কী সাজেশন দেন...”

*****

সেভেন-এ ক্লাসটা যথেষ্ট ভাল। বেশ কিছু মেধাবী ছাত্র আছে, যাদের উপর টিচারদের নজর আছে। তেমনই এক জন ঋষভ সরকার। ফর্সা, গোলগাল, এক মাথা কোঁকড়ানো চুল। ইংরেজির ভিতটা বেশ পোক্ত— গ্রামার, রাইটিং, কম্প্রিহেনশন— খুঁত নেই কোথাও। প্রকাশের ভারী ন্যাওটা ছেলেটা। ক্লাসে পড়ানোর সময় প্রকাশ লক্ষ করে, ঋষভের দৃষ্টি তার মুখের উপর থেকে এক মুহূর্তের জন্যেও সরে না। চেয়ারে বসে প্রকাশ জিজ্ঞেস করে, “কী যেন হোমটাস্ক দিয়েছিলাম আগের দিন?”

ঋষভ উঠে দাঁড়ায়, বলে, “একটা ইংলিশ প্যারাগ্রাফ লিখতে দিয়েছিলেন স্যর, ‘দ্য ম্যান হুম ইউ অ্যাডমায়ার মোস্ট’।”

“যারা লিখে এনেছ, এক-এক করে খাতা নিয়ে এসো।”

অন্যান্য দিনের মতো ঋষভই প্রথম এগিয়ে আসে। খাতাটা এগিয়ে দেয় প্রকাশের দিকে। বুকপকেট থেকে লাল পেনটা হাতে নিয়ে খাতা খোলে প্রকাশ, ঝরঝরে মুক্তোর মতো হাতের লেখা! প্যারাগ্রাফটা পড়তে গিয়ে প্রথম লাইনেই হোঁচট খায় প্রকাশ! ঋষভ লিখেছে, “দ্য ম্যান হুম আই অ্যাডমায়ার মোস্ট ইজ় আওয়ার ইংলিশ টিচার প্রকাশ স্যর।...”

চমক নয়, যেন বিছের কামড় কিংবা সাপের ছোবল খায় প্রকাশ! মোস্ট অ্যাডমায়ারেবল ম্যান কি না খারিজ হয়ে যাওয়া প্রকাশ স্যর! সব জেনেশুনে ব্যঙ্গ করছে না তো ছেলেটা? নাকি এটা সত্যিই ওর মনের মধ্যে জমে থাকা শ্রদ্ধার প্রতিফলন?

দ্রুত প্রকাশের চোখ চলে যায় পরের লাইনে, লিখেছে, “হি ইজ় আ ভেরি অ্যামিকেবল অ্যান্ড রেসপেক্টেড টিচার।”

অসহ্য লাগে প্রকাশের! ঋষভ নিজে না করলেও ‘রেসপেক্টেড’ শব্দটাই যেন একরাশ ঘৃণা আর ব্যঙ্গ ছুড়ে দিচ্ছে ওর দিকে। দ্রুত বাকি অংশে চোখ বোলায়। দুটো স্পেলিং মিসটেক আছে। লাল পেনটা দিয়ে কারেকশন করতে গিয়েও থমকে যায় প্রকাশ। এক জন বাতিল টিচারের কী এক্তিয়ার আছে লাল কালি দিয়ে ছাত্রের খাতা কারেকশন করার?

“লেখাটা ঠিক আছে, স্যর?” জানতে চায় ঋষভ।

প্রকাশ কোনওমতে বলতে পারে, “সত্যিকারের কোনও মহাপুরুষ সম্পর্কে লিখিস, কেমন? আমাকে নিয়ে নয়।”

“কেন স্যর?”

থমকে যায় প্রকাশ। কী উত্তর দেবে ও? কাল রাতে অহনার প্রশ্নের চেয়েও কঠিন এই প্রশ্ন। অস্বস্তি হচ্ছে প্রকাশের, গুমোট লাগছে ভীষণ! মাথার উপরে মান্ধাতা আমলের ফ্যানটা আপ্রাণ ডানা ঝাপটালেও হাওয়া নামছে সামান্যই। দেবশিশুর মতো অপার্থিব সারল্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে যে নিষ্পাপ কিশোর, তাকে কী জবাব দেবে ও? চোখ না তুলেও প্রকাশ বুঝতে পারে, শুধু ঋষভ নয়, গোটা সেভেন-এ তাকিয়ে আছে তাদের ইংরেজি স্যরের দিকে। কী অসহ্য তাদের সারল্য আর বিশ্বাস! ঘণ্টাটা পড়লেও যে বেঁচে যেত প্রকাশ। আড়চোখে এক বার হাতঘড়ির দিকে তাকায়, এখনও বারো মিনিট বাকি! অন্তহীন এই বারোটা মিনিট কী ভাবে কাটাবে সে?

আরও দু’-চার জন ছাত্র খাতা নিয়ে রেডি হয়ে আছে। ঋষভের পরে তারাও আসবে দেখাতে। ঋষভের মতো তারা যদি একই কথা লেখে? ‘রেসপেক্টেড’, ‘লার্নেড’, ‘অনারেবল’— প্যারাগ্রাফটার মধ্যে এই শব্দগুলো যদি আততায়ীর হিংস্র ছোরার মতো ঝকঝক করে? আচমকা হিমশীতল ভয়ের স্রোত শরীর জুড়ে বইতে শুরু করে।

বিশ্বাস নেই এদের। কোথায় কতটুকু বলতে হবে, সে জ্ঞানও নেই। এদের মতোই কেউ এক জন সেই অমোঘ, তীক্ষ্ণ প্রশ্নটা ছুড়ে দিয়েছিল না— “রাজা, তোর কাপড় কোথায়?”

বলা যায় না, আজ হয়তো ঋষভ কিংবা ওর বন্ধুদের মধ্যে কেউ হঠাৎ জিজ্ঞেস করে বসল, “স্যর, আপনি যোগ্য তো?” তখন? তখন?

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bengali Short Story Short story

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy