১৯৬৯ সালে যখন আমি গুয়াহাটির কটন কলেজে শিক্ষকরূপে যোগ দিয়েছি, কাগজে পড়লাম সুনীতিকুমার সাহিত্য অকাদেমির সভাপতি পদে নিযুক্ত হয়েছেন। মনে খুব আনন্দ হল, সে কথা সবিনয়ে তাঁকে একটি চিঠিতে জানালাম। এক সপ্তাহ পেরোতে না পেরোতে এল আচার্যের উত্তর! চিঠির শেষ লাইন, ‘আই অ্যাম গ্ল্যাড, পার্টিকুলারলি বিকজ় ইট হ্যাজ় মেড অল মাই ফ্রেন্ডস হ্যাপি’। ‘অল মাই ফ্রেন্ডস...’! আমি তখন তেইশ বছর বয়সের অর্বাচীন যুবক। চিঠি তো নয়, এ যে জয়পত্র!
এর প্রায় আট বছরের পরের ঘটনা। ১৯৭৭। আচার্য সুনীতিকুমারের প্রয়াণ ঘটে ২৯ মে ১৯৭৭ (জন্ম ২৬ নভেম্বর, ১৮৯০)। তার মাস তিনেক আগে ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে গেছি, গেছি তাঁরই অফিসে, বেলভেডিয়ারে। সরাসরি যাওয়ার না ছিল পরিকল্পনা, না ছিল সাহস। সম্ভব হল আর এক নমস্য চরিত্র, অধ্যাপক সুকুমার সেনের নির্দেশে। আমার পিএইচ ডি গবেষণাপত্রের কিছু সমস্যা-সমাধানের জন্য শরণাপন্ন হয়েছিলাম অধ্যাপক সেনের।
অধ্যাপক সেন বলে দিয়েছিলেন, “ওখানে গেলে পাবে শিশিরকুমার ব্যানার্জি আর অনিলকুমার কাঞ্জিলালকে। শিশিরবাবু পি এ, অনিলবাবু পি এস। যে কোনও এক জনকে বলবে, ‘সুকুমারবাবু পাঠিয়েছেন।’”
মাত্র দু’টি শব্দ! তার ওজন যে কত! শিশিরবাবুর সঙ্গে প্রথমে দেখা। শব্দদু’টি উচ্চারণ করতেই ম্যাজিক! বললেন, “আসুন, ভিতরে চলুন।”
বিশাল টেবিলের ও-ধারে পাঞ্জাবি-গায়ে নাতিদীর্ঘ সেই বিখ্যাত পুরুষ, টেবিলের এ-ধারেও এক বর্ষীয়ান ব্যক্তি, পণ্ডিত নিশ্চয়ই। টেবিলের পাশ দিয়ে গিয়ে প্রণামের উদ্যোগ করছি, শিশিরবাবু বলে উঠলেন, “আরে না, না... আপনি বসুন, স্যর কারও প্রণাম নেন না।”
দমে গিয়ে বসে পড়লাম। ওঁদের দু’জনের আলোচনায় ছেদ পড়েছিল, আমাকে চা দিতে বলে আবার সেই ভদ্রলোকের সঙ্গে আলোচনা শুরু করলেন সুনীতিকুমার। আমি সন্তর্পণে চায়ে চুমুক দিতে দিতে বিস্ময়ভরা চোখে সুনীতিকুমারকে দেখি! তখন তাঁর বয়স ছিয়াশি, কিন্তু আশ্চর্য কর্মক্ষম! বাঙালির নামের মধ্যপদ নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। বাঙালির নামের পরিবর্তন নিয়েও। মধ্যাংশকে প্রথমাংশের সঙ্গে জুড়ে রাখা না-রাখার বিভ্রাট নিয়েও কথা হল। শুনতে শুনতে বুদ্ধিভ্রংশ হল আমার, অনধিকারচর্চা করে বসলাম। বলে ফেললাম, “স্যর, আমার শিশুকালে আমাদের এক বন্ধু আপনাকে ‘সুনীতিপিসি’ বলে গৌরব আহরণের চেষ্টা করেছিল। দু’বছর আমার সেই ধারণাই ছিল, তার পর কথাটা আমার বাবাকে বলতে বাবা-ই দেখিয়ে দিলেন ‘ওডিবিএল’-এর দুটো খণ্ড, নাম দেখে আমার ভুল ভাঙল।”
বিষয়টা একটু খোলসা করা দরকার। একটা দুঃখ ছিল আমার। স্কুলের পুরস্কার বিতরণী সভায় এক জন বিশিষ্ট বক্তা ‘সুনীতি চ্যাটার্জি’র কথা শুনিয়েছিলেন আমাদের। সম্ভবত তখন ফাইভে পড়ি। অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার প্রমথ চট্টোপাধ্যায়ের সেজছেলে অলোক বালকমহলে প্রচার করল, ‘সুনীতি চ্যাটার্জি’ ওদের পিসি, আগামী পুজোর ছুটিতে হাইলাকান্দি আসবেন। সঙ্গত করল প্রমথবাবুর ছোটছেলে বাচ্চু। বাচ্চু আমার বয়সি। দুঃখ হল আমার, বাচ্চুদের পিসি এত বড় যে, সভায় তাঁর সম্পর্কে বক্তা এত ভাল কথা বললেন। আমার পিসি, নাহ্, আমার কোনও পিসিই নেই!
অনেক দিন মুখ বুজে দুঃখটা সইলাম। অলোকদের পিসি পুজোয় এলেন না, পরে ওরাও শিলচর চলে গেল। কিছু দিন বাদে বাবাকে এক দিন বললাম কথাটা। বাবা মৃদু হেসে অলোকের কথাতেই সায় দিয়ে বললেন, “হ্যাঁ, অলোকের ‘পিসি’ই বটে, কাল আমার সঙ্গে লাইব্রেরিতে যাবে, তোমাকে দেখাব পিসি কেমন বড় বড় বই লিখেছেন।” কিঞ্চিৎ অনিচ্ছা, কিছুটা কৌতূহল, পরের দিন বাবার সঙ্গে লাইব্রেরি গেলাম। মস্ত মস্ত দুটো চামড়ায় বাঁধানো বই বার করলেন বাবা, ‘দি অরিজিন অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট অব বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ’-এর দু’টি খণ্ড। লেখকের নাম সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়।
বাবা বললেন, “নামের মাঝখানে কুমার লেখা আছে, কুমারী নয়। সুনীতিবাবু পুরুষমানুষ। পুরুষমানুষ পিসি হয় কী করে?”
তার মানে অলোক আর বাচ্চু মিছে কথা বলেছে, আচ্ছা বোকা বানিয়েছে আমাকে! আজ ভ্রংশবুদ্ধি আমি এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো শেষ করেই দেখলাম উপবিষ্ট ভদ্রলোক মিটিমিটি হাসছেন, আচার্য সুনীতিকুমার চশমা খুলে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে।
ভয়ে, লজ্জায়, ক্ষোভে আমার মাথা নত হল। অর্বাচীন আমি এ কী করলাম! এত বড় এক জন মানুষের সামনে বাচালতা হয়ে গেল কি! কী ভাবলেন উনি!
ওঁদের আলোচনা চলতে থাকে, মাথা নিচু করে সসঙ্কোচে শুধু শুনে যাই। এক সময়ে সুনীতিকুমারই প্রসঙ্গ পাল্টে জিজ্ঞেস করলেন, “যোগীরাজ বসু কেমন আছেন?”
বললাম, “তিনি নেই।” কৃষ্ণকান্ত সন্দিকৈ আর যোগীরাজ বসুর কথা বলতে থাকলেন, দেখতে পেলাম শ্রদ্ধাবনত সুনীতিকুমারকে। ধীরে ধীরে আমার থিসিস প্রসঙ্গে উত্থাপিত সংশয়গুলোও জলের মতো করে বুঝিয়ে দিলেন।
সুনীতিকুমারের সঙ্গে দরকারি আলোচনার শেষে কৃতার্থচিত্তে উঠে দাঁড়িয়েছি, করজোড়ে প্রণাম জানিয়ে দরজার কাছে এগিয়ে পর্দা সরাতে গেছি, তখনই তিনি জোরালো কণ্ঠে ডাক দিলেন, “উষারঞ্জনবাবু, শুনুন, আপনারও কিন্তু রেহাই নেই; এক দিন হয়তো অপরিচিত মহলে আপনাকেও মাসি বানিয়ে কেউ গর্ববোধ করবে। আপনিও সাবধান!”
বিস্মিত আমি ঘুরে দাঁড়িয়ে তাঁকে আবার নমস্কার করলাম, তখুনি মুখে আমার কোনও কথা জুটল না, ওঁরা দু’জনেই হেসে উঠলেন। পরক্ষণে মনে কী যে দোলা লাগল!
ধীরপায়ে বেরিয়ে গেলাম ক্যান্টিনে, চায়ে চুমুক দিতে দিতে অবাক হয়ে ভাবলাম, কেন ভারতের শ্রেষ্ঠ আচার্য এক অপরিণত যুবককে সখ্যভাবে সাবধানতার ছলে কতখানি সম্মান দিলেন! একটু আগে অধোবদন দেখে কি আচার্যের মনে করুণা জেগেছিল, গ্লানিমুক্ত করার জন্যই নেমে এলেন চুড়ো থেকে আমার সমতলে, অনুশোচনা-দগ্ধ আমাকে সিক্ত করতে? কৃতজ্ঞতা অলোককে, বাচ্চুকে। ওদের অলীক স্বর্গ থেকেই একুশ বছর পর পুষ্পবৃষ্টি হল। ওরা জানতে পারল না।
শুরুতে একটা খটকা ছিল আমার। আচার্য সুনীতিকুমার আমাকে তুমি না বলে আপনি বললেন, হাঁটুর বয়সি আমাকে বললেন– উষারঞ্জনবাবু! এমন কেন? পরে বুঝতে পেরেছিলাম সকলের প্রতিই তাঁর এমন ব্যবহার। সুকুমারবাবু নিজেই বলেছেন তিনি ‘সুনীতিবাবুর চেলা’। ‘চেলা’কেও সারাটা জীবন আপনি বলেছেন সুনীতিকুমার। জীবনে একবার মাত্র নাকি এর ব্যত্যয় ঘটেছিল। আত্মজীবনীতে সে কথা বলেছেন সুকুমারবাবু। গুরু-শিষ্য সুনীতিকুমার ও সুকুমার সেনের সম্পর্ক ছিল শ্রদ্ধা, প্রীতি ও আস্থায় গড়া। ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে এক সভায় সভাপতি সুনীতিকুমার ছাত্র সুকুমার সেনকে ‘আচাৰ্য সুকুমার সেন’ বলে আহ্বান করেছিলেন। শুনে বিস্মিত ও মুগ্ধ হয়েছিলাম।
‘দ্বীপময় ভারত’ সুনীতিকুমারের লেখা অসাধারণ বই। ১৯২৭-এর ১৪ জুলাই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ সুনীতিকুমার, সুরেন্দ্রনাথ কর, ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ দেববর্মাদের সঙ্গে নিয়ে মাদ্রাজ (বর্তমান চেন্নাই) থেকে পূর্ব দ্বীপপুঞ্জে যাত্রা করেন। এই ভ্রমণকথা সুনীতিকুমারের কলম থেকে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রথমে বেরোয় ধারাবাহিক ভাবে, পরে বই হয়ে বেরোয় ‘দ্বীপময় ভারত’ নামে। সুনীতিকুমার সম্পর্কে কী বলেছেন রবীন্দ্রনাথ, সে কথা না শুনলেই নয়, “আমি তাঁকে [সুনীতিকে] নিছক পণ্ডিত বলেই জানতুম। অর্থাৎ, আস্ত জিনিসকে টুকরো করা ও টুকরো জিনিসকে জোড়া দেওয়ার কাজেই তিনি হাত পাকিয়েছেন বলে আমার বিশ্বাস ছিল। কিন্তু এবার দেখলুম, বিশ্ব বলতে যে-ছবির স্রোতকে বোঝায়, যা ভিড় করে ছোটে এবং মুহূর্ত স্থির থাকে না, তাকে তিনি তালভঙ্গ না করে মনের মধ্যে দ্রুত এবং সম্পূর্ণ ধরতে পারেন আর কাগজে-কলমে সেটা দ্রুত এবং সম্পূর্ণ তুলেনিতে পারেন।”
এ ছাড়া সুনীতিকুমারের উপস্থিতি আছে কবির ‘শেষের কবিতা’য়, ‘বাংলা ভাষা-পরিচয়’-এর উৎসর্গপত্রে ‘ভাষাচার্য’ অভিধায় এবং কবির চিঠিতে।
সুনীতিকুমারের শেষ অসম্পূর্ণ লেখার কথা বলি অন্তিমে। আত্মজীবনী লেখার অনুরোধ সুনীতিকুমার বার বার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, শেষে ইচ্ছে গেল তা-ই লিখতে। ১৯৭৭-এর ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি মাঝে মাঝে লিখে গেছেন ‘জীবন-কথা’, শেষ করতে পারেননি, কারণ চোখের দৃষ্টি ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে উঠেছিল। অনেক কাজ ছিল বাকি। দুর্দমনীয় প্রাণশক্তি বুকে নিয়ে ‘জীবন-কথা’তে রচনা করে গেছেন তাঁর জীবনবেদ। পড়তে পড়তে বুঝতে পারি জিজ্ঞাসা আর খোঁজার কোনও অন্ত নেই। উজ্জ্বল বুদ্ধি লক্ষ চেষ্টায়ও ভেদ করতে পারে না শাশ্বত দুর্জ্ঞেয়কে। আমাদের মতো অস্থির অজ্ঞানের কাছে সামাজিক সুনীতিকুমারের ‘জীবন-কথা’ এক নির্ভয় তরণী অথবা সুস্মিত পথরেখা বলে মনে হয়।
সুনীতিকুমারের বিশাল সৃষ্টিভান্ডারের সেরা দু’খানি বইয়ের একখানি ‘দি অরিজিন অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট অব বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ’ (দু’খণ্ডে), ১৯২৬, দাম কুড়ি টাকা। সুকুমারবাবু লিখেছেন, “সুনীতিবাবুর বই বেরোল। ইংরেজীতে লেখা। কোন উত্তেজনা হল না। বাংলায় লেখা হলে কি তা হত? মনে হয় না। তবে পিছনে ঢাকীর দল থাকলে অবশ্যই হত।... সুনীতিবাবুর বই বেরোল কিন্তু তাতে ‘আ মরি বাংলা ভাষা’র ছড়িদারদের সাড়া মিলল না। তবুও তখন বাঙালীর মধ্যে মানুষ ছিল। এইরকম একজন মানুষ নিজের ঘরে সুনীতিবাবুকে সমুচিত সংবর্ধনা দিলেন। সেদিন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বাঙালী জাতির মুখপাত্র হয়েছিলেন। Origin and Development of the Bengali Language প্রকাশ উপলক্ষে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় তাঁর পটলডাঙার বাড়িতে সুনীতিবাবুকে ও তাঁর কতিপয় জনকুড়িক-বন্ধুবান্ধবকে নিমন্ত্রণ করে প্রচুর জলখাবার খাইয়ে ছিলেন। অনেক খাবার তিনি নৈহাটি থেকে করিয়ে এনেছিলেন। তিনি জানতেন আমাকে সুনীতিবাবুর চেলা বলে। তা ছাড়া সুনীতিবাবুর বইয়ের ভূমিকায় আমার নাম আছে, শব্দ-নির্ঘণ্ট করে দিয়েছিলুম বলে। তাই আমারও নিমন্ত্রণ হয়েছিল।...”
১৯৭৭-এর এপ্রিলের শেষের দিকে আমি সুনীতিকুমারকে উদ্দেশ করে একখানি চিঠি লিখি। আমার দিক থেকে সংশয়জাত তিনটে প্রশ্ন। ২৭ এপ্রিল চিঠি পৌঁছেছিল তাঁর কাছে। পরের দিন ২৮ এপ্রিল চিঠির জবাব দিলেন শিশিরবাবু, তাঁর পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট। চিঠির বক্তব্য ছিল, আচার্য আমার চিঠি দেখেছেন, কিন্তু তাঁর পক্ষে এখনই কোনও উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। চোখে ছানির সমস্যায় তিনি কষ্ট পাচ্ছেন, খুব শীঘ্রই অস্ত্রোপচার করতে হবে।
১৭ মে নার্সিংহোমে ভর্তি হন, ১৮ মে ডা. বলাইকুমার মিত্র বাঁ চোখের ছানি কাটেন, ২৪ মে আচার্য বাড়ি ফিরলেন সুস্থ হয়ে।
২৯ মে হঠাৎ বার্ধক্যজনিত বিপর্যয়! শুয়া উড়িল রে!
সুনীতিকুমার-প্রয়াণে অন্নদাশঙ্কর রায় যথার্থই লিখেছিলেন, “এই সংস্কারমুক্ত পৌরুষের সামনে মাথা আপনি নত হয়।”
এ বছর সেই ইন্দ্রপতনের অর্ধশত বর্ষের সূচনা!
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)