সে-কালের গ্র্যান্ড হোটেলের নীচে আর্কেড মধুশালার দোতলায় বসে প্রেমেন মিত্তির বলছিলেন, “এ তো ভাল কথা নয়, এক ফোঁটা মদ্যপান না-করেই তুমি মদের এ-টু-জ়েড জেনে ফেলবে, আমি যেমন বিলেত না-গিয়েই লন্ডনের গলিঘুঁজি মুখস্থ করে ফেলেছি!”
আর শঙ্করীপ্রসাদ বসু বনগাঁর বাঙালকে উৎসাহ দিলেন, “বড় হোটেলে গাঁটের কড়ি গচ্চা না-দিলে, লেখা যাবে না কে বলেছে! হোটেলের ঝাড়ুদার, বালিশবাবু, টেম্পোরারি কর্মচারীর চোখ দিয়েই তুই লিখতে থাক তো!”
‘দেশ’ পত্রিকার অমন বাঘা সম্পাদক সাগরময় ঘোষেরও বুঝি চাপা টেনশন ছিল! বিলিতি ডিগ্রিধারিণী বিদুষী লেখিকার চিঠি আসছিল, “কাকে দিয়ে আপনারা কী লেখাচ্ছেন!” তার উপরে একবার মুদ্রণ প্রমাদে ‘বেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্ট’ শব্দবন্ধটি ‘ব্রেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্ট’ বেরোনোয় আরও চিত্তির। অনেকে ধরেই নিলেন, এও সেই মফস্সলি লেখকের মূর্খামি! মোদ্দা কথা, মণিশংকর মুখোপাধ্যায় নামের অনূর্ধ্ব ৩০ যুবার জীবনটা তখন একেবারেই মসৃণ যাচ্ছিল না। সদ্য যুবার কলমে ‘কত অজানারে’ বেরিয়ে ‘হিট’ হলেও ‘ওয়ান বুক অথর’ তকমাই যেন সেই নবীনের জীবনে ভবিতব্য বলে লেখা হয়ে গিয়েছে।
তিনি আর্কেডের বারে বসে প্রেমেনদা-র কথা শুনে জড়োসড়ো ভঙ্গিতে ‘লেম্বু পানি’তে চুমুক দিচ্ছিলেন। কিংবা তাঁর জীবনের প্রযোজক, পরিচালক, সুরকার শঙ্করীদার উৎসাহবাক্যে খানিক বল পাচ্ছিলেন। পরের ঘটনা অবশ্যই ইতিহাস! কিন্তু পর পর বেস্টসেলারের ছক্কা হাঁকানো শংকর এবং তাঁর সেদিনের উপন্যাস ‘চৌরঙ্গী’র জয়যাত্রা আজও এক ধরনের চমকপ্রদ বিস্ময়ের খোরাক হয়ে আছে।
এই তো সে-দিন, ২০২৩-এর ডিসেম্বরেও ক্যালকাটা ক্লাব ‘হাঁ’ হয়ে শুনেছে শংকরের গল্প। কচি বয়সে পিতৃহারা নিম্নবিত্ত ঘরের হাওড়াবাসী যশুরে এক নবীনের কলকাতা-জয়ের আখ্যান। আজকের ক্যালকাটা বা বেঙ্গল ক্লাবের ভদ্রমণ্ডলীর আড্ডায় তাঁর ট্রেডমার্ক বিনয়ী কিন্তু দুষ্টুমিমাখা হাসিটা ঠোঁটে ঝুলিয়ে রেখেছেন প্রবীণ। আপাত নিস্পৃহ স্বরে ক্যালকাটা ক্লাবের আসরে বলেছেন, “তখন কিন্তু আমি কক্ষণও এ ক্লাবে সামনের পোর্টিকো দিয়ে হেঁটে আসার চান্স পাইনি। মালকোঁচা মারা ধুতি, পাঞ্জাবি পরে টেনিস কোর্টের পাশ দিয়ে বারওয়েল সাহেবের ঘরের বারান্দায় উঠতুম!” কলকাতার শেষ ব্রিটিশ ব্যারিস্টার ফ্রেডরিক নোয়েল বারওয়েল তখন ক্যালকাটা ক্লাবের একতলায় ৭ নম্বর ঘরের বাসিন্দা। স্ত্রীকে রানিখেতের পাহাড়ে রেখে অবসর-জীবনের আগে কলকাতায় কাজকর্ম সামলাচ্ছেন। বারওয়েলের অবশ্য কর্মজীবন শেষ হয়নি। কলকাতা থেকে মাদ্রাজে কাজে গিয়ে আচমকাই তাঁর জীবনে পূর্ণচ্ছেদ পড়ে। ক্যালকাটা ক্লাবে বারওয়েলের ঘরের বাইরে আজও স্মারকচিহ্ন বিদ্যমান। বললে ভুল হবে না, ওই ঘর থেকেই ভাবীকালের যশস্বী এক বঙ্গসন্তানের প্রতিভায় শান দেওয়ার পর্ব চলছিল।
উকিলের সন্তান শংকর ছিলেন সেই সাহেব ব্যারিস্টারের মুহুরি। তবে বারওয়েল শুধু কেজো ডিক্টেশন দিতেন না, এক মুখচোরা যুবকের জীবনপথের আলোকবর্তিকাও ছিলেন। অল্প দিনেই শংকরকে অনেক দূর পথ চলার জ্যোতিরেখা এনে দেন যিনি। ক্যালকাটা ক্লাবের লাইব্রেরিতে শ্রীমতী বারওয়েলের স্মৃতিকথাতেও এই মুকুজ্জের প্রতি সাহেবের অপত্যস্নেহের উল্লেখ রয়েছে। শংকরের লেখা সাক্ষী, বারওয়েল সাহেবই তাঁকে প্রথম বিয়ার-আহ্বান করেন। শংকর পরে বলেছেন, গোঁড়ামি নয়, প্রথম চুমুকে তেতো লাগায় এবং পকেটের প্রশ্রয় না-মেলাতেই তিনি আর ও-পথে হাঁটেননি।
কিন্তু বারওয়েল সাহেব তাঁর স্নেহভাজনটিকে অননুকরণীয় স্টাইলে সামাজিক আদব-কায়দা শিক্ষা থেকে কলকাতার সম্ভ্রান্ত পাড়ার ঘাঁতঘোঁত চিনিয়েছিলেন। শিশুর মতো, “তুমি আজ আমায় লাঞ্চ খাওয়াবে, সিনেমা দেখাবে...” আবদার করে বারওয়েলই চুপিচুপি শংকরের হাতে টাকা গুঁজে দেন, তার পরে নবীন-প্রবীণে মিলে এক সঙ্গে ঘটে কলকাতা-অভিযান, যেখানে নিজেকে গুটিয়ে রেখেও বারওয়েলই ছিলেন প্রকৃত পথনির্দেশক।
ভবিষ্যৎ কর্পোরেট চাকরির অনেক দূর সিঁড়ি ভেঙে বা সাহিত্যিক যশ মুঠোয় আসার পরেও শংকর মাটিতে পা রেখে নিজেকে গুটিয়ে রাখার ছদ্মবেশ ধারণ করে চলেছেন। যেন তিনি কোনও শাপভ্রষ্ট রাজপুত্তুর। কর্পোরেট পরিসরে বা ক্লাবের আড্ডায় নিজ ব্যক্তিত্বে স্থিত থেকেও উচ্চকিত নন। সওদাগরি অফিসের চৌকস সহকর্মী, বসেদের সান্নিধ্যে স্বেচ্ছায় নিজেকে একটু স্তিমিত ভূমিকায় রেখেছেন। বেঙ্গল ক্লাব বা ক্যালকাটা ক্লাবে কদাচিৎই কোনও নিমন্ত্রণে তাঁকে দেখা গিয়েছে। যাঁরা বাংলা জানেন, ‘চৌরঙ্গী’ বা ‘সীমাবদ্ধ’র লেখককে দেখে অবশ্যই চমৎকৃত হয়েছেন। কিন্তু এ প্রশ্নটাও ঘুরপাক খেয়েছে, উচ্চকোটির জীবনের এত শত খুঁটিনাটি ইনি কখন জানলেন বা দেখলেন!
বেঙ্গল ক্লাবের ফুড অ্যান্ড বেভারেজ ম্যানেজার সুনীতকুমার মণ্ডল বললেন, “শংকরকে আপ্যায়নের কথা আমার তত মনে পড়ছে না! কিন্তু আমাদের স্মোকড ইলিশ বা অন্য রান্না বিষয়ক ওঁর লেখা নিয়ে রীতিমতো আলোচনা হত। ক্লাবের নামী স্টুয়ার্ট দেবেন মিত্তির খুব বলতেন শংকরের কথা, ওঁকে চিনতেনও! দেবেনবাবু কোভিডের সময়েমারা গিয়েছেন।”
শংকরের ছোট মেয়ে তনয়া বললেন, “বাবার সঙ্গেই হয়তো এক-দু’বার বেঙ্গল ক্লাবে কোনও ডিনারে গেছি। এ ছাড়া, লেখায় ব্যস্ত বাবা ছুটির দিনেও ছুটি নিচ্ছেন তত মনে পড়ে না।” আর বাংলায় সরস ভোজ-আখ্যানের জন্য সুবিদিত এই লেখকের শখের স্বাদ-আহ্লাদ বলতে শংকরের বড় মেয়ে মৌসুমীর মনে পড়ল, “ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে ডানলপের চাকরির সময়ে বাবা মাঝেমধ্যে গোল্ডেন ড্রাগনের চিকেন ফ্রায়েড রাইস, চিলি চিকেনগোছের কিছু আনতেন। সেটা আজও আমার কমফোর্ট ফুড।” তবে মৌসুমীর কাছে ডালাসে বেড়াতে গিয়ে নাতিনাতনিদের সঙ্গে বার কয়েক ম্যাকডোনাল্ডেসের চিকেন নাগেটস উপভোগ করেন শংকর। কলকাতায় অফিস ও লেখালিখির চাপে সচরাচর অতটা ফুরফুরে তাঁর থাকা হত না। তবে নকুড় নন্দীর মেজকত্তা স্নেহভাজন প্রশান্ত নন্দীর নানা নিরীক্ষায় নাছোড় অনুরোধে সঙ্গত করতে হত মণিদাকে। নকুড়ের নকুড়ত্ব ছিল তাঁর দুর্বলতার জায়গাও! রক্তে হালকা শর্করা থাকলেও গরম সদ্যোজাত ছানার পাক, চন্দ্রপুলিতে মুগ্ধ ছিলেন। প্রশান্ত একবার ছানার সঙ্গে মরিচ, মেয়োনিজ় দিয়ে নোনতা সন্দেশ গড়ে আনলে বিশেষ খুশি হননি ‘মণিদা’! খেলাচ্ছলে তৈরি সেই সন্দেশের নাম রাখেন, ‘চিনি না’!
রুচিতে নিপাট বাঙালি শংকর ডানলপের উঁচু পদে চাকরির সুবাদেই ক্যালকাটা ক্লাবের মেম্বার হন ১৯৮৪-তে। কিন্তু তখন তিনি সাধারণত সন্ধে সাড়ে সাতটায় শুয়ে পড়েন। তনয়ার মনে আছে, “আমাদের মা-ই যা স্কুল ফেরতা ক্যালকাটা ক্লাবের লাঞ্চে নিয়ে যেতেন! আমরা জানতাম বাবা ও-সব পারবেন না। এর জন্য রাগও হত না!”
বছর দশ-পনেরো আগেও আরপিজি গোষ্ঠীর হয়ে শংকরের প্রেস কনফারেন্সের নেমন্তন্ন মানে, বিজলিগ্রিলের প্যাকেটে ফিশ ফ্রাই, চিকেন কাটলেট, সন্দেশ মাস্ট। একটু বড় আয়োজনে স্নেহভাজন সাংবাদিককে বলতেনও, “কাজ মিটলেই চলে যেয়ো না কিন্তু, চিংড়ির মালাইকারি, ভীম নাগের দই করেছি!” আরপিজি-র ভিক্টোরিয়া হাউসে এই পর্বে তাঁর ছায়াসঙ্গী বিশ্বরূপ মুখোপাধ্যায় আবার দেখেছেন, দুর্গাপুরে স্পেনসর্সের বিপণি খুলতে গিয়ে সাহেবি লাঞ্চের ব্যবস্থাপনায় শংকরের বিরক্তি। জনৈক সুহৃদের অফিসে গিয়ে একটু ডাল-ভাত-কাতলাপেটি ভাজার আপ্যায়নে সোৎসাহে আত্মসমর্পণ করেছেন।
৭০-৮০-র কোঠায় পৌঁছেও চাকরিতে সক্রিয় শংকর এমন অনেকের সঙ্গে কাজ করেছেন, যাঁদের বাবারাও তাঁর সহকর্মী ছিলেন। স্পেনসর্সের এক জিএম অয়ন ঘোষ এক দিন তাঁর বাবা ফিলিপ্সের বিপণন কর্তা নিরঞ্জন ঘোষের (রনি) অ্যালবামে দেখেন, বাবাদের জাস্টিস চন্দ্রমাধব রোডের আপিসের বোর্ডরুমে তাঁর বাবা, সুচিত্রা মিত্র এবং স্যুট-টাইধারী শংকরের ছবি। সম্ভবত কোনও ইভেন্ট উপলক্ষে সঙ্গীতানুষ্ঠানের পরিকল্পনা হচ্ছিল। শংকরকে বলতেই তিনি স্মৃতিমুখর। স্পেনসার্সের এক ভিপি, মোহিত কাম্পানির বাবাও শংকরের ডানলপের সহকর্মী। মণিশংকরবাবুর চোখে, মোহিত বরাবরই স্রেফ মিস্টার কাম্পানির সুপুত্রই থেকে গিয়েছেন।
বাংলার কর্পোরেট জগতের ডাকসাইটে পিআর কুলে সাহিত্যিক শংকরের উপস্থিতি এক ভিন্ন মাত্রা বয়ে এনেছিল। আধা-ইংরেজ শাঁটুল গুপ্ত (রাধাপ্রসাদ), সনৎ লাহিড়ী, প্রবোধ মুকুজ্জে, দিলীপ মুকুজ্জেদের ধারা বহন করেও বাঙালি গৃহকর্তাসুলভ মেজাজ আমদানি করেন শংকর। আবার আমলা, ইতিহাসপ্রেমী জহর সরকারদের সঙ্গে আড্ডায় প্রায়ই কাটাছেঁড়া করতেন বঙ্গজীবনে মারোয়াড়িদের শাসনের ইতিহাস নিয়ে। কার্জন পার্কে স্যর হরিরাম গোয়েনকার মূর্তির পাদদেশে তাঁর ‘চৌরঙ্গী’ উপন্যাসের শুরু। সেখান থেকে কর্মজীবনে আমৃত্যু রমাপ্রসাদ গোয়েনকার সংস্থায় সসম্মান অধিষ্ঠান কাকতালীয় ভাবেই একটি বৃত্ত আঁকছে।
শংকরের সাহিত্য প্রতিভায় মুগ্ধ ছিলেন বাংলা মাধ্যমের ছাত্র রমাপ্রসাদ। আবার শংকরও তাঁর সাহিত্যিকের ধুতি-চাদর পেশাগত পরিসর থেকে দুরে সরিয়ে রাখতেন। মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য রাইটার্সে নেই। কিন্তু অমুক কথাটা সরাসরি বলবেন বলে আরপিজির প্রতিনিধি শংকর তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করে কাজ মিটিয়েছেন। পরে জেনে বুদ্ধবাবুই কুণ্ঠিত হন। শংকরের দীর্ঘ দিনের সহকর্মী ’৯৭-৯৮-এ আরপিজি নেটওয়ার্কের সিইও দিলীপ সেনের মনে আছে, ইএসপিএনের সঙ্গে মতান্তরে ক্রিকেট দেখানো নিয়ে টানাপড়েনে রাত একটা পর্যন্ত পার্ক স্ট্রিট থানায় বৈঠক চলেছিল। দায়িত্ববোধ থেকেই সারা ক্ষণ পাশে থেকেছেন শংকর। পরে ঠাট্টাও করেন, এই আপনার জন্যই আমার থানায় নিশিযাপনের এক্সপিরিয়েন্সটাও হয়ে গেল!
শংকরের কর্পোরেট পেশাদারিত্ব এবং সাহিত্যিকের ডেডলাইনের ভারসাম্য রক্ষাও ছিল দেখার মতোই!
অ্যাড এজেন্সির পেশাদার বরুণ চন্দ বার্ষিক কর্পোরেট রিপোর্ট নিয়ে বিশেষ দরকারে হাওড়ার গলিতে ডানলপ-কর্তা শংকরের বাড়ি গিয়েছেন। লেখক তখন ছুটি নিয়ে পুজোসংখ্যার উপন্যাস লিখছিলেন। ভবিষ্যতে ‘সীমাবদ্ধ’ ছবির নায়ক বরুণের এখনও মনে আছে, লেখার চাপের মধ্যেই প্রতিটি পাতায় সই করে দিয়েছিলেন মণিশংকরবাবু। তার পর তাঁদের পাড়ার দোকানের বিখ্যাত নিখুঁতি খাইয়ে আপ্যায়ন করেছিলেন।
সাংবাদিক থেকে জনসংযোগ কর্তা বিশ্বজিৎ মতিলাল, ঋতা ভিমানী বা তরুণতর প্রদীপ গুপ্তুরা সকলেই মণিদার এই সস্নেহ আপ্যায়নের স্মৃতি মনে রেখেছেন। সেই সঙ্গে ঘোরতর বিস্ময়, ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে ডানলপে দীর্ঘ আপিস-জীবনে পার্ক স্ট্রিট পাড়ার খুঁটিনাটি কেমন স্পঞ্জের মতো শুষে নিয়েছিলেন শংকর। নিজে জীবনযাপনে সাদামাটা গেরস্ত। কিন্তু নগরজীবনের আলো-অন্ধকারের সীমানা তিনি গুলে খেয়েছেন। বছর দশেক আগে মঞ্চ-মায়াবিনী মিস শেফালির আত্মকথা প্রকাশের সময়ে যোগ্যতম ব্যক্তি হিসেবে রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ ভক্ত শংকরকেই ডাকতে হয়েছিল। শংকরের চৌরঙ্গী-র মঞ্চায়নে বিশ্বরূপায় হোটেল নর্তকী কনির ভূমিকায় ছিলেন শেফালি। তখন কাগজের বিজ্ঞাপনে স্যাটা বোস বা শংকর নন, পাতা জোড়া ব্লোআপে তারার মতো জ্বলছেন শেফালিই। শেফালির ছবির পায়ের কাছে তাঁদের ছবি থাকায় অন্য অভিনেতাদের আঁতে লেগেছিল। শংকর কিন্তু তাঁর লেখায়, চৌরঙ্গীর অতীতের সব গৌরব ধুলোয় লুটিয়ে নাটকের প্রধান আকর্ষিকা হয়ে ওঠায় শেফালিকে অকপট কুর্নিশ করেন। শংকরের ‘সম্রাট ও সুন্দরী’তে থিয়েটার জীবনের খুঁটিনাটি ভালমন্দ, নিষ্ঠুরতা নিপুণ ভাবে ফুটে ওঠায় শেফালির আত্মকথা জুড়েও বিস্ময়, কী ভাবে এত কিছু জানলেন তিনি।
যৌবনে চাংওয়া রেস্তরাঁয় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সাগরময় ঘোষদের সঙ্গে কেবিনে বসে মদের বদলে জলের সঙ্গে চাইনিজ সস মিশিয়ে খেয়ে এই শংকর একদা বিপাকে পড়েন। চিনা রেস্তরাঁ মালিকের সন্দেহ হয়, লুকিয়ে সস্তার মদ এনে খাচ্ছেন তিনি। পরে মেনল্যান্ড চায়নার মালিক অঞ্জন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে ভাব হতে তাঁকে কলকাতার চিনা সসের পদ তৈরিতে উৎসাহ দিয়েছেন। মারোয়াড়ি সংস্থায় চাকরি করলেও বাঙালি ব্যবসায়ীরা অনেকেই শংকরের বিশেষ স্নেহপুষ্ট। অঞ্জনের বিলিতি রেস্তরাঁর নাম ‘চৌরঙ্গী’ জেনে বেজায় আনন্দ পেয়েছিলেন।
ঘোর সামাজিক, বিচিত্র জীবনের সাক্ষী এই সাহিত্যিকই কিন্তু আবার পেশাগত বাধ্যবাধকতায় খোলসের মধ্যে ঢুকে যেতেন। কাজের ক্ষেত্রে ক্ষুরধার বুদ্ধিধারী এই পেশাদারকে অনেকে বলতেন, উল্টোনো নারকেল। মানে বাইরেটা নরম হলেও ভিতরটা কঠিন খোলের মতো শক্ত। তাঁর লেখা প্রসঙ্গেও খুঁটিনাটি প্রশ্নের লতাপাতা অঙ্কুরে মুড়িয়ে ফেলতে দেরি করতেন না। শাজাহান হোটেলের অভিসারিকা মিসেস পাকড়াশী কে? ‘সীমাবদ্ধ’-র ওই ইলেকট্রিক পাখা কোম্পানি কি জিইসি-র আদলে? এ সব প্রশ্ন পেড়ে তাঁর কাছে বিন্দুমাত্র সুবিধা হত না।
চাকরিজীবনে কর্পোরেট অফিসে শংকরের ঘরে কখনও নেমপ্লেট বসেনি। অনুজপ্রতিম এক বন্ধুকে বলেছিলেন, নাম খোদাই করার অসারতার কথা। তবে সমসময় নিয়ে লিখে গেলেও মানতেন সাহিত্যিক জীবন মানেই আসলে বর্তমান নয়, ভবিষ্যতের বীমা করা। সত্যিই আজও হোটেল কর্তাদের মধ্যে সুভদ্র বিনয়ী সপ্রতিভ মুশকিল আসান কোনও চরিত্র দেখলে নিমেষে বাঙালি সহকর্মীদের মধ্যে তাঁর নাম হয়, স্যাটা বোস। সেটাও সাহিত্যিক শংকরের কালজয়ী সার্থকতারই প্রমাণ।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)