E-Paper

কেয়ার গন্ধ

দীপকে প্রায়ই মনে হয় কৈশোরে পড়া গুড সামারিটানের মতো। এক বার সন্ধে হয়ে গেছে, দীপ আসছে না, দীপঙ্কর গেলেন দেখতে। গিয়ে দেখলেন কেউ নেই মাঠে। অনেক দূর থেকে দেখা যাচ্ছে দীপ এক জনকে কাঁধে ভর দিয়ে নিয়ে আসছে, তার পায়ে চোট লেগেছে বলে।

অভিজিৎ চৌধুরী

শেষ আপডেট: ০৪ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:০৮

ছবি: সৌমেন দাস।

পূর্বানুবৃত্তি: মহকুমা তথ্য সংস্কৃতি দফতর থেকে শিল্পী ভাতার ব্যাপারে ডাক পেলেন জ্যোৎস্নাদেবী। সেখানে গিয়ে দেখা হল অন্যান্য শিল্পীর সঙ্গে। রাঁচির বেঙ্গলি ক্লাবে পালা নিয়ে যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ পেলেন জনমেজয়। তিনি তাঁদের সঙ্গে যেতে অনুরোধ করলেন দীপঙ্করকেও। দীপঙ্কর ছেলে দীপকে নিয়ে ওঁদের সঙ্গে যাবেন বলে ঠিক করলেন। বাড়ি ফিরে পল্লবীকেও সঙ্গী হওয়ার কথা বললেন, কিন্তু প্রত্যাশামতোই পল্লবী রাজি হল না। কিছু বোঝাপড়া করা বাকি আছে বলে তাকে থাকতে হবে, জানাল সে। যাওয়ার সময় দীপঙ্কর আর দীপের ট্রেনের খাবারও রান্না করে সঙ্গে দিয়ে দিল পল্লবী। প্রণাম করল দীপঙ্করকে, জ্যোৎস্নাদেবীর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিতে বলল তার হয়ে। ট্রেনে উঠে মায়ের জন্য একটু মনখারাপ হতে লাগল দীপের।

এক সময় ট্রেনের ঝাঁকুনিতে ঘুমিয়ে পড়ল দীপ। ছেলের নিষ্পাপ মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে রইলেন দীপঙ্কর। কত ছোট ছিল দীপ। এক বার তাদের দেওঘর যাওয়ার ছবি আছে তিন জনের। বাবার কোলে বসে হাসছে দীপ, ফোটো তুলেছিল পল্লবী। নন্দন পাহাড়ে তিন জনের এক সঙ্গে ছবি আছে।

দীপকে প্রায়ই মনে হয় কৈশোরে পড়া গুড সামারিটানের মতো। এক বার সন্ধে হয়ে গেছে, দীপ আসছে না, দীপঙ্কর গেলেন দেখতে। গিয়ে দেখলেন কেউ নেই মাঠে। অনেক দূর থেকে দেখা যাচ্ছে দীপ এক জনকে কাঁধে ভর দিয়ে নিয়ে আসছে, তার পায়ে চোট লেগেছে বলে। এ সব কেউ কখনও তাকে বাড়িতে করতে বলেনি। মানুষ বোধহয় শুভবোধ নিয়েই জন্মায়, আর শুভবোধ থাকলে সে খুব কষ্ট পায়— যেমন কষ্ট পায় গাছ, এই পৃথিবী নিজে।

পুরুলিয়া থেকে বাসে উঠছেন বীণাপাণি অপেরার শিল্পীরা।

পানসদা গুনে গুনে তুলছেন।

“জয়, জয়!” ডাকছেন পানসদা।

জনমেজয় সাড়া দিলেন। এই পালায় কৃষ্ণ সাজবেন জনমেজয়। কিন্তু পোস্টারে নাম লেখা রয়েছে বাসুদেব কৃষ্ণের ভূমিকায় জয় চ্যাটার্জি। অনেক দিন পর জনমেজয়ের মধ্যে জয় চ্যাটার্জি ফিরে আসছেন।

“পাঞ্চালী, পাঞ্চালী!” ডাকলেন পানসদা। ওর আসল নাম তনুশ্রী।

“কী রে যাজ্ঞসেনী, তোর বর এসেছে?”

“না, এল না শেষ মুহূর্তে। মা বাড়িতে একা আছেন তো। তবে পানসদা, আমাকে আবার যাজ্ঞসেনী বলে ডাকছেন কেন?”

“একই তো। দ্রৌপদী, কৃষ্ণা, সব নামই সেই পাঞ্চালী। চরিত্রের মধ্যে ঢুকে যেতে পারবি।কয়েক দিনের জন্য মৃত্যু হবে তনুশ্রীর।... কর্ণ, তুই কোথায় উঠেছিস?”

সুপার্থ সাড়া দিল, “এই যে পানসদা!”

“আর দুর্যোধন!”

“আমি, আমি।”

“তুমিটা কে?” বাজখাঁই গলায় জানতেচাইলেন পানসদা।

“শম্ভু, পানসদা।”

“না, তুমি শম্ভু চক্কোত্তি নও, তুমি যুবরাজ দুর্যোধন। ভীম, ভীম কোথায়?”

সম্রাট উত্তর দিল, “এই যে আমিবৃকোদর, পানসদা।”

“গুড, তোর রেসপন্স ভাল লাগল। এই ভজা, বেনারসি পান দে আমায়!”

ভজাও চলেছে রাঁচি।

“ড্রাইভার, মাখনলাল— বাস ছাড়ো হে!”

পানসদার গ্রিন সিগনালে বাস ছাড়ল।

নাটকের ডায়ালগ বলতে বলতে বাস এগোচ্ছে।

দীপঙ্করও কখন ঘুমিয়ে পড়লেন। দীপের ঘুম আসেনি। শুধু মায়ের কথা মনে পড়ে চোখ জলে ভরে উঠছে। মা কত আদর করত দীপকে। যখনই বায়না করত, নতুন রান্না করে দিত। ইদানীং মা বদলে যাচ্ছিল। কেন, কে জানে! শুধু বলত, “বুঝলি, তোর বাবা আর তোকে এমন ভাল রাখব ভাবতে পারবি না। আমাদের নিজস্ব গাড়ি হবে। ট্রেনে নয়, আমরা যাব ফ্লাইটে।”

এক দিন দীপ জিজ্ঞেস করল, “মা, তুমি মদপান করো?”

খিলখিল করে হেসে উঠেছিল পল্লবী, “তুই সাধু ভাষায় কথা বলছিস কেন?”

“বা রে! মদ খাওয়া তো হয় না, পানই তো হবে, কারণ তরল পদার্থ। মা, তুমি মদ খাও?”

“স্টেটাস বাড়াতে গেলে পার্টিতে যেতে হয়, ওসব খেতেও হয়। ওখানে যারা যায় তাদেরপ্রচুর টাকা।”

দীপ বলল, “মা, তোমার হরি মাঝির নৌকো চড়তে ভাল লাগে না?”

“আরে ধুস! দেখবি, সিলভার জেটে এক দিন চড়াব তোকে।”

“বাবাও চড়বে!”

“যাবে না, হিংসে।”

“বাবা কাউকে হিংসে করেন না।”

“করে, আমাকে করে শুধু।”

দীপঙ্কর ছেলের কাছে এসে বলল, “ঘুমোসনি! বিস্কুট খাবি?”

“না বাবা। ঘুম আসছে না।”

“চেষ্টা কর, না হলে কাল সারাদিন খুব চোখ জ্বালা করবে।”

২৫

পল্লবীর মনটা ভাল নেই। ফ্ল্যাট পাওয়া না-পাওয়া নিয়ে মনটা বড় অনিশ্চয়তায় ভুগছে।

জীবনটা তো তার মন্দ ছিল না। একটু ম্যাদমেদে। আলুনি লাগল। যৌবন, রূপ সবই তো ছিল। বাবা একটা সাধারণ ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিল। একটা কাপুরুষ। তাও আবার তার প্রথম বৌ বিয়ের রাতে পালিয়ে গেছিল। পলাশ মন্দ ছিল না। প্লেবয়, টাকা দিতে হত। দেবল ফাইভ স্টারে নিয়ে গিয়ে স্বপ্নটা হুস করে বাড়িয়ে দিল। এখন তার চাই-ই। বেশি কিছু নয়, গঙ্গার ধারে নিজের নামে একটি ফ্ল্যাট।

পল্লবী জানে, পুরুষেরা তার ক্রীতদাস। তার চাই টাকা আর টাকা। পুরুষ আর পুরুষ। আপাতত একটা ফ্ল্যাট।

হঠাৎই দেবল ফোন করল, “স্বামীদেবতা তো নেই এখন!”

“রাঁচি গেছে, ছেলেও গেছে।”

“চলে এসো তা হলে!”

“গিয়ে কী হবে, ফ্ল্যাটের মালকিন হতে পারব?”

“পারবে। সুবর্ণা সব মেনে নিয়েছে। বলেছে ফ্ল্যাট দিয়ে সব চুকিয়ে-বুকিয়ে দিতে হবে।”

পল্লবী বলতে যাচ্ছিল, ‘ঠিক আছে।’ কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “আসছি।”

দেবল বলল, “এসো ডার্লিং।”

আজ আর পার্লারে গেল না পল্লবী। চুলটা খোলা রাখল। হাতে নীল নেলপালিশ পরল। ম্যাচিং ঘড়ি, কানের দুল, একটা হার— সব ম্যাচিং করে পরল।

রাস্তায় নেমে ক্যাব ডেকে নিল। অনেকটা রাস্তা। ঘণ্টাখানেক লাগল, বা তারও বেশি হবে হয়তো। উত্তেজনায় ফুটতে ফুটতে পল্লবী গঙ্গার ধারে ফ্ল্যাটে চলে এল।

দেবল ছাদের উপর থেকে হাতছানি দিয়ে ডাকল, “চলে এসো।”

পল্লবী থার্ড ফ্লোরে উঠলে দেবল নেমে এল। লকটা খুলে ভিতরে ঢুকে দেবল জিজ্ঞেস করল, “কেমন লাগছে?”

পল্লবী চোখ সরাতে পারছিল না। এও তার জীবনে পাওয়া সম্ভব! অসাধারণ ইন্টিরিয়র ডেকরেশন! সাতশো স্কোয়ার ফুটকে নন্দনকানন বানিয়ে ফেলেছে। মেঝে ম্যাট ফিনিশ। দেওয়ালে হালকা রং। বাথরুমের শাওয়ারে শাড়ি পরা অবস্থায় ভিজে নিল পল্লবী।

“ডার্লিং, তোমার পছন্দ হয়েছে?”

উড়ে গিয়ে দেবলকে চুমু খেল পল্লবী।

দেবল বলল, “ককটেল বানিয়ে রেখেছি।”

“আমাকে বেহেড মাতাল করে দিয়ো না, প্লিজ়।”

“আরে ইয়ার, মাতাল না হলে এই মধুরাত জমবে কী করে!”

পল্লবীর মুখে মদের গ্লাস তুলে দিল দেবল।

দু’পেগ নিতেই আজ কেমন গা গুলিয়ে উঠল।

“খিদে পেয়েছে,” পল্লবী বলল।

দেবল বলল, “ও স্যরি, খাবার রেডি। চলো ডাইনিংয়ে বসবে।”

খেতে বসে পল্লবী বলল, “দলিলটা কবে হবে?”

“রেডি আছে, খেয়ে নাও।”

খাওয়ার পর দেবল একটা বায়নানামা বের করল। পুরোটা নকল। পল্লবী সই করল, দেবলও সই করল।

“হল ডিয়ার, এ বার মন খুশ?”

“তুমি যা দিলে, আমায় স্বপ্ন মনে হচ্ছে!”

“আরও হবে, শুধু আমাকে দিতে হবে।”

“তোমাকে নতুন করে আর কী দিতে হবে! সবটাই তো দিয়েছি।”

“চলো এখন বরং একটু ঘুমিয়ে নাও। রাতে কাজ করব।”

পল্লবীর বেশ নেশা হয়েছে, ঘুম-ঘুম পাচ্ছে।

সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত গড়িয়েছে, পল্লবীর নেশাও কাটছে। উঠে বসল পল্লবী, আলোগুলো জ্বালাল। একের পর এক ঘর দেখতে লাগল। তাদের এক তলার বাড়ির চেয়ে অনেকটা ছোট, তবে খুব আধুনিকতার ছোঁয়া আছে। পুব দিকের ঘরটা দীপঙ্করের জন্য ঠিক করল। দীপঙ্কর সূর্যপ্রণাম করে। পরের ঘরটা দীপ আর পল্লবীর। খুব এখন মনে পড়ছে ওদের কথা। দেওঘর, পুরী, দিঘা এসব জায়গায় গেছে। মোটামুটি ধরনের হোটেলে থেকেছে। এক সুন্দর পারিবারিক জীবনের কথা কখনও কখনও মনে হয়, তার পর অতিরিক্ত উচ্চাশা ওকে গ্রাস করে। তখন দীপঙ্কর আর ছেলের কথা মনে থাকে না। খুব ভাল ছাত্র দীপ, কখনও সেকেন্ড হয় না। কোনও চাহিদা নেই। তাদের সংসারে পল্লবী ছাড়া কারও কোনও প্রত্যাশা নেই। ওদের যেন সারা জীবন হরি মাঝির নৌকো হলেই চলে।

দেবল এল একটু পরে, দু’প্যাকেট বিরিয়ানি নিয়ে। মাটন বিরিয়ানি আর চিকেন চাঁপ। দু’জনে মিলে খেল। অদ্ভুত সুন্দর লাগছে পল্লবীর। শাড়ি পরেছে। মেয়েদের শাড়িতেই বেশি ভাল লাগে।

“তার মানে ফ্ল্যাট তোমার বৌয়ের নামে, আর আমি ভাড়াটে।”

“আর তো কয়েকটা দিন ডার্লিং। তার পরই বলব, এক জন কিনবে। টাকা একটু বেশি চাইবে। তখন আমি তোমার হয়ে কিনে নেব।”

“বিক্রির সময় আমার নাম দেখলে বিক্রি করতে রাজি হবে?”

“সে নিয়ে ভেবো না। সুবর্ণা টাকার বশ। সিলভার টনিক ওর বড্ড প্রিয়।”

চুপ করে রইল পল্লবী। ধৈর্য ধরতে হবে।

দেবল বলল, “খেয়ে আমরা ছাদে যাব। চারপাশটা খোলা। সাবধানে হাঁটবে।”

পল্লবী পরম নির্ভরতায় বলল, “তুমি তো আছ!”

দেবল একটু কঠিন হল। বলল, “চলো, একটু মদ খাই। হাওয়া আছে, নেশা জমবে।”

“আমি আর পারব না।... আমরা সাধারণ, তোমাদের তো কত আছে! একটা ফ্ল্যাট দিতে মন খারাপ হচ্ছে না তো! তোমার বৌ যা বলল আমায়!”

“ওর কথা ছাড়ো। এসো, একটু খাও, জাস্ট একটু... ছাদে খুব সুন্দর হাওয়া, দেখবে, ভাললাগবে তোমার...”

ছাদে উঠে বেড়াতে লাগল ওরা দু’জন। পল্লবীর গলার চার দিকে দেবলের আঙুল খেলতে থাকল। কপালের চার পাশে আদর বুলিয়ে দিতে থাকল পল্লবীর। কখন ওরা একেবারে ধারে চলে এসেছে, দেবল লক্ষ করলেও পল্লবী কিছুই বুঝতে পারল না। তার চোখ বন্ধ। সে দেবলের আদর উপভোগ করছে। তার মন বলছে, তারাভরা খোলা আকাশের নীচে একটু পরেই তাকে পেতে চাইবে দেবল। সে মনে মনে তৈরি হচ্ছে। দেবলের স্পর্শে মৃদু লয়ে জাগছে তার শরীর। ঠান্ডা হাওয়ায় মাথায় রিমঝিমেনেশার আবেশ।

যখন একেবারে ধারে নিয়ে এসে পল্লবীকে আলতো করে ধাক্কা দিল দেবল, তখন পল্লবীর প্রতিরোধ বলে আর কিছু থাকার কথা নয়। ছিলও না। পল্লবী লাট খেতে খেতে হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে নীচে পড়তে থাকল। মাত্র তিন বার “বাঁচাও!” শব্দটা শোনা গিয়েছিল। তার পর আর...

দেবল চোখ বুজে রইল। শেষমেশ এক বার ভেবেছিল পল্লবীকে টেনে ধরবে। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। এটা না করলে সুবর্ণা ওকে ছাড়ত না। পুরোটা সুবর্ণারই প্ল্যান। দেবলের পিছোনোর রাস্তাও ছিল না।

নিকষ অন্ধকার চারপাশে। অমাবস্যার গভীর রাত। দেবীপক্ষ শুরু হয়েছে। জনমানুষের চিহ্নও নেই কোথাও।

নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করে সুবর্ণা ফোন করল সোদপুর থানায়, “এক জন মহিলা খুন হয়েছে। খুনটা করেছেন আমার স্বামী দেবল।”

দেবল সুবর্ণাকে ফোন করল। এনগেজড। তার পর বার বার করল, প্রতি বারই সুবর্ণা ফোনটা কেটে দিল। দেবল বুঝল, সুবর্ণা খুব ঠান্ডা মাথায় প্রতিশোধ নিল। আর কিছু করার নেই। তার পিছোনোর রাস্তা ছিল না, এখন পালানোরও পথ বন্ধ হয়ে গেল।

হঠাৎ হু-হু করা একটা মনখারাপ উঠে এল দেবলের মনে। পল্লবীকে খুনটা না করলেও পারত। কিন্তু এখন আর কিছু করার নেই।

দেবল বাইকে কিক করল। সোজা চলে এল সোদপুর থানায়।

“মেজবাবু আছেন?” ঠান্ডা মাথায় জিজ্ঞেস করল। উনি দেবলের চেনা। পেশার খাতিরেই চেনাজানা রাখতে হয়।

“আছেন, উনি এখন ডিউটি অফিসার।”

মেজবাবুর সামনে দাঁড়িয়ে দেবল বলল, “স্যর, আমি খুন করেছি।”

মেজবাবু মুখ তুলে তাকালেন, “এ রকম করলে কেন দেবল! তোমার বৌ ফোন করে জানিয়েছে।”

“আমায় শাস্তি দিন স্যর, আমার ফাঁসি হওয়া উচিত!” গলাটা ভাঙা ভাঙা শোনায় দেবলের।

মেজবাবু বললেন, “কাল কোর্ট বন্ধ। তোমায় তুলতে তুলতে সোমবার হবে। আপাতত লক-আপেই থাকো।... আর একটা কথা দেবল, মেয়েটি বিবাহিত ছিল?”

“হ্যাঁ, স্যর।”

“ওর হাজ়ব্যান্ডের নাম জানো?”

“হ্যাঁ, জানি।”

“তাঁকে খবর দিতে হবে। তুমি কি উকিল নেবে?”

দেবল বলল, “না। আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না।”

“সুর্বণা তোমায় ট্র্যাপ করেছে?”

দেবল অদ্ভুত ভাবে বলল, “না। কেউ কিছু করেনি। আমার পাপের মূল্য আমাকেই দিতে হবে। সুবর্ণার কাছে আমার সন্তানেরা রয়েছে।”

লক-আপে ঢোকানো হল দেবলকে। লক-আপের ভিতরেও অস্বাভাবিক অন্ধকার।

মাটিতে পড়তে পড়তে পল্লবী চিৎকার করেছিল, “বাঁচাও... বাঁচাও...” শোনা গিয়েছিল মাত্র তিন বার।

দুই কানে হাত চাপা দিল দেবল। সেই আর্ত চিৎকার সে এখনও শুনতে পাচ্ছে। অজস্র বার।

রাঁচির আকাশে তখন এক ঝাঁক রাতচরা পাখি উড়ে গেল। দীপ ঘুমোচ্ছে। রাতে যাত্রা দেখতে যেতে হবে দুর্গামন্দিরে।

দীপঙ্কর বসে বাবার খেরোর খাতা পড়ছিলেন।

শোভাবাজার বটবৃক্ষের নীচে বটতলার ছাপাখানা। আদিরস, রতিমঞ্জরী-র প্রকাশক গঙ্গাকিশোর। আবার কোথাও লেখা বেঙ্গল গেজেট। নিঃশেষিত। আবার কোথাও কবিকঙ্কণের ভাষা অনুযায়ী চণ্ডীর পুস্তক।

এই সময় মোবাইল বেজে উঠল।

“আপনি দীপঙ্কর ঘোষ বলছেন?”

“হ্যাঁ। কে বলছেন?”

“আপনার ওয়াইফ একটু আগে খুন হয়েছেন। পাঁচ তলা ফ্ল্যাটের ছাদ থেকে ওঁকে ফেলে দেওয়া হয়েছে। খুনি নিজেই আত্মসমর্পণ করেছে। বডি পোস্টমর্টেমে পাঠানো হচ্ছে নিয়মমাফিক। আপনি চলে আসুন।”

ক্রমশ

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bengali Novel Bengali Series

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy